একটি পুরনো হাস্যকলহ || সোহরাব ইফরান

একটি পুরনো হাস্যকলহ || সোহরাব ইফরান

শেয়ার করুন:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমার নিকটবর্তী শহর। কেল্লা শাহের মাজারে ঘুরতে যাওয়ার পথে ভৈরব বাজার জংশন হতে লোকাল ট্রেনে আখাউড়া নামতে হয়। এরপর সেখান থেকে অটোতে করে জিন্দা কেল্লার মাজার। জিয়ারত করা। আর বিশাল ডেকচি ঘুরে দেখা। আর একটা মুগ্ধবোধ। আড়াইশো তালা মারা পাগল, টাকার মালা পরিহিত পাগল—তারা আসলে আউলিয়া বন্দিশদের উসিলা। তারা সমস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। তাদের একজনের সাথে একবার একটা ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে পাপারাজ্জির মতো পিছু নেই। শেষ পর্যন্ত জানতে পারলাম বেশিরভাগ তালা তার ভক্তদের রতি বন্ধ করার জন্য মারা হয়েছে। এভাবে পিছু নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে লোকনাথ দিঘির পাড়ে পৌঁছাই, পুরনো বিশাল দিঘি। উনি চট করে উধাও হয়ে গেলেন। জল পরিগ্রহ করতে করতে কখন যে নাই হয়ে গেল টের পেলাম না। আশেপাশের অনেককে জিজ্ঞেস করেও ট্রেস করতে পারলাম না। অগ্যতা একজন সাইকেলিস্ট ও একটা মাকড়শার জাল ভর্তি জানালার ছবি তুলি। তারপর এই শহরের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কৃতি সন্তান তাকে সবাই বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব বলে ডাকে, তার স্মৃতিসংগ্রহ নিয়ে যে-ভবন আছে সেখানে যাই, সেটিও তালা মারা। অগত্যা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাজারে ঘুরলাম। বিশাল বাজার। হাতপাখার বাহারী দোকান, মশলার বিশাল আড়তদার ভর্তি এলাকা। পানের বরজ যারা করে তারা দুই তিন রাত না ঘুমিয়ে বরজ খালি করে চালান নিয়ে ব্যস্ত। ওদিকে আমার তখন একটা ফ্রিল্যান্সিং সাংবাদিকতা করার নেশা হয়ে গিয়েছিল। কোনো পত্রিকায় নাই, কোনো পেজে নাই অথচ প্রায়ই নিউজ তৈরি করি। এর মধ্যে একটা ছাপাও হলো একদিন। গাছে পেরেক মারা নিয়া একটা নিউজ। সাইনবোর্ড থেকে নাম্বার নিয়ে লোককে ফোন করি। তার সাক্ষাৎকার নেই। এবং বুঝিয়ে বলি গাছে যেন পেরেক না মারে। ইত্যাদি। একটা ফটো তুলি এবং নিউজটা একটা পত্রিকায় ছাপা হয়। পরে সেই পত্রিকা অফিসে একবার ঢু মেরেছিলাম একদিন।



যাক সে কথা। আমার তো জানাই ছিল অন্নপূর্ণা দেবী বাংলাদেশের এক জননী। তার পিতা বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতের এক উজ্জ্বল গ্যালাক্সি। তার ঘরপালানো নিয়ে এলাকায় অনেক কিংবদন্তি। এত কথা কি আর ওরা জানে শুনে! আলাউদ্দিন খাঁ একবার না বহুবার পালিয়েছে নানাভাবে। কোনো একবার চূড়ান্তভাবে সফল হলো। আবার ফিরে এসে আবারো পালালো। মনে হয় একটা সিলসিলা ছিল পালানোর। কিন্তু একটা ব্যাপার হয়তো অনেকেই জানেন না,  ব্রিটিশ পিরিয়ডের পর পর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘরপালানো বা বাড়িঘর ছেড়ে নাগর আলী হয়ে যাওয়া ছিল একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কেউ না কেউ বাড়ি ছাড়ত। কেউ ফিরে আসত। কেউ আসত না। কেউ কোনোদিনই আর আসত না। কারো কারো খোঁজ পাওয়া যেত, খবর পাওয়া যেত। এই ঘরছাড়ার একটা তরিকা আছে। বেশিরভাগ যারা ঘর ছাড়ে, তাদের লাল কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘরছাড়ার নিয়ম ছিল। কম্বলটা শীত হোক বা গরম বাধ্যতামূলক ছিল। সাথে অল্প টাকা। অন্তত দশ টাকা। পঁচিশ হলে ভালো। বেশি হলে সমস্যা নেই। কিন্তু মালদার হয়ে ঘরছাড়ার অনুমতি ছিল না। তাহলে মাল শেষ করে ঘর ছাড়তে হবে। এগুলো লাল বাদশাহদের বহু পুরনো গুপ্ত নিয়ম। যারা ফিরে আসত তারা জানাত, হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় তারা সম্মোহিত হয়ে যেত। যা দরকার তা পথেই চালান আসত। গায়েবিভাবে বিভিন্ন মাজারে যাবার জন্য পথনির্দেশ থাকত। ঘরহারাদের খাবারের নিয়মের কিছু রীতি আছে। যেমন মাছমাংশ একইসাথে খাবে না, আলাদা আলাদা দিনে। আবার একবারে খাবার পাত্রে বা কলাপাতায় যা পাবে তা খাবে। তাদের সিলসিলার স্লোগান আছে, “খাবারের পাতে যাহা পাও হাতে, যতটুকু অর্ডার হইছে ততটুকুই তাতে।” মাজারে শিরনি দেয়ার সময় আপনি আরো চাইলে এই রকম বচন শুনতে পারেন হয়তো। বাবা আলাউদ্দিন যখন এই রকম একটা মৌসুমে ঘর ছাড়ছিল তখন তিনি খুব ছোট। আর যখন তার নামডাক হলো তিনি একবার শান্তিনিকেতন যাবার দাওয়াত পেলেন। দাওয়াত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই করে নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ হয়তো আমার মতো আলাউদ্দিন খাঁর এলাকার আধ্যাত্মিক ক্রেজ সম্পর্কে জানেন না ঐভাবে। জানলে সে একটা গ্রন্থ লিখতে পারত তাকে নিয়া। পরে সেই গ্রন্থ আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা লেখে, যেইটা খুবই সামান্য পরিশিষ্টমূলক লেখা। জীবনী ধরনের। আলাউদ্দিন খাঁ তো নিজেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে নিয়ে ঋত্বিক কুমার ঘটক একটা সুন্দর ডকুমেন্টারি করল। আচ্ছা, সেই শান্তিনিকেতনের দাওয়াতি মেহমান যখন কিছুদিন পাঠদান ও ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন শিল্পীকে সাক্ষাৎ ও সিটিং দিয়ে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হলেন, তখন ভরামজলিশে অনেকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা গম্ভীর হেসে বললেন, ‘এই নন্দলাল, তোমরা কেউ একজন আলাউদ্দিন খাঁর মাথাটা রেখে দাও তো’।  বলার সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথের ছাত্ররা জানালো সেটা তারা (রামকিঙ্কর) অলরেডি মুর্তি বানিয়ে রেখে দিয়েছে শান্তিনিকেতনে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আলাউদ্দিন খাঁ কি পদ্মার ইলিশ ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার মাথা রেখে দেওয়ার রসিকতাপূর্ণ ভানে রেখে দিতে চাইলো? একজন গুরুস্থানীয় শিল্প-আচার্যের সাথে ভানু সিংহের এ কেমন আতিথেয়তা! পঞ্চাশ বছর সাহিত্য করেও কি এটা উনি বুঝতে পারেননি, শিল্পীকে ঘাইহরিণের মতো দৌরাত্ম্যমূলক অনুভূতি দেয়া যে এক ধরনের পাপ!



রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য একজন যন্ত্রের জাদুকর তার বয়ানে রেখে দিয়েছেন। উনি তো বড় মাপের একজন মানুষ, এইজন্য খারাপলাগাটা শেয়ার না করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন রসিকতা। আজকে আলাউদ্দিন খাঁ যদি ঈশা খাঁ হতো বা বাংলার বারোভূঁইয়াদের একজন তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও একটা সত্যিকারের রসিকতা শুনিয়ে দিতো নিশ্চয়। আলাউদ্দিন খাঁর পরিবার সেই রসিকতা মনে রেখেছে লিপিবদ্ধ করেছে। কারণ ঠাকুর যা দিলো তার সবি তো উপহার। আজ যদি অঞ্জন দত্ত গান গেয়ে বাংলাদেশ থেকে গাড়িতে যাওয়ার সময় পপসম্রাট আজম খান একটা কোল ড্রিঙ্কস এগিয়ে দিয়ে বলে, পানীয় খাওয়া শেষ হলে একটু রুমে আসুন অঞ্জনদা, আপনার ফুসফুসটার একটা মেজারমেন্ট নিবো। অঞ্জন দত্ত কি তখন ক্লান্ত হবে না? আমার তো মনে হয় দত্তব্যাটার পা বরফ হয়ে যাবে বস্তির ছেলের এমন কথা শুনলে। আলাউদ্দিন খাঁ বা যারা ঘরাবাড়ি ছেড়ে ভবঘুরে থেকে কিংবদন্তি হলো তার আড়াইশো এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে যে ঠাকুর পরিবারের পক্ষে তা নিয়ে কোনো গ্রন্থ কল্পনা করাই সম্ভব হয়নি। কাজেই আলাউদ্দিন খাঁ হয়তো এই মাথা রেখে দেওয়ার রসিকতা শুনে ক্লান্ত হননি। কারণ ট্রমার যুগ কাটিয়ে তিনি গুরু হয়েছেন যে! কিন্তু এই রসিকতা নিয়ে আমরা যদি একটু রসিকতাপূর্ণ বিশ্লেষণ করি তাহলে কেমনে হবে? একজন বড় কবি একজন বড় সংগীতগুরুর মধ্যে রসিকতা বলে কথা। তার একটা এক্সটেনশন না তৈরি করলে সাহিত্যপাড়ায় জমবে কি? সংগীতগুরু কারা, যেমন তানসেন, আলাউদ্দিন খাঁ। তারা হচ্ছে দেবতুল্য মানুষ। তাদের রসিকতা আর রসিকতা হজম করার গল্প কোনোকিছুই ফেলনা নয়। তা অবশ্যই বুদ্ধিবৃত্তিক রস সঞ্চারের উপাদান।

(বি.দ্র. / বাঙালির রস রসিকতা ইতিবাচকভাবে নিন।)


সোহরাব ইফরান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you