পুষ্পদা : নেত্রকোণার প্রথম ভাস্কর্যশিল্পী || সরোজ মোস্তফা

পুষ্পদা : নেত্রকোণার প্রথম ভাস্কর্যশিল্পী || সরোজ মোস্তফা

রোজ দেখতাম। পনের-বিশ বছর আগে। এখন যেখানে বিষ্ণুর ফুলের দোকান তার উল্টোদিকে; আখড়া ও তেড়িবাজার মোড়ের মাঝামাঝি  ছোট্ট স্টুডিওতে বসে থাকতেন। নরম আদরে মানুষের দিকে তাকিয়ে ছবি তুলতেন। ‘চিত্রায়ণ’ নামের দোকান ছিল তাঁর। মানুষের ছবি মূলত মায়া মিশিয়ে  তুলতে হয়! এটাই ছিল তাঁর জীবিকা। নেত্রকোণা শহরে তিনিই প্রথম স্টুডিও স্থাপন করেন। সেই ১৯৬১ সালে। নেত্রকোণা তখন ময়মনসিংহ জেলার সাবডিবিশন। মহকুমা শহর। সাধারণের ‘কালিগঞ্জ বাজার’। সেই কালিগঞ্জ বাজারে বাংলার সহিলপুর থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতেন। দোকান বন্ধ করে রাতের নির্জন পথে বাংলা স্টেশনের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরতনে। রোজকার একই নিয়ম। আসা-যাওয়ায় প্রত্যেকটা সাইকেলের একটা নিজস্ব ধ্বনি থাকে। সেই ধ্বনিতে বাংলা স্টেশেনের তালগাছগুলোও বুঝত, তিনি ফিরছেন। নিজেদের ডাল-ভাতের ছোট নির্জন ঘরে শান্তি নিয়ে ফিরতেন। কিংবা ঘরে এস শান্তি  খুঁজতেন। ঘুমিয়ে থাকতেন। ভোরে জবা ফুলের বারান্দায় বসে নিজের সাইকেলটার দিকে তাকাতেন। শুরু করতেন নতুন দিনের কথামালা।

দুই
আমি জানতাম উনি পুষ্প রঞ্জন আচার্য। শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে বাংলায় থাকেন। শহরে শুধু জীবিকার জন্য আসেন। মানুষের জীবিকার কোনো শেষ নেই। আসলে, জীবিকার ভেতরে প্রকৃত মানুষটাকে কখনোই খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবিকার বাইরে ছোট ছোট কথা, কর্ম ও কল্পনার ভেতরে ব্যক্তির গুণ ও ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের আলো দিয়েই প্রতিটি মানুষ জগৎকে আলোকিত করেন। কবি ও ‍চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র তালুকদার ( পাপ্পু কাক্কু) আমাকে ও মিজান মল্লিককে উনার স্টুডিওতে নিয়ে যেতেন। কোনো কাজে নয়; নিরিবিলি রুমে স্রেফ আড্ডা দিতে। পাপ্পু কাক্কুর বন্ধু ছিলেন তিনি। দীর্ঘদেহী, শ্রীমান, প্রবীণ পাপ্পু কাক্কু আমাদের বন্ধু ছিলেন। খুব চাইতাম উনার সান্নিধ্য। উনি তখন ছবি ও কবিতায় নিমগ্ন মানুষ। দেখা হলেই চিত্রশিল্পের ইতিহাস নিয়ে উনার স্টাইলে দ্রুত বলে যেতেন। কথার সাথে থাকত হাসির ফোয়ারা। যে হাসি অনেক দূরের পথিককেও হাসির উচ্ছ্বাসে আহ্বান করে। ছবি দেখিয়ে, কবিতা শুনিয়ে  তিনি হতেন আড্ডার অধিপতি। মল্লিক আর আমি পৃথিবীর নতুন-পুরনো বিস্ময়ে উনার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। পাপ্পু কাক্কুর আড্ডায় মশগুল হয়ে উনার স্টুডিওর ভেতরেও বসেছি। উনার ছোটছেলে নয়ন তখন আরো ছোট। আমরা তখন বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকতে পারতাম না। ‘হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে’ মুডে পুরো শহর ঘুরে বেড়াতাম। দেখতাম, স্টুডিওর ভেতরে একমনে কাজ করছেন তিনি। পাপ্পু কাক্কু বলতেন, ‘এভাবে লুকিয়ে থেকে শুধু কাজ করলে হবে না। কাজ দেখাতেও হবে। একটা এক্সিবিশন যদি করতে পারত! এই বাজারের যুগে যেখানে সবাই বিখ্যাত হতে চাইছে, সেখানে ওর মতো নিভৃত শিল্পীকে কে  সামনে  নিয়ে আসবে। ওর মতো ভাস্কর্য তৈরির হাত কয়জনের আছে?’

তো, পাপ্পু কাক্কু, যিনি এই কথা বলতেন তিনিও লুকিয়েই ছিলেন। কাঠের নির্জন দোতলা ঘরে তিনি শুধু লিখতেন আর আঁকতেন। আমরা কয়েকজন উনার আঁকাআঁকি আর কবিতার লাল বড় বড় খাতাগুলোর কথা জানতাম। উনার আশ্চর্য আর আলাদা ছবির ফর্ম অনালোচিতই থাকল। উনার বন্ধু পুষ্প রঞ্জন আচার্য আর উনি নিজেদেরকে অগোচরে রেখে আজ চলেই গেছেন। হয়তো এই শহরের মাটিতে কিংবা অনেকের চোখে ও হৃদয়ে শুকিয়ে গিয়েছে উনাদের মুখ। কাজের ভেতরে উঁকি দিতে না পারলে মানুষের নামকে আর কয় পুরুষ মুখে তুলে রাখে? এই শহরের নবাগত নাগরিকবৃন্দ কিংবা নতুন জেনারেশনের কেউ কি উচ্চারণ করবে উনাদের নাম? নবাগত মজলিশে কে আর বসাতে চায় পুরনো নাম। কেটে-যাওয়া ঘুড়ির মতো মানুষের নাম কোথায় যে হারিয়ে যায়! দেয়ালের লেখা্ স্থায়ী হয় না। মানুষের নামও কি স্থায়ী হয় কিংবা স্থায়ী করা যায় অম্লান এপিটাফে?

তিন
আসলে পুষ্প রঞ্জন আচার্যর স্টুডিয়োর ভেতরে ছিল আরেকটা স্টুডিও। জীবিকার নিত্য কর্মকাণ্ডের ভেতরে ছিল নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা। মধ্য-দুপুরের নিশ্চুপ শহরে মর্ম ও মরমি জ্ঞানে কল্পনায় কল্পনায় মানুষের প্রতিবিম্ব বানাতেন।  ছবি আঁকতেন। দীর্ঘ কথার মানুষ তিনি ছিলেন না। স্বল্প কথায় জীবিকার রোজকার কর্ম ‘ছবিতোলা’ শেষে ভাস্কয নির্মাণে  ডুবে থাকতেন। যাচাই-বাছাই আর নিজেকে নির্মাণের অবিরাম চেষ্টা। আত্মযাপনের নিজস্ব কোঁচায় স্বপ্ন; অবিরাম কাজ করে মন ও মনন।

আচ্ছা, মানুষের জীবিকায় কেন আমরা নাম চাপিয়ে দিই! জীবিকায় জীবিকায় নামের ভেতরে নাম চাপিয়ে কেন আমরা আসল মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি! কিন্তু জীবিকার চেয়েও স্পষ্ট ছিল পুষ্পদার নাম। এই শহরে তিনি ছোট-বড় সবারই পুষ্পদাই ছিলেন। ‘চিত্রায়ণ’ স্টুডিওর কথা কে আর বলত!; বলত, পুষ্পদার দোকান।

মানুষের ছবি তুলে একমুঠো গরম ভাত খেতে চাইতেন তিনি। কিন্তু সাদা চোখের ভেতরে ছিলেন ভাস্কর্যশিল্পী। মন ও কাঠামোবিদ! মগরা নেত্রকোণার প্রথম ভাস্কর তিনি। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরম ভাস্কর! আসলে রক্তের ভেতরে ছিল ভাস্করের ধ্যান ও ক্ষমতা। পিতা রাধাগোবিন্দ আচার্য আর ঠাকুরমা ছিলেন জাত মৃৎশিল্পী। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে লেখাপড়া করেছিলেন। তারপর বাবা এবং ঠাকুরমার পৈতৃক মৃৎশিল্পের পেশায় যোগ দেন। নেত্রকোণার বারহাট্টা রোড়ের নরসিংহ জিউর আখড়ায় মূর্তি বানাতেন; বানাতেন বিভিন্ন পূজার দেবীপ্রতিমা। মাটির মূর্তি বানাতে বানাতেই একদিন প্রবেশ পেশাদার ‘ছবি তুলকে‘ কিংবা ফটোগ্রাফির জগতে প্রবেশ করলেন।

কীভাবে এই জগতে প্রবেশ করেছিলেন? এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। তবে অনুসন্ধানে জানা যায় নেত্রকোণার বড়বাজারে মণি সাহা নামে একজন শৌখিন ফটোগ্রাফার ছিলেন। ফটোগ্রাফির কোনো ব্যবসা কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য তার ছিল না। কলকাতায় কারো কাছ থেকে তিনি এই ফটোগ্রাফি শিখেছিলেন। জানা যায় এই মণি সাহাই পুষ্পদাকে ফটোগ্রাফি শেখান। এই কাজ কেন তিনি শেখেন? নিশ্চয়ই তিনি বুঝেছিলেন এই শহরেও ফটো তুলতে চায় মানুষ। পাট এবং ধানের ব্যবসায়ী ছাড়া এই শহরে ছিল সরকারের কোর্ট-কাচারি আর রাজস্ব আদায়ের লাল ইমারত। পাহাড়ি নদী মগরা তখন বিপুল স্রোতস্বিনী। সেই মগরার তীরে তিনি বসিয়ে দিলেন ফটো তোলার স্টুডিও। বক্স ক্যামেরার আশ্চর্য বাকশো। মানুষ আরো সহজ করে বলত মিনিট ক্যামেরা। মানুষকে বসিয়ে রেখেই ছবি দিয়ে দেয়া হতো।

একটা আশ্চর্য সৌন্দর্যে স্নাত ছিল কালিগঞ্জ শহর। শহরে তখনও স্থাপিত হয়নি পাওয়ার স্টেশন। আত্মমগ্ন একজন বাতিওয়ালাই শহরের আলো। সন্ধ্যায় রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে রাখা বাতিগুলো অসীম মমতায় জ্বালিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন আলোর মানব। রাতের অন্ধকারে মিশে-যাওয়া বাতিওয়ালা সান্ধ্য ডিউটিতে ফিরে আসে রোজ। কথা বলে না। রহস্য নিয়ে ঘোরে। খুব দ্রুত বাতিগুলোতে তেল ভরে। একটা জ্বালিয়ে হেঁটে চলে অন্যটায়। একটু একটু করে শহরটা পরিবর্তিত হচ্ছে। বছর দশেক আগে দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় আর চন্দ্রনাথ স্কুলের ছাত্ররা মিলে শহরে ভাষা আন্দোলনের মিছিল করেছে। মিছিল করতে করতে আঞ্জুমান স্কুলের ছাত্রদের বের করে নিয়ে এসেছে। এমএলএর বাড়ি ঘেরাও করেছে। পরিবর্তনের একটা হাওয়ায় নিত্য বদলে যাচ্ছে শহর, মানুষ ও মানুষের চিন্তা।

চার
শুধু জীবিকার তাগিদেই বিদ্যুৎহীন বাজারনির্ভর শহরে স্টুডিও স্থাপন করে ফেললেন পুষ্প রঞ্জন আচার্য। রোদের ভেতরে ছবি তুলতে হতো। মেঘালয়ের পাদদেশে বৃষ্টি-বাদলের এই অন্ধকার শহরে ছবি তোলার ব্যাপারটা সহজ ছিল না। সেই কঠিন ব্যাপারটাকে সহজ করতেই হ্যারিক্যানের আলোয় একটা আশ্চর্য কৌশলে ছবি তুলতেন তিনি। এই পথের অগ্রনায়ক তিনি। পরবর্তী সময়ে অনেকেই স্টুডিওর পেশাকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছেন। খালিয়াজুড়ি হাওরেও তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন স্টুডিও। নেগেটিভ বড় করে হ্যারিক্যানের আলোতে এক্সপোস দিতেন। আসলে হ্যারিক্যানের আলোয় যে ছবি তোলা যায়, এই টেকনিকটা আর কেউ জানত না। ফলে দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি।

পেশার ভেতরে হারিয়ে যাননি পুষ্পদা। স্বপ্নে ও মননে ছিলেন জাত ভাস্কর। ভাস্কর্য তৈরি, ছবি তোলা, ব্যানার লেখা — তিনটি কাজ একসাথে করে যাচ্ছেন, করে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু বেশি ঝুঁকে পড়েন ভাস্কর্য নির্মাণে। ভাস্কর্য তৈরিতে তিনি নতুন মাত্রা যুক্ত করেন। মাটি ছাড়া  আর্টপেপার, কপিল বার্নিশ, ময়দা, জিঙ্ক অক্সাইড ও বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক আশ্চর্য উপকরণের মাধ্যমে  নতুন ধারার  ভাস্কর্য গড়েন। এই মিশ্রণে শক্ত এক ধরনের আঠালো পদার্থ তৈরি হয়। দেখতে এই আঠালো পদার্থ অনেকটা এঁটেল মাটির মতোই শক্ত। ভিন্ন ধারার এই উপকরণ দিয়েই তিনি ছোট-বড় ৫০টি ভাস্কর্য তৈরি করেন। ভাটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাণ ও প্রকৃতিই তার বিষয়। কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া মাটি, মানুষ ও প্রকৃতিই ছিল তার শিল্পের ভূবন।

ভাস্কর্যের নাম দেখেই বোঝা যায় তাঁর শিল্পের ধারা ও নিমগ্নতা। ‘দুর্ভিক্ষ দিন’, ‘ভাষা অন্দোলন’, ‘ঘূর্ণিঝড়’, ‘স্বাধীনতা’, ‘মাছ ধরা’, ‘নির্যাতিতা একাত্তর’  ‘মুক্তিযোদ্ধার মা’, ‘বন্দী জীবন’, ‘আজো ভুলিনি মা একাত্তরের দামাল ছেলেকে’, ‘কৃষক ধন্য যোগায় অন্ন’, এবং ‘বেকার নয় হকার’। নিভৃতচারী এই শিল্পী মনে করতেন মাটির বিকল্প এই সহজ ও টেকসই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্প খরচে মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। কিন্তু যে-সমাজ ভাস্কর্যশিল্পের প্রতি দরদী নয়, সে-সমাজে কীভাবে টিকবে পুষ্প রঞ্জন আচার্যর নাম?

পাঁচ
১৯৭১ সালে নিজের প্রিয় স্টুডিও  থেকে তাকে ধরে নিয়ে চোখ বেঁধে বধ্যভূমিতে বন্দুকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। শেষে জল্লাদ বাহিনীর একজন তাকে মুক্তি দিয়ে দেয়। নবজীবন নিয়ে বাঘমারা ক্যাম্পেই ছিলেন বাকিটা সময়। স্বাধীন দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দর্শন নিয়ে শিল্প গড়েছেন। শুধু স্টুডিওর ব্যবসা করে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকেই অনেক কামিয়ে নিয়েছেন। তিনি পয়সা কামানোর দিকে নজর দেননি। পূর্বপুরুষের যাপিত জীবনের রক্তধারায় বেছে নিয়েছেন শিল্পীর জীবন। স্বীকৃতি পাননি। হাততালি ও পুরস্কার পাননি। তাতে কি! একজন ভাস্কর্যশিল্পী হয়ে জনপদের মাটি ও মানুষের বিশ্বাস ও প্রকৃতিকেই গড়েছেন তিনি। একজন শ্যামল চৌধুরী, একজন অখিল পালের অগ্রপুরুষ তিনি। শিল্পের ভাষা কখনোই হারিয়ে-ফুরিয়ে যায় না। নবাগতের ধ্যান ও অনুশীলনে অগ্রজ থাকেন বিশ্বস্ত আদরে।


কৃতজ্ঞতা  : কবি মুশফিক মাসুদ। শিল্পী নয়ন আচার্য ।। ছবি : বারীণ ঘোষ

… …

গানপার

COMMENTS

error: