বেদনাটা আজ সকাল থেকেই শুরু হয়েছে।
দেবেশ রায়ের ‘উপন্যাসের খোঁজে’ নামে একটা প্রবন্ধের বই আছে। শিরোনাম ঠিক আছে কি না বুঝতে পারছি না। বইয়ের ভিতরের লেখা পড়ি কিন্তু বইয়ের নাম ভুলে যাই, এইটা আমার বহুদিনের পুরোনো অসুখ। মানুষকে বলতেও তো লজ্জা হয়। এইটা কোনো কথা! ভুল তো করেছি সাথে সেটা বড় করে বলছিও। মাপ করবেন বন্ধুগণ। যে মাছের ঝোল এই একটু আগে খেলাম, এখন যদি সেই মাছের নামই বলতে পারলাম না, এতবার কেউ বলে দেয়ার পরও ভুলে গেলাম বারংবার, সেইটা তবু মাপ করে দেয়া যায়। কিন্তু সাহিত্যে এইসব বালপাকনামি খাটে না, সিধা বাত। যা-ই হোক, বেদনার কথাটা আগে বলি। পরে যা বিচার হয় করবেন।
দেবেশ রায় উপন্যাসের ভাষা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ঔপনিবেশিক সিস্টেম কীভাবে মূল ভাষাকে সরিয়ে অন্য লেখাকে লিখতে বাধ্য করল লেখককে। যেমন ভারতীয় হয়ে রুশদি ইংরেজিতে লিখছেন, নাইপল আছেন, নারায়ণ আছেন, আফ্রিকা থেকে বিশাল তালিকা আছে। লাতিন থেকেও লম্বা তালিকা আছে। মার্কেস ইন্ডিয়ানদের নিয়ে লিখছেন স্প্যানিশ ভাষায়, তাদের ভাষায় নয়। সে যা-ই হোক, লেখার ক্ষমতা থাকলে যে-ভাষাতেই লিখুক, বিষয় সেইটা না, বিষয় হলো মূল জনগোষ্ঠীর ভাষাকে সরিয়ে অন্য আরেকটা ভাষাকে বাহন হিসাবে ব্যবহার করাটা কতটুকু টাচ করছে! কতটুকু তাকে ধরতে পারছে! চেতনে/অবচেতনে সে কোনোভাবে স্লিপ করছে না তো!! এইটা বড় জটিল হিসাব। এ নিয়ে বহুত তর্কবিতর্ক আছে। এই জটিলতার মধ্যে আমিও একজন। ফিল করতে পারছি বলেই তো এ-লেখাটা লিখলাম।
আমি মণিপুরি মেইতেইদের নিয়া লেখালেখি করি। ভাষা কোনটা? বাংলা। গল্পের চরিত্র মণিপুরি, মণিপুরিদের সমৃদ্ধশালী নিজস্ব ভাষা রয়েছে। অথচ তার ন্যারেটিভ দিচ্ছি বাংলায়, ডায়লগও বাধ্য হয়ে বাংলায় দিতে হচ্ছে। খেয়াল করবেন, আমি বলছি বাধ্য হয়ে। দেবেশ রায় উদাহরণ দিয়ে বলছেন, আফ্রিকা মহাদেশের বড় লেখক একজন থিবো নংগিগো, তিনি ইংরেজি ভাষায় তার জনপদের মানুষকে নিয়ে বড় বড় বই লিখেছেন। এক-সময় তিনি বুঝতে পারলেন, কোথায় একটা বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। নিজে বহুদিন তিনি এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্ধের মধ্যে কাটিয়েছেন। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে তিনি উপন্যাস লেখা থেকে অবসর নিয়ে নেন। একজন জীবিত লেখকের জন্য এইটা যে কত বড় যন্ত্রণার, কতটা যে তিল তিল করে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার, যারা এর ভিতর দিয়ে গেছেন, তারাই এইটা বুঝতে পারবেন। আমার বেদনার কারণ সেটাই।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, তিনি চাকমা ভাষায় উপন্যাস পড়তে চান। এখন তার সেই কথার ২০/২২ বছর পরে আমি জিগাই কোনো চাকমা ঔপন্যাসিককে, আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন?
- একটা ডিলেট করা সিনের মধ্যে ঢুকে বসে আছি || নাফিস সবুর - March 27, 2026
- মেঠোসুরের আঠারো বছরপূর্তি সংখ্যা : লোকজ চেতনার নবউদ্ভাস || মিহিরকান্তি চৌধুরী - March 26, 2026
- জ্বালা-নি-সংকট || নাফিস সবুর - March 26, 2026

COMMENTS