আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
আমাদের মতো ছোট করে কেউ হাসেনি
কী নাম ভুলে গেছি, কিন্তু খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, একটা নাটকে এই গান শুনেছিলাম। ওই একবারই, এরপর আর শুনি নাই, কিন্তু মনে আছে এর পুরো সুরটুকু। সুরের চলনটুকু। কথাচিত্র পুরো মনে নাই, কিছু খুচরো পঙক্তি ছাড়া, উৎকলিত দুইটা লাইন হুবহুপ্রায় গানের মুখাংশ। একটা টেলিনাটকে এইটা টাইটেল স্যং হিশেবে ছিল।
ছোটবেলা থেকেই সিনেমা-নাটক মন দিয়া দেখি বা না-দেখি, শুরুর তো বটে এবং শেষের টাইটেল ও ক্রেডিট লাইনের অংশগুলো খুব খুঁটিয়ে দেখা আমার অভ্যাসের মতোই ছিল। প্রযোজনা কার, কে এর পরিচালক, আলোটা কে করল, কোরিয়োগ্রাফিটা কার করা, আলোক-প্রক্ষেপণে কয়জন জড়িত ছিলেন, ফলি-আর্টিস্ট কে এবং কারা তার কস্টিউম নকশাকারী ইত্যাদি ঠিকঠাক খেয়াল করা চাই। কিন্তু এইসব তো আর সিনেমা-নাটক না। মানে, এইসব তো খোলসের দিকটা। আর্ট তো অন্য জায়গায়। যার ফলে জীবনে তেমন সুশিক্ষা লাভ করতে পারি নাই থিয়েটার-ম্যুভি থেকে, কেবল কয়েকটা নাম মনে রাখতে পেরেছি। কিছু প্রোপার নাউনে বা প্রোনাউনে কী আর আর্ট থাকে?
অ্যানিওয়ে। এপিগ্রাফে যে-লাইনজোড়া টাঙায়ে এসেছি, টিভিফিকশনে নয়া হাওয়া পাম্পের দিনগুলায় একটা সিঙ্গল এপিসোড নাটকে এই ইনফেকশাস কথাচিত্র ও সুরের গানটা শুনেছি ইয়াদ হয়। এই গানটার গীতিকার কামরুজ্জামান কামু, নব্বইয়ের দশকের নিজস্ব রচনাশৈলীসম্পন্ন অগ্রগণ্য কবি, এইটা আমি ড্যাম-শিওর। নাটকটার নির্মাতানাম মনে না-থাকলেও এইটা-যে তখনকার ক্রেইজ ভাইবিরাদরদের কেউ বানিয়েছিলেন এতে সন্দেহ অল্পই। গীতের হাহাকার বাস্তবের হাহাকারের চেয়েও ভয়ানক ভুবনার্দ্র ব্যাপার, মুহূর্তে ছেয়ে ফেলে সবকিছু। কত কত গান শুনে জীবনে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই।
২
কিন্তু তুমি যা-ই বলো-না, গানের কথাগুলো সত্য, তোমার জীবনে, আমার জীবনে, আমাদের অনেকেরই জীবনে। আমাদের মতো ভালোবাসা বাসেনি কেউ, ছোট ছোট বাঁকা বাঁকা হাসি হাসেনি কেউ আমাদের মতো, জন্মে যেয়ে পেয়েছি নির্ধনিয়ার ধন এই ভালোবাসা, কান্নাকাটা, ভাদ্রমাসের রৌদ্রধুলা আর প্যাকপানিজলকাদা, আর কিছু পাই নাই দয়াময়, আপনজনা হে! এত হাসি হেসেছে কেউ দুনিয়ায়, আমাদের ন্যায়, আমাদের আগে! বেসেছে কেউ ধুন্দুমার এত ভালোবাসা, আমাদের আগে, আমাদের মতো! দময়ন্তী হে! এত ঝগড়া! আমাদের ন্যায়! এত অসহ অমূলক সন্দেহ, সখা! আহা, আমাদের মিষ্টিতেতো সন্দেহগুলো! খুনসুটিখিটিমিটিগুলো! চড়ুইফিঙেগুলো! কখনো ফিরিবে কি আর জীবন অমন, আমাদের পরে, এই আমাদেরই মতো!
৩
ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সিনেমায়, ‘দ্য উওম্যান নেক্সট ডোর’, একটা দারুণ সুন্দর মুহূর্ত পাওয়া যায়, একটা তো নয় আসলে, অ্যা সিরিজ অফ দুর্ধর্ষ মুহূর্ত ত্রুফোর যে-কোনো ম্যুভিতেই মিলবে রেন্ডোম চয়েসে গেলেও, তবে এই সিনেমার একটা বিশেষ দৃশ্য, সংলাপিকা আসলে, আমার কাছে যেন শুশ্রূষার মতো, অথবা দৃশ্যটা আসলেই কিন্তু রোগশয্যার, সেইখানে কিছু সংলাপ ভীষণ সুন্দর ও সত্যের মতন আততায়ী।
সিনেমার নায়িকা, ফ্যানি আর্ড্যান্ট নায়িকা কাস্ট, যখন নার্ভাস-ব্রেইকডাউনজনিত কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাখাটে মুমূর্ষু দশা, নায়ক ভিজিটিং আওয়ারে দেখতে এসে তারে দেয়াল-ঘেঁষে-রাখা নিউজরেডিয়ো অন করে দেবে কি না জিগ্যেশ করছে, জেরার্ড ডেপার্ড্যু অভিনয় করেছেন নায়কের রোলে, সেই সময় নায়িকা তারে উত্তরে বলে এই কথাগুলো :
বরং গানের কোনো রেডিয়োস্টেশন ছেড়ে দিয়া যাও। গান কখনো মিথ্যা বলে না। সবচেয়ে বাজে-বিচ্ছিরি গানটাও বলে চেনা-চেনা মানুষেরই কথা, মানুষের মায়াভরা আকুতি ও মিলন-বিরহের গূঢ় ইচ্ছার কথা, বলে প্রাগৈতিহাসিক ভালোবাসা-বাসনাকামনার কথা। গানগুলো সবসময় এই মিথ্যাপূর্ণ সত্য কথাটাই চিরায়ত বলে চলে ঘুরায়েফেরায়ে—আমি তোমাকে ভালোবাসি…তোমায় ছাড়া আমি বাঁচব না…আমারে ছেড়ে যেও না প্রিয়…
অবিকল সংলাপ তো বলতে পারি নাই, কিন্তু অলমোস্ট ওই কথাগুলোই ছিল।
৪
অদ্য দুইহাজারছাব্বিশ থেকে পেছিয়ে একযুগ আগে একবার সার্চ করেছিলাম গানটার, ইউটিউবে, তখনটায় পাই নাই। এইবার পেয়েছি, কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ আপ্লোড। তন্ন তন্ন করে এছাড়া আর কোনো সোর্স পেলাম না যাতে এর অরিজিন্যাল আওয়াজটা পাওয়া যায়। সাউন্ডটা পাওয়া গেল অন্তত । অন্য কোনো তথ্য, কথা কার সুর কার সংগীতটা আয়োজন করা কার, কোথাও পেলাম না খুঁজে। এই লিরিকসংবলিত গানটা নাটকে শুনেছি মিলেনিয়ালের মধ্যভাগে। এখন অতটা আর মনে না থাকলেও মনে আছে এই গানের কথা কামরুজ্জামান কামুর, তথ্যটা আমি স্ক্রিনে না-দেখলে এভাবে এন্ট্রি রাখতাম না। আজ যখন ফেসবুকস্মৃতি ফিরিয়ে দিলো নোট-আকৃতি নিবন্ধটা, তা চৌদ্দ সালে লেখা, খানিকটা তালাশ করে দেখলাম রিসোর্স আপডেট। বিশেষ কিছু উল্লেখ করার মতো তথ্য পেলাম না। গানটা মাত্র দুইটা হাবিজাবি ভিডিয়োর গায়ে ব্যবহৃত হয়েছে দেখতে পেলাম। তবে এর গীতিকার সুরকার গায়ক সম্পর্কে এখনও গোছানো কোনো তথ্য সুলভ নয়। আশ্চর্য লাগে, এত সুন্দর একটা গান, এই সেদিনের একটা নাটকে শোনা গান, তথ্যহীনতায় হেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন আরও কত কত গান রোজ হারায়!
একবার গানটা শুনে দেখি কিংবা তার কথাগুলো পড়ি :
আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
এত ছোট ছোট বাঁকা হাসি কেউ হাসেনি
আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
আমাদের মতো ছোট করে কেউ হাসেনি।
ছোট ছোট দিন এত রঙিন
চারিদিকে বাজে এত ভায়োলিন
এভাবে কখনো সবকিছু ফেলে
চলে যাবে বলে কেউ কোনোদিন আসেনি।
আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
আমাদের মতো ছোট করে কেউ হাসেনি।
আকাশের গায়ে সুতাকাটা ঘুড়ি
এলোমেলোভাবে করে উড়াউড়ি
এলোমেলো চুল পেছনে উড়িয়ে
ফিরে যাবে বলে আমার মাধবী আসেনি।
আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
আমাদের মতো ছোট করে কেউ হাসেনি।
আমাদের হাত আমাদেরই হাতে
সমর্পণের অশ্রুর আঘাতে
ছোট ছোট রাত জেগে বসে থেকে
ফিরে যাবে ভেবে সে-মাধবী ঘরে আসেনি।
আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি
আমাদের মতো ছোট করে কেউ হাসেনি।
গীতিকার সুরকার গায়ক আর গায়িকা কারা তা আন্দাজ করা সাধ্যাতীত অবশ্যই নয়। এই নিবন্ধের এপিগ্রাফে সেই দুইটা লাইন টুকে রাখায় আস্ত গানটাই খুঁজে বের করা গেল। অন্য তথ্য অতটা আবশ্যক মনে হয় না, গানটা যদি লিসেনারদের কানে তুলে দেওয়া যায়। আমাদের মতো, সত্যিই তো, সুতাকাটা কাইটের উড়াউড়ি করেছিল কেউ? মনে হয়, আমাদের মতো, অত কেউ নয়।
৫
এবং ইত্যাদি। মিথ্যা নয়। এইসব সত্য। অসত্য নয় এই সমস্ত। সুন্দর এইসব।
শুনতে ক্ষ্যাত শোনালেও কথাগুলো তো প্রমিত-অপ্রমিত বহ্বাড়ম্বর ঝগড়াফ্যাসাদেরর ন্যায় কিছু নয়, কিংবা নয় যিশুর অনুসারীদের ন্যায় বন্ধুহন্তা।
গানের এই ঝরনাতলায় এমন কত কত গান আছে যেগুলি স্মৃতির নরম অন্ধকারে ক্ষণতন্দ্রায় শায়িত। হয়তো কখনো পুনরোন্মেষ ঘটবে সেই অশ্রুত গান্ধারের।
জাহেদ আহমদ
রচনা ০২ এপ্রিল ২০১৪ সংযোজনা ০২ এপ্রিল ২০২৬
- আমাদের মতো ভালোবাসা কেউ বাসেনি - April 2, 2026
- চৈত্রে শোনা ফাগুনগান ও এক যতিচিহ্নের বয়ান - March 31, 2026
- ছায়াছন্দ - February 16, 2026

COMMENTS