রামমঙ্গলের বিভা রানী : বিভাময়ী দিবারাত্রি || সঞ্জয় সরকার

রামমঙ্গলের বিভা রানী : বিভাময়ী দিবারাত্রি || সঞ্জয় সরকার

শেয়ার করুন:

বিভা রানীর ‘বিভা’ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা পূর্ব-ময়মনসিংহে। লোকগানে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলটিতে যারা রামায়ণ (রামমঙ্গল) গাইতেন, তাদের মধ্যে একমাত্র নারী গায়েন ছিলেন তিনি। নেত্রকোনার ‘বিভা গাইন’ বললেই চিনতেন সবে। ছিলেন সুকণ্ঠী গায়িকা। কিন্তু সত্তর পেরোনো বিভা রানীর সেই ‘বিভা’ আর নেই। জরা-ব্যাধিতে জর্জরিত। জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাচ্ছেন অতি কায়ক্লেশে।

পুরো নাম বিভা রানী আচার্য। জন্ম নেত্রকোনা সদর উপজেলার সহিলপুর গ্রামের বিখ্যাত আচার্য পরিবারে। বিখ্যাত বলার কারণ — বিভার ঠাকুরদাদা বিজয় নারায়ণ আচার্য ছিলেন পূর্ববাংলার স্বনামধন্য কবিয়াল ও প্রবন্ধকার। আর বিভার বাবা মদনমোহন আচার্য ছিলেন পূর্ব-ময়মনসিংহের নামকরা কবিয়াল। মদনের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই এ অঞ্চলে কবিগানের ধারার বিলুপ্তি ঘটে। কাজেই পরিবারিক পরিবেশেই গানে আকৃষ্ট হন বিভা। রামায়ণের দল তৈরির পর পরিচিতি পান ‘বিভা গাইন’ নামে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভার বয়স ছিল ১৯ বছর। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আশ্রয় নিতে হয়েছিল মহষেখলার শরণার্থী শিবিরে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কুমারী মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বাবা-মা। নিরূপায়ে বড় ভগ্নিপতি কুমুদ রঞ্জন আচার্যের সঙ্গে তাকেও বিয়ে দিয়ে কন্যাদায়মুক্ত হন। কিন্তু পরিণতিতে দুই বোনকে হতে হয় পরস্পরের সতীন। সচরাচর যা ঘটে, তাদেরও এর ব্যতিক্রম হলো না। কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা দিলো সম্পর্কের টানাপোড়েন। এ অবস্থায় বড় বোনের পথের কাঁটা হয়ে থাকতে চাইলেন না বিভা রানী। সংসার ছেড়ে মেয়ে বাসন্তীকে নিয়ে চলে এলেন বাবার বাড়ি — সহিলপুরে।

এবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে গানকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার চিন্তা করলেন বিভা রানী। তবে বাবা-ঠাকুরদাদার মতো কবিগান না। তিনি জড়ালেন রামায়ণ (রামমঙ্গল) গানে। পাশ্ববর্তী বর্ণি গ্রামের ওস্তাদ গিরিন্দ্র গায়েনের কাছ থেকে শিখলেন রামায়ণ পালা পরিবেশনার কলাকৌশল। আর অল্প কিছু বাউলগান শিখলেন নিজের প্রচেষ্টায়। বাবার কাছ থেকে কবিগানের কিছু ধারণা তো পেয়েছিলেন আগেই।

রামায়ণ কাহিনির ওপর বেশকিছু পালাগান প্রচলিত আছে। যেমন : ‘পুত্র পরিচয়’, ‘রাবণ বধ’, ‘শতস্কন্ধ রাবণ বধ’, ‘রাম-সীতার বিবাহ’, ‘সীতার বনবাস’, ‘লক্ষণের শক্তিসেল’ ও ‘কলাবনের যুদ্ধ’ ইত্যাদি। ওস্তাদ গিরিন্দ্র সরকারের সাহচর্যে উপরোক্ত সাত পালাই আয়ত্ত করতে সক্ষম হন বিভা। লেখাপড়া না জানলেও পালা কাহিনিগুলোর বর্ণনা ও সুর-তাল রীতিমতো মুখস্থ করে ফেলেন। এরপর খোলবাদক ধীরেন্দ্র, মাধব, হারমোনিয়ামবাদক ননীগোপাল, মাখন ও মন্দিরাবাদক বাচ্চু এবং রাখালকে নিয়ে দল গঠন করে নেমে যান আসরে।

ওই সময় রামায়ণ পালার নারীগায়ক বলতে এ অঞ্চলে আর কেউ ছিলেন না। তাই বিভা রানীর ‘বিভা’ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। নেত্রকোনার দশ উপজেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এমনকি ময়মনসিংহের গ্রামগঞ্জ থেকেও আসতে থাকল ডাক।

জানা যায়, কেবল কণ্ঠশিল্পী হলেই রামমঙ্গল গাওয়া যেত না। রামায়ণের পুরো কাহিনি মুখস্থ থাকতে হতো। দর্শকরা এটা-ওটা প্রশ্ন করতেন বলে অন্যান্য শাস্ত্র সম্পর্কেও কিছু ধ্যান-ধারণা রাখতে হতো। আর জানতে হতো সুর, তাল, ছন্দ ও অভিনয়। বিভা রানীর এই গুণগুলো ছিল। বিশেষ করে নারী গায়েন হওয়ার কারণে তার চাহিদা ছিল সর্বত্র। শুরুতেই ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যাপক সুনাম।

বিভা রানী জানালেন, এমনও হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরোনোর পর গান করতে করতেই সপ্তাহ বা পক্ষকাল চলে গেছে। এ অঞ্চলে হিন্দু বাড়ির কারও মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে রামায়ণ পালার আয়োজন ছিল অত্যাবশ্যকীয়। তাছাড়া শিশুর মাসিক ব্রত বা প্রথম সন্তানসম্ভবা নারীর সিমন্তোন্নয়ন উপলক্ষেও রামমঙ্গল পালার আয়োজন করা হতো। কেউ কেউ এমনিতেও মানত করতেন। তাই সারাবছরই গান থাকতো। বিভা বলেন, ‘শুরুর দিকে প্রতি পালা বাবদ চার-পাঁচশ টাকা পেতাম। তখন টাকার অনেক মান ছিল। সর্বশেষ ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্তও পেয়েছি। তা দিয়েই দলের সদস্যদের সংসার চলতো। এখন বুড়ি হয়ে গেছি। গান গাওয়ার মতো শক্তি ও দম পাই না। এ কারণে কেউ ডাকেও না।’

বিভা রানী সংসারত্যাগী হলেও তার সংসার একেবারে ছোট নয়। মেয়ে বাসন্তী, বাসন্তীর অন্ধ স্বামী ও সন্তান সহ চার-পাঁচ সদস্যের বোঝা টানতে হয় তাকে। অথচ একটুকরো বাড়ির জায়গা ছাড়া সহায়-সম্বল বলতে আর কিছুই নেই। যে ঘরটিতে থাকেন সেটিও ভাঙতে ভাঙতে আর ভাঙে না। আয়ের পথ তো নেই-ই। পেটের টানে কিছুদিন বাড়িবাড়ি গিয়ে কীর্তন গেয়ে কিছু চাল বা টাকাপয়সা জোগাড়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জরা-ব্যাধির কারণে এখন তাও পারেন না। হাঁটতে কষ্ট হয়। তাই কাছাকাছি থাকা এর-ওর কাছে গিয়ে কবিতার ছন্দ বলতে বলতে হাত পাতেন : ‘বাংলা আমার বসতবাড়ি / সহিলপুর গ্রাম / মদন ঠাকুরের ছোট মেয়ে / বিভা রানী নাম। / জনমভরা দুঃখ করি / দুঃখের নাই শেষ / সদাই ঘুরি আমি / পাগলেরও বেশ।’ অথবা ‘বিভা রানী নাম আমার / বয়স আশির মতো / বাঁচলে আর বাঁচব কত / চেহারা বেহারার মতো / শূন্য অন্তঃসার / এক হইল ভাতের পীড়া / হইয়াছি কঙ্কালসারা / যারা ছিল ইষ্ট / তারা দিয়াছে পৃষ্ঠ / এখন আমি কোথায় যাই / দয়াল বিনে আর গতি নাই।’

বিভা রানী কবিগান গাইতেন না। কিন্তু কবিয়াল বাবার কাছ থেকে কবিগানের কিছু কলাকৌশল রপ্ত করে শখের বশে নিজেও দু-চারটে কবিতা রচনা করেছিলেন। এখন সেই কবিতাগুলোই তার শেষ সম্বল!

এদিকে বিভা রানী আচার্য যেমন ‘বিভা’ হারিয়ে আজ পথে, তেমনি রামায়ণের পালাও গ্রামগঞ্জ থেকে চির বিলুপ্তির পথে। হাতেগোনা দু-একজন শিল্পী অত্যন্ত ম্রিয়মান ধারায় ঐতিহ্যটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

সঞ্জয় সরকার
শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you