একটা সাক্ষাৎকারে বেশ-খানিকটা আনোয়ার হোসেন

একটা সাক্ষাৎকারে বেশ-খানিকটা আনোয়ার হোসেন

SHARE:

না, একটা নয়, আনোয়ার হোসেনের দুইটা সাক্ষাৎকার সেই-সময় পড়েছিলাম। যথেষ্টই বিশদে একটা জানাশোনার ব্যাপার ঘটেছিল ওই ইন্টার্ভিয়্যুদ্বয়ের সুবাদে। এর মধ্যে একটা ছাপা হয় ‘শিল্পরূপ’ নামে একটা সাময়িক পত্রিকায়, আরেকটা ‘কাউন্টার ফটো’ নামের একটা জার্নালে। ‘শিল্পরূপ’ অনেকদিনই নিয়মিত প্রকাশিত হতে দেখেছি বিভিন্ন সময়ে, এখনও হয়ে থাকলে সেইটা বইবেচাবিকির দোকানে যাই না বলে জানা হয় না, কেবল ‘কাউন্টার ফটো’ পত্রিকাটা আর বাইরই হয় নাই বোধহয়। আনোয়ার হোসেনের ইন্তেকালসংবাদে পুরানা কাগজপত্রপর্বত খুঁড়ে বের করতে মন চাইল পত্রিকাদুইটা, আদ্ধেকটা পাওয়া গেল, মানে একটা পত্রিকা আস্ত খুঁজে বের করা গেল গোটা রাইতের কোয়ার্টারহাফ ইনভেস্ট করার মধ্য দিয়া।

‘কাউন্টার ফটো’ পত্রিকার একটামাত্র ভলিয়্যুমই পাব্লিশ হয়েছিল যদ্দুর খবর রাখতে পেরেছি। এইখানে একটা ইন-ডেপ্থ ইন-ডিটেইল্ড ইন্টার্ভিয়্যু পড়ি শিল্পী হোসেনের, ফোটোগ্র্যাফি নিয়া খানিকটা চাঞ্চল্যকর জ্ঞানগম্যিও হয় এর মাধ্যমে, কথাবার্তা সঞ্চালন করেছিলেন সাইফুল হক অমি ও মুনেম ওয়াসিফ মিলে। এই পত্রিকার সম্পাদনায় সাইফুল হক অমি নামটা মুদ্রিত দেখতে পাই প্রিন্টার্স লাইনে এবং এডিটোরিয়্যালের তলায়, কো হিশেবে মুনেম ওয়াসিফ নামটাও। অনেক পরে এই ধারায় আরও দুইয়েকটা কাজ বাজারে এসেছিল ফোটোগ্র্যাফি নিয়া, ‘কামরা’ দুইখণ্ড ও ‘দেখা’ নামে একটা ভালো পত্রিকা/জার্নাল স্মর্তব্য। বর্তমানে কেউ কি সিনসিনারি নিয়া কাগজ বাইর করবার শখ-আহ্লাদ করে? স্ট্যাটাসও তো দিতে দেখি না কাউরে ফেসবুকেটুকে। কেবল কবিতাশিল্প আর গালগল্পশিল্প। স্লোগ্যানশিল্পও। বুদ্ধিবৃত্তিশিল্প। অনেক আছে আরও। শুধু মরার সিনসিনারি নিয়া আলাপের পোর্টালপত্তর নাই কোনো।

তো, বলছিলাম যে আনোয়ার হোসেন সম্পর্কে একটু সবিশদ জানবার সুযোগ হয় দুইহাজারচাইরে এই ইন্টার্ভিয়্যু পড়ার বরাতে। এর আগে উনারে একটু অন্য অ্যাঙ্গেলে চিনতাম যদিও, উনার স্ত্রী এদেশের মেধাবী অভিনয়শিল্পীদের একজন; — ডলি আনোয়ার। ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ সিনেমায় পার্ট করেন। কমিটেড স্যুয়িসাইড। তখন উনার সম্পর্কে, ডলির হাসব্যান্ড আনোয়ার হোসেন সম্পর্কে, একটু উল্টাসিধা নানান জিনিশই কাগজে বেরিয়েছিল। অনেক নিউজপ্রিন্ট সাপ্তাহিক-পাক্ষিক বেরোত তখন। ফলে সেসবের সত্যিমিথ্যা নির্ণয় ন জানি। কিন্তু তখনও আনোয়ার হোসেন আমাদের অনেকের কাছে স্থিরচিত্রের নন, চলচ্চিত্রের নেপথ্যে কর্মরত কুশলী শিল্পীই ছিলেন। অনেক সিনেমায় ক্যামেরার কাজের কাজি হিশেবে টাইটেলকার্ডে উনার নাম আমরা দেখে থাকব। অনেকের কাছেই ভিলেন ছিলেন হয়তো, ডলির আত্মহত্যার অব্যবহিত পরে অন্তত। পরে আনোয়ার হোসেন বিদেশে যেয়ে ক্যারিয়ার করেন নয়া উদ্যমে, বিয়াশাদিও করেন বিদেশি, সেইসময়ের একটা ভালো ডক্যু উঠে এসেছে এই ‘কাউন্টার ফটো’ কথালাপে।

এইখানে বেশি কিচ্ছু না, আমরা খালি তিন/চারটে প্যারাগ্র্যাফ উঠিয়ে এনে প্রয়াত আনোয়ার হোসেনের প্রতি ট্রিবিউট জানাইতে লেগেছি। ইন্টার্ভিয়্যুটা এমনই যে আস্ত উৎকলনের ইচ্ছা সামলাতে পারাটাও মুশকিল। অত পরিশ্রম পোষাচ্ছে না আপাতত। লোকে এখন পড়ে দেখে না রাষ্ট্রীয় দরপত্র কলের বিজ্ঞপ্তি ব্যতিরেকে তেমনকিছুই। তারপরও যদি রিডারের রেস্পোন্স পাওয়া যায়, একদিন শুভ কোনো শনি/মঙ্গলবারে ম্যে-বি ইন্টার্ভিয়্যুটা আস্ত পুনর্মুদ্রণের তোড়জোড় করা যাবে। এখন শুধু কোটেশন কয়েক, ছোট ছোট, প্রয়াত আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের।

অবশ্য কোটেশন চয়নের আগে একটা হ্যান্ডশেইকের আদব সারা দরকার। মানে, একটু পরিচিতি ইত্যাদি। কিন্তু অতটা জানাশোনা নাই যেহেতু ফোটোগ্র্যাফিশিল্প সম্পর্কে, এবং আনোয়ার হোসেনের কোনো প্রদর্শনী ইত্যাদিতেও প্রবেশ ঘটে ওঠে নাই এই নিবন্ধকারের, অ্যাডেড একটু মুশকিলেই পড়া গেল। সলিয়্যুশনও এল দ্রুত ও মজবুত অত্যন্ত। অমি-ওয়াসিফ ড্যুয়োর সাক্ষাৎকারপাঠকৃতিটির শুরুতে যেই প্রিফেইসভাষ্য, ওইটার চেয়ে ব্যেটার পরিচয়প্রারম্ভিকা বাংলায় আপাতত সুলভ নয়। সেই প্রিফেইসপ্যারাগ্র্যাফের একাংশ পড়ে নিলেই ইন্ট্রোটা ভালোমতো হয়ে যায় :

বাংলাদেশের আলোকচিত্র যে-কয়েকজন আলোকচিত্রীর কাজের মধ্য দিয়ে সাবালকত্ব অর্জন করেছিল — আনোয়ার হোসেন তাদের মধ্যে সম্ভবত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অর্জন অনেক। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর কাজ প্রভাবিত করেছে সকল প্রজন্মের আলোকচিত্রীদের এবং সেই প্রক্রিয়া এখনও চলমান। … আমরা মনে করি আনোয়ার হোসেনের কাজকে ভালোভাবে জানা, বোঝা ও দেখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আলোকচিত্রের একসময়কার মূলস্রোতটি। আমরা যদি ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন ও তাঁর কাজকে গভীরভাবে বুঝতে পারি তবে বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতির অনেকটাই আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠবে।

হ্যাঁ, এইবার যেতে পারি ইন্টার্ভিয়্যু থেকে এক/দুইটা আলাপ চয়নে যা সাক্ষাৎকারগ্রাহীদ্বয়ের বিভিন্ন প্রশ্নের ফেরে আনোয়ার হোসেনের জবানিবাহিত :

কোটেশন ১ ।। ফোটোগ্র্যাফি থেকে ফিল্ম
“যদি তুমি মানুষকে ভোলাতে পারো যে, সে ছবি দেখছে, যদি তাকে সে-জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় তবে ছবি দেখে লোকে কেঁদে ফেলে, হেসে ফেলে। কাঁদে কেন? এটা একটা মেকি জিনিস। অনেক সৃষ্টি মেকি, ছবি তোলাও মেকি। টিভিতে যেটা দেখি সেটা মেকি, ছবি আঁকাও মেকি। কারণ, ধরো একটা কাগজের মধ্যে তুমি একটা নৌকা আঁকছো, মেঘ আঁকছো। এটা তো সেই নৌকা বা মেঘ নয়। কবিতা লেখাও একটা মেকি। কারণ কবিতাতে তুমি একটা কাগজ নিচ্ছো, কিছু শব্দ চয়ন করছো। কিন্তু এই সবকিছুরই শক্তিটা হলো — মেকির মধ্যেও এত সত্যি কথা বলা হয়, এত আত্মার ব্যাপার আসে, যেটা আর মেকি মনে হয় না। মানুষ দু-লাইন পড়ে, দুটো ছবি দেখে, বইয়ের দুটো পাতা উল্টায়। কিন্তু চলচ্চিত্রের অর্ধেক মিনিট যাবার বা দু-মিনিট যাবার পর ওটার মধ্যে মিশে যায়। … ছবি যখন তুনি ওটা একটা জিনিস আর চলচ্চিত্রে সেই ছবিগুলো আরো বেশি কথা বলবে, সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেম চলতে হলে একটা গল্প বলাই সহজ হবে। এবং আমার মনে হয় এই প্রবণতাটা আমার আজকে পর্যন্ত আছে। যখন আমি ফটোগ্রাফির বই করি অথবা এই প্রদর্শনীতে … এর ভেতরে কেমন একটা সিনেমাটিক ধারা আছে, মানে একটা গল্প বলা টাইপের, একটা থিম পরস্পরের সাথে যাচ্ছে — এই আর-কি …।”

কোটেশন ২ ।। ফোটোগ্র্যাফি ও ফোক আর্ট
“আমাদের বাংলাদেশে এখনো ফোক আর্ট আছে। একেবারে গ্রামে … হয়তো মাটির মধ্যে আঙুল দিয়ে আঁচড় কেটে কিছু করছে, সেটাই আর্ট হয়ে গেল। সেটা তারা অ্যাফোর্ড করতে পারছে এবং সেখান থেকেই তারা জীবনের আনন্দটা নিচ্ছে। কিন্তু ব্যাপার হলো ফটোগ্রাফি করতে গেলে আমাদের একটা ক্যামেরা দরকার। আমার ঐ পরিপ্রেক্ষিতে ভাবতে হবে যে তারা ক্যামেরাটা কিনতে পারবে। ক্যামেরাটা কেনার পর ছবি। তাহলে কিন্তু পার্সপেক্টিভটা বদলে গেল। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি যাদের ক্যামেরা নেই, বা আজকেও বাংলাদেশে অনেকেরই ক্যামেরা নেই, তাতে কোনো অসুবিধা নাই। প্রকৃতি এমন একটা মহান ব্যাপার, প্রকৃতিতে এতকিছু সুন্দর ব্যাপার আছে, আমরা একটা সৃষ্টি, সৃষ্টির সন্তান আমাদের মাঝখানে, আশেপাশে মানুষ, প্রকৃতি, যার যে পরিবেশ, যার যে ইকোনমি তার মধ্যে ওটার সদ্ব্যবহার করা, মানুষের কথা বলা, ভালোবাসার কথা বলা, ভ্রাতৃত্বের কথা বলা। ক্যামেরা কিনতে পারা, কবিতা লিখতে পারা, ছবি আঁকতে পারা কিন্তু খুব জটিল ব্যাপার। তখন তোমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব হচ্ছে — প্রকৃতি, সমাজ, স্রষ্টা তোমাকে আরো বেশি জিনিস দিয়েছেন। It becomes more difficult to handle, তখন ঐ পরিবেশে যাতে folk মানুষটার মতো, যেটা প্রকৃতিই তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছে — এটা যদি সঞ্চারিত করতে পারো, মানে এটাকে বেশি profit level-এ না নিয়ে গিয়ে যতদূর পারো বিস্তৃত করতে পারো সেখানেই সার্থকতা, সে-অর্থে …”

কোটেশন ৩ ।। ফোটোগ্র্যাফি, নারী ও ন্যুডিটি
“এটাকে যদি পুরো উহ্য করে আমরা একটা বই করি — It’s not correct. ছোটবেলা থেকে একটা বিষয় আমাকে তাড়িত করত, সেটা হলো — দ্য ফর্ম। … একটা শিশু জন্ম নেবার পর থেকে দুধ খাবার সময় মায়ের দুধের বাটনটা গোল দেখে। সাম্প্রতিককালে, আমি গতবছর বাংলাদেশের একজন নামকরা মহিলার সাথে কথা বলেছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আমার দুটি শিশু (মেঘ, দূত) কানে এত হাত দেয় কেন? তুমি দেখবে শিশুরা কেন যেন কান ধরে … আমি এখন পর্যন্ত কোনো এক্স্যাক্ট উত্তর পাইনি। হয়তো এক্সপার্টরা বলতে পারে। ওই মহিলা আমাকে বললেন, আনোয়ারভাই, আমার মনে হচ্ছে ঐ যে শিশুরা যখন দুধ খায়, মাকে সাক্ করে হয়তো ঐ ফিলিংসটা, ঐ সফটনেসটা কানে পায়, হিট বা ভাইব্রেশনের মাধ্যমে। তো এইটা যদি আমাদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে … তাহলে আমি তো এই ন্যুডিটিটার কোনো অসুবিধা দেখি না। বাংলাদেশের পত্রিকায়, আজেবাজে জায়গায় প্রচুর আজেবাজে ন্যুড ছবি যত্রতত্র ছাপা হচ্ছে। পণ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, হিন্দি ফিল্মে ব্যবহার হচ্ছে। গ্লোবালি প্যারিসের রাস্তায় মেয়েদের যত্রতত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার এখানে যতগুলো ন্যুড ছবি আছে, যদি প্রতিটা ন্যুড ছবির অব্জেক্ট দিয়ে কথা বলার প্রয়াস থাকে বা লাইফের একটা ব্যাপার থাকে তাহলে আমি তো কোনো আপত্তির জিনিস দেখছি না। … এখন কেউ যদি আমার ছবিগুলো তার পর্নোগ্রাফিক চোখ দিয়ে দেখে … সেটা তার ব্যর্থতা, ঐ অর্থে এটা আমার ব্যর্থতা নয়।”

এই তিনটামাত্র উদ্ধৃতি দিয়া সাক্ষাৎকারকৃতিটির কিছুই আঁচ দেয়া গেল না আমি নিশ্চিত। এইটা আস্ত পড়তে পারলে বেজায় আনন্দ হতো। ‘উইমেন’ নিয়া, ‘নার্সিসিজম’ সিরিজের ছবি নিয়া, লিমিটেড প্রিন্ট রেখে নেগেটিভ ডেস্ট্রয় করবার ব্যাপারটা আনোয়ার হোসেনের মতে একটা ক্রাইম ইত্যাদি নিয়া সাংঘাতিক ইন্সাইটফ্যুল কথাবার্তা আছে এই ইন্টার্ভিয়্যুকাণ্ডে। এর গ্রাহকদ্বয় — সাইফুল হক অমি ও মুনেম ওয়াসিফ — এজন্য স্মরণীয় রইলেন এই নিবন্ধকারের কাছে অন্তত।

তথ্যসূত্র থুয়ে আপাতত ক্ষান্ত দিই। ‘আনোয়ার হোসেন : এ কালের আয়নায়’ / সাইফুল হক অমি, মুনেম ওয়াসিফ — কাউন্টার ফটো, ২০০৪, ঢাকা। এইটাই ছিল পত্রিকার প্রথম কন্টেন্ট, অন্যান্য রচনাগুলোও তখনকার জন্য এবং এখনও গুরুত্বপূর্ণ। সবিশেষ উল্লেখ করব সেই লেখাটার কথা, যা লিখেছিলেন এবাদুর রহমান, ন্যান গোল্ডিন সম্পর্কে এর আগে হারাম একটা দানাও জানা ছিল না। আর এবাদুরের রচনার সেই ‘সিরিয়াস’ অভিনবপ্রাবন্ধিক গদ্যভাষা! লা-জোয়াব!

আনোয়ার হোসেনের কোনো ফোটোগ্র্যাফিশিল্পকর্ম বর্তমান শ্রদ্ধাজ্ঞাপক গদ্যে সেঁটে দেয়া আপাতত সম্ভব হলো না। অ্যাভেইলেবল নানা মাধ্যমের মারফতে অ্যাট-লিস্ট কিছু তো সকলেই নিতে পারেন দেখে।

নিবন্ধপ্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবির শিল্পী  প্রণবেশ দাশ

প্রতিবেদন : সুবিনয় ইসলাম

… …

COMMENTS

error: