তারাভরা রাতে এবি || মিঠু তালুকদার

তারাভরা রাতে এবি || মিঠু তালুকদার

রাতের সব তারারাই দিনের আলোর ভিতরে সেঁধানো রয়েছে, এমন একটা লাইন রবীন্দ্রনাথের কবিতায় পেয়েছি ইশকুললাইফে আউটবই পড়ার সময়। জীবনের সুন্দর সময়গুলো, সুখের সময়গুলো, অত্যন্ত দুঃসময়েও ছুঁয়ে থাকে আমাদেরে ঘিরে; কেউ হয়তো খেয়াল করি কেউ করি না। একইভাবে কেটে যাবার পরেও দুঃসময়গুলো রয়ে যায় আমাদের মনে। এবং বহু বছর পার করে একেকটা আচমকা অসতর্ক মুহূর্তে সেই দুঃসময়গুলো স্মরণ হয় আমাদের এবং স্মৃতিচারণ করি আমরা। আগের সেই বিভীষিকার জায়গায় একচিলতা হাসির মতো রোমন্থন করি আমরা খারাপ-সময়ের সেই দংশন নিয়ে এবং তখন কয়েকটা ভালো অনুষঙ্গ স্মরণ হয়। যেমন স্মরণ হয় ভীষণ দুঃখদিনে ব্যক্তিগত পরিসরে কে বা কারা পাশে ছিল, কোল দিয়েছিল কারা বা খাবার ও আশ্রয়, তেমনি বিভীষিকাদিন পারানোর সময় কোন গান বা কোন কোন সংগীতশিল্পী সুরে এবং কথায় সান্ত্বনা যুগিয়েছেন বা বাঁচতে প্রেরণা দিয়েছেন তা-ও মনে পড়ে।

ব্যক্তিগত দুর্বিষহ দহনের দিনে একটা বড় আশ্রয় দিয়েছিল আমাকে এবির অসাধারণ সেই গানটা। “তারাভরা রাতে / আমি পারিনি বোঝাতে / তোমাকে আমার / মনের কথা” … গানটা জানেন সবাই। এই গান না শুনে পেরিয়ে এসেছেন তপ্ত তরুণদিন, এমন মানুষ বোধহয় শেষ আড়াই-তিন দশকের বাংলাদেশে একজনও পাওয়া যাবে না। প্রাচ্য ঘরানার সুর ও সংগীতে এবির দখল, ইস্টার্ন মেলোডি মেইকিং মায়েস্ত্রো হবার সমস্ত রসদই ছিল এবির হাতে এমন প্রত্যয় আইয়ুব বাচ্চু অনেক গানেই দেখিয়েছেন। শুধু তারাভরা রাতেই নয়, ‘দরোজার ওপাশে’ বা তার ‘ময়না’ বা ‘রক্তগোলাপ’ অ্যালবামের কয়েকটা গানে এই নিশানা আমরা দেখেছি। কিংবা হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল যখন অ্যালবাম করলেন, সেইখানে এবির ইস্টার্ন মেলোডি নিয়ে খেলা করাটা আমরা আজো সবিস্ময় দেখি।

কিন্তু বলতে চাইছি যে কেবল ওয়েস্টার্ন রক ঘরানা দিয়েই দি বস্ আইয়ুব বাচ্চুকে বিচার করেও বাংলায় গ্রেইট মিউজিশিয়্যানের কাতারশীর্ষে রাখা যাবে কথাটা সত্যি হলেও সুরকার-সংগীতকার আইয়ুব বাচ্চুকে খণ্ডিতভাবে দেখা হবে যদি তার করা দেশজ সুরের এবং বাদ্যযন্ত্রের বাতাবরণ তৈরি করে বাঁধা গানগুলো বিবেচনায় না রাখা হয়। বেশিরভাগ শ্রোতা বাচ্চুকে তার গিটার আর রকগানের জন্য মনে রাখবেন নিশ্চয়। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বাচ্চুর দেশজ অনুষঙ্গ লগ্নি করে বাঁধা কাজগুলোর আমি ভক্ত শুরু থেকেই।

যাকগে। ব্যক্তিগত স্মৃতিটায় ফিরি। একটা রাতের গল্প বলতে বসেছিলাম, বলি। সেই রাতে আসমানে তারা ছিল কি না জানি না, তারাজরিপের মতো মনমিজাজ বা ব্যবস্থা ছিল না। আমার স্পষ্ট মনে আছে বছরটা ছিল ২০০৭ এবং জীবনের বলা যায় প্রথম দুর্যোগ পারাচ্ছিলাম আমি। চারদিক থেকে একটা আজদহা আন্ধাইর ঘিরে ধরছিল আমাকে। ক্যারিয়ারে, রুটিরুজির বন্দোবস্ত সবখানেই ধাক্কা খাচ্ছিলাম থেকে থেকে। এরই মধ্যে আমার জীবনে যে বায়ান্ন তাস হয়ে এসেছিল, যাকে আমি জীবনের ধ্রুবতারা ভাবতেই ছিলাম অভ্যস্ত, সেই মাধুর্যের আত্মীয়াটির বিবাহ স্থির হয় এবং আমার পায়ের তলায় তখনও মাটি আসে নাই বলে এবং অন্যান্য চাপে বেদিশা আমাকে ট্রেনে চেপে বসতে হয়। সেই যাত্রায় আমার সঙ্গে বেশ কয়েকজন বন্ধু উঠে বসেছিল রেলগাড়ির কামরায়। সারারাত আমরা ট্রেনভরে গেয়েছি একটাই গান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে : সেই তারাভরা রাতে / আমি পারিনি বোঝাতে …

গানের কথাগুলো তো অত অবাক হবার মতো কিছু না। বাংলা গানে এই লিরিকেরই থিম্যাটিক চর্বিতচর্বণ দেখতে পাই আমরা আদিকাল থেকে। প্রেমিকাকে হারিয়ে প্রেমিকার জন্য ক্রন্দন ইত্যাদি। কিন্তু বাচ্চুর এই গানে একটা আশ্চর্য সুরের ব্যক্তিত্ব কমন কথার এই গীতিখণ্ডটিকে আবহমান বাংলা গানের চিরস্মরণীয় হীরকের দ্যুতিতে দেদীপ্যমান করে রেখেছে। সেই বিষাদব্যঞ্জিত রাত্রির ট্রেনে গেয়েছি গানটা প্রাণ ও শরীরের সমস্ত তাক্কত উজাড় করে। কেঁদেছে আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে। কেঁদেছে কি না দেখি নাই কিন্তু বুঝতে পেরেছি ট্রেনবগির অন্য সমস্ত যাত্রীরাই আমাদের গান শুনে গেছে। এবং সম্ভবত দরদের পারদ উঁচুতেই ছিল বলে কেউ এসে রাতবিরেতে হেঁড়ে গলার মরাকান্না থামাইতে রিকোয়েস্ট করে নাই।

এমনিতে জেমস্ আমার অলটাইম ফেবারিট মিউজিশিয়্যান। শুরু থেকে, আজও, এখনও। তখন সময়টাই ছিল এমন যে প্রিয় শিল্পী একজনের সবকিছুই ছিল অনুমোদনযোগ্য আমাদের কাছে এবং প্রিয় গান ছিল সমস্ত শিল্পীর কাছেই রাখা। আইয়ুব বাচ্চুর কাছেও রাখা আছে আমার অসম্ভব প্রিয় কয়েকটা গানের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। ‘সেই তুমি’ তো অবশ্যই, ‘শেষ চিঠি’ অবশ্যই, ‘কষ্ট’ অ্যালবামের যে-কোনো গানই, কিংবা সুনীল দাসের সঙ্গে সেই বেহালায় আনপ্লাগড ‘ফেরারী মন’ ইত্যাদি অনেক। তবে যে-গানটা আমাকে এবির ভক্ত বানিয়েছে সেইটা ‘মাধবী’। রেডলাইট অ্যারিয়ার এমন একটা ক্যারেক্টারকে এতটা টাচি করে প্রেজেন্টেশন বাংলা গানে এবির অরিজিন্যাল কন্ট্রিবিউশন সন্দেহ নেই।

কিংবা আমি হয়তো এইভাবে বলতে চাইব না, তারপরও বোঝানোর জন্য বলি যে এবিকে আরেকটা কারণে তারিফ করি। সেইটা তার ভার্সিটিলিটি। বিচিত্র সব সুরে খেলিয়েছেন নিজের কম্পোজিশনগুলো। যখন কণ্ঠশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর কথা বলতে চাইব তখন আমি বলব যে বাচ্চু কণ্ঠের জোরের জায়গাটায় ছিলেন বৈচিত্র্যঋদ্ধ। তুলনা দিলে বেখাপ্পা লাগবে, তারপরও বলি যে এবি ছিলেন প্রায় সমস্ত স্কেলেই গলা খেলিয়ে নেবার মতো দক্ষ ভোক্যালিস্ট। এমনকি মিউজিকের ঈশ্বর জেমসের সঙ্গে এই জায়গাটায় এবিকে রেখে যদি বলি যে জেমস্ যেখানে জি-স্কেলে বেশিরভাগ সময় স্টে করেন, বাচ্চু সবসময় স্কেল থেকে স্কেলান্তরে বেড়ান ঘুরে বিহার করে। এর মানে এও নয় যে একজন খাটো বা আরজন উচ্চ। পুরা ব্যাপারটা তাদের যার যার সংগীতব্যক্তিত্বের সঙ্গে গেছে কি না তা-ই বিবেচ্য। জেমসের গেছে, এবির গেছে, সেইজন্যেই তারা মহামহিম।

একেকটা গান এবং একেকজন সংগীতশিল্পী জীবনের প্রত্যেকটা ভালোয়-মন্দয় আমাদের সঙ্গেই থাকেন। সংগীত তো আর কিছু না, গান হোক কথায় কিংবা বাকরহিত বাদ্যযন্ত্রের বা সরগমের, আমাদের মানবজনমে সংগীত হচ্ছেন মা। স্বর্গাদপি গরিয়সী। তিনি সর্বত্র বিরাজেন। দুর্গা। আমাদেরে ঘিরে রাখে এই বিপুলা সাংগীতিকতা। আইয়ুব বাচ্চু মহাজাগতিক সংগীতসংশ্রয়েরই এক সপুষ্প শাখা।

… …

মিঠু তালুকদার

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you