থাকতে জীবন হইল না সাধন  || সুমনকুমার দাশ

থাকতে জীবন হইল না সাধন  || সুমনকুমার দাশ

SHARE:

প্রথমে ভেবেছিলাম — যাব না। কিন্তু পির নজরুল ইসলামের অনবরত তাগদায় সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সম্মতি জানাই। সেদিন ছিল বুধবার, ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে। স্থান — সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভার চণ্ডীপুর গ্রাম। সেখানে মরমিকবি মুন্সী মনিরউদ্দিনের ৫৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনাসভা ও মরমিগানের আসর বসেছিল। প্রয়াতের নাতি পির নজরুল ইসলামের আয়োজনে প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়ে আসছে। তাঁরই চাপাচাপিতে চণ্ডীপুর যাওয়া।

কালনী নদীর পাড়ে ছোট্ট মফস্বল শহর দিরাইয়ের লাগোয়া গ্রাম চণ্ডীপুর। বেশ বড় গ্রাম। এ নিয়ে চণ্ডীপুরে আমার তৃতীয়বারের মতো যাওয়া। আগেরবার যখন গিয়েছিলাম, সেও তো কম করে বছর ছয়েক পর। আগে যখন এসেছিলাম তখন রাস্তা পাকা ছিল কি ছিল না, তা মনে নেই। তবে এ যাত্রায় গিয়ে পাকা সড়ক চোখে পড়ে, যদিও ছোটবড় অসংখ্য খানাখন্দ রয়েছে। আমাদের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খানাখন্দে পড়ে শরীরে ভালোই ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। ঝাঁকুনি খেতে খেতেই কালনী নদীর দিকে তাকিয়েছিলাম।

লম্বা প্যাঁচানো কালনী নদীটাকে মনে হয়েছিল রূপোর বড় কোনো হার। জোৎস্নাবিহীন, তবু তেমন অন্ধকার নয়। কী যেন কী মায়াময় পরিবেশ। কিছুটা গুমোট ভাব। নদীটাকে বড় রহস্যময় মনে হলো। যেন কোনও নারীরই প্রতিরূপ। ঠিক সেই গানের মতোই — ‘এখানে রমণীগুলো নদীর মতন / নদী ও নারীর মতো কথা কয়’। নদীর ডানদিক দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। সে-পথ দিয়েই অটোরিকশাভর্তি যাত্রীরা যানে চেপে এগিয়ে চলছিলাম। একসময় একটি মাদ্রাসার পাশে যানটি থামে।

অটোরিকশা থেকে নেমে মিনিট দশেক সদ্য-মাটি-ফেলা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটার পর মুন্সী মনিরউদ্দিনের জন্মভিটায় পৌঁছলাম। পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। দিরাই পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান হাজী আহমদ মিয়া প্রধান অতিথির বক্তৃতা দিলেন। প্রধান আলোচকের বক্তৃতা রাখলাম আমি। গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রবীণ ব্যক্তিদের কয়েকজন মুন্সী মনিরউদ্দিনের স্মৃতিচারণা করলেন। তাঁদের বক্তব্যে মনিরউদ্দিনের একটা অবয়ব আমার চোখে দাঁড়িয়ে যায়। না-দেখা মানুষটির একটা ছবি আমার চোখে ঝলঝল করতে থাকে। বেশ উপভোগ্য মনে হলো পুরো আলোচনাসভাটি।

আলোচনাসভার পরেই মিনিট দশেকের বিরতি। এর ফাঁকে পুরো মাঠে ত্রিপল বিছিয়ে উৎসুক গ্রামের মানুষদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। মুহূর্তেই পুরো উঠোন মানুষে একাকার হয়ে যায়। সবাই গোল হয়ে বসে পড়েন। শুরু হয় গানের আসর। ঘাম-জবজবে শরীরে এগিয়ে আসেন পির নজরুল ইসলাম। তাঁর হাতে একটি ছোট কাঠের খাট, সেটিতে কয়েকটি বড় মোমবাতি জ্বালানো। সেই খাটটি তিনি ত্রিপলের ঠিক মধ্যখানে রাখেন। এতক্ষণ ধরে চলতে-থাকা গুনগুন শব্দ নিমিষেই থেমে যায়। সদ্য সন্ধ্যায় যেন মধ্যরাতের নির্জনতা নেমে আসে।

উঠোনজুড়ে কেমন যেন প্রশান্তি ভাব। বৈশাখের ভারী বাতাসের ঢেউ আমাদের শরীরে লাগে। এরই মাঝে পির নজরুল ইসলাম তাঁর দাদার লেখা গানে সুর ধরেন — ‘আসসালামু আলাইকুম’। এটি বন্দনাগীত। পির নজরুলের চোখ বন্ধ। তিনি পদ্মাসনে বসা। তাঁর সৌম্য মুখমণ্ডল দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম — হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করছেন গানের প্রত্যেকটি পঙক্তি। চিশতিয়া, কাদরিয়া, নশবন ও মজদ্দদিয়া — এই চার তরিকার চারজন পির সহ আশিকগণকে সালাম জানান গভীর শ্রদ্ধায় :

আসসালামু আলাইকুম
মোমিন পড় হে কালাম
রাসুলউল্লার পাকজুনাবে
আমার হাজারও সালাম।।

হাসন-হুসন হজরত আলি
মা ফাতেমা যার
ওই সবার জুনাবে আমার
হাজারও সালাম।।

চিশতিয়া কাদরিয়া নশবন
মজদ্দদিয়ার
ওই চাইর তরিকার পিররে
আমার হাজারও সালাম।।

সালাম করা সুন্নত ভাই রে
আলেক দেওয়া ফরজ
বয়ান করি কইছইন নবিজি
হাদিসতে খবর।।

আল্লাতালার পাকজাতে
যত আশিকগণ
সবাকারে জানান সালাম
মনিরও অধম।।

গান শেষ হলে নজরুল ইসলাম একটু শ্বাস টানেন। এরপর বলেন, “আমার দাদার লেখা বহুল প্রচলিত ‘থাকতে জীবন হইল না সাধন’ গানটি এখন গাইব। এই গানটির প্রথম পঙক্তির শিরোনাম দিয়ে দাদার একটা বইও প্রকাশিত হয়েছে।” কথা শেষ করেই তিনি ধরেন :

থাকতে জীবন হইল না সাধন
বেভুলে দিন ঘুমে যায়, হায়রে হায়
আমার মউতকালে কী হবে উপায়।।

সাধন কোটে যে বাজায়
নগদ দামে মাল খাটায়
আসাধনের খাতায় বাকি
আসলও ভাঙিয়া খায়।।

শিখো ভাই নামাজের সাধন
ঠিক করো তার কায়দাকানন
না পড়িলে যত্নমতন
ঢালব দোযখের গাড়ায়।।

কায়দাকানন ঠিক না করে
কেন বান্দায় নামাজ পড়ে
আকাশটা মান্দারের ফুলে
ভ্রমরা বঞ্চিত পায়।।

আলিপ খাড়া রুকু হায়
দালে আসন মিম সজিদায়
মুর্শিদ রূপে ধ্যান করে
করো সজিদা সময় যায়।।

বেনামাজি মারা যায়
এখন করি কি উপায়
রংপুরের বাজারে মনির
নামাজ না করলা আদায়।।

গান শেষ হলে গল্পচ্ছলে নজরুল ইসলামকে এই গানের ব্যাখ্যা করার অনুরোধ জানাই। আমার অনুরোধ শুনে তিনি চমকে উঠে বলেন, ‘মনা রে, এই কালামের ব্যাখ্যা যে দিতে পারব না। এর ব্যাখ্যা রসিক মানুষ ছাড়া যথাতথা বলা নিষেধ।’ তবে সেদিন তিনি আকার-ইঙ্গিতে কিছু কথা বলেছিলেন। ব্যক্তিগত চিন্তা-ধারণা ও পির নজরুল ইসলামের ইঙ্গিতবহ কথাগুলো মিলিয়ে গানটির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নিই নিজের মনের মধ্যে।

গানটির অর্থ বেশ চমকপ্রদ মনে হয় আমার কাছে। আমরা জানি — মান্দার ফুলের গন্ধ হয় না, তাই ভ্রমরা সে-ফুল থেকে মধু আহরণ থেকে বঞ্চিত হয়। তেমনি কায়দাকানুন ঠিক না রেখে নামাজ পড়লে সেই মান্দার ফুলের মতোই অবস্থা হয়। তবে এই নামাজ তরিকতপন্থায় পড়তে হবে। ‘আলিপ’ মানে সোজা ও ‘রুকু’ মানে হাঁটুতে যাওয়া। তারপর সিজদার সময় মুর্শিদরূপ ধ্যান করতে হবে। সেই ধ্যান করতে পারলে চোখের সামনে আল্লারূপী মুর্শিদ উপস্থিত হন। আর সেই আল্লাকেই হাজির-নাজির রেখে সেজদা করতে হবে। সঠিক পদ্ধতিতে সাধন-ভজন করতে না পারলে রংপুরের বাজার অর্থাৎ দুনিয়ার ভবপুরে আসাটাই বৃথা।

বাউলসাধনায় মুর্শিদভজনা প্রধান শর্ত। কারণ মুর্শিদ ভালো-মন্দের সন্ধান দেন। ষড়রিপু থেকে কীভাবে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব, কিংবা কীভাবে দমসাধনা করতে হয় — সবকিছুর নির্দেশনা মুর্শিদ তাঁর শিষ্যকে শিখিয়ে দেন। কামনদী থেকে কীভাবে উতরে বস্তুসাধন করা যায়, সেটাও আয়ত্তে আনতে হলে মুর্শিদের সাহায্য প্রয়োজন। তাই বাউলসাধনায় মুর্শিদ ভজনার বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে মুন্সী মনিরউদ্দিনের একটি গানও রয়েছে। ওইদিন গানের আসরের তৃতীয় গান ছিল এটি। পির নজরুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে গানটি গেয়েছিলেন তাঁরই শিষ্য ত্রিশোর্ধ্ব সজলু মিয়া। গানটি এ-রকম :

পাগল মন আমার
সকাল সকাল মুর্শিদ ভজন কর
না করলে মুর্শিদের সেবা
নরকে দিবা চরবাচর।।

বেভুল নিদ্রায় ঘুম দিয়াছ
রইলে মন তুই বেখবর
মুর্শিদ বিনে নিদ্রাভঙ্গের
ঔষধ না মিলিবে তোর।।

পিরমুর্শিদরে মন্দ বলে
নিন্দা করে যে পামর
শতবৎসর নেক কামাইলে
তবুও দিব কারাগার।।

চোরে কাফের মাঝে
দিছেন বাড়ি ওই কবর
পড়িলে ঘুম রাহিল ঘুমে
মুর্শিদ না মিলিবে তোর।।

মনিরউদ্দিন গেল বিফলে
পিরের শয্যা হইল না তোর
ধরিয়া মুর্শিদের পদে
লাম আলিপে ধ্যান কর।।

এভাবে বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন পির নজরুল ইসলাম সহ তাঁর শিষ্য-অনুসারীরা। আমি চলে যাব — এ কারণে সেদিন রাত নয়টার দিকেই আসরের সমাপ্তি টানা হয়। তবে বেশ বুঝতে পারি — গ্রামবাসীর গানের ক্ষুধা মেটেনি। অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়েই তাঁরা ফিরে যান। কারণ গুটিকয়েক গানে তাঁদের মন ভরার কথা নয়। অন্যান্য সময়ের মতো তাঁরা সারারাত গান শোনার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন।

গান শেষ হলে পির নজরুল ইসলামের ছোট্ট কুঁড়েঘরে ঢুকি। সেখানে গিয়ে দেখলাম চৌকির উপর খাবারের বিশাল আয়োজন। হরেক রকমের রান্না পুরো চৌকিজুড়ে। আমি নজরুল ইসলামকে বললাম, ‘আমি তো জানি — আপনার সংসারের খরচ চালানোর কোনও ক্ষমতা নেই। কিন্তু এত খরচ করে কেন এই খাবারের আয়োজন করতে গেলেন।’ পির নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দাদা, আমি গরিব হতে পারি। কিন্তু এই ফকিরের বাড়িতে এসে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যাবেন, এতে যে আমার অমঙ্গল হবে।’ আমি আর কথা বাড়াই না। নীরবে খেতে শুরু করি। অমৃতসম স্বাদ প্রত্যেকটি উপকরণে।

খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পির নজরুল ইসলামের সঙ্গে ফকিরিতত্ত্ব নিয়ে বেশ কথা হয়। তিনি বলেন, “কুষ্টিয়ার লালন বলেছেন — ‘যেই তো মুর্শিদ সেই তো রাসুল / খোদাও সে হয়/ লালন কয় না অমন কথা / ও তার দলিলে গায় / ওপারে কে যাবে রে নবিজির নৌকায়।’ এই মর্মে বুঝতে পারছি, যাকে আমরা মুর্শিদ ধরলাম সে-ই রসুল। খোদাও সে হয়। মানে এটা তিনজনে একজনে সংযুক্ত। খোদার কোনও রূপ নাই। তাই মুর্শিদকেই খোদা ভাবা ভুল নয়।” তিনি আরও বলেন, “মুর্শিদকে খোদার সমতুল্য মনে করলে নাস্তিক, খোদা থেকে যুদা (আলাদা) মনে করলেও নাস্তিক। এখন খোদা আর মুর্শিদকে কোন আদালতে রাখবেন? রাখতে হলে মুর্শিদ, খোদা ও রাসুল এই তিনজনকে একজনে সংযুক্ত রাখতে হবে। এককথায় খোদা, মুর্শিদ ও রাসুল সমান। কেউ বড়ও না, কেউ ছোটও না। একজনকে বাদ দিলেই অপরজনকে পাবেন না।”

পির নজরুল ইসলাম বলেন, “আল্লা বলেন — আমাকে সেজদা করো। আবার আল্লা বলেছেন — আমি মোমিনের কল্ববে (বামের স্তনের দুই আঙুলের নিচে কল্বব কোঠা) থাকি। এবং মুর্শিদ ভজার হুকুম কোরানের মধ্যে আল্লাপাকই বলেছেন। তাই মুর্শিদ ভজাতে কোনও শরিয়তি নিষেধাজ্ঞা নেই। অথচ অনেকে এটি না জেনে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করেন।” কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারি, পির নজরুল ইসলামের জন্ম ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের ৮ অগ্রহায়ণ, রোজ বুধবার। তাঁর বাবা কলমদর মিয়া, মা লালবিবি। উভয়েই প্রয়াত। তাঁর দাদা মুন্সী মনিরউদ্দিনের মৃত্যুর বছর নজরুল ইসলামের জন্ম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। নজরুল ইসলাম চণ্ডীপুর গ্রামের কওমি মাদ্রাসায় ছুয়ম পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। একদিকে পড়ালেখায় নিজের মন নেই, অপরদিকে আর্থিক কারণেও পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

পির নজরুল ইসলাম জানান, মাটিকাটা ও রোজবন্দী চাকরি করা ছিল তাঁর পেশা। ১৯৯৪ সালে গ্যাস্ট্রিক-আলসার হয়ে তাঁর খাদ্যনালী শুকিয়ে যায়। এ-সময় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর একটা অস্ত্রোপচারও হয়। এরপর থেকে কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। মুন্সী মনিরউদ্দিন সম্পর্কে তিনি জানান, তিনি প্রায় তিনশ গান রচনা করেছেন। এর মধ্যে ফকিরিগানই বেশি।

খাওয়া শেষে বিদায় নিয়ে বের হই। আমাদের এগিয়ে দিতে আসেন পির নজরুল ইসলাম। আমি তাঁকে এই সময়ের মধ্যে একটা গান শুনাতে বলি। তিনি বলেন, “দাদা, জানেন তো? — অন্ধকার কবরে বাতি নাই, আলো নাই, মোমিন ব্যক্তির জন্য নামাজেই আলো দিব। এটা ভেবেই দাদা মুন্সী মনিরউদ্দিন একটি গান লিখেছিলেন। আমি সেই গানটিই শোনাই আপনাকে।” রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তিনি গানে সুর তোলেন :

নামাজ পড় মোমিনগণ
নামাজ বিনে মোমিনের
নাই রে কোনও ধন।।

নামাজও অমূল্য ধন
পড় মোমিনগণ
অন্ধকার কয়বরে হইব
নামাজে রৌশন।।

এশকভাবে পড় নামাজ
ছাইড়া ভবের মায়া
হাশরে রদ্রির তাপ
নামাজে দিবা ছায়া।।

পিরের চরণ সাধন করি
নামাজ পড় সার
মনির, দিন গেল বিফলে
না-পড়লা নামাজ
ভক্তিভাবে পড় নামাজ
শুদ্ধ করি তন।।

হেঁটে হেঁটে গান শুনতে শুনতে চণ্ডীপুরের অস্থায়ী গাড়িস্ট্যান্ডে পৌঁছি। কিন্তু দিরাই যাওয়ার কোনও গাড়ি নেই। পির নজরুল ইসলাম বলে-কয়ে গ্রামেরই এক তরুণের মোটরবাইকে আমাকে তুলে দেন। আমি বাইকে উঠার সময় তিনি একটি খাতা আমার হাতে তুলে দেন এবং বলেন, “দাদা, আমার গানের পাণ্ডুলিপি আপনার হাতে তুলে দিলাম। একটু পড়ে দেখবেন।” আমি পাণ্ডুলিপিটি বুকে আগলিয়ে ধরি। বাইকে চড়ে দিরাই পৌঁছে সিলেটগামী গাড়িতে চাপি।

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ফিরতিপথে খুব নিঃশব্দে ‘থাকতে জীবন হইল না সাধন’ গানের দুটি পঙক্তি গুনগুনিয়ে গেয়েছিলাম। খুব ভালো করেই জানি — এমন রাত প্রতিদিন পাবো না। তাই একটু বেশিই যেন আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ে যায় পির নজরুল ইসলামের দেওয়া পাণ্ডুলিপিটির কথা। তখনও গাড়ির লাইট নেভেনি। সেই আলোয় পাণ্ডুলিপিটির পাতা উল্টাতে শুরু করি। কর্ণফুলি কাগজের একটি বাঁধাই খাতায় লেখা ৪৬টি গান। গানের ভাষার চমৎকার গাঁথুনি ও তত্ত্ব আমাকে উদ্বেলিত করে। পাণ্ডুলিপির দ্বিতীয় গানটি এ-রকম :

মানুষ ছাড়া পাওয়া যায় না
মানুষের সন্ধান
মানুষ হইল সর্বশ্রেষ্ঠ
মানুষই প্রধান।।

মানুষ হইতে মানুষের জন্ম
মানুষেরই ধর্মকর্ম
মানুষ হইয়া মানুষ চিনো
মানুষকে করো সম্মান।।

মানুষের সেবা করিলে
মরিলেও অমর থাকে
মানুষ যারা ভোলে না রে
গায় মানুষের গুনগান।।

মানুষ হইতে পারলাম না রে
বেলা অবসান
কয় নজরুলে পাই না খুঁজে
আমি মানুষের সন্ধান।।

গানটিতে সুস্পষ্টভাবে মানুষ-বন্দনা পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর পাণ্ডুলিপিতে প্রায় একই ধারার বেশ কয়েকটি গান রয়েছে। যেমন — ‘মানুষে মানুষে কেন / এত ভেদ আর ব্যবধান / সব মানুষ তো আদমসন্তান / আদম হয় মাটির তৈয়ার।। / আমি সৈয়দ আমি পাঠান / আমি চোর জমিদার / এই নিয়া ওরে বোকা করিস না আর অহংকার / সৃষ্টির সূত্র আদম-হাওয়া / সবাই তো তাদের সন্তান।।’ মানুষবন্দনার পাশাপাশি বাউলতত্ত্ব এবং বেশকিছু বিচ্ছেদী গানও রয়েছে। একসময় গাড়ির চালক আলো নিভিয়ে দিলে আমার দেখায় ছেদ পড়ে। তবে পির নজরুল ইসলামের গান নিয়ে চলে বিরতিহীন ভাবনা।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন-যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। বাসের কন্ডাক্টরের ডাকে ঘুম ভাঙে। দেখি — চোখ ঝলসে যাচ্ছে বৈদ্যুতিক বাল্বের তীব্র আলোয়। ছোট-ছোট চোখে বাইরে তাকাই, কোথায় এসেছি ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। একটা সাইনবোর্ডে তাকাতেই দেখলাম — টুকেরবাজার, সিলেট। তার মানে, আমার নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাত্র মিনিট দশেক দূরত্বে রয়েছি।

… …

সুমনকুমার দাশ

কবি, লোকগান গবেষক ও সংগ্রাহক, এবং গানের কাগজ ‘দইয়ল’ সম্পাদক
সুমনকুমার দাশ

COMMENTS

error: