বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির গভীর থেকে উঠে আসা সুরের নাম ‘মেঠোসুর’। দীর্ঘ পথচলার সাক্ষি হয়ে এই ছোটকাগজটি যখন আঠারো বছরে পদার্পণ করেছে, তখন তার বর্তমান সংখ্যাটি কেবল একটি প্রকাশনা নয়—এ যেন এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের দলিল। বিরতির পর নতুন উদ্যমে প্রকাশিত এই সংখ্যা আমাদের সামনে তুলে ধরে বাংলার লোকঐতিহ্য, মননশীলতা ও সৃজনশীলতার এক সমৃদ্ধ ভুবন।
এই সংখ্যার প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন গ্রামীণ জীবনের নান্দনিকতা, লোকবিশ্বাস, সংগীত ও স্মৃতির সঞ্চিত ভাণ্ডারকে নতুন করে উন্মোচন করে। হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলোকে যত্নে তুলে এনে ‘মেঠোসুর’ কেবল সংরক্ষণই করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে তা অর্থবহ করে তুলছে। ফলে এটি একদিকে যেমন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য নির্মাণ করছে এক সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
এখানে যে সৃজনচর্চা ধরা পড়ে, তা নিছক সাহিত্যিক প্রকাশ নয়; বরং সমাজ-সংস্কৃতির গভীরতর উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। লোকজ জীবনবোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই তিনের সম্মিলনে ‘মেঠোসুর’ হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মঞ্চ, যা আমাদের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

বৈচিত্র্যময় সূচিপত্র : লোকজ জীবন ও সাহিত্যধারার সম্মিলন
এই সংখ্যার সূচিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘মেঠোসুর’’ তার স্বকীয় ধারাকে অটুট রেখে বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। গদ্য, পদ্য, গান, আলোচনা, প্রতিবেদন, ক্রোড়পত্র—সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংকলন।
গদ্য অংশে স্থান পেয়েছে লোকসংস্কৃতি, সংগীত, গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং ইতিহাসনির্ভর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। “বাংলার লোকসংগীত থেকে পশ্চিমা লোকসংগীত”, “তেলুয়ার ঘর : হারানো এক লোকউৎসব”, “কালের গহ্বরে বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ সংস্কৃতি”—এসব লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সংস্কৃতির বিবর্তন ও সংকটের চিত্র। এই ধারাবাহিকতায় “বাংলার ধানক্ষেতের বহুবর্ণিল রূপ” শীর্ষক আমার প্রবন্ধটি স্থান পাওয়ায় আমি বিশেষভাবে আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। বাংলার কৃষিজীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যে নান্দনিক রূপ সেখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, তা এই সংকলনের সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
পদ্য ও গানের অংশটি যেমন বহুস্বরের মিলন, তেমনি ক্রোড়পত্রে সংযোজিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা স্মরণ, অপ্রকাশিত রচনা ও বিভিন্ন লেখকের অবদান—যা এই সংখ্যাকে ঐতিহাসিক ও আবেগময় মাত্রা দিয়েছে। গল্প, গীতিনকশা ও আলোচনা অংশে সমকালীন সাহিত্যচর্চার প্রতিফলন লক্ষণীয়।

সম্পাদকীয় ভাবনা : পুনর্জাগরণের আহ্বান
সম্পাদক বিমান তালুকদার, তাঁর বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো—পুনরায় যাত্রার সংকল্প। দীর্ঘ বিরতির পর ‘মেঠোসুর’ আবার প্রকাশিত হওয়া নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন—লোভ, লালসা ও ভোগবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে কেবল সৃজনশীল শিল্প-সংস্কৃতি। তাই লোকপ্রজ্ঞার পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে ‘মেঠোসুর’ বাংলাদেশের চিন্তাচর্চায় নতুন আলোর সঞ্চার করতে চায়। এই ভাবনা কেবল একটি পত্রিকার নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভিত্তি।

শুভেচ্ছাবাণীর তাৎপর্য : সংস্কৃতি মানেই জাতির আত্মপরিচয়
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল তাঁর শুভেচ্ছাবাণীতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে জাতির দর্পণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—সংস্কৃতির অবক্ষয় মানেই আত্মপরিচয়ের সংকট।
তিনি উল্লেখ করেছেন, যখন মানুষ নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সমাজে এক গভীর মানসিক শূন্যতা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ‘মেঠোসুর’-এর কার্যক্রম—গ্রামে-গঞ্জে সাংস্কৃতিক চর্চা, শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ততা, লোকবাদ্যযন্ত্র মেলা, বই উৎসব—এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, পশ্চিমবঙ্গের করিমপুরে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘মেঠোসুর’-এর অংশগ্রহণ ও সম্মাননা অর্জন—যা এই সংগঠনের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে।

‘বাংলার ধানক্ষেতের বহুবর্ণিল রূপ’ : মৎপ্রণীত রচনা
‘বাংলার ধানক্ষেতের বহুবর্ণিল রূপ’ প্রবন্ধটি মূলত বাংলার কৃষিজীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক জীবনঘনিষ্ঠ উপস্থাপন। এখানে ধানক্ষেতকে কেবল খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং এক জীবন্ত শিল্পভূমি হিসেবে দেখা হয়েছে—যেখানে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রঙ, গন্ধ ও অনুভূতির পরিবর্তন ঘটে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে ধানক্ষেতের রূপ বদলায়—কখনো কচি সবুজ, কখনো হালকা হলুদ, আবার কখনো পাকা সোনালি। এই রঙের বৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, গ্রামীণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, শ্রম ও জীবনের প্রতীক হিসেবেও প্রতিফলিত হয়।
প্রবন্ধটিতে বিশেষভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যে, বাংলার ধানক্ষেত কেবল কৃষির অবলম্বন নয়; এটি লোকসংস্কৃতি, গান, উৎসব এবং সামগ্রিক জীবনচক্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই ধানক্ষেতের এই বহুবর্ণিল রূপ আসলে বাংলার নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্যেরই এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। আমার জীবনের সার্থকতা এই যে, আমি সেই অপরূপ দৃশ্য দেখেছি নানা সময়ে নানা মাত্রায়, নানা পরিপ্রেক্ষিতে, নানা আয়োজনে। সেই অভিজ্ঞতারই কিছু ধরার প্রয়াস করা গিয়েছে ‘মেঠোসুর’ আঠারো বছরপূর্তি সংখ্যায় আমার নাতিদীর্ঘ রচনায়।

‘মেঠোসুর’ : একটি পত্রিকার চেয়ে বেশি কিছু
এই আঠারো বছরপূর্তি সংখ্যা আমাদের উপলব্ধি করায় যে ‘মেঠোসুর’ কেবল একটি সাহিত্যপত্র নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, একটি চিন্তার ক্ষেত্র, একটি আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, সংগীত, কৃষিজীবন, মানবিকতা—সবকিছুকে ধারণ করে এটি এক ধরনের নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। বর্তমান সময়ে যখন বৈশ্বিক সংস্কৃতির চাপে স্থানীয় সংস্কৃতি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়, তখন ‘মেঠোসুর’ সেই হারানো সুরকে পুনরুদ্ধারের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা
এই গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যায় আমার প্রবন্ধ ‘বাংলার ধানক্ষেতের বহুবর্ণিল রূপ’ স্থান পাওয়ায় আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই সম্পাদক বিমান তালুকদার সহ সম্পাদনা পরিষদের সকল সদস্যকে, যাদের নিরলস পরিশ্রম ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতায় এই সংকলন সম্ভব হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘মেঠোসুর’ তার এই আঠারো বছরের পথচলায় যে আলোর দিশা দেখিয়েছে, তা ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত হোক। বাংলার মাটি ও মানুষের সুর যেন এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হতে থাকে—এই প্রত্যাশাই রইল।
২৫ মার্চ ২০২৬
মিহিরকান্তি চৌধুরী। লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার সিলেট
মিহিরকান্তি চৌধুরী রচনারাশি
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS