বাঘ এবং আঠারো ঘা || সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

বাঘ এবং আঠারো ঘা || সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

জনপ্রিয়তার দিক থেকে উত্তমকুমার সবার উপরে। আমি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের কথা মনে রেখেই এ কথা বলছি। সব বামপন্থী বুদ্ধিজীবী নেতাজি প্রসঙ্গে তাঁকে ‘পলিটিক্যাল উত্তমকুমার’ বলে রেফার করছেন, এমনটা শুনেছি। কিন্তু উত্তমকে কেউ কোথাও ‘চলচ্চিত্রের নেতাজি’ বলেছেন এমনটা শোনা যায়নি।

জনপ্রিয়তা হলো সেই বাঘ যা ছুঁলে আঠারো ঘা। উত্তমকে ছুঁয়েছিল। আর সেই ঘা যখন আঠারো কলায় দগদগে, তখন একদিন টালিগঞ্জের বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে আমি তাঁকে প্রথম দেখি। পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘ছেঁড়া তমসুক’ প্রসঙ্গে সেই একবারই আমি স্টুডিয়োতে যাই। সেই একবারই দেখা। কোনো একটি ছবির ফ্লোর থেকে রাজা-সাজে বেরিয়ে এসেছেন। বয়স তখন ৫০। শরীর মেদবহুল। সারা মুখ বীভৎসভাবে পেইন্ট করা। জুন মাসের ঘাম চুলের গোড়া থেকে দরদরিয়ে নেমে আসছে। খুব করুণা হয়েছিল তাঁর সেই দুর্দশা দেখে।

নয়-নয় করেও উত্তমকুমারের খানদশেক ছবি আমি দেখেছি। একটি ছবির একটি দৃশ্যও মনে নেই। মনে রাখার মতো কাজ করার সুযোগই তিনি পাননি। এক ‘নায়ক’ ছাড়া। আমার এক-একবার মনে হয়, ওই ছবিতে কাজ করতে করতে তিনি একসময় টের পেয়েছিলেন যে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অন্তঃসারশূন্য জনপ্রিয়তাকে এক্সপোজ করার জন্যই সত্যজিৎ ছবিটি তুলছেন। ‘তবে রে, দাঁড়া, তবে আমিও দেখাচ্ছি’ বলে তিনি শুধু এই একটি ছবিতে নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন।

আসলে, উত্তম নেমেছিলেন এক ইঁদুরদৌড়ে। ইঁদুরদের প্রশংসা, ইঁদুরদের কিচকিচই তিনি সারাজীবন ধরে শুনে গেছেন। ইঁদুর-চিত্রপরিচালক, ইঁদুর-প্রযোজক, ইঁদুর-নায়িকা, ইঁদুর-চলচ্চিত্রসমালোচক — এরা সব।

এমনটাই হবার কথা।

  • সংগ্রহ-উৎস : চলচ্চিত্র চঞ্চরী ।। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ।। প্রতিক্ষণ পাব্লিকেশন্স প্রা. লি. ।। কলকাতা ১৯৯৫

… …

গানপার

COMMENTS

error: