একটা শিশুতোষ পুস্তকে কী থাকলে বাচ্চারা সেটাকে গ্রহণ করবে আমি জানি না। অনেক দিন দেখেছি ভাত ছিটালেও শালিক আসে না কিন্তু রোদের দুপুরে খই-ফোটানো হাসিতে সেই পাখি আমার দিকে লাফাতে থাকে। আসলে শালিক পাখির রঙ ও কল্পনাকে ভাত ছিটিয়ে পোষ মানানো যায় না। আমার মনে হয় শিশুসাহিত্যও এরূপ। শিশুসাহিত্য শুধু সত্যেন্দ্রনাথীয় ছন্দের খেলা নয়। বরং ছন্দের থেকেও গ্রন্থটায় আদর থাকবে; রঙ ও কল্পনার পবিত্র অনুভব থাকবে—এই অনুভবের মায়ায় একজন শিশু লাল মোরগের ফুর্তিতে দৌড়ুতে থাকবে। কাশবনের সাদা আদরের ভেতরে পথ খুঁজে দৌড়ানোর মতো এই আনন্দের সীমা-পরিসীমা নেই। আমার কাছে শিশুসাহিত্য তাই স্বপ্ন, ছবি ও কল্পনা।
২
সহজ বোধে বুঝি বাচ্চাদের পুস্তকে রঙ থাকবে; মায়া ও কল্পনা থাকবে; থাকবে টগর ফুলের মতো সহজ ও ছোট ছোট গল্পের বিবরণ। ছড়ার ভেতরেও ছোট ছোট গল্প থাকে। থাকে দেখা না-দেখা প্রকৃতি। ছড়া-সাহিত্যের ছান্দিক ও বাস্তবিক বিবরণে একটা ফ্যান্টাসি কিংবা একটা স্বাপ্নিক ঘোর না থাকলে শিশুদের কল্পনার সাথে ছড়াটা দৌড়ুতে পারে না। পুস্তকের ভেতরের কল্পনা শিশুদের হাত ধরে একটা পরিচিত কিংবা অপরিচিত কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। সেখানে শিশুদের স্বপ্ন ও রঙপেন্সিলগুলো কথা বলে। ঘরের ভেতরে কিংবা বাইরে বাচ্চারা একা একাই কথা বলে। ছড়াকারেরা যখন বাচ্চাদের একা মুহূর্তের কথাগুলো লিখতে পারেন তখনই জমে ওঠে ছড়াসাহিত্য।
৩
আমি ছড়াসাহিত্যের কোনো তাত্ত্বিক নই। খুঁজে খুঁজে কল্পনাকেই পড়ি। আজ দুপুরে বিজয় আহমেদ রচিত ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ বইটাতেই ছিলাম। কল্পনাভর্তি একেকটি ছড়া যেন সাদা শাপলার পুকুর। শাপলা ভর্তি পুকুরে যেমন সাঁতরানো যায়, তেমনি পুকুরপাড়ে গালে হাত দিয়ে বসে কাটিয়ে দেয়া যায় অনেক দুপুর।
বিজয় আহমেদ ছন্দও রপ্ত করেছেন। কিন্তু আমি ছড়াসাহিত্যের ছন্দের তালে লাফাতে চাই না। আমি গালে হাত দিয়ে সাদা শাপলার পুকুর দেখতে চাই। সেটাই দেখলাম পুরো দুপুর; কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে দেখলাম বিজয়ের কুয়াশাপুর।
কখন শেষ হয়েছে ভোর! তবু বিজয়ের ‘ভোরে’ ঢুকে আমি ভোরেই হাঁটছি। আমি হয়তো গ্রামের রাখাল কিংবা শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির অভিজাত ছেলে। আমাদের সবাইকে ডেকে ডেকে ভোর দেখাচ্ছেন কবি।
লালচে রঙের ভোর দ্যাখো
পাখির পালক গায়ে মাখো
খুব কুয়াশায় ঘাসদল
হয়ে আছে নীল মখমল!
আজকে ডাকছে জুঁই তোকে
মাছের ডানায় মুখ এঁকে!
(ভোর)
…
লালচে রঙা ভোর
নামটা কিরে তোর?
মোরগ ঝুঁটি হাসে
লুকাও মুখ ঘাসে!
ফুটছে পথে, ফুল
উড়ছে বেণী, চুল!
লালচে রঙা ভোর
নামটা কিরে তোর?
(ভোর ২)

৪
শিশুতোষ এইসব স্বপ্ন ও কল্পনাকে বিজয় লিখেছেন। এই কৃত্রিম নাগরিক জীবনে বিল, পাখি, নদী ও প্রকৃতিকে আমরা হয়তো হারিয়েই ফেলেছি। অনেকেই হয়তো ইচ্ছে করেও হারিয়ে ফেলতে চাইছি। এই হারিয়ে ফেলাতে একটা গর্ব ও নাগরিক স্ট্যাটাস এনে হাজির করছি। বিজয়ের ছড়া ও কল্পনার ভেতরে আমাদের প্রাকৃতজনের শৈশব আছে।
প্রতিটা মাটিরই একটি চিরায়ত শৈশব আছে। বহু জেনারেশনের পরেও সে-শৈশব একটা বাঁশিতেই বাজে। লাল মোরগের ঝুঁটিতে বিজয় চিরায়ত সেই শৈশবের বাঁশিটাকেই বাজিয়েছেন। শৈশবের অফুরান গতিতে তিনি লিখেছেন। এ ভাষায় কোনো মন্থরতা নেই। সেই মন্থরহীন ভাষায় একটার পর একটা পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি আমি।
এখন ফাল্গুন মাস। কিন্তু এই দুপুরেও বিজয় আমাকে মেঘ দেখাচ্ছেন। ফাল্গুনের আম ও লিচুর মুকুলের ভেতরেও আমি মেঘ দেখছি। বিজয়ের পরিবেশনটাও অসাধারণ। যেন কেউ আমাকে ডেকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে—
উড়ু উড়ু মেঘ
ডাকে তোকে দ্যাখ!
পাহাড় আঁকিস তুই
চামেলী, কামিনী জুঁই
পাহাড় ডাকছে শেষে
মেঘের ছানারা এসে!
৫
বিজয়ের ছড়া ও কল্পনার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরেছি। দুপুরের খাবার চারটা-পাঁচটায় খেয়ে খেয়ে হয়তো চারটা-পাঁচটাতেই দুপুরকে নিয়ে গেছি। টেবিলের উপর ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ রেখে ভাত খাচ্ছি। কখন যে সাত বছরের পয়ার বইটার ঝকঝকে রঙের ভেতরে ঢুকে গেছে। পয়ায় নাচতে নাচতে পড়ছে। এই নাচটাই হয়তো ছড়ার ছন্দ। সেই ছন্দে অসাধারণ পড়ছে পয়ার। সে পড়ছে—
এলো গো ধানের দিন
জাগো
সে কি হাসি ধানশীষে
মাগো!
খলবল খলবল
করছে দুপুর;
ধানমেয়ে গায়; নাচে
পায়ের নূপুর!
(ধান)
আমি দেখছি সাত বছরের ছেলেটা শুধু পড়ছে না। নিজেকে নিজেই ধানক্ষেতের দুপুরে নিয়ে যাচ্ছে। ধানের শীষের হাসি, ধানমেয়ের গান কিংবা ধানমেয়ের পায়ের নূপুরকে পড়ে পড়ে ছেলেটা আমাকে চিনিয়ে দিচ্ছে। আমি ভাত খাচ্ছি। রাজীব দত্তের অলঙ্করণে ঠাসা একেকটি পৃষ্ঠা সে উল্টাচ্ছে। কখনো ভাঙা কখনো স্পষ্ট করেই সে পড়ে যাচ্ছে। সে আমাকে বলছে, ‘বিজয় আহমেদ কে? ওর কবিতা আমার ভালো লাগছে। এই বইটা আমাকে দিয়ে দাও। লাল মোরগের ঝুঁটিটা আমার টেবিলে থাকবে।’
আমি ভাবি, বাচ্চারা অকৃত্রিম কথা বলে। বিজয় আহমেদের এই রঙিন পুস্তকটি সাত বছর ছুঁই ছুঁই ছেলেটির কল্পনাকেও স্পর্শ করেছে। বাচ্চাদের কল্পনাকে স্পর্শ করা এত সহজ না। বিজয় এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করেছেন। স্যালুট কবি।
রচনাকাল ২০১৮
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
গানপার বইরিভিয়্যু
- দোয়েল, দুপুর ও ধানমেয়ের গান || সরোজ মোস্তফা - March 9, 2026
- কবির শৈশব কবির কৈশোর - March 7, 2026
- আলাপচারিতায় ছত্তার পাগলার অনুসন্ধান ৪ : বংশীবাদকের বয়ান || সরোজ মোস্তফা - February 23, 2026

COMMENTS