সাত্যকি ও তাজদার : ফার্স্ট এনকাউন্টার

সাত্যকি ও তাজদার : ফার্স্ট এনকাউন্টার

শেয়ার করুন:

তাজদার জুনায়েদের বাজানো শুনেছিলাম প্রথম সিলেটের একটা গানের আসরে। সেইটা আনুমানিক ২০০৮/’৯ হবে। সেই আসরের মধ্যমণি ছিলেন যিনি, তিনিই ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিয়েছিলেন তাজকে, এবং আরেকজনকে, মেধাবী মিউজিশিয়্যান হিশেবে। সেই আরেকজন সাত্যকি ব্যানার্জি। সেই আসরের মধ্যমণি ছিলেন মৌসুমী ভৌমিক। উনার গানের দলের দুই মেম্বার হিশেবে সেই প্রথম তাজদার ও সাত্যকি নামদ্বয় শুনি। ইউটিউবে এদের কাজ অ্যাভেইল করি এরও কয়েক বছর পরে। এই অনুষ্ঠানে প্লে করেছিলেন দুইজনেই। মৌসুমীর সঙ্গে। প্লে করেছিলেন সোলো, যন্ত্রে। একটা মাহোল তৈয়ার হয়েছিল আসরে। গেয়েছিলেন মৌসুমী ছাড়া সাত্যকি শুধু। ওই আসরটারই গল্প বলতে বসেছি এখানে।

এখানকার কয়েকজন কালচারাল-অ্যাক্টিভিস্ট মিলে একটা ইভেন্ট অর্গ্যানাইজ করার প্ল্যাটফর্ম গড়েছিলেন সহজিয়া   নামে। এরা ‘সহজিয়া আসর’ বলে একটা আয়োজন বছরে দুই-তিনবার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্থানীয় সংগীতসমুজদারদের কাছে। এবং হয়েওছিল সম্ভবত গোটা পাঁচেক আসর সর্বসাকুল্যে। সেখানে কমপক্ষে দুইবার এসেছিলেন মৌসুমী, মৌসুমী ভৌমিক, গান শুনায়েছিলেন এবং প্রোজেক্টরে ডকু দেখায়েছিলেন।

মৌসুমী ফিরে ফিরে এসেছেন এই অঞ্চলে, গানের কাজে, সেই সময়টায়। পানি-পাকুড়-করচ আর নিধুয়া পাথারের সুর ও হাহাকার আর সহজ মানুষের কথাবস্তু সংগ্রহণের কাজ। উনার একটা রিসার্চ প্রোজেক্ট আছে অনুমান করি। দি ট্র্যাভেলিং আর্কাইভ   নামে একটা ওয়েবক্ষেত্রকেন্দ্রী ক্রিয়াশীলতা আছে তার। খুব ঘরোয়াভাবে এসে গানের খোঁজকর্ম করে ফের চুপিসারে বাড়ি ফিরে যান। সেলেবসুলভ কোনো শোহরত ছাড়াই। কিন্তু ক্বচিৎ কখনো স্থানীয় শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধ-উপরোধে একাধটা আসরে রাজি হন গাইতে। তেমন এক-দুইটা আসরে অডিয়েন্সসারির একদম কর্ণারে অন্ধকার আসনে গ্যাঁট হয়ে বসে আমিও শুনেছি গানবাজনা মনে পড়ে। সেবার তাজদার জুনায়েদ নামে একজনকে মৌসুমী ইন্ট্রোডিউস করায়েছিলেন। তরুণ। বাজায়েওছিলেন মন্দ না। তবে সেই আসরে আমার কাছে সেভাবে ইম্প্রেসিভ কিছু মনে হয় নাই তাকে। সঙ্গত করেছিলেন তিনি মৌসুমীটিমে।

কিন্তু সেবার একটা অনেক বড় প্রাপ্তি ঘটেছিল আরেকজন তরুণ শিল্পীকে পেয়ে। মৌসুমীরই টিমমেইট হিশেবে এসে একদম মেসমেরাইজ করে দিয়েছিলেন বাজায়ে-গেয়ে। তিনি সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায়। খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শানে সেই ‘দিল্লিতে নেজামুদ্দিন আউলিয়া’ গান গেয়ে একদম খরিদ করে ফেলেন আমাকে এই শিল্পী চিরতরে। একটা কাওয়ালি ঢঙের রেন্ডিশন আগাগোড়া। তারপরও বহুস্বর তৈরি করে দেখিয়েছিলেন তিনি গানটায়, এক থেকে যেন শতকণ্ঠ শতবাদন উছলায়, তাক-লাগানো ও সমীহ-জাগানো তার গায়ন ও বাদন ও দম।

বাণীবাহিত গানে পোলিফোনি ক্রিয়েট করা সাংঘাতিক জোর ও জজবার কাজ বলে আমি মনে করি। গাইছেন একজন, অথচ সাউন্ডএফেক্ট ও আবহ এমন হয়ে ওঠে যে মনে হয় গাইছে অনেকে। এইটা আবার কয়্যার বা বৃন্দসংগীতশৈলী নয়। এই জিনিশ বাংলা গানে গরহাজির নয়। আছে। একদম রিসেন্ট উদাহরণগুলির মধ্যে যেমন কফিল আহমেদ এক অভিজ্ঞতা।

আনপ্যারালাল, অতুলনীয়, কফিলের পোলিফোনি। উপন্যাসে যে-পোলিফোনি ক্রিয়েট হয় দেখতে পাই আমরা, বাখতিন যেইটা নিয়া আলাপ বিস্তার করেছিলেন দস্তয়েভস্কির গদ্য টেবিলে রেখে, সেই জিনিশ; কফিলের একেকটা লাইনে একসঙ্গে সাতটা শঙ্খ তো ফুকারি ওঠেই, কথা কয়ে ওঠে তামাম কওম, গাছ পাখি তরুলতা মানুষ ও গরুমোষ কথা কয়ে ওঠে। এ নিয়ে কথা বলতে হবে একসময়, একদিন, আমাদেরে। অ্যানিওয়ে।

যেইটা বলছিলাম, সহজিয়া  তাদের প্রত্যেকটা আয়োজনে একটা লিটলম্যাগপ্রতিম অনুষ্ঠানস্মারক বের করেছে অলমোস্ট প্রত্যেকবার। ওইরকমই এক প্রকাশনায় তাজদার ও সাত্যকি সহ অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্য করা মৌসুমী ভৌমিক ও কলাকুশলীদের সকলের ক্যারিয়ারগ্রাফ সমেত সচিত্র লাইফপ্রোফাইল ফিচার করা হয়েছিল। প্রকাশনার প্রথমভাগে ছিল আহমদ শরীফ ও ফরহাদ মজহার প্রমুখের সঙ্গে এক-দুইটা আরও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক-প্রাবন্ধিকের সংজ্ঞানুসন্ধানী রচনা। তারপরে এই আসরের শিল্পীদের পয়পরিচয় নিয়া বাকি পাতাগুলি বিন্যাস্ত।

অনেকদিন পরে সেসব আর ভালো মনে পড়ে না। বাট সহজিয়া আসরের আয়োজক মূল ব্যক্তিটি ছিলেন অম্বরীষ দত্ত। ওই টাইমটার কথা বলছি, স্ক্রিনরিয়্যালিটির যুগ তখনও শুরু হয় নাই, চব্বিশঘণ্টা লাইভের লাইফ তখনও কল্পনার আওতার থেকে একটু দূরে, জেলাশহরগুলায় নিজস্ব ধারায় একটা সাংস্কৃতিকতার হাওয়া বইত। ওই সময়টায় ট্রেন্ডসেটার কিছু লোক থাকতেন শহরে, ট্রেন্ডি উইন্ড থেকে একটু তফাতে রেখে লোকালিটিতে বেটার স্পেইসের একটা কালচার অপারেইট ও এক্সিবিট করতেন তারা, নাটকে স্টেইজে আবৃত্তি কিংবা গানের আসরে। তেমনই একজন অম্বরীষ দত্ত। সহজিয়া আসর আয়োজন করবার সময়টায় ব্যাংকার ক্যারিয়ারে লেজের দিকটায় ছিলেন বোধহয়। স্থানীয় পরিমণ্ডলে এরা প্রায় কিংবদন্তি আমার বিবেচনায়। এমন অনেক সিগ্নিফিক্যান্ট ওয়ার্ক রয়েছে এদের। ফিজিক্যালি কন্ট্রিবিউট করবার সময় ছিল তখন। অম্বরীষ দত্ত, শুভেন্দু ইমাম তথা আব্দুল হান্নান বা বাংলাদেশের যে-কোনো জনপদে এদের মতো লোকপ্রজ্ঞাবাহক আধুনিক মননের মানুষ লোকালয়গুলি জীবন্ত শৈল্পিকতায় দীপ্ত করে রেখেছিলেন ওই সময়। এরাই ছিলেন লাস্ট মোহিকান্স। এরপর সময় পাল্টে যায়। ব্যক্তি হয় ক্ষীণ ও খর্বকায়। জেলাশহরগুলা তার নিজস্ব জোরের ও গরিমার চিহ্নগুলা হারায়। বেবাক পর্যবসিত হয় ফাটকা পুঁজির প্রাতিষ্ঠানিকতায়। জাতীয় সংস্কৃতি বৃথা যায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের মাশরুমগ্রোথ লাশটানা মাস্তানিচর্চায়।

সেই সময়, এই ফাংশন যখন অনুষ্ঠিত হয়, আট নয় সালের দিকটায়, এত শোচনীয় ভবিষ্যৎ আন্দাজ করা যায় নাই। কিছু সন্দীপিত ব্যক্তি তখনও অতিকায় ব্যবস্থাকে নেভিগেইট করবার হিম্মৎ রাখত। সহজিয়া আসর ওইরকম কিছু ব্যক্তিপরিকল্পিত উদ্যোগের একটি উদাহরণ। অনুষ্ঠানস্মারক পুস্তিকাটা হাতের কাছে পেলে একবার ফিরে দেখা যেত অনুষ্ঠানদিনটা আরও অন্তরঙ্গ করে। এখন মনে নাই ঠিক মৌসুমী ভৌমিক কোন গানগুলি গেয়েছিলেন। তবে একটা গানের কথা আলাদা করে ইয়াদ আছে, ‘বাড়ি কোথায়’ সেই গানের হুকলাইনটি ছিল। পরবর্তীকালে বহু বছরের অ্যালবামবিরতি শেষে ২০১৭ সালের দিকে বেরোনো ‘স্যংস ফ্রম টোয়েন্টিসিক্স এইচ’ অ্যালবামে এই গানটা পাওয়া গিয়েছিল।

পরবর্তীকালে এই আসরের সুবাদে চেনা তাজদার ও সাত্যকি দুইজনকেই বৃহৎ পরিসরে পেয়েছি। কিন্তু পরিচয় সেই সিলেটের শাহিঈদগা বালুচরে নয়া বিল্ডিঙে শিফট হওয়া জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির অডিটোরিয়ামে। মৌসুমী ভৌমিকের পৌরোহিত্যে। অম্বরীষ দত্ত শুভেন্দু ইমাম তুষার কর প্রমুখদের দৌত্যে।

এই ইভেন্টটার রেকর্ড রাখা আছে কি না জানি না। আমার হাতের ফোনটা ক্যামেরাবান্ধব না-হওয়ায় এবং জমায়েতস্থলে ক্যামেরাচালনায় অনভ্যস্ত হওয়ায় স্থিরচিত্রও ধরে রাখা হয় নাই। ইভেন্ট চলাকালে ক্যামেরা না-চালানোর উপর্যুপরি অনুরোধও ছিল মনে পড়ে মৌসুমী ভৌমিকের গলায়। কাজেই, নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলি রিয়্যাল টাইমের অনেক পরেকার, ছবিগুলি ইন্টার্নেট থেকে নেয়া।

জাহেদ আহমদ (রচনাকাল ১১ এপ্রিল ২০১৫ পরিমার্জনাকাল ১১ এপ্রিল ২০২৬)

গানপারে মৌসুমী ভৌমিক

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you