একটি কবিতার লাল হৃৎপিণ্ড || সরোজ মোস্তফা

একটি কবিতার লাল হৃৎপিণ্ড || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

কবিতা দিয়ে নজরুল পুরো বাঙালির, পুরো ভারতবাসীর মানবীয় ও স্বাদেশিক  চেতনাকেই স্পর্শ করেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজকে জাগিয়ে দেয়ার এই অঙ্গীকারকে, চেতনাকে, কবিতার ভাষাকে রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। জীবনানন্দের ‘আমি এত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না’-ধর্মী ভাষায় কবিতা লেখার শান্ত মন নজরুলের ছিল না। সময়ের প্রগাঢ় উত্তাপে তিনি জাহাজের সম্মুখে টানানো পতাকার মতো পতপত করে উড়ছিলেন। ঘোষণা দিচ্ছিলেন স্বরাজের। তিনি মহাত্মা গান্ধি নন। কিন্তু কবিতার কালো কালো অক্ষর দিয়ে তিনি গান্ধিবাদিতার বাইরে এসে কিংবা গান্ধিবাদকে অটুট রেখেও মানুষ ও সময়কে মুক্তি দিতে চেয়েছেন।

১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল কবির ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। কবিতাটির জন্ম শাসকবর্গকে নিশ্চয়ই স্বস্তি দেয়নি। তাই তিন সপ্তাহ পরেই যখন ‘ধূমকেতুর’ সম্পাদকীয়তে পূর্ণ স্বাধীনতার আহ্বান জানালেন, তখনই শিল্পীর বিরুদ্ধে তৈরি হলো লাল কানুন। শুধু ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের অভিযোগে ইংরেজ প্রশাসন ধূমকেতুর অফিস তছনছ করে এবং তুলে নিয়ে যায় পত্রিকার অবশিষ্ট কপি। ছাড় পাননি পত্রিকার প্রকাশক। ভারতীয় দন্ডবিধি ১২৪(এ) ধারা অনুসারে ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর গ্রেফতার হন প্রকাশক আফজাল-উল হক। ২৩ নভেম্বর নজরুলকে গ্রেফতার করা হয় কুমিল্লা থেকে। অন্তরীণ থাকা অবস্থা থেকে কবি মুক্তি পান ১৯২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯২৩ সলের ৭ জানুয়ারি নজরুল লেখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল বিচারকার্য । ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ সেই বিচারকার্যকে ত্বরান্বিত করেছে। আনন্দময়ীর আগমনে  কবিতাটির জন্য কবিকে ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় দন্ডবিধির ১২৪(এ) এবং ১৫৩ ধারা অনুসারে বিচারপতি সুইনহো কবিকে একবছরের সশ্রম কারাদন্ড দেন।

কী ছিল আনন্দময়ীর আগমনের কণ্ঠে, যা সমগ্র প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল? কবিতাটি আসলে কোনো স্লোগ্যান নয়, মা’র কাছে সন্তানের এক-ধরনের প্রার্থনা। এ-ধরনের প্রার্থনা ১৩২৮ সালের পুজোয় লেখা ‘আগমনী’ কবিতাতেও কবি রেখেছিলেন। মাকে আহ্বান করে কবি লিখেছিলেন — “আজ রণরঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ মহারণ / দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে দশ প্রহরণ / পদতলে লুটে মহিষাসুর, / মহামাতা ঐ সিংহবাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে— / শাশ্বত নহে দানবশক্তি— পায়ে পিষে যায় শির পশুর।”

দানবশক্তি-যে শাশ্বত নয় এই বার্তাই মানুষকে পৌঁছে দিতে চান কবি। মোহররম  কবিতাতেও মুসলমানদের  জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, “দুনিয়াতে খুনিয়ারা দুর্মদ ইসলাম, / লোহু লাও, নাহি চাই নিষ্কাম বিশ্রাম”। কিংবা ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতাতেও বিশ্বমানবিক নজরুলকেই পাই। যিনি আহ্বান জানাচ্ছেন, “টুঁটি টিপে মারো অত্যাচারে মা, / গল-হার হোক নীল ফাঁসি, /  নয়নে তোমার ধূমকেতুজ্বালা / উঠুক সরোষে উদ্ভাসি”।

কবিতা তো তা-ই, যা আমাকে  আহ্বান করে কিংবা বোতলের ভেতর আটকানো আমার আত্মাটাকে মুক্তি দেয় কবিতা। আমি হয়তো মুক্তি চাই কিন্তু বুঝতে পারি না। কবিতা আমাকে বুঝিয়ে দেয়। দেখিয়ে দেয় পথ ও পথের মানচিত্র। কবিতার কাছে প্রণত হওয়ার দীক্ষা লাগে না। লাগে প্রত্যয় ও আগ্রহ। এই প্রত্যয় ও আগ্রহ নিয়েই বাঙালি পাঠক নজরুলের শিল্পপথে প্রবেশ করেছে। কবিও প্রার্থিতদের নিরাশ করেননি। ‘আগমনী’, ‘মোহররম’, ‘রক্তাম্বরধারিণী’, ‘খেয়াপারের তরণী’ কিংবা ‘ভাঙার গান’ কবিতায় যে ভাষা ও বোধ তিনি প্রস্তুত করেছেন তারই উদ্দাম বিস্ফোরণ দেখিয়েছেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। দুর্গতিনাশিনী মাকে ভারতবর্ষের মুক্তির দূত হিসেবে আহ্বান করছেন কবি। কবিতাটির কয়েকটি পঙক্তি — “অনেক পাঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা; / আয় পাষাণী, এবার নিবি আপন ছেলের রক্তসুধা! / দুর্বলদের বলী দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তিপূজা / দূর করে দে, বল্ মা, ছেলের রক্ত মাগে মা দশভুজা! / সেই দিন হবে জননী তোর সত্যিকারের আগমনী, বাজবে বোধন-বাজনা, সেদিন গাইব নব জাগরণী। / ‘ময় ভুখা হুঁ-মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী, / কৈলাস হতে গিরি-রাণীর মা-দুলালী কন্যা অয়ি! / আয় উমা আনন্দময়ী!”। ঐতিহ্যের সাথে সংযুক্ত হয়ে এই কবিতায় কবি ইংরেজ প্রশাসনকে মোকাবেলা করেছেন। দুশো বছরের সাম্রাজ্যবাদীদের চেয়ারটিকে আঘাত করেছে প্রতিটি পঙক্তি ও অক্ষরমালা। সাম্রাজ্যবাদীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই কবিকে দেয়া হলো একবছরের রাজদন্ড। কিন্তু কবি ও কবিতাকে কী রাজদন্ডে আটকে রাখা যায়!

সময়ের মৃত্যু হয় কিন্তু কবিতার মৃত্যু হয় না। কারণ সময় ফুরিয়ে গেলেও যে-ক্রাইসিসটা নিয়ে কবিতা রচিত হয় সেই ক্রাইসিসটা ফুরোয় না। কবিতার ভেতরে তাকিয়ে-থাকা জাগ্রত অক্ষরমালা সেই ক্রাইসিসটাকে মোকাবেলা করে। নজরুল চলে গেছেন কিন্তু অসুরদেরকে নিয়ে সাধারণের ক্রাইসিসটা চলে যায়নি। চলে-যে যায়নি তা তৃতীয়বিশ্বের স্বাস্থ্যহীন চোখ-ঢেবে-যাওয়া মানুষগুলোর চেহারা দেখলেই বুঝি। উনিশ শতকের অসুর ইংরেজ একবিংশে এসে মুখোশ বদলেছে। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির নতুন অসুর চলে এসেছে আমার দরজায়। আমি সে-অসুরের খপ্পরে পড়ে গেছি। জানি সে-অসুর আমাকেই খাবে। কিন্তু ঘাড়ভাঙা বকের মতো আমি তাকিয়ে আছি। আমার সেই তাকিয়ে-থাকার মধ্যে লজ্জা আছে কিন্তু সাহস নেই। আসলে আমি ও আমার মতো তৃতীয়বিশ্বকে সাহস দেবে নজরুলের কবিতা। কারণ নজরুলের কবিতা তৃতীয়বিশ্বের ক্রাইসিসকেই মোকাবেলা করে।


লেখাটা ‘লাল জীপের ডায়েরী’ থেকে নেয়া হয়েছে, লেখক ও জীপসঞ্চালকের সম্মতি নিয়েই। উল্লেখ্য, ‘লাল জীপের ডায়েরী’ বহুদিন যাবৎ সচল নয় আর। — গানপার

… …

COMMENTS

error: