পন্ডিতজি || আল ইমরান সিদ্দিকী

পন্ডিতজি || আল ইমরান সিদ্দিকী

SHARE:

বহু বছর আগের কথা। সাধারণ, পরম্পরাগত পরিবারে জন্ম নেয়া দশ-এগারো বছর বয়সের একটি ছেলে, ওস্তাদ আব্দুল করিম খানের একটি রেকর্ড শুনল। বাইরের সুর অন্তরের সুরে এসে মিলল, আর সেই ছেলে নিজ গ্রাম থেকে বহু দূরে সাবারিকান্ধার গ্রামের রামভাও কুন্ডগুলকরের কাছে পৌঁছাল।

: গুরুজি! গুরুজি!
: কে, কোথা থেকে এসেছো (দরজা খুলে)?
: গদক থেকে।
: কি ব্যাপার?
: এই বালকের সংগীত শেখার ইচ্ছা। আপনার শিষ্য হতে চায়।

এভাবে কয়েক বছর গুরু-শিষ্য পরম্পরার ভেতর থাকার পরও তার সংগীতযাত্রা জারি থাকল। গোয়ালিয়র, লক্ষ্মৌ, জলন্ধর, রামপুর, — ভারতবর্ষের এমন অনেক শহরে লাগাতার সে সময়ের নামীদামি সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকে দীক্ষা নিতে থাকল।

দুই
(বহুবছর পর)
: পন্ডিতজি, আপনি সংগীতের প্রেমে কিভাবে পড়লেন? বাতাবরণ না প্রেরণা, এতে কার হাত বেশি?
: উভয়েরই। আমার মা ঘরে ভজন গাইতেন। আমার ভেতর সংগীতপ্রেম তিনিই জাগিয়েছেন। আমার মনে হয় ভালো সংগীতশিল্পী হতে হলে তিনটি বিষয় খুবই জরুরি : ভালো গুরু, ভালো রেওয়াজ, আর তৃতীয়টি হলো ভালো কপাল।

: চতুর্থটি বলতে আপনি সম্ভবত বলতে ভুলে গেলেন অর্থাৎ আপনার স্ত্রী?
: ঠিক বলেছেন আপনি। আজ আমি যা-কিছু, সে সহযোগিতা না করলে তা সম্ভব হতো না। সে নিজেও গান করে। খুব ভালো গাইতে পারত কিন্তু সে তো সংসার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে গেল আর আমি নিশ্চিন্ত মনে সংগীতসাধনা করে গেলাম।

: আপনি কি এখনো আগের মতো রেওয়াজ করেন?
: না, এখন তেমন করি না। এত প্রোগ্রাম করতে হয়, তাতেই যথেষ্ট রেওয়াজ হয়ে যায়। কিন্তু প্রথম প্রথম পনেরো-ষোলো ঘণ্টা রেওয়াজ করেছি, কখনো বিশ ঘণ্টাও রেওয়াজ করেছি। একটা সময় ছিল, তখন জেদ ছিল, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার।

: আপনি বহু ওস্তাদের গান শুনেছেন, অনেকের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছেন, অনেক রেওয়াজ করেছেন, কিন্তু কি মনে হয়, ভালো সংগীতশিল্পী হতে হলে কি এসব যথেষ্ট?
: না, যথেষ্ট নয়। দেখুন, ভালো সংগীতশিল্পী হলো চোরবিশেষ। সে দীক্ষাগুরুর গান থেকে বা যাদের ভালো ভালো গান শোনে, তাদের থেকে কিছু কিছু জিনিস আত্মসাৎ করে। কারো নকল করাটা খুব সহজ। নিজ গায়কী দিয়ে নকলকে আসল বানানো খুব কঠিন কাজ। আমি আমার শিষ্যদের বলি, আমার মতো করে নয়, নিজের মতো করে গাও, নিজের গলার ধর্ম অনুসারে গাও।

তিন
সংগীত আমার প্রথম প্রেম। দ্বিতীয় প্রেম ড্রাইভিং। একসময় সাইকেল চালাতাম। এখন মোটরগাড়ি কিনেছি; মোটরগাড়ি চালাই। আমার দুই নাতনী — যশোদা আর রেনুকা। আমি যখনই বাইরে থেকে আসি, তাদের জন্য কিছু-না-কিছু নিয়ে আসি।

: পন্ডিতজি, লোকে বলে শিল্পী নিজের দুনিয়া নিয়ে পড়ে থাকে। নিজের বাইরে সে খুব কমই তাকায়…?
: আমি এ-কথা মানি না। শিল্পীর সবকিছু জানা উচিত, সবকিছুর সাথে তার সম্পর্ক থাকা উচিত। ডাল-আটার দামের সাথে, পারিবারিক বন্ধনের সাথে, দেশের অবস্থার সাথে — সে সবকিছুর সাথে জড়িত।

চার
আমার এই মোটরগাড়ি ও আমি ভীমসেন যোশী, দুজনই অজানা গন্তব্যের যাত্রী। যাত্রী অচেনা পথের। সংঘাতপূর্ণ গতির নামই জীবন। যা ভালো লাগে, যা মন ভরে দেয়, তা-ই সংগীত হয়ে ওঠে। শিল্পীর তৃষ্ণা কখনো মেটে না, তৃপ্তি আসে না। শিল্প তো স্বয়ং এক যাত্রা, আর অন্তর্যাত্রাই তার গন্তব্য। সমুদ্রের গভীরতাকে, আকাশের উচ্চতাকে, কে মেপেছে? সংগীতের ধর্ম সংগীতই; এখানে জাতপাত নেই। যে ভালো গায়, যশ তারই …


ডকুমেন্টারিটির ইউটিউবলিঙ্ক : https://www.youtube.com/watch?v=kdbvcbZdxtI

[পন্ডিত ভীমসেন যোশীর উপর নির্মিত ইউটিউব ডকুমেন্টারি অবলম্বনে। — লেখক]


গা ন পা র ভা ষ্য

এই লেখাটা আগে একবার ছাপা হয়েছিল। কোথায়? ‘লাল জীপের ডায়েরী’ শীর্ষক একটা সাইটে। এইটা আজ থেকে বছর সাতেক আগে ২০১৩ জানুয়ারিতে পয়লা ছাপা হয়েছিল। ওইখান থেকেই নিয়েছি আমরা। লালজীপপ্রকাশের সময়  সাইটের তরফ থেকে এপিগ্র্যাফিক স্টাইলে একখানি ইন্ট্রো সংযুক্ত হয়েছিল, ওইটাও গানপারপ্রকাশের সময় এইখানে সংযোজিত করে রাখছি নিচে :

“সুরসম্রাট ও সুরসাধক ভীমসেন যোশী। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তারকার তালিকাটি কম দীর্ঘ নয়। উস্তাদ আবদুল করিম খাঁ থেকে শুরু করে উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, উস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খাঁ, উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ, উস্তাদ আমির খাঁ, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ হয়ে পন্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ, উস্তাদ আলি আকবর খাঁ, পন্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, উস্তাদ আমজাদ আলি খানের এই তালিকার এক সদস্য অবশ্যই পন্ডিত ভীমসেন জোশী। সংগীতে নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ। পড়ুন পন্ডিত ভীমসেন যোশীর উপর নির্মিত ইউটিউব ডকুমেন্টারি অবলম্বনে আল ইমরান সিদ্দিকীর গদ্য।” — লাল জীপের ডায়েরী

ভীমসেন যোশীকে ঘিরেই নিবন্ধপ্রতিম রচনাটা আবর্তিত। কথাবার্তা বা সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এটি লিখিত। কবি আল ইমরান সিদ্দিকী লিখেছেন স্বাদু গদ্যে এই নির্ভার-নিরুপম লেখাটি। ইউটিউবতথ্যচিত্রাবলম্বনে লেখা, তা তো বলে দেয়াই আছে। লেখাটা পড়ার সময় একবারও অবলম্বনের ছায়ারেখাপাতহীন পড়ে যাওয়া যায় একটানে। এরপরও অনুসৃত তথ্যচলচ্চিত্রটা আমরা আগ্রহী হলে দেখে নিতে পারব।

পরসমাচার এ-ই যে, লালজীপ সাইটটা আজকাল সঞ্চালন বন্ধ বলে এর কোনো প্রকাশনা শেয়ার ইত্যাদি করা যায় না, শেয়ারের লিঙ্ক কাজ করে না। তাই, কিছু লেখা পাঠকের নাগালে অ্যাভেইলেবল রাখার তাগিদ থেকে, এই রচনাটা গানপারে নেয়া। আর্কাইভড রইল, পড়তেও পারা গেল, প্রয়োজনে শেয়ার ইত্যাদিও করা গেল হয়তো কখনো।

রচয়িতা আল ইমরান সিদ্দিকী  এবং পয়লা পাব্লিশের সাইটসঞ্চালক বিজয় আহমেদ পুনর্প্রকাশপূর্ব অনুমতি আদায়কালে সদর্থক সহযোগিতা করেছেন। উভয়ের প্রতি গানপারের কৃতজ্ঞতা। — গানপার

… …

COMMENTS

error: