টেস্ট এনভায়রনমেন্ট

টেস্ট এনভায়রনমেন্ট

ইমরুল হাসানের কবিতাবই ‘টেস্ট এনভায়রনমেন্ট’। জাঁকজমকবাহুল্যহীন প্রচ্ছদে স্লিম শরীরের বইটি নিঃসন্দেহে নজরকাড়া। পাঠক-দর্শকদের মধ্যে যারা ডামাডোলের বাইরে একটু উল্টোস্রোতা পাঠোপকরণ খুঁজে বেড়ান হামেশা, তারা হাসানের এই কাজটির (ও অন্যান্য কাজগুলো) কদর করবেন নিশ্চয়।

ডিসেম্বর ২০১৬ সনে এই বই রিলিজ্ হয়েছিল। পুরনো হয়ে গেছে সেই বিবেচনায় অবশ্য। শুধু প্রকাশকালের হিসাব মোতাবেক একটা বইয়ের নয়া-পুরানা সাব্যস্ত হয় যেই দেশে, সেই দেশের আ মরি বাসিন্দা আমরা। কাজেই, কিছুটা ‘লিবারাল’ হওয়া আবশ্যক বইধৃত কবিতাগুলো গ্র্যাব্ করতে যেয়ে। কেবল বছর-তিন আগে বেরোনো বইটারে একদম আনকোরা পাব্লিকেশনের স্বীকৃতি দিতে যেয়েই যে ‘মৃদু উদারতা’ রিকোয়ার্ড, তা নয়; এর অন্তর্গত কবিতাগুলোর ধরনধারণও প্রথানুগত কবিতাধারার সঙ্গে অভ্যস্ত পাঠকের কাছে একটু দলছুট ঠেকতে পারে, সেজন্যেও যথেষ্ট গ্রহিষ্ণু ও উদার হওয়া দরকার। এর বাইরে ডেমোক্র্যাট, সোশ্যালিস্ট, কনজার্ভেটিভ, ন্যাশন্যালিস্ট সহ সর্বস্তরের লিগ-ফ্যুটবলার আর ক্লাব-ক্রিকেটার পাঠকের কাছে এই বইটা আদরণীয় হবার জোর সম্ভাবনা আছে।

অ্যাভেইলেবিলিটি নিশ্চয় একটা সমস্যা। বাংলাদেশে এখন বইয়ের দোকান বাড়ছে, সেসব দোকানে শো-শা ব্যাপক হলেও মনমতো বই ঠিক সময়টায় পাবেন না তা বলেই দেয়া যায়। টেস্ট এনভায়রনমেন্টের ন্যায় একটু অফবিটের বই হলে তো লভ্যাংশের অতি ক্ষীণ সম্ভাবনা।

সাকুল্যে দুইফর্মা, মানে থার্টিটু পৃষ্ঠা, ক্র্যাপবোর্ড মলাটের বই ‘টেস্ট এনভায়রনমেন্ট’ প্রকাশ করেছে ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ শিরোনামে এক প্রতিষ্ঠান। নবাগত বলা যাবে না পাব্লিশিং প্ল্যাটফর্মটাকে, গেল দুই/তিন বছরে বেশকিছু বই রিলিজ করে ফেলেছে এই প্রিন্ট পোয়েট্রি এবং বইখোঁজাদের নজর কেড়েছে।

বইটা ছাপা হয়েছে, এবং ব্যুকলঞ্চ সিরিমোনি সহ অন্যান্য বিলি-বিপণন সবই হয়েছে, ‘বাংলাসাহিত্যের রাজধানী’ হিশেবে নামজাদা ঢাকা থেকে। ‘বাংলাসাহিত্যের বিশ্ব’ কলকাতায় এই বইয়ের কোনোপ্রকার রিলঞ্চ/রিলোড/রিপ্রকাশের খবর এখনও কানে আসে নাই। কিন্তু হয়ে গেছে দেখতে দেখতে বছর তিনের মতো। কলকাতায় রিমুদ্রিত না-ই যদি হলো, তবে সেই বইয়ের দামদস্তুর বিষয়ে একটু সন্দেহ থাকিয়াই যায়।

বইটি ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ প্রকাশ করলেও মহান বইমেলায় তাদের কোনো স্টল বা টেবিল বা দাঁড়ানোর গাছতলা নাই। লিগ্যালি তা থাকবার কথাও নয়। কেননা এইটাই ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ লঞ্চড পয়লা প্রোডাকশন। আর অদ্যকল্য স্টল বরাদ্দদানের বিধিবিধান-শর্তাবলি ইত্যাদিতে পুরাকালের তুলনায় ঢের কড়াকড়ি বেড়েছে। অ্যাট-লিস্ট খানপঞ্চাশেক ছাপানো বইয়ের আইটেম ছাড়াও অন্যান্য বহুবিধ ‘প্রান্তিক যোগ্যতা’ লাগে মেলায় স্টল/ভূমিতল পেতে গেলে। প্রিন্ট পোয়েট্রি কি হাফসেঞ্চুরি করে ফেলতে পারল না আজও? চমৎকার কিছু বই তো এইবারেও বাইর হয়েছে।

অ্যানিওয়ে। এই রিপোর্টারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ব্যুকস্টলে ডেইলি ওয়েইজেস্ বেইসিসে কর্মরত জনৈক তরুণ কবি কাম্ বিক্রয়বালকের। স্টলের ম্যারাপগুলো তক্তায় পেরেক ঠুকে ঠিকঠাক করবার ফাঁকে অ্যানোনিমাস্ পরিচয়ের প্রাকশর্তে রাজি হওয়াতে বেশকিছু কথাবার্তা চালানো সম্ভব হলো। কথা হচ্ছিল যে, সেই বিক্রয়রিপ্রেজেন্টেটিভই বলছিলেন যে, এখন প্রকাশনাজগতে মধ্যস্বত্বভোগের বিকাশ উল্লসিত হবার মতো উচ্চতায় যেয়ে ঠেকেছে। এই শিল্পের পরানভোমর যে লেখক, এই ইন্ডাস্ট্রির নিউক্লিয়াস ও ফ্যুয়েল যে লেখক, একটা পাইপয়সা লাভের গুড় বেচারা লেখকের জেবে যেতে দেখা যায় যদি তো সেইটা কিংবদন্তিতুল্য উদাহরণ। অথচ লেখক রঙচঙা পাব্লিশার কর্তৃক মহানন্দে প্রতারিত হতেছেন পৌনঃপুনিক, প্রতিবাদের কোনো পুকার নাই মুখে।

এমতাবস্থায় ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ কিসিমের প্রকাশোদ্যোগ অত্যন্ত সাধু। হুদা পাব্লিশারের দ্বারস্থ হয়ে স্ট্যামিনা না-খুইয়ে এইভাবে ইনফর্ম্যাল প্রকাশরাস্তায় যাওয়া আজ কবিসাহিত্যিকদের জন্য অনেক বেশি ডিগ্নিটির। এ-ধরনের প্রকাশব্যবস্থাকেই ইংরেজিতে ভ্যানিটি প্রিন্টিং প্রেস্ বলে বোধহয়। ইংরেজি লিট্রেচারের রথী-মহারথীদের বইপত্র উল্লেখযোগ্য পর্যায় পর্যন্ত এই কায়দায় প্রকাশিত হয়ে থাকে। লেখকপ্রাচুর্যের এই দেশে তরুণ সাহিত্যিকেরা যত বেশি এই রাস্তায় এগোবেন, প্রকাশকগোত্রের বেপারিদের লেখকঠকানো দৌরাত্ম্য তত দ্রুত সহনীয় মাত্রায় আসতে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা আশা রাখছেন।

কবি, গল্পলেখক, সমালোচক ও অনুবাদক ইমরুল হাসানের কাগজমাধ্যমে মুদ্রিত প্রকাশনা আছে বেশকিছু। কবিতাবই সবগুলোই, গল্পবই আছে একটা। ‘কালিকাপ্রসাদে গেলে আমি যা যা দেখতে পাবো’, ‘অশ্বত্থ বটের কাছে এসে’, ‘তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই’, ‘রাঙামাটি’, ‘স্বপ্নের ভিতর’, ‘বসন্ত ১৪১৯’ প্রভৃতি তার কবিতাবই; রিসেন্টলি কিছু প্রকাশিত হয়েছে কি না জানা নাই। গল্পবই ‘পুরির গল্প’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫-তে। ‘টেস্ট এনভায়রনমেন্ট’ কবিতাবইটি প্রিমিয়ারের প্রাক্কালে ফেসবুকে এক বার্তায় লেখক জানাচ্ছেন,

নিজের বই ছাপানির কথা মনে হইলে সবসময়ই মনে হইতো (এখনো হয়) যে বন্ধুবান্ধবদেরকে (ফ্রেন্ডআসলে তখনো চালু হয় নাই আর দোস্তও এনাফ ‘বাংলা’ মনে হইতো না) আমার কবিতাগুলি পড়াইতে চাই। এই বন্ধুবান্ধব/ফ্রেন্ড/দোস্ত তো আসলে ইম্যাজিনড একটা ব্যাপারই। ইন-রিয়্যালিটি, তেমনকিছু থাকা নিয়া সন্দেহের ভিতরই থাকি। … মানে, কিছু মানুষজন ছিলেন, যাদের সাথে আমার কবিতা রিলেট করতো বইলা ভাবতে পারতাম আমি। এখন এইরকম হোপফুল হওয়ার কোনো কারণ নাই! বেশ ডিস্ট্যান্ট একটা রিয়্যালিটিই মনেহয়। কিন্তু এর এগেনেস্টে না-জানা কোনো অডিয়েন্সের কথাও ভাবতে পারি নাই। তারপরও ডিস্ট্যান্টলি কানেক্ট করেন হয়তো কেউ কেউ। লিখতে থাকলে কিছু মানুষ তো আবিষ্কার করতে চাইতেই পারেন। খুশি লাগে কেউ যখন বলেন কবিতার জন্যই মানুষ হিসাবে আমারে পছন্দ করা যায়। অবাকও লাগে।

এইভাবে লেখকের বইপ্রকাশনেপথ্য অভিপ্রায় এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটা মাপা ‘আত্মস্বীকারোক্তি’ রিসেন্ট বাংলাদেশজ কাব্যঢক্কানিনাদী রিয়্যালিটির পার্সপেক্টিভ থেকে দেখতে গেলে বেশ বিরলদৃশ্যই বলতে হবে। এবং পাঠকপ্রান্তে এ এক স্বস্তিকর উপরি পাওনাও অবশ্য।

বইটির বিক্রিবাট্টা ভালো হোক। পাঠকের সংবেদনায় সাড়া জাগুক। বইপ্রকাশের ব্যবসায় লেখকের প্রকৃত মর্যাদা আসুক।

‘টেস্ট এনভায়রনমেন্ট’ কবিতাবইয়ের কবি ইমরুল হাসান। প্রিন্ট পোয়েট্রি ঢাকা থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে এইটা বাইর হয়েছিল।

প্রতিবেদন / সুবর্ণ বাগচী

… …

গানপার

COMMENTS

error: