আমার দোকানের সামনে চারপাঁচটা তরমুজের আড়ৎ। প্রতিদিনই দেখি বড় বড় ট্রাক থেকে তরমুজ নামছে। এইসব দৃশ্য দেখার মাঝে ভাবি, বিজয় আহমেদের কবিতার কিতাব ‘তরমুজ ফলের দেশ’।
বইটা ২০২১ সালে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হয়। চার ফর্মার এই বইটি ছিল শুধু কবিতার। বইটির গায়ের মুদ্রিত মূল্য ছিল ১৮০ টাকা। মূলত কবি এখানে যেই দৃশ্যটা ফুটাইতে চাইছেন সেইটা সম্পর্কে একটা ধারণা থাকুক পাঠকের।
বিজয় আহমেদ বলেন, “গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজের গভীরে প্রোথিত বিশ্বাস, লোকাচার, মিথ আর ধর্মীয় অনুষঙ্গ কীভাবে সমাজে প্রবাহিত হয় আর ধর্মীয় বিশ্বাস কীভাবে একটা কৃষিভিত্তিক সমাজকে পরিচালিত করে, আমি এই গ্রন্থে তা-ই লেখার চেষ্টা করেছি।”
জানি, শিল্পের শেষ বিচারক সময়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাশি লেখক ও দার্শনিক ভলতের (Voltaire)-এর একটা কথা আছে, “Tous les genres sont bons, excepte le genre ennuyeux”. অর্থাৎ, “সব শিল্পরীতিই ভালো, কেবল একঘেয়ে না হলেই হলো।” একঘেয়েমিকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাই হলো সর্বক্ষেত্রে সৃজনশীল শিল্পীর সাধনা আর তার সাধনার সাফল্যকে ঠিক সময়ে স্বীকৃতি দিতে পারাতেই রয়েছে শিল্পসমজদারির প্রকৃত সার্থকতা।
এইদিক থেকে আমার মনে হয়েছে বিজয় আহমেদের ‘তরমুজ ফলের দেশ’ কবিতার বইটায় কবির সাবলীল ভাষার গাঁথুনি এবং শৈলীটাই পাঠককে মুগ্ধ করবে।

০২.
গ্রীষ্মকাল, তরমুজ ও বাংলাদেশ এখন সমার্থক। অদ্ভুত লাগে এই পৃথিবীর দুপুরবেলা। হয়তো এই কারণেই এদেশের কবিরা বাংলাভাষায় সুন্দর কবিতা লেখেন। ঢেঁকিশাকের জঙ্গল থেকে একটা শাদা প্রজাপতি উড়ে এসে বসলো আমার টিশার্টের উপর। ঠিক যেন বুকের মাঝবরাবর। তখন আমার মনে হলো বিজয় আহমেদের একটা কবিতার লাইন : ‘সূর্য, উদিতের পর পক্ষী হলে, বুক খুলে রাখি।’
কবিতা আমাদের মনের কল্পনাকে জাগিয়ে দেয় আরো নানাভাবে।
‘তরমুজ ফলের দেশ’-এর দুয়ার খুলে দেখতে পাই, যমুনার তীরবর্তী ধু ধু চর। যে-চরের মানুষজন একদিন ফসল বপনের আগে মাটিকে মনে করেছে ঋতুমতী বলে। সেই মাটিতে তরমুজের পাতার মোটিফ খুবই প্রচলিত। আমি ভাবি, মানুষ কেমন! কথার রুমাল উড়িয়ে দিয়ে তরমুজখেতের পাশে মৌন বাতাসের অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকে।

০৩.
বসন্ত বয়ে যাচ্ছে, অথচ মনে পড়ছে পার্থিব পৃথিবীর দিকে গোবিন্দাসী নামের সেই গ্রাম। আরও অন্ধকার কবরে জড়িয়ে পড়ছে কী রক্তজবার ফুলগুলো? আমরা শিখলাম আরো এক ধরনের জড়িয়ে ধরা আছে ফুলেদেরও কবরের সাথে। তখন আমাদেরকে খুব সহজে ছুঁয়ে ফেলে বিষণ্ণ হবার মতো বহুমুখী অভিজ্ঞতা। কবিতাকে কোথায় কোথায় নিয়ে যেতে হবে গতি ও সুন্দরতায়, তা কবি বিজয় আহমেদ জানেন। যমুনার সেই চর যেখানে প্রান্তর থামেনি, অথচ চরানো গরুগুলো থেমে আছে। যেন ইশারার খেলা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গরুর রাখাল।
কবি বিজয় আহমেদ ভাবকে, কথাকে ছন্দের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারেন। তখন কথা থেমে গেলেও যেন বলা থামে না।
শুভ্র সরকার
শুভ্র সরকার রচনারাশি
গানপারে বিজয় আহমেদ
- কেন লিখি? || হামীম কামরুল হক - April 17, 2026
- মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান - April 12, 2026
- শামীম কবীর : দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান || শাহ মাইদুল ইসলাম - April 12, 2026

COMMENTS