হিমুর হুমায়ূন (পর্ব ২)

হিমুর হুমায়ূন (পর্ব ২)

কথন : ফজলুল কবির তুহিন || লিখন : শামস শামীম এবং আ স ম মাসুম

অনুলিখিত রচনাটি লিখেছেন দুইজন মিলে, লেখকদ্বয় শামস শামীম ও আ স ম মাসুম। রচনাটি লিখিত হয়েছে লেখকদ্বয়ের স্মৃতি ভিত্তি করে নয়, লেখকদ্বয়ের কোনো পর্যালোচনাও রচনায় পাঞ্চ করা হয় নাই। ডিক্টেশন প্রক্রিয়ায় লিখিত হয়েছে এই রচনা। আর যিনি এই লেখার কথক, মূলত তিনিই লেখক বলতে হবে যেহেতু কথন আর লিখনের মধ্যে ব্যবধান নাই বলতে গেলে। জ্যাক দেরিদা প্রমুখ রিডার্স রেস্পোন্স থিয়োরি দিলে পরে এদ্দিনে আমরা জেনে গেছি যে লিখন  আর কথন  বস্তুত একই জিনিশের দুই উৎসার।

কাজেই এই লেখার মূল সোর্স কথক। কথকেরই স্মৃতিভিত্তিক এই লেখা। শামীম ও মাসুম শুধু কথাধারক হিশেবে এবং পরে সেইটা পাঠকের হাত পর্যন্ত তুলে দিতে যেটুকু দূতিয়ালি করতে হয় তা করেছেন। অবশ্যই ডিফিকাল্ট টাস্ক এইটাও। ফজলুল কবির তুহিন মঞ্চনাটকের একজন নিবেদিত কর্মক। নব্বইয়ের দশকে তার যৌবন স্ফূরিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত থেকে। সেইসময় দেশের একমাত্র টেলিভিশনচ্যানেলে হুমায়ূন আহমেদের টিভিফিকশনের সুবাদে তুহিন পরিচিতি পান দেশজোড়া। পরিচিতি পান হুমায়ূনের হিমু চরিত্রে অভিনয় করে। এবং নাটকীয়তামুক্ত উদাস গলায় গাওয়া তুহিনের গানও তখন নাটক ও জলসাঘর  অনুষ্ঠানের সুবাদে দেশের মানুষের কৌতূহল জাগিয়েছিল। পরে ব্যবসা এবং জীবনজীবিকার তাগিদে তুহিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শোবিজনেসে তাকে দেখা যায় নাই আর। এই রচনার লেখকদ্বয় বৃত্তিসূত্রে সাংবাদিক হওয়ায় ফজলুল কবির তুহিনকে বের করেছেন, ইন্টার্ভিয়্যু করেছেন, শ্রুতির সহায়তা নিয়া ধারণকৃত কথাগুলো অনুলিখন করেছেন, এবং দীর্ঘ ধকলের পরে এই কথাবস্তু শেইপ-আপ করেছে একটা প্রায় উপন্যাসোপোম সুদীর্ঘ রচনায়।

গানপারে এইটা ধারাবাহিক ছাপা হচ্ছে, এইখানে প্রথম পার্ট। — গানপার

1971

অধ্যায় ২ ।। হুমায়ূনময় হাসন লোক-উৎসব

১৯৯৩ সালে সুনামগঞ্জে তারুণ্যের ডাক দিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান হন মরমী কবি হাসন রাজার প্রপৌত্র কবি মমিনুল মউজদীন। স্বপ্নবাজ তারুণ্য যোগ দেয় তার সৃষ্টিশীল কাজে। তাকে কেন্দ্র করে গান ও আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে তারুণ্য। মাদকের বিরুদ্ধে তারা রাজপথে নামে। নানা সামাজিক আন্দোলনে জাগ্রত তারুণ্যকে নিয়ে তিনি সমাজ গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন। মমিনুল মউজদীন যেন ব-দ্বীপের বিনয়ী জোছনা ও বিপ্লবী কবি। প্রেম ও দ্রোহের নদী বয়ে যায় তার কবিতার ভেতর দিয়ে। এতে দারুণ প্রভাবিত হয় স্বপ্নবাজ তারুণ্য। তার কবিতার গীতল নদীতে শুধু সুনামগঞ্জই নয় দেশের প্রত্যন্ত এলাকার কবিজনরাও সিক্ত হন। জমিদার বংশের আভিজাত্যের পোশাক ফেলে দিয়ে মউজদীন মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বারবার নির্বাচিত হয়ে তার সৃষ্টিশীল কাজের ছাপ রেখে গেছেন। তিনিও ছিলেন হুমায়ূনস্যারের ভক্ত ও এক প্রিয়জন।

১৯৯৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বিশালাকারে হাসন রাজা লোক-উৎসবের আয়োজন করা হয়। ভিন্ন ও বিচিত্র আয়োজনের (প্রথমবারের মতো) এ হাসন লোক-উৎসবের প্রস্তাবকও ছিলাম আমি। অতিথি হিসেবে আমি হুমায়ূনস্যারের নাম প্রস্তাব করি। তাঁর অনেক উপন্যাস ও গল্প পড়ার পাশাপাশি তাঁর নির্মিত নাটক দেখেও আমি তাঁর প্রতি মুগ্ধ ছিলাম। এই প্রীতির কারণেই সম্ভবত আমার এই প্রস্তাব।

তখন হুমায়ূন আহমেদ লেখক হিসাবে, নাটক নির্মাতা হিসাবে খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থান করছেন। তরুণ-তরুণীর কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় এবং তারা তাঁর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত। যারা বই পড়েন না তারা তখন বিটিভির কল্যাণে বহুব্রীহিএইসব দিনরাত্রিঅয়োময়কোথাও কেউ নেই  … ইত্যাদি জনপ্রিয় নাটকের গুণমুগ্ধ দর্শক ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের বিভিন্ন চরিত্র তখন সারাদেশে আলোচনায় থাকত। আরো হাজার তরুণের মতো আমি ছিলাম তার চমকে-দেওয়া বিভিন্ন ঘরানার লেখা ও নাটকের ভক্ত। কি যেন একটা শক্তি আমাকে চুম্বকের মতো টেনে নেয় তার বইয়ের কাছে। একনিশ্বাসে দেখতাম তার নাটকগুলো। এত সহজ কথা সরসভাবে লিখতেন স্যার যে চোখ ও মন আটকে যেত তাতে, যা পড়ে মুগ্ধ না হয়ে, ভেতর থেকে না হেসে, না ভেবে থম মেরে বসে থাকা সম্ভব নয়। ভাবনার দরোজা খুলে দিয়ে তার চরিত্রগুলো আমাদের ঘর থেকে বের করেছিল। আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম এক অনিন্দ্য সুন্দর পথ। স্যারের সেই সুন্দরের পথ আজো আমাদের পাথেয়।

সেবার হাসন লোক-উৎসবে নানা কারণে আয়োজকদের অনেকে আমলা বা শীর্ষ রাজনীতিবিদদের অতিথি করতেই আগ্রহী ছিলেন। এক পর্যায়ে আমার এ প্রস্তাবে অতিথি হিসেবে তাকে রাখার জন্য আয়োজকরা হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব আমাকেই  দেন। আমি তখন নাট্যকেন্দ্র-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলে সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান ও হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠজন দেশখ্যাত সাংবাদিক ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলি। সালেহ চৌধুরীকে অসম্ভব সমীহ করতেন হুমায়ূনস্যার। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি হুমায়ূনভক্তরাও বিষয়টি জানতেন। অনুকরণীয় এ মহৎপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিককে তিনি তার পরিবারেরই একজন মনে করতেন। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও মুক্তিযুদ্ধের আগ থেকেই তিনি তার মুক্তিযুদ্ধে শহিদ পিতার সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন সিলেটে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কেবল হুমায়ূনস্যার নয় তার পরিবারের সবার সঙ্গেই সালেহভাইর এই সখ্য অটুট ছিল। স্যার জীবনের ওপারে চলে যাওয়ার পরও সালেহভাইর সঙ্গে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠতা বজায় আছে। তিনি ২০১৩ সনে তার ‘হুমায়ূন ও আমি’ গ্রন্থে নানা স্মৃতি ও অন্তরঙ্গ বর্ণনা দিয়েছেন। এতে স্যারের জীবনের অনেক অজানা দিক উন্মোচিত হয়েছে। হুমায়ূনভক্ত ও অনুরাগীরা আরো বেশি জানতে পেরেছেন তাদের প্রিয় মানুষ সম্পর্কে। একজন হুমায়ূনভক্ত হিসেবে আমিও সালেহ চৌধুরীর অনবদ্য এমন কাজের জন্য অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীকে স্যার ‘নানা‘ বলে সম্বোধন করতেন। হাসন লোক-উৎসবে সালেহ চৌধুরীও ছিলেন অন্যতম বিশেষ অতিথি। এছাড়াও আমার বন্ধু ও হুমায়ূন আহমেদ স্যারের ছাত্র সেলিম চৌধুরীর সঙ্গেও তাকে অতিথি হিসেবে নিয়ে আসার জন্য কথা বলে তারও সহযোগিতা কামনা করি। স্যারকে সুনামগঞ্জে আনতে আমি কোমর বেঁধে মাঠে নেমে যাই; যেহেতু অতিথি হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেছিলাম আমি, তাই দায় ও চ্যালেঞ্জটা ছিল আমারই। যেভাবেই হোক তাঁকে উৎসবে আনতে হবে। যোগসূত্র খুঁজতে থাকি স্যারের ঘনিষ্ঠজনদের। ঢাকায় এসে সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি একদিন আমাদেরকে স্যারের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় নিয়ে যান। আমরা তাকে হাসন লোক-উৎসবে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। তিনি উৎসবে যেতে রাজি হলেন। তিনি যাতে সানন্দে উৎসবে যেতে পারেন এবং রিলাক্সড মুডে সেখানে যেতে পারেন সেজন্য আমি স্যারকে প্লেনের টিকেট দেয়ার কথা বলি। স্যার বললেন, আমার সাথে তো আরও অনেক লোকজন যাবেন। আমি কখনোই কোথাও একা যাই না, প্লেনের টিকেট কয়টা দিবা? এসবের দরকার নাই। আমি উৎসবের দিন চলে যাব। তুমি চিন্তা করো না। স্যারের এ কথায় আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। আরো যারা স্যারের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে যেতে আগ্রহী তাদেরও আমন্ত্রণ জানাই আমরা। আমি কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে ৬/৭ টিকেট কেটে ফেলি। অনুষ্ঠানের প্রকাশনা সম্পাদনার দায়িত্ব ছিল আমার আর আমার বাল্যবন্ধু এখনকার প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট পীর হাবিবুর রহমানের উপর। স্যুভেনিরে আমি হুমায়ূনস্যারকে প্রধান অতিথি হিসেবে রাখায় আমার এক বন্ধু ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকার এক সাংবাদিককে প্রধান অতিথি করার কথা বলে। পরিস্থিতি এমন হলো যে বাধ্য হয়েই বন্ধুত্বের দাবি মেনে তা আবারও সংশোধন করে স্যারকে প্রধান অতিথির বদলে বিশেষ অতিথি হিসেবে রাখি। এটা আমি মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।

অনুষ্ঠানের আগের দিন আমরা স্যারের ৫/৬জন সঙ্গী সহ রেলযোগে সিলেট আসি। আমরা তাকে কাছে পেয়ে খুবই আনন্দিত হই। স্যার খোলা মন নিয়ে নানা বিষয় আলোচনা করলেন। সালেহ চৌধুরীও অনেক গল্প করলেন ট্রেনযাত্রায়। তার অভিজ্ঞতার ঝুলিও সমৃদ্ধ। ট্রেনের চলন্ত সেই আড্ডায় আমি আর সেলিম ছিলাম মুগ্ধ শ্রোতা। গুণীদের কথা গোগ্রাসে গিলছিলাম। স্যার কথা বলতেন কম। তবে তার কথা শুনতে খুব ভাল লাগত। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, হাসন লোক-উৎসবে অতিথি হয়ে যাচ্ছি ঠিক; কিন্তু হাসন রাজা সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না। আমি তখন ভয়ে ভয়ে স্যারকে আমাদের সম্পাদিত স্যুভেনিরটি দিয়ে বলি : হাসন রাজার সংক্ষিপ্ত জীবনপাঠ, গানের বিষয়ে টুকিটাকি আলোকপাত করা হয়েছে এ স্যুভেনিরে। আমার ভয়ের কারণ ছিল সংশোধিত স্যুভেনিরে স্যার প্রধান অতিথির বদলে ছিলেন বিশেষ অতিথি। যাকে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল তিনি খ্যাতি ও পরিচিতিতে ছিলেন স্যারেরও অনেক নিচে। কিন্তু স্যার এসবে কিছু মনে করেননি। এখানেই হুমায়ূন আহমেদ অন্যদের চেয়ে খুবই আলাদা ছিলেন। এখানেই তাঁর মহত্ব। তাছাড়া তাড়াহুড়ো করে সম্পাদনা করতে যেয়ে স্যুভেনিরে অনেক বানানভুলও হয়েছিল। যাক, স্যুভেনির পেয়ে স্যার খুশি হয়ে দ্রুত পড়ে ফেললেন। সবাই স্যারের এ গুণের কথাটি জানেন যে তিনি নিজে খুব দ্রুত পড়তে পারতেন। এবং সেই পড়া ধারণও করতে পারতেন অন্য অনেকের চেয়ে অনেক ভালো। স্যারের ভালো পাঠাভ্যাস তাঁর সৃষ্টিকে কালোত্তীর্ণ করেছে। কিন্তু আমাদের কিছু না বলে আবার আড্ডায় মনোযোগী হলেন স্যার। খ্যাতির শীর্ষে এবং এত বেশি সেলিব্রেটি হয়েও স্যার সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার কাছ থেকে শিখি আর্টিফিশিয়্যাল নয়, সহজ-সরল হলে ভালো বন্ধুর অভাব হয় না। সহজ-সরল ও সাধারণ জীবনযাপন করতেন বলেই তাঁর কখনো ভালো বন্ধুর অভাব হয়নি, এটি অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্তই তিনি অনেককে বন্ধুত্বে বেঁধে রেখেছিলেন। তাঁর বন্ধুত্ব ছিল নিখাদ। হৃদয় জয় করে নেয়ার মতো অসম্ভব একটি বিষয়কে স্যার নিজের আয়ত্তে এনেছিলেন নিপুণভাবে। তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা কখনো স্যারের ভালোবাসাবঞ্চিত হননি। কিন্তু স্যার এই বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে গিয়ে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

হাসন লোক-উৎসবে স্যার বক্তব্য শুরু করেন তাঁর আমেরিকা থাকাকালীন শোনা একটি জনপ্রিয় লোকগান প্রসঙ্গ দিয়ে। তিনি বলতে থাকেন, তখন আমেরিকার চারদিকে এক ফোকশিল্পীর এই গানটি ‘ক্লোজ ইউর আই, ট্রাই টু সি’ বাজত। আমি মুগ্ধ হয়ে সরল কথার হৃদয়-তোলপাড়-করা এই গানটি শুনে তন্ময় হয়ে যেতাম। গুনগুনিয়ে সর্বক্ষণ আমার মনে বাজত সেই গান। কিন্তু হাসন রাজার ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপ রে’ শোনার পর আমার গর্ব হতে থাকে। অন্যরূপে ধরা দেয় আমাদের লোকায়ত সুর ও কথার ব্যঞ্জনামধুর এসব গান। ইংরেজ শিল্পীর অন্তত অর্ধশত বছর আগে আমাদের হাসন রাজা এই গান লিখেছেন। মানুষের মরমে ভাব ও ভালোবাসার তুফান তুলেছেন তার সহজ-সরল চিত্তাকর্ষক কথায়। অনুষ্ঠানে স্যার ৫ মিনিটের বক্তব্যে সবাইকে এভাবেই মুগ্ধ করে দেন। ঝিম ধরে যান সবাই। এমন চিত্তাকর্ষক বক্তব্যের কারণে পুরো অনুষ্ঠানই হয়ে ওঠে হুমায়ূনময়। তিনি তার সাবলীল কথাসাহিত্যের গদ্যের মতোই বক্তব্যেও সবাইকে মোহাবিষ্ট করে বিদায় নেন মঞ্চ থেকে। করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

রেলযাত্রায় একপলকেই পুরো স্যুভেনির পড়ে স্যার হাসন রাজাকে নিয়ে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছিলেন। স্যারের পাঠধারণক্ষমতা যে কত প্রখর তা তাঁর স্বল্পসময়ের পড়ে আত্মস্থ করে মাত-করা বক্তব্য থেকেই বোঝা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে  তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘রূপালি দ্বীপ’ হাসন রাজাকে উৎসর্গ করেছিলেন। হাসন রাজার গান তিনি ব্যবহার করেছেন পরবর্তী সময় বিভিন্ন সিনেমা ও নাটকে। তাঁরপছন্দের আড্ডায় আমাকে আর সেলিমকে হাসন রাজার অনেক গান শোনাতে হতো স্যারকে।

উৎসব থেকে এসে রাতে আমরা সার্কিট হাউসে প্রায় ভোর ৫টা পর্যন্ত আড্ডা দেই। আড্ডার এক ফাঁকে আমি বাউল শাহ আবদুল করিমের গান ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গেয়ে শোনাই। তন্ময় হয়ে স্যার গানশোনা শেষে বললেন, কালকেই এই বাউলশিল্পীকে তাঁর সঙ্গে দেখা করানোর জন্য। তখন আমি বলি, তার বাড়ি অনেকদূর এবং তাকে এ সময়ে বাড়িতে না-ও পাওয়া যেতে পারে। কারণ তিনি গান গেয়ে বেড়ান এখানে-সেখানে। এ-সময় সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীও আবদুল করিম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বলে তার সম্পর্কে ভালো ধারণা দেন। সালেহ চৌধুরীর কথা শুনে স্যার বাউল করিমের প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আমৃত্যু মাটির টানে নিবেদিত হুমায়ূনস্যার করিমের গান শুনতে ও তাঁকে দেখতে উতলা হয়ে ওঠেন। আড্ডাশেষে শেষরাতে তিনি গোসল করে দলবল নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে চলে যান হাসন রাজার কবরস্থানে। কুয়াশায় ঘেরা ভোরের শান্ত সময়ে হাসন রাজার কবর জিয়ারত করেন তিনি সবাইকে নিয়ে। এ বিষয়ে আমার বন্ধু পীর হাবিবুর রহমান তাঁর ‘অফ দ্য রেকর্ড’ বইয়ে সরস বর্ণনা দিয়েছে। আমি অবাক হই আজকে, সেই মেলা গত হয়েছে ২১ বছর হয়, কিন্তু অন্য আরো অনেক বড় বড় অতিথি ছাপিয়ে এখনো হুমায়ূনময় হাসনমেলা সবার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল! স্যারের দেয়া ৫ মিনিটের বক্তব্য এখনো আড্ডায় আড্ডায় ঘুরে বেড়ায়। হুমায়ূনস্যার তার যাদুকরী মধুকথায় এখনো আচ্ছন্ন করে যান সুনামগঞ্জের মানুষকে।

সুনামগঞ্জে থাকাকালীন স্যার বাউল করিমকে দেখতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই ঢাকা চলে যান। যাওয়ার পরও একাধিকবার আমাকে বন্ধু সেলিম চৌধুরীর মাধ্যমে তাগাদা দিতে থাকেন। বাউল করিমকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটি অনুষ্ঠান করার জোর তাগিদ ছিল স্যারের পক্ষ থেকে। সারাজীবন বঞ্চনা, অবহেলা ও চরম দারিদ্র্যর মধ্যে বাস করেও কিভাবে মানুষের মনের কথা সহজ-সরল ভাষায় ও সুরে বাঁধতেন তা ভেবে স্যার খুবই শ্রদ্ধা করতেন বাউলদের। কোনোভাবে তাদের সহযোগিতা করতে পারলে স্যার আনন্দিত হতেন। সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীও বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় আনার চেষ্টা করেন।

এর মধ্যেই একদিন স্যারের ড্রাইভার সেলিমের বাসায় একটি চিরকুট দিয়ে যায়। সেলিম যাতে আমাকে নিয়ে স্যারের বাসায় দ্রুত দেখা করে সে-কথা লেখা ছিল চিরকুটে। চিরকুট পেয়েই আমরা স্যারের বাসায় ছুটে যাই। বাসায় যাওয়ার পর স্যার বললেন, তাঁর নেত্রকোণায় কুতুবপুর গ্রামের বাড়িতে গ্রামের লোকদের একবেলা জিয়াফত খাওয়াবেন তিনি। তাদের সঙ্গে একবেলা খাবেন, গল্প করবেন। এসময় গ্রামের সব লোক যারা গ্রামের বাইরে কাজ করে সবাই যেন থাকে। উৎসব হিসেবে তারা মিলিত হয়। আশপাশের স্বজনরাও এসে জড়ো হয়। তাই তিনি গ্রামবাসীদের কাছে অনুরোধ করেন তারা নিজেরাই যেন একটি তারিখ নির্ধারণ করে স্যারকে জানায়। গ্রামের লোকজন সবাই মিটিং করে, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে একটি তারিখ দিয়েছেন উনাকে। স্যার চাচ্ছেন আমি আর সেলিম যেন স্যারের সঙ্গে যাই। আমরা সানন্দে রাজি হই। একদিন স্যারের দেওয়া তারিখেই আমরা প্রায় দেড়শজনের একটি বহর নিয়ে স্যারের গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা দেই। এ যাত্রায় অনেকেই ছিলেন সস্ত্রীক। সালেহ চৌধুরী, কবি হাসান হাফিজ, প্রকাশক আলমগীরভাই, ফরিদভাই সহ অনেকেই ছিলেন। স্যারের অন্যতম একটি সুন্দর গুণ ছিল যখন কোথাও যেতেন একসঙ্গেই যেতেন। স্যার যাওয়ার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা রাখতেন না। কোআর্টিস্টদের সঙ্গে নিয়েই যেতেন। প্রচণ্ড  আড্ডাবাজ ছিলেন স্যার। আমাদের অনেক সুখস্মৃতি রয়েছে সেইসব আড্ডার।

স্যার তাঁর গ্রামের এই অনুষ্ঠানে রাতে সবার সামনে শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গাইতে বলেন আমাকে। আমি, সেলিম সহ আমরা রাতভর অনুষ্ঠানে গান গাইলাম। স্যারের এলাকার অন্ধ বাউল যাকে ‘কানা সিরাজ’ ডাকত মানুষ তিনি মরমী সাধক উকিল মুন্সির গান গেয়েছিলেন। সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী তার কাছে উকিল মুন্সির গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। শেষে মধ্যরাতে উকিল মুন্সির গান গেয়ে সবাইকেই এক অলৌকিক সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন করে বিরহকাতর করে রেখেছিলেন বাউল সিরাজ। গ্রামের মানুষ খুব উপভোগ করলেন স্যারের আয়োজন, আমাদের গান। যারা বিভিন্ন স্থান থেকে উৎসবে অতিথি হয়ে গেছেন গভীর রাতে তাদের বাসায় নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। উকিল মুন্সির গান শোনার পর আরো মুগ্ধ হন স্যার। পরবর্তীকালে বারী সিদ্দিকীকে দিয়ে তিনি তার ছবিতে উকিল মুন্সির গান গাওয়ান। এভাবে উকিল মুন্সির গানও জনপ্রিয় করতে স্যারের অনেক ভূমিকা রয়েছে।

স্যার এ অনুষ্ঠানে সেদিন মাটির টানে ফিরে গিয়ে হয়েছিলেন আত্মহারা। আজকাল অনেকেই বিখ্যাত হলে তাদের মধ্যে শিকড় ভুলে যাবার একটা প্রবণতা দেখি। স্যার ছিলেন সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো। নাড়ির টানে প্রায়ই ফিরে যেতেন গ্রামে। স্যারের বিভিন্ন লেখায় স্মৃতিময় শৈশব-কৈশোরঘেরা নিজের গ্রাম ও নানাবাড়ির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে সাবলীলভাবে। তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’ বইটিতে জ্বলজ্বল করছে সেই সুখপাঠ্য বর্ণনা।

আমরা যারা ঘনিষ্ঠভাবে স্যারের সাথে চলাফেরা করেছি তারা তো জানিই, স্যার আসলে নাগরিক কোলাহলের মাঝেও সত্যিকার অর্থে গ্রামীণ হৃদয়েরই মানুষ ছিলেন। গ্রামের ছায়াঘেরা প্রকৃতির উদার ও অনন্ত জীবন তাকে মেকি নাগরিকতায় বেঁধে রাখতে পারেনি কখনো। গ্রাম ঘুরেফিরে এসেছে তার লেখা নাটক-সিমেনায়। মুক্তিযুদ্ধ-অন্তপ্রাণ স্যার তার জীবনের অনেক সঞ্চয় দিয়ে এলাকায় গড়ে দিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্যারের প্রোডাকশনটিমেও এলাকার অনেক মানুষকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন। এদের মধ্যে এখন বেশ কয়েকজন নামকরা ডিরেক্টর হয়েছেন। বইয়ের পাণ্ডুলিপির আশায় অনেক প্রকাশকই স্যারকে যে শুধু একারণে সঙ্গ দিতেন তা নয়, তার সঙ্গ তাদের ভাল লাগত। তারা তাঁর প্রখর ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করতেন। ভালোবাসতেন তাকে। তাদের অনেকেই স্যারের গ্রামের বাড়ির এ অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গী ছিলেন।

বাউলদের তীর্থভূমি সুনামগঞ্জের ছেলে হওয়ায় গানটা আমরা গলায় জন্মগতভাবে পেয়েছিলাম হয়েতো। সুনামগঞ্জে প্রাতঃভ্রমণে বের হলে প্রতিটি বাড়ির সারগাম শুনতে শুনতে হাসননগর থেকে উকিলপাড়া হয়ে নতুনপাড়ায় চলে যেতাম। বিকেলে বাড়িতে বাড়িতে বসতো গানের আসর। আমি বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় টেবিল চাপড়িয়ে গান গাওয়া মানুষ। হেঁড়ে গলায় গান গাইতাম বলে থিয়েটারে দলের প্রয়োজনে গান গাইতে হতো। কিন্তু কখনোই কোনো স্টেজে বা গণমাধ্যমে গান গাইবার মতো সাহস হয়নি। স্যারের অনুরোধে কতবার যে আমি কত অনুষ্ঠানে বাউল করিমের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আমার মনে হতো স্যারের সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই স্যার এই গানটিই আমার কণ্ঠে আগে শুনতে চাইবেন। অনেকবার হয়েছেও তাই।

আফসোসটা রয়েই গেল যে স্যারের শেষযাত্রার আগে আর বাউল করিম, রাধারমণ, হাসন রাজা, দুর্ব্বীণ শাহ, সৈয়দ শাহনূর, শফিক নূরের গান তাঁকে শুনাতে পারলাম না।

(চলবে)

গানপার

COMMENTS

error: