বাংলাদেশের ছবি এবং সূর্যদীঘল বাড়ি বিষয়ে মৃণাল সেন

বাংলাদেশের ছবি এবং সূর্যদীঘল বাড়ি বিষয়ে মৃণাল সেন

মি বাংলাদেশের ছবি বিশেষ দেখিনি। তবে যতটুকু দেখেছি তাতে করে বাংলাদেশের ছবি সম্পর্কে আমি খুব উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে পারছি না এখন পর্যন্ত। আমার খুব রিসেন্ট মেমোরিতে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে গত বছর (১৯৮১) কার্লোভিভ্যারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ দেখে। ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ছবি সম্পর্কে আমার যে কোনো সমালোচনা নেই তা নয়, সমালোচনা আছে, তবু বলব, এই ছবিটার ভেতরে একটা মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, একটা গ্রামের ছোটখাটো ডিটেলের ব্যাপারে এর ভালোবাসা, এর শ্রদ্ধামেশানো একটা দৃষ্টিকোণ —  সেটা আমাকে খুবই নাড়া দিয়েছে। এবং আশা করব ভবিষ্যতে এ-ধরনের ছবির সংখ্যা আরও বাড়বে।

[এই নিবন্ধটি মৃণাল সেনের লিখিত কোনো রচনা নয়, এইটা সাক্ষাৎকারের ভিতরগত অংশ একটা। মাহবুব আলম কর্তৃক গৃহীত ১৯৮২ ইন্টার্ভিয়্যুটা ঢাকা থেকে প্রকাশিত মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত ‘ধ্রুপদী’ পঞ্চম সংকলনে ধৃত। ১৯৮৫ অগাস্টে এই ইশ্যুটা আলোয় এসেছিল। অলমোস্ট অর্ধশতেক পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত সাক্ষাৎকারে একাধিক প্রসঙ্গ ছুঁয়ে সেনের বীক্ষণ-পর্যালোচন পাওয়া যায়, সেখান থেকে একাংশ চয়ন করে এনে এই নিবন্ধ। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে একেকটি ভিন্ন প্রসঙ্গ উৎকলন করে একেকটি নিবন্ধের আকৃতি দিয়ে এই তরিকায় আমরা ছাপাছাপির কাজটা মাঝেমধ্যে চালাতে চাই রিপ্রিন্টনির্ভর, নিছক পোস্ট আপ্লোডের জন্য পোস্ট আপ্লোড করা নয়, চাই লোকের দৃষ্টি যেন আকৃষ্ট হয় বিষয়নিচয়ের দিকে এবং লোকে যেন দুইটা বাক্যালাপে ব্যাপৃত হয়। অ্যানিওয়ে। এইখানে সাক্ষাৎকারগ্রহিতা মাহবুব আলম এবারে “এই ছবিটা কিন্তু বাংলাদেশের ছবির ট্রেন্ডের বাইরে এবং মোস্টলি ফিল্ম সোসাইটির ছেলেদের করা” — এই কথাটা অ্যাড করবার পরে সেন প্রম্পট উত্তর করতে যেয়ে যা বলেন তা রাখা যাচ্ছে নিচের প্যারায় — গানপার]

সার্থক সূর্যদীঘল বাড়ি এবং বেনিয়মের কারবার
এই তো, তাই তো হবে। এই ট্রেন্ডের বাইরে গিয়েই, সেইখানেই আপনাকে নতুনভাবে চিরকালীন প্রথার বিরুদ্ধে যেতে হবে। শত্রু বানাবেন অনেক। আমার জীবনেও শত্রু অনেক হয়েছে। যে-লোকটার শত্রু নেই তার জন্য আমার কষ্ট হয়। শত্রু করতেই হবে। নিয়মকানুনের বাইরে যেতে হবে, বেনিয়মের কারবার করতে হবে। এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতবর্ষে আমাদের যে ঘটনা হচ্ছে, আমাদের বাপঠাকুরদারা যা করে গেছেন, বাপঠাকুরদার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। এবং আপনি যা বললেন তাতে মনে হচ্ছে ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ সেদিক থেকে খুবই সার্থক।

[এরপর “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্রবিনিময়ের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?” জিজ্ঞাসিত হলে মৃণাল সেন সংক্ষেপে স্রেফ দুইকথায় যা বলেন তা সাম্প্রতিক যৌথপ্রযোজনার নামে যে-টেন্ডেন্সি ক্রিয়াশীল সেইটার বিষয়েও চলচ্চিত্রসমুজদারদের সতর্ক করায়। যাকগে, সেই প্রশ্নটা ছিল “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্রবিনিময়ের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?”]

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও ম্যুভিবিনিময়
হতে পারে, যদি ঠিক সমান সমান ভাবে হয়। সমান সমান অর্থে … আমি কোয়ান্টিটি-কোয়ালিটি দুটোই একসঙ্গে জড়িয়ে নিচ্ছি — এইভাবে যদি হয় আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এটার সুযোগ নিয়ে এক দেশ যদি আরেক দেশের উপর জুলুম করতে চায়, নিজেকে চাপাতে চায় — আমি তার বিরুদ্ধে।

[এই নিবন্ধটা, আগেই বলা হয়েছে, মাহবুব আলম কর্তৃক গৃহীত কথাদলিল থেকে কালেক্টেড এবং রিঅ্যারেঞ্জড। মুখ্য ব্যক্তিটি মৃণাল সেন, যিনি সিনেমানির্মাতা হিশেবে এ-পর্যন্ত পঞ্চাশটির মতো ছবি নির্মাণ করেছেন। দুনিয়ার ফিল্মবোদ্ধারা তারে চেনেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে এই ইন্টার্ভিয়্যু গৃহীত হয়েছিল, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সিনেমা যা-কিছুই মৃণাল দেখেছেন সেসবের ভিত্তিতে মন্তব্য করেছেন অনুত্তেজ, সংগত কারণেই। কিন্তু তখনও তো মোকাম্মেল-মোরশেদ-মাসুদ প্রমুখ কারোরই কাজকর্ম ওইভাবে আসে নাই, নাকি এসে গিয়েছে? এখন, এই ২০১৮-য়, মৃণালকে যদি ইন্টার্ভিয়্যু করা হয় তাইলে কি ভিন্ন হতো কথাগুলো? সন্দেহ হয়। এমন কোনো র‍্যাডিক্যাল চেইঞ্জ তো হয় নাই বাংলাদেশি সিনেমায়। অ্যানিওয়ে। শেখ নিয়ামত আলী নির্মিত ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ মৃণালের কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছিল। পরে শেখ আলী আরও দুইটা ছবি বানিয়েছেন, ‘দহন’ ও ‘অন্যজীবন’, ভালো কাজ করেও বুদ্ধিবৃত্তিজীবীদের কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স আলীর তিনটা কাজের অ্যাক্লেইম দেয়নি। নিয়ামত আলী মৃত্যুর অগম পারে গেছেন অনেক বছর হয়। মৃণাল সেন তাঁর ছোট্ট মন্তব্যে সেই বিরাশি খ্রিস্টাব্দেই নিয়ামত আলীর কাজটিকে স্যাল্যুট করেছিলেন। — গানপার]

… …

COMMENTS

error: