দ্য পোস্টম্যান

দ্য পোস্টম্যান

শেয়ার করুন:

কেভিন কস্টনার একখানি সিনেমা বাঁধেন দ্য পোস্টম্যান  নাম দিয়ে, ডিরেকশন দেন ও নামভূমিকায় অ্যাক্ট করেন কস্টনার নিজে, এইটা ক্রাইস্টজন্মোত্তর ১৯৯৭ অব্দের মুক্তিপ্রাপ্ত ম্যুভি। কিন্তু খুব-একটা নামডাক শোনা যায় না ছায়াছবিখানার, পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক কল্পনাধাঁচের ছবি, ম্যুভি বিষয়ে একদম উম্মি আমার ভালোই লেগেছিল ও মাঝেসাঝে দেখতে খারাপ লাগে না আজও। উইল প্যাটন অভিনয় করেছিলেন, যথাস্বাভাবিক তুখোড়, অলিভিয়া উইলিয়ামস তো তখন এবং এখনও সুদর্শিনী। চিঠি একটা সেন্ট্রাল মোটিফ, রূপক বা মেটাফরও বলা যায়, পুরো বই জুড়ে। চিঠি, তথা কবিতা, পোস্টম্যান, তথা কবি। চিঠির দৌত্যে, তথা কবিতার, সভ্যতা বাঁচাবার কাহিনি সিনেমাখানা আমাদের সামনে নিয়ে আসে। শেইক্সপিয়্যর তথা তার নাট্যকাব্য ধ্বংসপ্রায়-সেই-সভ্যতার জিয়নকাঠি হিশেবে ব্যবহৃত হইতে দেখা যায় সিনেমায়। চিঠিই, তথা কবিতাই, নিয়ে যায় সেই সিনেমায় অঙ্কিত জনজাতিটিকে নতুনতর শুরুর দুয়ারে। কেভিন কস্টনার এখানে এক অনামা সার্ভাইবর, জনমনিষ্যিবিরল তার চলাফেরায়-দিনযাপনে একমাত্র কম্প্যানিয়ন একটি ঘোড়া, ফর্লোর্ন ডেজার্ট অ্যারিয়া মাইল-মাইল পেরিয়ে একটা-কোনো জনপদে যেয়ে শেইক্সপিয়্যর থেকে বাচনিক অভিনয় দেখিয়ে নিজের ও তার সবেধন ধূসরমণি ঘোড়ার গ্রাসাচ্ছাদন জোটান কস্টনার। ঘোড়াটা যেন-বা প্লাতেরো, অনামা কস্টনার যেন হিমেনেথ, মনে হতে থাকে উভয়ের পারষ্পরিক বাক্যালাপ দেখে। শেইক্সপিয়্যর মঞ্চায়নে এই দুইমাত্র কুশ ও লব — ঘোড়া আর তার নিঃসঙ্গ সহিস। ঘটনাধারায় ফেইক এক পোস্টম্যানের ভূমিকায় অ্যানোনিমাস কস্টনারকে দেখা যায় দাঁড়াইতে — এমন এক জনপদ যেখানে সর্বপ্রকার কম্যুনিক্যাশন ব্যাহত, ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন সিনেমার আউট-ল’ অধ্যুষিত বাস্তবতা বিরাজে যেইখানে, এমনকি লোক্যাল পোস্টাপিশের অতিকায় ইমারত ভগ্নস্তূপপ্রায় যেইখানে, এক কম্যুনিটির সঙ্গে আরেক কম্যুনিটির কোনো সংযোগ নাই — ঠিক এইরকম এক ওয়েইস্টল্যান্ডিক রিয়্যালিটিতে রেনেসাঁ আসে একজন পোস্টম্যান তথা বার্তাবাহক কবির মারফতে। শেইক্সপিয়্যর রিসাইট্যাল দিয়ে অ্যারিয়া-ডুয়েলারদেরে আশাকরোজ্জ্বল জাগায়ে তোলা দেখে লোকালয়ের লোকজন অনামা সেই ঘোড়াওয়ালা ভবঘুরেকে শেইক্সপিয়্যর নামেই ডাকতে শুরু করে। একসময় সেই দেশে চিঠির চড়ুইমুখে চেপে, ভর করে এক বহুকাল আগের ও চিরকালের কবির কবিতাপাখায়, আসে বসন্তের সুবাতাস। প্রকৃত কবি কিংবা ডাকপিয়ন, প্রকৃত কবিতা বা বার্তাবাহী চিঠি, চিরদিন সভ্যতায় এইভাবে ক্রিয়া করে যায় ইয়াদ করব।

শুরুতেই ডিসক্লেইমার। রচনাটা একজন কবিকে কেন্দ্র করে, কিংবা তার কবিতা পাঠোত্তর রিডার্স রেস্পন্স, এটি ঠিক ক্রিটিক টাইপের কিছু নয়। এই নিবন্ধরচনার কোথাও কোনো জীবিত অথবা মৃত অথবা মাঝামাঝি জীবন্মৃত কবির সনে এথা প্রতিপাদিত কবিতাধারা বা কবির মিল-বেমিল শক্তি-ভক্তি বিরক্তি-অনুরক্তি প্রভাব-প্রাদুর্ভাব খোঁজা হয় নাই। তবু যদি তেমনকিছু খুঁজিয়া পাওয়া যায়, নেহায়েত হবে সে-এক আর্কিমিডিয়ান উল্লাস অথবা য়্যুক্লিডিয়ান জট্টিল জ্যামিতি। যে-কবিকে কেন্দ্রে রেখে কথাচারণ, তিনি লিখছেন অলমোস্ট দু-দশক ধরে, প্রকাশিত কবিতাপুস্তিকা তার মোটমাট পাঁচ (তথ্য ২০১১ পর্যন্ত)। ঋতুচিহ্নগুলি  দিয়ে এতদঞ্চলে তার পদচারণা শুরু, সর্বশেষ এ-যাবৎ রাঙামাটি,  রয়েছেন ফ্যুলস্পিডে সচল তিনি। বিস্তারে না-যেয়ে এইখানে বলবার কথাটা হলো, দুনিয়ার মশহুর কোবিদ যারা, তাদিগের একটা ব্যাপার খুব চোখে ঠেকে, সেইটা হলো, কবিতার ক্রিটিক করতে যেয়ে যেন কবিশিক্ষক হয়ে ওঠেন তারা, যেনবা তারা কবিকে শেখাতে চান অনেককিছু, সবক দিবার চান কবিতার, আলোচনা-সমালোচনার ব্যানারে এন্তার সহজ-নামাজশিক্ষার মতো সহি-বড় কবিশিক্ষার বইপত্তর চোখে পড়ে। ব্যতিক্রম অতি ক্ষীণ। কবিতা উপভোগের, কবিতা উদযাপনের, মুখে এমন কথা আমরা বলি ঠিকই, কিন্তু কবিকে সেলিব্রেট করার রুসম্ খুব-একটা নাই। বৃথালোচনাগুলোর মালিকপক্ষ মনে করেন কবি শিক্ষালাভোদ্দেশ্যে উদগ্রীব বসিয়া আছেন গণ্ডফোলা ফাঁপা কাব্যালোচনা হইতে, লেকিন আদতেই কী তাই? বিলকুল না, আমার তা মনে হয় না অন্তত। কবি শিখতে চান না, কাউয়া-কা-কা আলোচনা থেকে তো নৈব চ, আলোচক-বিলোচক-সমালোচকবর্গের তরফ থেকে একজন কবিকে বড়জোর উদ্দীপিত-অনুপ্রাণিত করবার একটা চেষ্টা চালানো যায়, এরচেয়ে বেশি কিছু তো নয়। স্ট্রেইট-কাট ট্রুথ হচ্ছে এ-ই যে, যে-কোনো কবিতার বা কবিকেন্দ্রী আলোচনার অভীষ্ট লক্ষ্য কখনো কবি নন, খোদ কবিতালোচক নিজে। সেই কবি কিংবা কবিতা বিষয়ে কথা চালাতে যেয়ে আলোচক কবিতার দিকে যাওয়ার সম্ভাব্য একটা পথ তৈয়ার করেন, বলা বাহুল্য, প্রথমত ও প্রধানত নিজেরই জন্য রচিত সেই পথ। অথচ জনাব কবিতাক্রিটিক ভান ধরেন এমন, যেন তিনি ত্রিভুবনের কবিতাস্বার্থে একখানা চিরকেলে চ্যারিটি স্থাপিলেন! ডিসগাস্টিং নয়? এথাকার এই নিবন্ধ সেসব বিচারে না হয়েছে ইধার-কা, না উধার-কা, পাঠকের কবিতা-পড়াকালীন কতিপয় আন্ডারলাইন্স আর মার্জিননোটস কেবল।

কেউ কাউকে চিঠি লেখে না আজকাল আর। এই ফেসবুক-টুইটারের যুগে কেউ হয়তো মনেও রাখেনি চিঠিমুখ, চিঠিচিবুক, ছলছল অভিমান আর তার চনমনা হাসি। অথচ এই চিঠি, একদিন, ছিল মানুষের নিঃসীম ঊষর নৈসঙ্গে মরুদ্যান। ওয়েসিস। লরেন্স অফ অ্যারাবিয়ার সহসা-পাওয়া ক্যাক্টাসঝোপ, মরুভূখণ্ড খুঁড়ে জলোত্তোলন, জলের মশকে চেপে ওষ্ঠ ও অধর এককাৎরা পান ও তৃষ্ণানিবৃত্তি, ছিল একদিন চিঠির ছায়ায় ঘেরা বাস্তুপৃথিবীর দৈনন্দিন চিরকালিনতা। কামানের গোড়ায় বসে কেউ লিখত রিক্তের বেদন, কারাগার থেকে রাজবন্দীর জবানবন্দী, শিলাইদা-শাজাদপুর থেকে কেউ ছিন্নপত্রাবলি, পদ্মাবোটে খিড়কিকিনারে এসে-ফের-ভেসে-যাওয়া গ্রামসবুজাভা, মাইল মাইল শান্তিকল্যাণের সুপুরিবিস্তীর্ণ বরিশাল থেকে কেউ লিখত সর্পিল ভুবনময়ীর প্রতি… ছিল এইসব, ঝুমঝুম ঘণ্টি বাজিবার রাত ও রানার, ছিল লণ্ঠন ও লাঠি নিয়া গ্রামপাহারাদার, কত নদী সরোবর আর লাল নীল দীপাবলির চিঠিজীবন্ত অজর যৌবন, ঘনঘুমাচ্ছন্ন দুপুরবেলা দোরকড়া-বাজিয়া-ওঠা রক্ত-ও-হৃদিচঞ্চলতা… আহা, আজি সেই বসন্ত নাই, কিন্তু বসে থাকা আছে… নেশাখোর নন্দদুলালের ন্যায় একঘেয়ে বেধুরা না-হক তর্কাতর্কি আছে… নিরো সম্রাটের আগুন-গনগনে ভস্মাগ্রাসী দিনদুপুরে মাউথঅর্গ্যান বাজানোর নন্দনতাত্ত্বিক নাচানাচি আছে… ফেসবুকে-টুইটারে ফাটাফাটি ফিউটাইল স্টারডম আছে… একলা ও জটলায় নাঙ্গা তলোয়ারবাজি আছে… রাতের সব তারা — মায় আস্ত দুগ্ধপন্থ গ্যালাক্সিখানাই — নাকি ইন-ডিসগাইস এইসব সোশ্যালস্পেসশিপগুলোতে এসে বেঁধেছে ডেরা-বাড়িঘর! কমেন্টে কমেন্টে কম্ব্যাটিং দেখি নীহারিকা আর আদমসুরত, সপ্ত ঋষি তো অনেক আগেই পোলাপানের প্রত্যাঘাতে যুদ্ধাহত পঙ্গু হয়ে স্ট্রেচারে ল্যাপ্টপ-লিট্রেচার প্রণয়ন করে চলিয়াছে মহাকালের ডোবায় নেমে মালকোঁচা মেরে… এইসব নক্ষত্রনৌটঙ্কি… শিঙের আগায় উঠে মহিষের-বারোটা-বাজানো এইসব বলীবর্দ বুজুর্গদের হুল্লোড়… এই নিষ্প্রেম ঝগড়ায় জায়মান দিনরাতগুলি… তিড়িংবিড়িং ফড়িঙের দেখি তৃণসৌধে উঠে পর্বতশীর্ষস্পর্শনের বড়াই… রিয়্যাকশন আর রেস্পন্সের ফারাক না-জেনে দেখি কী বিভীষণ মুচকি মুচকি বিকট কবিগিরি… তিন-কমেন্টের মাথায় দেখি বারায়া আসে তহবন্দ্-পিন্দা তেঁতুলহুজুরি…! কিন্তু কী হচ্ছে এসব, কোথায় যাচ্ছেন, বুদ্ধিজীবা সাহেবসুবো বিবিবাবু! দ্য অ্যান্সার, মাই ফ্রেন্ড, ইজ ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড, দ্য অ্যান্সার ইজ ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড… কহেন কথা, গাহেন গানা, বাবু নক্ষত্র পরামানিক : ক্যা, দ্যাখতাছ না, যাইত্যাছি কবিসভায়! লভিবারে যাই পোয়েট-লরিয়েট স্যাশ ও নেক্লেসখানা যাহা আমি ভিন্ন অন্য কোনো কবিশিয়ালের গলে শোভা নাহি পায়…। জ্বে, আইজ্ঞে, তাই-তো তাই-তো! মুই কী-আর করুম, উস্তাদ, যাই, গিয়া প্যাচবুকে আপ্নের নামে একখান ইশটিটাশ মাইরা আহি! জিয়াচ্ছা, আপ্নে বাংলাবিহারউড়িষ্যা খাবলায়া খাবলায়া জয় কৈরা কাঁটাবনসন্নিকট শাহবাগে আয়া যহন ঘাঁটি গাড়বেন, মোরে মনে রাইখেন ইট্টু, মুই হমু আপ্নের খানকা-শরিফের মেইন মুতোয়াল্লি… আপ্নে আগান, মায়েস্ত্রো, মুই ইদিক সামলাইত্যাছি, থ্রি-নট-থ্রি নিয়া আছি আপ্নের নিরন্তর ভৃত্য ও প্রহরী… নাঙ্গা তরোয়াল হাতে লৈয়া পাহারা দিতাছি আপ্নের খুশবুদার বোখারা সমরখন্দ … উস্তাদ, বড়ি ইজ্জৎ-কা বাত, মুই যে এই আপ্নের নামে দিনরাত দুরুদ ভেজিতেছি : ইয়া কবি সালামালাইকা… আগাও হো জওয়ান! লুইটা লাও সম্মুখে পাও যা যা… কালিকাপ্রসাদে  যাইবার চায় ক্যাঠা, হাঁদারাম, খুন ও পসিনা ঝরায়া বাঁচিবারে চায় কোন বোকা!

হেমন্তের অরণ্যে আমি অনেক পোস্টম্যান ঘুরতে দেখি না আর। ঘুরতে দেখেছি কি না কোনোকালে একসঙ্গে একদঙ্গল পোস্টম্যান, মনে পড়ে না। আজন্ম বিশ্বাস, এ-ই জেনে এসেছি যে, পোস্টম্যান চিরকাল চুপচাপ চলেফেরে লোকালয়ে, সংঘ থেকে সংকীর্তন থেকে তফাতে, ফেলে যায় দোরে দোরে চিঠি। সকলে প্রাপক নয় এখানে, কেউ-কেউ তার নিজের মুদ্রাদোষে, যার যার জন্মপাপে, প্রাপক হয় এসব রোদনভরা রাহসিক বৈদুর্যমণির — হৃদয়ে রয়েছে যাদের কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা… ইত্যাদি। চিরদিন পোস্টম্যান রহস্যের গ্রহ থেকে নেমে আসা প্রাণ, অন্তত আমার কাছে, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে সংসার করে অথবা না-করে সংসার স্বাভাবিক নিয়মের সে ব্যত্যয় এক, দ্রষ্টব্য নয় কিন্তু স্মর্তব্য, গভীর রাত্তিরে দূরের দূর্গবাড়ির চূড়ায় দেখা আনআইডেন্টিফায়েড অব্জেক্ট, গ্রহান্তরের গান অথবা গণ্ডার যা-ই-হোক সে উপেক্ষণীয় নয়, সে একশব্দে অ্যালিয়েন। মঞ্চে অথবা মাথায় তুলে নিয়ে কেউ যদি তারে নিয়া বা তারে ঘিরে বেমক্কা নাচানাচি প্রবর্তন করে, এবং সে যদি তাতে বিরক্ত হয়, দেন-অ্যান্ড-দেয়ার বুঝতে হবে এই মাল অরিজিন্যাল। বুঝতে হবে এ সেই সিনেমার পোস্টম্যান, হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাপ, দুনিয়ার সমস্ত স্বঘোষিত ও বিঘোষিত ছোট-বড় যত মুক্তিদাতাদের মাথাব্যথার কারণ, কারো কারো দুই-চউক্ষের বিষ, যেমন প্লেটোর। সমস্ত আদর্শ রাষ্ট্র, সব ধরনের রিপাব্লিক, অপেক্ষায় থাকে তার — অপেক্ষায় থাকে রূপ পেতে তার হাতে, স্বপ্নকল্পনা পেতে, স্ট্র্যাটেজিক্যালি রিভিয়্যুড হতে — অপেক্ষায় থাকে তারে নির্বাসন দিতে, দিভিনা কমেদিয়া  লিখে যে এক্সাইলে গেল না সে ফেইক দান্তে তো! দণ্ডিত হতেই হবে দান্তে অ্যালিগিয়েরিকে, আদারোয়াইজ ইনফার্নো  অধ্যায়ে ভেজাল পোরা আছে বুঝতে হবে। বস্ত্রদুরস্ত পোস্টম্যানদের পুংটামি দেখে আমাদের অরণ্যের পোস্টম্যান মহা আমোদে হাসে, আর কয় জনান্তিকে, তেঁতুলহুজুর, নাচো!

অমরায় গিয়ে, একদিন, বাংলার ভাঁটফুল ও শটিপুষ্প অলঙ্কারে অ্যাট্রাক্টিভ-অ্যাপিলিং করে তুলে নিজেরে, যে-বেহুলা ক্যাবারেড্যান্সার হয়েছিল নিতান্ত অনিচ্ছায়, দায়ে পড়ে, তেঁতুলহুজুরের সমলিঙ্গ লখাইরে বাঁচাইয়া তুলিবারে, সেই মহান পার্ফর্মারের দোহাই, সেই দেবলোকে-তোলপাড়-তোলা আর্টিস্ট ও আদি কোরিয়োগ্র্যাফার বেহুলার কিরা কেটে কনফেশন এ-ই যে, আজও আমি মাঝেসাঝে চিঠি পাই বটে, সেইটা হোক-না যতই বিরলপাওয়া কালেভদ্রে কদাচিৎ, পাই তো, অরণ্যের পোস্টম্যান মরিয়া যায় নাই আজও। সম্প্রতি কিছু হস্তগত (ও হৃদয়গত) হওয়া এমনই চিঠি — কিংবা বোতলপত্র মহাসময়ের দরিয়ায় — বিনিময়ের মানসে এই চিৎকৃত কমেন্ট্রিবক্স। পোস্টম্যানের নাম এই দুনিয়ার খুব কম পত্রগ্রাহক মনে রাখে, এই যুগ মুখেচোখে-খৈ-ফুটানি নিউজপ্রেজেন্টারের, কেউ জিগাবে না সন্দেহে তাই নিজে থেকেই মেনশন করি সেই নিঃস্ব ও লুপ্তপ্রায় প্রাচীন বংশের এক সদস্যের নাম, সেই পোস্টম্যান, নেইম অফ দ্য ডিভাইন ডাকপিয়ন ইজ মহামতি ইমরুল হাসান। পোস্টম্যানের নিকট শুকরিয়া আদায়ের কিছু নাই, কিন্তু পত্রপ্রাপক খুশি হইলে প্রেরকই নয় কেবল পোস্টম্যানও খুশি। পত্রগ্রহিতার দুঃখই পোস্টম্যানের দুঃখ — পোস্টম্যান বংশের এ-ই সিলসিলা। জগতের সকল প্রাপক, প্রেরক ও বার্তাবাহকের সম্পর্ক সুদৃঢ় হউক!

পড়ি তিন কিংবা চারটে লেটার, অফ ল্যভ অ্যান্ড আদার ডেমন্স, স্যং অফ ডিস্পেয়ার, রক্-ন্-রল্ অফ মেলাঙ্কলিয়া, বাংলা ব্লুজ, পড়ি সীমাহীন শূন্যমাঝারে এই মহাশূন্য সমুচ্চয়। এবং পড়ব পরপর অথবা প্যজ দিয়ে দিয়ে, যেমন যার ইচ্ছে তেমন, পড়ব পরাবাস্তবপ্রেমী এই সেল্যুকাস কবিকুলের ডিজনিল্যান্ডে একগুচ্ছ রিয়্যাল খরগোশের নৈরল্য। পঞ্চবটী এই বনের দেশে, এই গোদাবরী নদীটির স্মৃতিবিজড়িত মনু-মহানন্দা-মাতামুহুরী-তিতাস-লৌহজং-সুরমা-ঘাঘট-করতোয়া-সাঙ্গু তরঙ্গিত বদ্বীপা ল্যান্ডস্কেপে, এক অশ্বত্থ বটের কাছে এসে একতিল বসি, জিরোই কিয়ৎক্ষণ, অতঃপরবর্তীকালে গেটিং-লেইট মণিবন্ধ অল্প ঝাঁকায়ে এক অননুকরণীয় টেলিফিল্মিক কায়দায় শ্রাগ করে উঠে যাই, গিয়ে প্র্যাক্টিস করি ন্যাংটি-ইঁদুরের দন্ত্যধন্য কর্পোরেটোক্র্যাসি…

  • পোস্টম্যানের প্রথম গস্পেল অথবা চিঠি নাম্বার ওয়ান : না-লিখা   শিরোনাম

না-লিখার গর্তে পড়ে এরা আছে ঠিকই; লিখা নাই, না-লিখার হতাশা তো আছে! আছে কবিজন্ম, কবিতামুহূর্ত। অশরীরী বোধ নাই, আছে ভাবনাহীন অস্তিত্ব বিন্যাস। না-লিখা তো ভালোই, যখন লিখার ভিতরকার জলজ্যান্ত সাপগুলি উঠে এসে দাঁড়িয়ে আছে, ছোবল দিচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে শরীরের ভিতর না-লিখার বিষ। যারা লিখছে, তারা লিখছে তাদেরটাই, আমার না-লিখা লিখার অতীত, চলছে ভবিষ্যতে; হাত-পা নিয়া আগাইয়া যাচ্ছে…ভুস ভুস করে যাচ্ছে সময়…যাক না বাবা, কোথায় যাবে তারা…আমাকে ফেলে দিলে আমার না-লিখাও লিখার ভিতর থেকে উঠে আসতে থাকবে…

  • পোস্টম্যানের দ্বিতীয় গস্পেল অথবা পত্রক্রম দুই : নীরবতা  নাম তার

সবকিছুই যে লিখতে হবে এইরকম কোনোকিছু মনে হয় না, মাঝে মাঝে মনে হয় দিনগুলি বিস্মৃতির, অস্তিত্বগুলি অসংলগ্ন, পাঠগুলি মৌন, নীরবতাগুলি জরুরি ও অভিব্যক্তিময়; জরুরি যে কথাগুলি, তা হচ্ছে, নীরবতা…শব্দগুলি, অস্তিত্বগুলি, বর্ণনাগুলি এতটাই অসম্পূর্ণ যে প্রকাশমাত্রই তা বিহ্বল…এইরকম নীরবতার ঘোরটোপে আটকে পড়ে আছে দিন, তার বাগবিধি ও প্রকরণ ভাষার দৃশ্যমান প্রকোষ্ঠে, শব্দের অর্থবোধকতার পাশে…মসৃণ, পেলব হয়ে থাকে…এইভাবে ভাষার ভিতরে নীরবতাগুলি জরুরি…জরুরি নীরবতাগুলির ভাষা হয়ে ওঠাটাও…কথার মাঝখানে বিরতিগুলি…শ্বাস নেয়ার অভিঘাতগুলি…ক্রোধে বিস্ফোরিত হওয়ার আগে সঞ্চিত শক্তিগুলি…অন্তিম উচ্চারণের আগে কেঁপে ওঠার ভিতর স্থবিরতাগুলি…কথা বলতে বলতে ডুবে যাবার ভিতর আরো কথা খুঁজে নেবার অভিযাত্রাগুলি…মৌন, নীরবতার ক্লেদ নিয়ে শুধুই নীরব, নীরবতাগুলি…উচ্চারণের পূর্ব-মুহূর্তগুলি…যেন এখনই কথা বলে উঠতে চাইছে…আর কথাগুলিও বলছে, নীরবতা…দ্রুত ও অভিঘাতময় নীরবতার শব্দগুলি আছড়ে পড়ছে…ছন্দ-আকুল তার একটি…কর্কশ বেয়াদবি…মিহি মিছরির ছুরি…গোপন মলম…প্রলেপ বন্ধুত্বের…আশ্বাস ও সান্ত্বনাবাণী…হুঁশিয়ারি…আর বলো না কোনো কথা তুমি…নীরবতার ঘরবাড়ি ডুবে যাচ্ছে সময়ের পানিতে আবার…ভেসে উঠছে নৌকা কথার…নীরবতার ভিতর কত যে কথা…কথাগুলি বলছে, ‘নীরবতা, তুমি চুপ করবে নাকি?’

  • পোস্টম্যানের তৃতীয় গস্পেল অথবা চিঠি তিন : কবিতা-লেখা  সাইনবোর্ড

আসলে মাঝে মাঝে কিছু রাত আসে, আসে দিনযাপন; মনে হয় সবটাই কবিতার। যে-কোনোকিছু লেখা সম্ভব। আর যা কিছু ভাবছি, তার সবটাই কবিতা। একরাতে একটা কাব্যগ্রন্থ লিখে শেষ করে ওঠার মতো বিষয়। এত যে কবিতা, লিখে শেষ করে ওঠা যায় না। হতচকিত, একটার পর একটা, ভাসছে দুর্দমনীয় ভাবনাগুলি, আকাঙ্ক্ষার; কাকেই-বা প্রতিহত করি, বলি, একটু দাঁড়াও! দুইহাত দিয়ে যা পাই, তার সবটাই নিতে চাই। বলি; সময়, ডাইনী বুড়ি, তুই একটু দাঁড়া। রাতগুলি দীর্ঘ হয়ে ওঠে, দিনের ক্লান্তিগুলিও ম্লান হয়ে আসতে থাকে। কী যে বিহ্বলতায়, মুহূর্তগুলি কেঁপে কেঁপে ওঠে, মোহগ্রস্থতায়, স্থাণুর মতো বসে থেকে থেকে। তবু সে কি আসে? হৃদয়হরণ, চপল চরণ, নটী বেটির মতন; হেসে হেসে প্রতিচ্ছায়া ফেলে যায়, বলে, আসছিলাম তো!  

এই শুনে মূঢ় প্রেমিকের মতোই হতবিহ্বল, ভাবি; তাহলে কে সত্যি : আমি, প্রেম না কবিতা?

না-লেখা আর লেখা — এই দুই নিয়াই ইমরুলকে ভাবিত হতে দেখি ফিরে ফিরে, এবং কবিতামাধ্যমে এমনধারা ভাবনা সন্নিবেশকরণ অনেকটা পুলসেরাত পেরোনোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ, ইমরুল হাসান সফলতার সঙ্গে সেতু পেরোতে পেরেছেন নো-ডাউট। না-লেখা তথা লিখনবন্ধ্যাত্ব/রাইটিং-ব্লক নিয়া ভাবাভাবি অবশ্য নতুন নয়, ফিকশনলিখিয়েদেরকে এই নিয়া ভাবিত হইতে দেখা গিয়েছে যুগে যুগে এবং কবিতাতেও অভিব্যক্ত হয়েছে এই দশা। ইমরুলে এসে এই ব্যাপারটা তার কবিতার ক্যারেক্টার হয়ে দাঁড়ায়, যেইটা খুব উপভোগ্যও হয়, এবং না-লেখা আর লেখার কাইন্ড অফ অ্যা প্রোসেস-ডক্যুমেন্টেশন উপরিপাওনা হিশেবে পেয়ে যাই আমরা তার কবিতায়, পেয়ে উপকৃত ও পরিতৃপ্ত হই। ইমরুল হাসানের ঝাঁপিতে উঁকি দিয়ে যে-ব্যাপারটা আলাদাভাবে খেয়ালযোগ্য, অন্তত যা আমি নিরখিয়া আশ্চর্যে অন্বিত হয়েছি ইমরুল হাসানের কবিতার সনে, সেইটা খানিক বলে নিই। ইন-জেনারেল কবিতায় আমরা নানান উপায় ও অনুষঙ্গের উপর ভর দিয়া চিন্তাকে হাজির হতে দেখি, চিত্রকল্প-উপমা বা নানাবিধ অন্যান্য অলঙ্কারাদির আয়োজনে সেই চিন্তা সামনে এসে খাড়ায় পাঠকের কিংবা পাঠক নিজেই হয়তো কবিতা পড়তে পড়তে একটা আগডুমবাগডুম চিন্তা বা ভাবনা খাড়া করে নেয়। কিন্তু ইমরুল হাসানে যেন প্রোসেসটা রিভার্স্যাল, আই মিন, তিনি চিন্তার ওপর ভর দিয়াই চিত্রকল্প প্রভৃতি যা যা আবশ্যক কবিতার জন্য তা তা খাড়া করান। অন্য একটা ব্যাপারও মনে হয় আমার, ইমরুল হাসান কর্তৃক প্রকল্পিত কন্সট্র্যাকশনগুলো যথাসাধ্য ঘন ও নিবিড় নয়নে দেখতে দেখতে : একটা কবিতায় সচরাচর আমরা বস্তুর বা ভাবের, ভবের বা অনুভবের রূপ-রঙ-দৃশ্য-গন্ধ-শব্দ-সোয়াদ-ধ্বনিচিত্র উপহার পাই, ইমরুলের কবিতায় আমরা রূপ-রঙ-দৃশ্য-গন্ধ-শব্দ-সোয়াদ-ধ্বনিচিত্র পাই চিন্তার। ব্যাপারস্যাপার শুনে কারো মনে হতে পারে, ইমরুল বুঝিবা আইডিয়ানির্ভর কবিতা লেখেন — না, ব্যাপার মোটেও তা না। আইডিয়ানির্ভরতার বাইরে রেখে একটা কবিতায় কেমন করে চিন্তার রৌদ্রকুচি ইনজেক্ট করে দেয়া যায়, সেই হেকিমি ইমরুলকবিতার উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন। ইমরুল হাসান সেই আলকেমিস্ট, আবহমান বাংলাস্টাইলের কবিতাকিমিয়ায় যিনি ডিস্টিংক্ট একটা পার্ফিয়্যুম পরিশোধনরত। গোয়িং অন, অবশ্যই, ইমরুল হাসানের পাঁচটা কাব্যপুস্তক অনোয়ার্ডস কবিতারাজি ভিন্নতর শূন্যোদ্যানের পানে অগ্রসরমান। অগ্রন্থিত ওই ডিরেকশনে এ-যাত্রা যাচ্ছে না যাওয়া।

স্টেজের থিয়েটারে যেমন প্লে উইদিন প্লে, ইমরুল হাসানের কবিতায় একটা পৌনপুনিক থিম্যাটিক ট্রিটমেন্ট দেখতে পাই যে তিনি লেখার ভেতর লেখা নিয়া ভাবছেন, কবিতার ভেতর কবিতাচিন্তা চালান করে দিচ্ছেন, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনাও বলা বাহুল্য, লেখা নিয়ে যেমন না-লেখা নিয়েও, খোদ ব্যক্তিগত রচনপ্রক্রিয়া নিয়ে, লেখা আর না-লেখার অন্তর্বর্তী দ্বিধাদোলাচল ও আলোআঁধারি নিয়ে, এমনকি কিউপিডভূমিকাভিনয়ে কবি যখন তথাকথিত প্রেমের কবিতা লিখছেন তখনও তিনি লিখনভঙ্গিমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধান সচল রাখতে ভুলছেন না, আশ্চর্য উদ্ভাস বটে এ এক, এমন সর্বসত্তায় লিখন নিয়া ভাবনমগ্নতা আগে হেরিয়াছিনু বলে ইয়াদ হয় না। যারা তাই লিখন নিয়া হামেশা ভাবেন, লিখনবন্ধ্যাত্বে ভোগেন ও ভোগান্তিনিষ্ক্রমণের রাস্তা তালাশ করেন, তাদের কাছে ইমরুল উপভোগ্য হয়ে ওঠেন। কোডিং-ডিকোডিং প্রোসেসের যাবতীয় পোটেনশিয়্যাল ও লিমিট্যাশনগুলো সম্পর্কে ইমরুলের কবিতা পাঠককে সজাগ রাখতে চায়, শিস বাজায়া যায় পাঠকের মগ্নচৈতন্যে তারা বারবার। পুরো ব্যাপারটা তিনি এত অবিরাম করেন, অবিরল ও অনাবিল করে চলেন, অনেকটা হার্কিয়্যুলিয়্যান টাস্ক বলেই মনে হয় ব্যাপারটা আমাদের কাছে। দ্যাট ডাজন্ট মিন যে মরা গরুর হাড্ডি হয় সেসব, শকুন চশমখোর বঙ্গকলেজিয়েট প্রোফেসরদিগের জন্য সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বস্তুপিণ্ড নয়, সেসব হয়ে ওঠে এমনকি আমাদের মতো উদয়াস্ত বুভুক্ষু অল্পপ্রাণা পাঠকদের কাছেও উপভোগ্য ও উদযাপনযোগ্য।

টানাগদ্যের কবিতা, বা রানিং-ফর্ম্যাটের কবিতা নামেও অভিহিত করেন কবিরা, চালু মাল কবিতাবাজারে আজকাল। অবশ্য পুরান খবর এইটা। যা নতুন, তা হচ্ছে এই, ইমরুল হাসানের গদ্যস্পন্দে একবর্ণও জোরাজুরি নিরুপস্থিত। গদ্যকবিতা মানেই যেন কল্পনা আর কবিকামনাবাসনার কূট বিন্যাস, রিলেন্টলেস জাক্সটাপোজিং, উল্লম্ফন ও উল্লঙ্ঘনের বল্গাছাড়া ব্যবহার, মোট কথায় টাওয়ার অফ ব্যাবেল বানানো ব্যতিরেকে যেন গদ্যকবিতার কোনো উদ্দেশ্য-বিধেয় নাই। ইমরুলকে এই মিথের বিপরীতে ছেনি-বাটালি হাতে বিশ্বকর্মার রূপে দাঁড়াতে দেখা যায়। এন্তার তৎসম-তদ্ভব আর উল্লম্ফন-উল্লঙ্ঘন এস্তেমাল করে কবিতাকে কেঠো ঘোড়া বানাতে হয় না তাকে, কেউ যদি সেথায় কাঠভাব খুঁজেও পান তবে খেয়াল করুন অভিনিবেশে সেই তুরঙ্গমের পায়ের দিকে, ঘুঙুর রয়েছে তার পায়ে, একদম গণেশ পাইন! কবিতায় রহস্য আমদানি করতে যেয়ে তাকে গায়ে খেটে একের-পর-এক গাব্দাগোব্দা আর্টকসরত প্রদর্শিতে হয় না, ইভেন জর্নালধর্ম বজায় রেখেও কবিতাকে কেমন স্প্যাক্টাক্যুলার অধরা মাধুরী করে তোলা যায় সেই লেসন লার্ন করা যাইল উপরের গস্পেলত্রয়ীতে। কেবল টাইপোগ্র্যাফি পাল্টানোর শখে, কেবল থোড়া-সা স্বাদবদলের গরজে, এই কবিকে আমরা টানাগাদ্যিক হইবারে নারাজ দেখি। এই কথাটার অ্যাটেস্ট্যাশন পাওয়া যাবে তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই  গ্রন্থিকায়। একই জায়গায় এক-ঔর সবক পাই প্রাচীরের শেষ পারাবতের মুখোমুখি হয়ে, আমাদের রাশোমন গল্প সেই পারাবতের নাম, সেইখানে দেখি আখ্যানোপম বয়ান রেখেও অদ্ভুত ডোজ দিয়া ইমরুল আমাদেরে নিয়া যান আখ্যানোত্তর এক বৈকুণ্ঠলোকে। এবং মজা এ-ই যে, আকিরা কুরোসাবা বা তার সিনেমাজাত রাশোমন ইফেক্ট সম্পর্কে একদমই কিচ্ছুটি না জেনেও কবিতাপাঠক সংলগ্ন হতে পারেন সহজে এই কবিতায়। এইসব ও অন্য-অন্য নানান রুমাল ও বেড়াল রয়েছে ইমরুলরাজ্যে, সবটাই আমি দেখে সেরেছি এমন তো নয়, একজীবনে আমি কেবল কালিকাপ্রসাদে যেতে চেয়েছি, গিয়ে বসতে চেয়েছি নিধুয়া প্রান্তরের কোনো অশ্বত্থ বটের কাছাকাছি। কিন্তু আমার পাঁয়তারাই সার হয়েছে কেবল, হায়, ভবহরিহর!

কবিতাভাষার প্রসঙ্গ নিয়া আলাপ তো মুশকিল আমার ন্যায় নির্গুণ সাধারণের পক্ষে। কেননা বাক্যসংস্থান আর নিছক লিখনশৈলীই ল্যাঙ্গুয়েজ মনে করি না যেহেতু, কমপ্লিকেইটেড অবস্থা কাজেই, বলতে গেলে একটু গুরুগর্ভ পঠনশ্রবণ তো রিকোয়্যার্ড। তবু বলতে একটু ইচ্ছেও করছে যে! এইখানকার কথাগুলো অতএব অপ্রস্তুত বক্তব্য ধরে নিয়ে পড়তে হবে, সেইভাবে হ্যাজাক জ্বালায়া স্ক্রুটিনি রিডিং এক্ষণে অভিপ্রেত নয়। দেখো, মগর প্যার-সে। পড়ো, ইয়ে দিল-কা পুকার। যে-একধরন নগুরে রকিং কম্পোজিশনে এখন গত দুইদশক ধরে লিখছি আমরা, তাতে বেনিফিটেডও হচ্ছি ক্রিয়াপদ প্রভৃতি ব্যবহার বা কাঁড়া-আকাঁড়া শব্দের নির্দ্বিধ প্রয়োগে লেখাকে ঢের অব্যর্থ লক্ষ্যাভিসারী করে তুলতে পারছি, কিন্তু অল্পবিস্তর এর সীমাবদ্ধতাগুলোও গোচরে এসে যাচ্ছিল ক্রমশ। মনে হচ্ছিল একটা সময়ে এসে যে এই টিউনে রমণীয় বেল্-লেৎর্ ব্যতিরেকে সর্ট-অফ সিরিয়াস প্রবন্ধ রচা সম্ভব নয়। এবাদুর রহমানের একটা প্রবন্ধ পঠনাভিজ্ঞতায় এসে যাবার পর আমার এ-ধাঁচা আশঙ্কা দূরীভূত হয়। ন্যান গোল্ডিন ও তার ফটোগ্র্যাফিশিল্প নিয়ে এবাদ লেখেন, ছাপা হয় প্রথম ‘কাউন্টার ফটো’ নামের একটা পত্রিকায়, এরপর লেখকের ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে এইটা জায়গা নিয়েছে। এখন বেশ অনেকেই এই টিউনে ফাইজলামির বাইরে যেয়ে ভালো রচনা ফলিয়ে তুলতে পারছেন। কিন্তু কবিতায় এইটা বুঝি সম্ভব হবে না মনে হচ্ছিল। কবিতায় যেমন বেদনাবাহক বেদ থাকা দরকার, অন্তত যা আমার মনে হয়, চালু স্বরলিপি দিয়ে যেন সেই বেদনাটা আনা যাচ্ছিল না, বা বেদনা এলে বেদ রয়ে যাচ্ছিল বহিরস্থিত। অনেক সম্ভাবনাবহ কবিতাও কেমন যেন ঈশ্বরমুখো তথা ঐশ্বরিক হয়ে যাচ্ছিল, ঈশ্বরগুপ্তপ্রবণ কবিতাই দিকে দিকে উচ্চকিত হচ্ছিল, দুনিয়া যেন শ্রেণিমিত্র আর শ্রেণিদুশমন দ্বারা ভাগ করে পরে কবিতা লিখছিলেন কবিরা, বা ছ্যাবলামি করছিলেন স্রেফ বেশিরভাগ। ইমরুল হাসানে এসে দেখা গেল যে এই টিউনে লেখা কবিতায় বেদনা ও বেদ — দুয়েরই কো-এক্সিস্টেন্স খুব সম্ভব। কবিতায় বেদনা বলতে যে-একটা ভাল্নারেবিলিটি ধারণ করেন একজন কবি, যা অন্য কোনো প্রকাশমাধ্যমে সেইভাবে যায় না ধারণ করা, অন্তর্গত রক্তের ভেতরের যে-খেলানেলা, যা আপনি বিপন্ন বিস্ময় হিশেবে চেনেন, ইমরুলের কবিতার সুরসংশ্রয়ে সেইটা ধরা পড়তে দেখা গেল, ইমরুলকবিতার টিউনস্কেপ সেই অ্যাব্জর্বিং ক্যাপাবিলিটি প্রিজার্ভ করে দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল বলতে গেলে পয়লাবারের মতো। খুব বেশি কেউ এখনো যুগপৎ বেদ ও বেদনা — জ্ঞান ও মন অর্থে বেদ ও বেদনা — ধরতে পারছেন না বিশেষ এই টিউনিং তথা ওয়ার্ডিং তথা সিন্ট্যাক্সিং দিয়ে। কেউ কেউ পারছেন, খুব কম, ইমরুল হাসান ছাড়া এ-বাবতে আরেকজনের নাম মনে পড়ছে, তিনি জহির হাসান। ইমরুলের আর্বেইন টোনাল ইফেক্টটাই ইউনিক, জহিরের যেমন রুরালিটি, প্যাস্টোরাল অ্যাটমোস্ফিয়ারের একটা আমেজ জহিরের কবিতায় পাওয়া যায়, ইমরুলের কবিতায় যেমন শহুরে অ্যালিয়েন্যাশনের অরব হাহাকার। মজার একটা ব্যাপার, পুরাকালে সেইম থিং অন্য দুয়েক কবিও করেছিলেন মনে পড়বে, ইমরুল হাসানেও লক্ষিত হইল; ঘটনাটা এ-ই যে, বাংলায় নারীলিঙ্গীয় একবাচনিক তৃতীয়ব্যক্তিক সর্বনাম ব্যবহারজনিত বিশেষ একটা এক্সপেরিমেন্ট; আংরেজির শি-হি থেকে একটু সরে এসে দেখতে পারলে এইখানে একটাবার অন্তত দুঃখিনী বাংলারে স্যালুট ঠোকা যাবে। থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার নারী-পুরুষ একাকার থেকে যাওয়ার ভেতর দিয়ে যে-একটা তাৎপর্য, ঐতিহাসিক-পৌরাণিক নানান দিক থেকে এই রাধাকৃষ্ণ অভেদ হরিহরআত্মা বাংলারই ইউনিকনেস ও স্ট্রেংথ কি না ভাবা যাইতেও পারে একবার, শুধু সর্বনামের এই আল্লাপ্রদত্ত সুবিধার কারণে বাংলাকাব্য পয়লা সাক্ষাতেই দ্বিরার্থ তৈয়ার করে নিতে পারছে — এইটা মারহাবাযোগ্য নয়? অ্যানিওয়ে, এইটা মাইনর ইশ্যু, কবির সর্ববিধ পরীক্ষানিরীক্ষা মাথাধার্য কবিতাপাঠকের। বটে।

এইটা ঠিক যে এই বিশেষ ধরনে লেখার ভঙ্গিমা বা ভাষা, তা তাকে যে-নামেই ডাকা হোক, কমিবেশি দ্বিদশক পূর্ণ করে ফেলেছে। এর অভিঘাত ও প্রভাবও তো বহুমুখা আর নানামাত্রিক। লক্ষ করা যাবে, কবিতায় এর প্রয়োগ ক্রমশ বিবর্ধিত ও বিচিত্রিত হয়ে চলেছে। এর অভিঘাত এমন যে, এমনকি ভীষণ কনভেনশনভক্ত কবি-লিখিয়েরাও প্রতিদিনকার সংযোগের আশ্রয় করছেন একে, এর শরণ নিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় রোজকার অব্যর্থ সংযোগোপায় হিশেবে। কেবল কবিতা বা নিবন্ধপ্রবন্ধ লিখতে যেয়ে একটা বিশালাংশ কবি-লেখক হয়তো দোদুল হয়ে ওঠেন এই বিভঙ্গি কি বিভাষা আদৌ মহাকালগামী হইতে পারবে কি পারবে না হেন দ্বৈধ দ্বারা; কাজেই শিল্পরচক হয়ে জীবনের ঘণ্টা-মিনিটগুলো অমর করে তুলতে চান যারা, তারা হয়তো রচনাকালে রবীন্দ্রশুদ্ধতার কাছে ফেরেন। কথাটা যা-হোক এ-ই যে, কে পথিকৃৎ আর কারা পথানুগামী ইত্যাদি শিশুবুড়োতোষ তর্ক তফাতে রেখে, একটা বিশেষ বোলচালভঙ্গিই তো-আর ভাষা নয়, যেমনটা আগেই নিয়েছি বলে, এবং কবিতাভাষা বা যাকে বলে কবির ডিকশন তা তো নয়ই, কিন্তু ধরা যাক ব্রাত্য রাইসু প্রমুখ যেই জিনিশ করে দেখিয়েছেন বাংলা কবিতায়, সেই সময়ের ইন্ডিয়ান বাংলা কবিতার আদলে ধুমিয়ে শের লেখার কবিসমাজে রাইসু একলাই দশানন হয়ে একটা পাকাপোক্ত ভূমিকা রেখেছেন, রাইসু-অনুকারীরা কেবল তস্যাতিতস্য অনুকারই হয়েছেন। সম্প্রতি যারা চ্যাটাং চ্যাটাং অ্যান্টিপোয়েট্রি লিখবার শখের বাইরে বেরিয়ে নিকানার পাররা বা ভাস্কো পোপা বা চেশোয়াভ মিউশ প্রমুখদের হার্টবিট-পাল্স বুঝে বাংলা কবিতার উন্নয়ন ও বিকাশের কাজে লেগে রয়েছেন, অঙ্গুলিমেয় সেই কয়েকজনের মধ্যে ইমরুল হাসান একজন। ঝুঁকি ছিল পুরামাত্রায় রাইসু হয়ে পাঠকের নিকট প্রতিভাসিত হওয়ার, কিন্তু তা তো হয়ইনি, উল্টে একেবারে আলাদা একটা হরাইজন উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে, সেই দিগন্ত উদ্ঘাটনের পেছনে ইমরুল হাসানের দুতিয়ালি বিলক্ষণ স্মর্তব্য।

সারাটিজীবন আমি, চিরটাকাল আমি, চিঠি লিখে যেতে চেয়েছি ইনভ্যারিয়্যাব্লি। নিজে যেহেতু নবিশ পত্রকার হবারও কম্পিটেন্স রাখি না, তাই চিঠি চিরটাকাল পেয়ে যেতে চেয়েছি, চিঠিতে চিঠিতে চেয়েছি নিতে একরত্তি নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস। খুব খুশনসিব নিয়া তো জন্মাইনি, তবু অল্পকিছু চিঠি আমি পেয়েছি এ-জীবনে। হেমন্তের অরণ্যে টহলরত পোস্টম্যান মাঝেমাঝে এসে থেমেছে আমাদেরও দুয়ারে, বাজিয়েছে টুংটাং ডাকঘণ্টি তার, একদৌড়ে চিঠি রিসিভ করে লেফাফা খুলতে খুলতে গেছি চলে পুকুরপারে সেগুনগাছের ড্রাগনসদৃশ বড় বড় শুকনো পত্রমর্মরিত জলনির্জন অঞ্চলে। এবং, খোদার কসম জীবনানন্দপনা নয়, একটা চালতাগাছের ছিপনৌকাপাতায়-ছাওয়া ছায়ায় চিঠি পড়ে পড়ে কেটেছে আমার গতজন্মের ছুটিদিনের মধ্যাহ্ন ও স্কুলফের্তা অপরাহ্নগুলো। শরতের আমন্ত্রণমাখা শারদীয় সন্ধ্যায়, শিশিরের শব্দের মতন সুরম্য শীতে, চিঠিস্মৃতি রোমন্থন করি আমি বিনম্র নস্ট্যালজিয়ায়।

এখন চিঠি পাই না আর। দৌজ ডেইজ অফ গেটিং লেটার্স অ্যান্ড সেন্ডিং ব্যাক অ্যাজ ওয়েল হ্যাজ গন উইথ দ্য উইন্ড ফরেভার। শক্তির পঙক্তিজোড়া মনে পড়ে থেকে-থেকে : “আমরা ক্রমশই একে অপরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি / আমরা ক্রমশই চিঠি পাবার লোভে সরে যাচ্ছি দূরে”…। তবু আমি চিঠি খুঁজি, দিনরাত এ-দোকানে সে-দোকানে চিঠি খুঁজে ফিরি, জোটে যদি মোটে দুয়েকখানা, আওড়ায়া চলি ফিরে ফিরে এই নগরান্ধকারে। এখন চিঠি আসে না আর হাওয়ায় ভেসে ভেসে, বাই এয়ার মেইল, বহু খুঁজেপেতে বহু খড়কাঠ পুড়ায়ে এরপরে একখানা চিঠি এখন হস্তগত হয়। এনভেলাপ খুলে খুলে পড়ি প্রিয়ংবদা আখরগুলো, পত্রে রচিত পরাঙ্মুখ দিনের মর্সিয়া, পাঠ করি বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস স্বীয় অস্তিত্বের, পড়ি বিকামিংগুলো। পড়ে ফের ভুলে যাই, কিছুদিন ভুলে থাকি, কিছুদিন পরে ফের ধূসর ধূসরতর বছরের পুরনো ইঁদারার তলদেশ থেকে উঠে আসে আওয়াজ। গায়েবি নয়, এরচেয়েও কুহকী, চিঠির আওয়াজ। শৈশবের লুকোলুকি খেলার তুক্কুতধ্বনির ন্যায় চিঠিধৃত বর্ণমালা ডাকছানি দিয়া কাছে নেয় টেনে। কেউ কেউ, সব চিঠি নয়, কোনো কোনো চিঠি খুব ঘনঘন ডাকাডাকিপ্রিয়, টেনে নিয়া যায় তার হৃদয়ের পাশটিতে একবার দুইবার তিনবার… বারেবারে এইভাবে।

হেমন্তের অরণ্যে আমি, শীতের অপরাহ্নে আমি, গ্রীষ্মের গানভোলা পাখির দুপুরে আমি, বৃষ্টির ঝিমিঝিমি বরষায় আমি, বসন্তগুঞ্জনভরা গোধূলিতে আমি, লিটল-লিটল-স্টার-টুইঙ্কল্ড শারদ রজনিতে আমি, শহরের স্লাম অ্যারিয়ায় ল্যাম্পপোস্টপরিবেষ্টিত কুয়াশাসিরিজের শীতরাত্তিরে আমি, চিঠিবিথারের মাঝখান চিরে বের করে করে চলি নিঃশ্বাসবান্ধব নরম পথঘাট, ব্রেদিংফ্রেন্ডলি য়্যুনিভার্স। খুব ব্যক্তিগত খোঁজাখুঁজি এসব, খুব ট্র্যাডিশন্যাল, উইদাউট অ্যানি ইন্ডিভিজুয়্যাল ট্যালেন্ট। তবে যে-দেশে যেয়ে পৌঁছাই আমি এই তরিকায়, সেই দেশ নয় স্রেফ অলাবুভক্ষণের, নয় ক্ষণপরিত্রাণের, সেই দেশ আদৌ হজম-বদহজমের নয়, সেখানে পরিশ্রমশ্রান্তি নাই, তাই পরিত্রাণপ্রশ্ন অবান্তর সেথা, তাহে নাই শিকওয়া কোনো শান্তি-অশান্তির, জওয়াব-ই-শিকওয়া নাই, নিরুপম নিরুদ্বেগ নিরভিযোগ ভূখণ্ড সেই, সেই দেশ উর্ধ্বে এসব বিলাস ও ব্যসনের… সেই দেশে খোঁজাখুঁজি আছে, খোঁড়াখুঁড়ি আছে, কিন্তু অহেতু ও উদ্দেশ্যপ্রণোদনাকীর্ণ কোনো খোঁচাখুঁচি নাই; খুনসুটি আছে, কিন্তু কোনো খুনোখুনি নাই; নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া আছে, একের-পর-এক সূর্যাস্ত-চন্দ্রোদয় আছে, হেঁড়ে চিৎকার নাই কিচ্ছুটি নিয়া। যাত্রাপথ, সেই দেশের, টিডিয়াস নয়, ঠ্যাঁটামোভরা আর্গ্যুমেন্ট নাই সেই জার্নিতে, সেই পথ গভীর নির্জনের। নিরিবিলি নিভুনিভু মোমের আলোর সেই জিরোবার সরাইখানা, পানশালা পান্থজনের গলা-ভেজাবার স্নিগ্ধ সুথির। সেই সার্চ প্রোগ্রামের নাই কোনো ইন্সিডিয়াস ইন্টেন্ট, ফলে সেখানে কেউ অক্ষম-পিঁচুটি ক্রিটিক কি হুঁকোমুখো অধ্যাপক হয়া লাঠিখেলা দেখাবার সার্কাসমাস্টার সাজে না, জলের মতো ঘুরে ঘুরে সেথা খালি ট্রিমেন্ডাস সেল্ফ-রিয়্যালাইজ্যাশন, ক্যাথার্সিস, বোধিবিমোক্ষণ। সেই দেশ বসে-থাকার নয়, স্থাণুর নয়, ঝিমুনি-লাগা ফার্মের মুর্গির নয় সে-দেশ, সে-দেশে কেবল চরৈবেতি। কি কি আছে সে-দেশে… যা যা আছে তা তা ট্যাঞ্জিবল না ননট্যাঞ্জিবল, অবস্কিউর না সি-থ্রু, সাহেবসুবা না কাঙাল হরিনাথের… দেখতে হলে সেই দেশে সশরীর সরেজমিন যেয়ে দেখতে হয়। সে-দেশে সবই ইন্ট্যাক্ট, দেহহীন চামেলিসৌরভ, অরূপরতন ইত্যাদি। সে-দেশে এমন জ্যোছনা যে সবার, সবকিছুর, সকলের, আকৃতি ঝরে ঝরে যায়। ইন শর্ট, সে-দেশ ছবির দেশ, কবিতার দেশ…

চিঠি ও চিঠিবাহক নিয়ে ঢের সিনেমাছায়াচিত্র তো দুনিয়ায় আছে, কে রাখে খবর কয়টার এই টেক্সটিঙের যুগে! এই কিচিরমিচির টুইটিঙের যুগে কে-আর পুঁছবে বলো পত্রদূত-বার্তাবাহকেরে! কেউ কেউ পোঁছে, নিশ্চয়ই, এবং অনেকেই রিমোটবোতাম টিপতে টিপতে চিঠিযাপন করে, হ্যাঁ, আজও করে, যেমন সর্বকালেই করত। কত অজানারে হয় নাই জানা আমাদিগের, কত সিনেমারে হয় নাই দেখা, তারপরও কতই তো দেখা-জানা হলো ভবে এসে! একটা সিনেমা পাবলো নেরুদার ওপর পঞ্চাশের দশকে আরোপিত অন্তরীণ-দিনগুলো নিয়ে, ইল পোস্তিনো  নাম সেই ইতালীয় ম্যুভির, পোস্টম্যান ও কবিতা ও কবি ও চিঠির জয়গাথা অনবদ্য। অন্যান্য রয়েছে অনেক, যেমন দ্য মেসেজ, দ্য মেসেঞ্জার  প্রভৃতি। সর্বত্রই চিঠি ও চিঠিবাহক ও কবি ও কবিতা একাকার। ইমরুল হাসানের কবিতায় চিঠির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উল্লেখ রয়েছে অনেক। যে-ফর্মেই দাও তুমি, চিঠি দিও, প্রিয়! পৃথিবীর সমস্ত মহত্তর শিল্প অন্তিম বিচারে বস্তুত অপার আলোর আশকারাবাহী চিঠি একেকটা, বাদবাকি বৃথা মাশ্টারি।

উপরোক্ত সমগ্র রচনার কতিপয় ন্যারেটিভস ও তাদের সার্কাম্সটেন্সেস, বহুদূরবর্তী কোনো কালের কন্সিক্যুয়েন্সেস, কন্সিডারেশনে রেখে এই চিঠিনিঃশেষিত ফুর্তিবিস্রস্ত গ্রহের এককোণে একখানি কিতাবের নাম থুয়ে যাই; কবিতাকিতাব, নাম তার কালিকাপ্রসাদে গেলে আমি যা যা দেখতে পাবো;— বিষণ্নমগন কোনো সন্ধ্যায়, ওয়্যর্কোহলিক দিনের শেষে, কেউ হয়তো পড়তে চাইবে সেইখানে-ফুটে-থাকা চিঠিগুলি  নামের সেই কবিতাটি অন্তত — “নিস্তরঙ্গ ঘুমের ভিতর চিঠি-লেখার দিনগুলি ফুরায়ে গেলে আবার, মৃদু পায়ে কারা উঠে আসে? / ডাকঘরের বাক্স থেকে ঘরে ঘরে বিলীয়মান শব্দে, আবারো মুছে যায়; / অস্ফুট আলো আসে জানালা দিয়ে, শীতের নরোম দিন, বানর নাচছে সকালে”… এইসব লাইনঘাটের সেই কবিতাটা, যার শেষে এমন অনুরোধভরা শান্ত বিষাদ : “পোস্টকার্ড পাঠাও আরো, সম্ভব হলে; / চিঠি লিখার দিনগুলি শেষ হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত”… যেন ভিনসেন্টের লেটার টু থিও। অথবা “আমাকে তুমি ঘুম করে কাছে নিয়ে গেছো” ও “তোমার অভিযোগগুলি তুমি চিঠি করে লিখে জানাতে পারো” পঙক্তিঋদ্ধ কবিতাটা তো একই কিতাবের অন্তর্ভূত। গুমখুনের এই মৃত্যুউপত্যকায়, প্রিয় হে পরমন্তপ, ঘুম করি নিয়া যাও মোরে তব হৃদয়ের কাছে। এবং “গাঢ় সেন্টের গন্ধ-মাখা তোমার রুমাল, পোস্টম্যান দিয়ে গেলো / কি লিখবো এর উত্তর?; ‘আর কবিতা না, / তুমি লিখ অনেক দীর্ঘ, দি-ই-র-ঘ আমার চিঠি’ / প্রত্যাভিক্ষা তোমার!” বলো তবে, হে রহস্যমঞ্জুষা, আমি কোথা যাই, কারে যায়া জিগাই, ওগো, পত্রার্পিত ওই দিনগুলো ছোঁ মেরে নিয়ে গেল ছিঁড়ে কোথাকার কোন চিলে? এখন লোকে খালি কবিতাই লিখিয়া যায় বেদম, পত্রমর্মর নাই, ডিস্কোর্স খালি, ডিস্কোড্যান্সার নানাবিধ কসরতের — ভাষার, দর্শনের, বিবমিষার। পোস্টম্যান নাই, দিকে দিকে কবি আর কবি, ইতলবিতল কথাদৃশ্যের ফটোগ্র্যাফার খালি। কিন্তু কবি কারে কয়, বেহুদা এই জিগানো, এর একটা উত্তর যেমন পুরনো মধুতে মেলে, তেমনি নতুন ইমরুলেও। কবি, যে-জন শবদে শবদে বিবাহের পুরোতগিরি করেন — মধু উবাচ। পরন্তু ইমরুলে এসে ভ্যাবাচ্যাকা খাই, তিনি বলে বসেন কবি এক ‘শুয়ে-থাকা মুহ্যমান’ প্রাণ, বলেন কিনা ‘কবি, যে কুটবুদ্ধি-বিকল’ — বর্দাশ্ত করা যায়! কেননা আমরা তো কবিকে দেখতে পাই সিআইএ-কেজিবি অ্যাজেন্টের ভূমিকায় আমাদের শহরের চাদোকান আর মদমণ্ডপগুলোতে কেয়ারফ্রি কীর্তনের সঙ হয়ে ব্যস্ত চলাফেরা করেন, বন্ধুর পিঠে অ্যাম্বুশপূর্বক নিশানা তাক করেন সাইলেন্সার পিস্টলের, তবু কেন কবিকে হেন অক্রিয় ভাববেন ইমরুল! নট ফেয়ার অ্যাট অল, ড্যুড! কুটবুদ্ধিবিকল বলতে কবি কি বুঝাইতে চাহিলেন, আমরা আপত্তি উত্থাপন করিনু। অব্জেকশন সাস্টেইন্ড। কূটবুদ্ধির সনে পেরে-না-ওঠা ত্রাহিচিৎকৃত কোনো ভিক্টিম, অথবা কবি স্বয়ং মহাভারতের মামু শকুনি, যিনি কিনা দ্যূতক্রীড়াচ্যাম্পিয়ন, কূটকচালিতে যেন পদ্মবনে হস্তির মতো মত্ত, কোন অর্থে ইমরুল কূটবুদ্ধিবিকল প্রয়োগ করলেন কবি ডিফাইন করতে যেয়ে — হেন প্রশ্নে জাতি আজি জর্জরিত। তবে দ্ব্যর্থক পঙক্তিবিন্যাস ইমরুলের হাতের টোকা বা আঙুলের তুড়ি মাত্র; আর কে হেন বুর্বাক যে জানে না দ্ব্যর্থকতা কবিতার ভিত্তিশর্তগুলোর অন্যতম! ইমরুলকবিতার লাইনে লাইনে দ্ব্যর্থকতা পাওয়া যায়। এই দ্ব্যর্থকতা সাম্প্রতিক অগ্রন্থিত ইমরুলকবিতায় ঢের পরিমাণে বৈচিত্র্যবিভোর, অনেকার্থময়। এই কথাটা প্রমাণসাপেক্ষ যদি, ইমরুল হাসান হইতে তাহা আয়াস ব্যতীত প্রমাণসাধ্যও বটে। এজলাস বসানো বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের ফোকাস নয় আপাতত।

শুভ মহরৎ হয়, ইমরুল হাসানের, ঋতুচিহ্নগুলি  দিয়া। কাজীর দেশে, জীবনদাশের দেশে, ট্যাগোরের দেশে ডেব্যু হো তো অ্যায়সা! স্বাগত সম্ভাষিত হচ্ছি ইমরুল হাসানের হেন স্বগত কবিতা-বিভাব মারফৎ : “মনে হয় বহুদিন পর, জেগে উঠতে চেয়েছি আজ, চারপাশে বৃত্তের মতো এত ঘুর্ণায়মান” … এবং এইসব “ভেবে ভয় হয়” তার, “ঘুমের মতো তবু ভয় হয়, মৃত্যুর মতো আনন্দ হয়” … আর “কেবলই ইচ্ছে হয় চুপচাপ বসে থাকবার” … আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের ’পর … অনুরূপ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গমুহূর্তে ইমরুল অতি মৃদু গলায় নিচ্ছেন নিজের ভবিতব্য বলে : “ঋতুনির্ভর সবকিছুতে, হয়তো পরিবর্তন এসে যাবে” — এসেছেও, পরিবর্তন, পরপর পাঁচটা কাব্যবইতে। যেমন অনাড়ম্বর অনুচ্চার অথচ গভীর তাৎপর্যবহ পরিবর্তন সূচিত হয় বছর-বছর ঋতুনির্ভর শরীরী অস্তিত্বে আমাদের। লক্ষণীয়, অভিষেকবেলাতেই ইমরুলের কবিতায় কিছু ছোট ছোট অনুষঙ্গ উপস্থিত যা-সব পরবর্তীকালে তার কবিতার পরিচয়তিল ও সনাক্তিকারক জড়ুল হয়ে উঠবে। যেমন ভ্রমণ  কবিতাটা, যেখানে এমন স্বচ্ছজলা লাইনগুলো সুলভ : “কৃষ্ণনগরে যে থাকত তার নাম রাধা। সেই এক পালের নৌকা। তরতর মাঝি। আমরা যে যাচ্ছিলাম তার প্রমাণ ছিল বাতাস। শোঁ শোঁ আর্তচিৎকারের মতো, উৎসবের মতো, একান্তই বিরহের। … লেবুঝোপের পাশে চাঁদ, উড়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো, আমাকে দেখে;” … এবং, লক্ষণীয়, পরবর্তী দিনগুলোতে ইমরুলের কবিতায় ভ্রমণানুষঙ্গ ও ভ্রমণআবহ, পরিব্রাজনধর্ম ও পর্যটনশীলতা আলাদাভাবে নয়নাভিরাম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াবে, একসময় ইমরুল অন্য অনেক সমাদরযোগ্য বৈভবের পাশাপাশি নির্দ্বিধ প্রতিষ্ঠা পাবেন ভ্রমণগৌতম কবির পরিচয়ে। এই বিচরণবৈশিষ্ট্য নহে জেটপ্লেনের গতিদীর্ণ গর্জনশীলা ব্যাপার, এ যেন বৌদ্ধভিক্ষুর নম্রপদ প্রাজ্ঞ হণ্টন, শ্রমণের ব্রতসমাহিত স্কন্ধ অল্প ঝুঁকায়া আরণ্য বিহার। স্মিতমুখ, স্বতঃশ্চল, অন্তর্লীন।

কথার কায়দা দ্যাখো, শুনে কেউ মনে করতে পারেন ইমরুল বুঝিবা সাধুসন্ত শাকাহারী! নির্বাণ ছাড়া আর কিছুতেই কিছু বোঝানো যায় না তারে, এবং তিনি নির্বাণপ্রচারক কবি এক, খুব দর্শন কপচান কবিতায় — একদম ডাহা অন্যায় হেন প্রোমোশন্যাল ক্যাম্পেইন, ইমরুলকবিতা এসবের উল্টোদিকে এবং অঘটনঘটনপটু তথা ডাইভার্সিফায়েড। উয়্যার্ড কোনো স্তবক ইমরুল হাসানের কবিতাসমগ্রে মেলে না, মার্বেলসদৃশ ঝলমলে মিষ্টি দুষ্টুমি কিন্তু দুর্নিরীক্ষ্য নয় তা-বলে। আমাদের রাশোমন গল্প  লেখেন যিনি, তিনিই লিখতে প্রেজুডিস বোধ করেন না “একটা সোনম কাপুর বসে আছে / ঠোঁট বাঁকাচ্ছে, চুলে হাত দিচ্ছে… / পিজাতে কামড় দিয়া ঘোরাচ্ছে চোখ” প্রভৃতি দৃশ্যাণু। ওহো, সোনম, বাহারা বাহারা হুয়া দিল্ পেহলি বারে মে … ক্যায়া বাত, গুরু! মোদ্দা কথাটা হলো, গডজিলা ভাবের কবি ইমরুল হাসান নন, হইতে চানও না। গানের পাখিই তো, “শচিন-কর্তা গাইলেন, / মুগ্ধ হয়া শুনলেন যিনি, তিনি পাখি / পাখি কখন জানি উড়ে যায়!” বিন্দু, যদিও, প্রকৃত প্রস্তাবে সিন্ধুরই সিম্যুল্যাশন। অন্যত্র, দৈনিক পত্রিকায় : “দিন শেষ তাই / দিনের পত্রিকা তুলে রাখি / দেয়ালের পাশে স্তুপ জমে যাচ্ছে ক্রমশ” — সেইটাই তো, অগত্যা, মানবজন্মবাস্তবতা অথবা বাস্তবতার অনন্যোপায়-অনুচ্চার কাউন্টডাউন। তবে এগুলো কোনোমতেই ইমরুল হাসানের কবিতাজাগতিক প্রতিনিধিস্থানীয় নয়, কিন্তু মুহূর্তমঞ্জুরি হিশেবে এগুলোতেও যে কম মণীষামাহাত্ম্য নেই তা স্বীকার করা যাক। প্রসঙ্গত লাগসই ভেবে একটা লাইন, ইমরুলেরই, এইখানে লাগাই : “আসলে আমরা তো সবসময় অভ্যাস করি / রিপ্রেজেন্ট করার অধিকার” — ভালো হোক আর মন্দ হোক, প্রতিনিধিত্বশীলতার হেন অনুশীলন অনেকটা আমাদের ললাটেরই লিখন করে নিয়েছি যেন, ইমরুল এই কথাটা আমাদেরে মনে করায়ে দেন ছত্রে ছত্রে। এমনি রিপ্রেজেন্টেশন খুব নিরীহ মনে হলেও, দুনিয়ার এনজিওবাজরা তো ইভেন টোকেনিজমকেও শাস্ত্রীয় শেইপ দিয়ে সেরেছে, রিপ্রেজেন্টেশনের রাজনীতিটা কিন্তু ভুবনব্যাপ্ত ও মারাত্মক। কল্পনা চাকমার স্মরণে ইমরুল হাসানের ভ্রমণবেদ ও বেদনা রাঙামাটি  রিড-আউট করতে যেয়ে এই কথাটা মনে হয়েছে বারবার। কল্পনা নিখোঁজ হলেন, নিখোঁজ রইলেন, কল্পনাপার্বত্য অঞ্চলটুকুর খোঁজ কী আমাদের কাহিনিতে কবিতায় আজও পাওয়া যায়? ইমরুল কী দিতে পেরেছেন গল্পগাছার স্যানাটোরিয়্যম কি স্যাংচ্যুয়্যরির চুক্তিপিসফ্যুল পার্বত্যাঞ্চলের হদিস? স্বকপোলকল্পিত তেন খোঁজ ইমরুল দিতেও চান নাই মনে হয়, তিনি যা দিতে চেয়েছেন তা ভালোই দিয়েছেন, এইখানেই ইমরুল পলিটিক্যালি কারেক্ট অর ইনকারেক্ট তা জিগানোও হয়ে যায় বাহুল্য ও অহেতু উটকো প্রসঙ্গ। ধূসর ও ঝাপসা হয়ে চলেছে দিন-কে-দিন এই অঞ্চলগুলো, গোটা দুনিয়া জুড়েই নৃগোষ্ঠী/জনজাতিগুলো যথা অ্যামেরিকান রেড ইন্ডিয়ান থেকে শুরু করে সিলেটি পাত্র জনসম্প্রদায়, যদিও তাদিগেরে রিপ্রেজেন্ট করার অধিকার আমরা বহাল রেখেছি এবং শনৈ শনৈ এক্সটেন্ড করে চলেছি রেইঞ্জ অ্যান্ড অ্যারিয়া অফ রিপ্রেজেন্টেশন। ইমরুলের এই কবিতাপ্রবাহের পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের কথাটা মানস চৌধুরী বিস্তার সহ বলেছেন বইয়ের এপিলোগ অংশে। রাঙামাটির পাতা ধরে এগোতে এগোতে এহেন প্রশ্ন উঁকি মারে মনে : রাঙামাটি রয়েছে কী রাঙামাটিতেই!

কে ভালো কবি আর কে খারাপ কবি, এতদবিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা আদৌ সম্ভব নয়, ইন দিস রিগার্ড সেইভাবে স্ট্রেইটলাইন টানা ডিফিকাল্ট। তবে ভালো কবি বিষয়ে একটা ধারণা সকলেরই থাকে, এবং ধর্মেরই ন্যায় ধারণাটা যার যার তার তার। আমারও, বলা বাহুল্য, রয়েছে। তবে কিনা আমার ভালো কবি বিষয়ক ধারণাটা যত স্ট্রং, খারাপ কবি বিষয়ক বুঝসমুজ ততই দুর্বল ও ভঙ্গুর। ভালো কবি, তথা ভালো কবিতা, আমাকে যেভাবেই হোক আমার অতীত তথা আমার যাপিত তথা কাটায়া-আসা জীবনের সঙ্গে যুক্ত করিয়ে দেয়। এদিকে খারাপ কবি তথা বাজেকাব্য সবসময় আমাকে ব্ল্যাকহোল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়, হেরি সর্ষেপুষ্প দু-নয়নে, মনে মনে ভাবি, মাবুদে এলাহি হে, এইবার কবিতাপাঠ বুঝি ত্যাজিতেই হইবে! কেননা শাস্তর পাঠকরতঃ কবিতা পাঠোদ্ধারের বিলাস তো আমার লাগিয়া হাইলি এক্সপেন্সিভ! কথাটা আপাতত এ-ই যে, ইমরুল হাসান আমার কন্সেপ্চুয়াল ক্ল্যারিটি অনুসারে একজন ভালো কবি, কেননা আমাকে তিনি আমার অর্জিত অভিজ্ঞতার সনে নানা ছুতোনাতায় রিলেভ্যান্ট ও রিলেটেড করে দেন। উদাহরণ উত্তোলন করছি না, তাতে ব্যাপক পরিসর লাগবে এবং স্বতন্ত্র বৈঠক দরকার পড়বে। অ্যানিওয়ে, একটা মজা বিনিময় করা যাক এই ফাঁকে। তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই  গ্রন্থিকার পয়লাই ক্রসফায়ার  কবিতাটা পড়ে একজন কবির একটা কাব্যগ্রন্থের নাম মনে পড়ে যায়, একযুগ আগের সেই পুস্তিকা কাব্যটির নাম ওরা আমারে ঘিরিয়া ঘিরিয়া নাচে আর গুলি করে, কবি আহমেদ নকীব। বহু-বহুকাল ব্যাঙনিদ্রার পরে আমি সেকেলে লিটলম্যাগাজিনগুলো ঘেঁটে বের করতে চাইলাম নকীবের কবিতার সঙ্গে ইমরুলের কবিতার মিল। পারলাম না। কাজল শাহনেওয়াজের রহস্যরেঞ্চ হাতে নিয়া খানিক ট্রাই করলাম, অসার চেষ্টা, ব্যর্থ হইলাম। তবে সরাসরি না-হইলেও খুব আবছা প্রায়-বুজে-যাওয়া প্লাইস্টোসিন পিরিয়ডের একটা ট্রেইল যেন খুব নিরখিলে ফাইন্ডাউট করা যায়, যে-ট্রেইলটার মূল ব্যাপার ছিল কবিতার গা থেকে অর্নামেন্টস খসানোর, কবিতাকে সো-ফার নিরলঙ্কার করে তোলবার, রহস্য খোলার রেঞ্চ   আর আমার শ্বাসমূল   প্রভৃতি দিয়া কাজল শাহনেওয়াজ প্রমুখ জনাকয় সেই ইনিশিয়্যাটিভ নিয়েছিলেন। তবে সেই সময়ে কাজলের দিনরাত্রির বন্ধুরা আবার ইন্ডিয়ান বাংলা কবিতা তথা ডাইরেক্ট-অ্যাকশনে উৎপল-মৃদুল-রণজিৎ-বিনয় এবং অনেক স্পেসিফিক্যালি জয় থেকে চোথা মেরে চলেছিলেন। দুঃস্বপ্ন ঘুচেছে, এইবেলা, যা-হোক। তথাস্তু!

আশ্চর্য কবিতা এক, মন তুমি করো মনোনিবেশ, আ! “যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছি, / এসে কৃষিকাজে করেছি মনোনিবেশ” … আ! তারপর? “কিছুদিন কেটে গেল এই করে / ভাবছি পালানোর সময় এল, আবারো” … তবু কদ্দুর-আর পালাতে পারে মানুষ, বস্তুদুনিয়ায়, বলো? “যুদ্ধ থেকে পালাবো / কৃষিকাজ থেকে পালাবো / সবকিছু থেকে সরিয়ে নিবো নিজেকে” … এরপর তুমি বাপু যাইবাটা কোথা? আ! ব্বাস তু ভাগ মিলখা … না, না, … আব তু জাগ মিলখা … কারণ পলায়ন কোনো পথ হতে পারে না, মায়েস্ত্রো, ওয়ে মিলখা সিং! যে পালায়, ইন-ফ্যাক্ট, সে-ই তো ফেরে। দেখিয়াছি ঢের লড়কে-লেঙ্গেওয়ালাদেরে, তেরোইঞ্চি বিচির ভিতর হইতে তেষট্টিহস্ত ভুঁড়িয়াল বুজরুক হইয়া বাইরাইতে। দেখা আছে, হে, ঢের দেখা আছে! এ-জীবনে মিলখাদের আইডি একটাই তো — “যো দৌড়াতা”। রাকেশ মেহরা বলুন আর ইমরুল হাসান বলুন, গল্পকার বা নির্মাতা যে-ই হোন, বাগি মিলখা বা পান সিং টোমার, গল্প তো বদলাতে পারেন না। খালি যে সামনের দিকেই যায়, যে কেবল দৌড় জিতেই যায়, সে তো বড়জোর খোদার খাসি কিংবা ষাঁড়, আখ্যানের প্রোট্যাগোনিস্ট হইবার মকদুর তো নাই তার, ইমরুল হাসান বা রাকেশ মেহরা বা তিগমাংশু ঢুলিয়ার প্রোডাকশন তো কোনো সম্রাট বা ভাঁড়ের বীরগাথা না। কারণ দৌড় তো সকলেই কোনো-না-কোনো উপায়ে জেতে কিংবা হারে, কিন্তু ফিনিশিং লাইনে যেয়ে সেই মিলখার দুইহাত পেছনে রেখে জেতার দৃশ্য, মোহনীয় মহত্তর পিছুটান সেই, জিতি যদি তো সবাইকে সঙ্গে নিয়াই জিতিবারে চাই, একা আমি বীর হইতে না-চাহিনু ভাই, বিভিষীকা সারাজীবনের উন্নিদ্র অভিশাপ, সবকিছু ভুলে যেয়েও কিচ্ছুটি ভুলে-না-যাওয়া, আক্রোশহীন অসহায় নিয়তিনিঃসীম সেই তাড়া … ভালোবাসা, ধুলো আর কাদা … কাঁদতে নেই জেনেও তবু গোঙানিহীন কাঁদা … আ! আবারও, সোনম কাপুর, বিরু! ‘উয়ো নুর কা ঝরনা হ্যায় / ম্যায় পিয়াস পুরানি … ইশক করো ইয়া করো ইবাদাত’ … গলায় তোলো ঝুম কাওয়ালি দিওয়ানা সেই জিকির … ‘আলিফ আল্লা, আলিফ আল্লা, আলিফ আল্লাহু’ … ভুলিয়া যেয়ো মোরে, বিরু, ম্যায় মিলখা সিং! “যদি না-জিততে পারো তো জিতো না, কিন্তু তুমি হেরেও যেয়ো না তা বলে।” — এই লাইন দিয়ে শয়নযান  শুরু করেছিলেন ভাস্কর চক্রবর্তী। ইমরুল প্রোক্ত কবিতা বা ম্যুভিটা শেষ করছেন, য়্যু সি, এইভাবে : “আসলে নিজ বলে তো কিছু নাই / যুদ্ধ আর কৃষিকাজ পড়ে আছে।” এইসব মনে পড়ে। এবং মনে পড়ে, একই কবিতার সমগোত্রীয় এক-ঔর শের কিয়দ্দুর পর : “আমার পালানোর পথে তুমি কাঁটা বিছায়ে রাখো” … তো, জো আছে পালাবার আমার! ওগো, নুর-কা-ঝরনা, তোমার কাছ থিকা! আমার মাতৃপুষ্প জবা! কাজ নাই বৃথা বাঁচতে চেয়ে, য পলায়তি স জীবতি ইত্যাদি শ্লোক আমার জন্য নয়, আমি বরং “তোমার মুখের পানে চেয়ে / তোমার মুখ থেকে যেই হাসি ঝরে গেছে / তার স্মৃতি মনে করে / লিখি আমি একটা কবিতাই না-হয়।” — সেইটাই ভালো হবে। এইখানেই তো গোর ও ক্রোড় দুইটাই আমার লভিতে হইবে, কেননা “আমি ও অনন্তকাল এইখানে পরস্পর বিস্ময়ে বিঁধে আছি।” কিন্তু বন্ধুত্বের এক জবর-আজব সময় এটা, আলবৎ, জব্বর বন্ধুবৎসল সময়! নেহি ইয়ার, চিঠিফিটি দিয়ো না খামাখা, টাইম নাই দোস্তো, কমেন্টবক্সে যায়া বলো যা-কিছু বলার, না-পারো তো লাইক দাও মোরে যত পারো তত, টাইম কিল কোরো না হুদাই, বিপরীতযৌবনা হইলে অবশ্য সাইমাল্টেইনিয়াসলি ইনবক্সিং চলবার পারে, সে তুমি হও উদ্ভিন্না বা অনুদ্ভিন্না, কাৎলাহার বিলের রোহিতমৎস্যগন্ধা বা স্টেনগান-হাতে মিলি কিংবা কাবুলিওয়ালার মিনি, উইল ডু, চলবে। “অনেক কমলো বন্ধু, হৃদয়ের ক্ষোভ / তোমাদের কাছে বসে থেকে থেকে / কথা শুনে শুনে তোমাদের / ভোলা গেল নিজের সংকীর্ণতা” … মারাত্মক! বন্ধু কমলো, তোমাদের সংলগ্ন হয়ে, হৃদয়ের ক্ষোভ কমলো, তওবা কাটলাম “আর যাব না ঠাকুরবাড়ি / আমার রাধার নাই রে শাড়ি” — কফিলসংগীত গেয়ে, এবং মোস্ট ইম্পোর্ট্যান্ট থিং যেইটা হলো, তোমাদের কদাচার দেখে আমি নিজের কদাচারগুলোরে বেশ গ্লোরিফাই করিতে শিখলাম। হ্যাটস্ অফ!

ইমরুল হাসানের কবিতা যেন “উল্টানো নৌকার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা”, তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই  পিঠমলাটে যেমনটা বলা হয়েছে, “একটা রহস্যময় স্পষ্ট অবলোকন”, কথাগুলোর অন্তর্নিহিত দাবি ভিত্তিহীন নয়। একইসঙ্গে রহস্যময় ও স্পষ্ট — রহস্যময় হয়েও স্পষ্টাক্ষর, অথবা আলোর মতন স্পষ্ট হয়েও রহস্যময় — বৈশিষ্ট্যই বলা যায় এই কবির কাজের। ধরা-অধরার মাঝামাঝি, কিংবা ছাড়া-ধরা বা সরমা-পরমা প্রভৃতির উর্ধ্বে, বিরাজ করে ইমরুলের কবিতা। উল্টানো নৌকার মেটাফর তো খুবই লাগসই এক্ষেত্রে। এই উল্টানো বোটের উল্লেখে মনে পড়বে ডেভিড কপারফিল্ডের মুখ। হুইচ ওয়ান? চার্লস ডিকেন্সের সেই উপন্যাসে চিত্রায়িত কিশোর, নাকি সেই অ্যামেরিক্যান ম্যাজিশিয়ান? দুইজনেই নয় কেন? বটে! “এই কবিতাগুলি বাজারের ভিতর দিয়া মানুষ দেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করছে”, হ্যাঁ, বাক্যাংশস্থ ক্রিয়াপদের কালনির্দেশ লক্ষণীয়, ‘করছে’। এবং কবিতা তো বলা বাহুল্য অন-গোয়িং ইভেন্ট বা অ্যাক্টিভিটি, এভার চলিষ্ণু, নিয়ত করে চলেছেন কবি সেই কাজ।

এই পর্যায়ে একটুখানি ইমরুল হাসান মিসেলেনিয়াস। অথবা শাল-মহুয়ার বনে এসেছে কবিতা পড়ার প্রহর। বন্ধনীতে কে যেন বলে যায়, পুরানো সেই দিনের সামিনা চৌধুরীর জন্য কয়টা লাইক…! অতএব এখন মনোজ্ঞ বিচিত্রানুষ্ঠান, অথবা বিচিত্রানুচ্ছেদ। ইমরুল হাসানের অরণ্যস্থিত পঞ্চতরুর পত্রপল্লব ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই আলতো ও দৈবচয়িত। পড়ি : “হৃদয় আমাকে কাঁদায়, তোমার শহর ছেড়ে যেতে মনে হয় শৈশবকাল” … “এই যে এখন তোমাকে মনে পড়ে, ম্লান মুখের মতো তোমার … চোখগুলির মতো শান্ত হয়ে আছি; ভাবনায়, এত কাছে তোমাকে পেয়েছি যেন” … “কেমন প্রতিকল্প তুমি, আকাশেও আছো” … অভিষেকবেলার ঋতুচিহ্নগুলি  থেকে চয়িত হলো পঙক্তিনিচয় এতক্ষণ। “তোমার শীতপোশাকগুলি নেড়ে নেড়ে আমাকে দেখাচ্ছো / তোমার ভবিষ্যৎ দিন, আমি নাই, সেইখানেও” … পড়ি ইমরুলকাব্য দোসরা বালাম হইতে, সংক্ষেপে কালিকাপ্রসাদ  শিরোনাম, হ্যামলেট  নামীয় কবিতার প্রায়-পুরোটা : “যখন মঞ্চের ভিতর নেমে আসতেছে অন্ধকার / আর মানুষগুলা শুধু ছায়া ছাড়া আর কিছুই না, তখন / এই নির্বোধ পাঠ থিকা আমারে বাদ দাও / # / নিভে-যাওয়া চুলার ভিতর ফাঁপা ধোঁয়াও যে / তারও আছে শেষ হয়া যাওয়ার পূর্ণতা, বিরতি ও বিশ্রাম; / আমারেই বইলো না শুধু / দুর্গ-প্রাচীরে লেখা শোকলিপিগুলা পড়তে বারবার” … গ্রন্থে-ধৃত কবিতা লেখা  নামের একটা কবিতায় : অন্ধকারের ডানায় তোমারে উড়ে চলে যেতে দেখে / ফিরে যাবো; ঘরে বসে, টেবিল চেয়ারকে বলবো / ‘ক্ষমা করো, এই প্রবঞ্চনা, ভারবাহী মহিষের’ … ইমরুল হাসানের তৃতীয় পুস্তক থেকে মেমোরেবল কয়েকটা লাইন : “গাধা দিয়া হইতেছে হালচাষ / … তার পাশে / দৃশ্যের বোঝা টানতেছি / আমি আরেক গাধা” … আরেকটা কবিতায় : “আমাদের গরিমা সকল পদচ্ছাপে, / কথ্য-রীতি, ভাষার ভিতর / ফুলে-ফেঁপে উঠছে” … একটা কবিতা আছে পা ও পাজামা,  সেইখানে : “চিন্তা নাই, সকলই গড়িমসি / গড়াতে গড়াতে যাই / ফিরে আসি, টাল খেয়ে / ভাবি, নির্বাণ আরো কত দূর! / … / পাজামা ছাড়া / পা দুইখানাই আমার, স্পেয়ার হয়ে গেছে” … গ্রাম ও শহরের গল্প  কবিতার সূচনা ও অন্তিম পঙক্তি দুটি : “ঘিঞ্জি বস্তির শহরগুলি, আমি ভালোবাসি” ও “গ্রাম্যতাই আসলে শহরের রিয়েল অবসেশন” … মনে রেখে দেয়া গেল। অথবা, সাপোজ, সবিস্ময় এই জিজ্ঞাসা : “যারা নাই তারা আসলে কেমন?” — ভাবায় তো! পড়া হলো যে-অশ্বত্থ বটের কাছে এসে  এতক্ষণ, উহার শেষ রচনা : “আহ্, অশ্বত্থ / সকাল হয়ে এলে আমি কোথায় লুকাবো! / … / সকাল হয়ে এল, / আমি যাব কোনদিকে, প্রস্তুতিহীন” …। প্রতিদিনের কথাভিব্যক্তিগুলোকেও কেমন রহস্যবর্ণাঢ্য ও মর্মদ্রাবী করে তোলা যায়, এর একটা নজির লিপিবদ্ধ তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই  কিতাবের কবিতাবলিতে। দৈনন্দিনতাকে কেমন চিরকালীন সুরে ফেলে দেন ইমরুল, লক্ষণীয়, উল্টোটাও, শাশ্বত অধরারে এনে নামান চিরপরিচিতের দৈনন্দিন ধরণীতে। একটা কবিতা পাওয়া যায় এখানে, পোশাকের কান্না,  এর ভেতর অঙ্কিত বিপন্নতা ছুঁতে হলে এর পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতি/আবৃত্তি দরকার। গ্রন্থিকার নামকবিতায় এমন পঙক্তিধারা : “আমি লিখতে চাই আমার কবিতা তোমার কথাগুলি দিয়া / তোমার কথাগুলির ভিতর আমি বলতে চাই আমারই কথা / … / তোমার আত্মার ভিতর যে ফাঁকা / সেইখানে আমি বসে বসে / তোমার নীরবতা দেখতে চাই / … / শারীরিক হইতে চাই আরো / সর্বগ্রাসী শ্যাওলার মতো তোমার বাকলে / লেপ্টে থাকতে চাই” … কী মিস্টিরিয়াস সহুজে এই উচ্চারণ ধ্বনিত হইতে শুনি একটা কবিতায় : “কতদিন তোমারে দেখি না! / তোমারে না-দেখার ভিতর আমার আত্মা জমে যাচ্ছে!” একটা কবিতায় এই তিনটা লাইন চোখে গেঁথে গেল : “বারবার একটাই চক্রের ভিতর / ছোট্ট একটা ঢেউয়ের ভিতর / কম্পমান, ভাবনাগুলি” … কিংবা বর্ষাকাল  কবিতাটা : “অনেক সূর্যের দিন শেষ হলো। / এখন বর্ষাকাল” … অথবা বিরহের গান  যেমন : “একটা নারকেলপাতার মতোই দীর্ঘ ও করুণ—এই হাহাকার / বৃষ্টিশেষের বাতাসে দুলছে;” … এবং গ্রন্থিকার শেষের কবিতার আগের কবিতা নামহীন  : “দিনগুলি তোমাদের, শীতের শুরুতে পড়ে-থাকা পাতাগুলির মতো / কত কত নামহীন সত্তাহীন বস্তুজগতেরই ভ্রম” … লেট’স সি, কিছু টুকরাটাকরা লাইন্স, ফ্রম রাঙামাটি, ভিন্ন ভিন্ন কবিতা থেকে : “স্যাটায়ার মানে বেদনারূপ, মনোকষ্ট, / অব্যক্ততার।” … “যেখান থেকে শুরু / সেখানেই ফেলে আসছি সমস্ত প্রয়াণ।” … উদ্ধারকর্তা, ঝর্ণার কাছে, পেদা টিং টিং  প্রভৃতি কবিতার স্যাটায়ার, তথা বেদনারূপ, তথা মনোকষ্ট, তথা অব্যক্ততা আমাদের অন্তত অনুভবিতে বেগ পেতে হয় না। আর, কবির মনোজগতের হদিস পাওয়া ভার জেনেও, এইভাবে ভুলভাল করে হলেও কবির মনোজগতে ভ্রমণ করে আসার একটা মওকা আমরা পাই বৈকি।

লক্ষ না-করলেও চলে, তবু নজর টেনেছে হেতু লক্ষ করছি, জীবনানন্দ দাশ করকমলে উৎসর্গিত ইমরুল হাসানের কবিতার পয়লা বালাম ঋতুচিহ্নগুলি । পিছনপ্রচ্ছদে, ঋতুচিহ্নগ্রন্থিকার, ইমরুলের পয়েন্ট অফ ভিয়্যু থেকে কবি-কন্সেপ্টের সঙ্গে আমরা ওরিয়েন্টেড হতে পারছি, যিনি দুনিয়ার সব থুয়ে খাস করে কবিতার বেপারিগিরি করেন, তিনি আসলে কে, যেমন প্রচারিত যুগ যুগ ধরে হেন অভিজ্ঞান যে কবি হলেন অসম সাহসী যোদ্ধা আর ঐশ্বরিক শক্তিধর দ্রষ্টা, যেমন বলা হয় তিনি হো ভিন্না, গালগল্পের এমন কবিবাজারে ইমরুল যেভাবে স্বাভাবিকতায় কবিকে দেখতে চাইছেন, সেই চাওয়াটা, ইমরুলের সেই দেখাটা, অত্যন্ত মনোজ্ঞ ও বহুদিন মনে ধরে রাখার মতো। ফলে এখানে সেটা উৎকলনযোগ্য। নর্ম্যালি যাকে আমরা ব্লার্ব বলি, কিংবা গ্রন্থিক কবির তনুমনের প্রশস্তিবিম্বিত কবিপরিচায়ক ফ্ল্যাপ, সেইসব বিজ্ঞাপনাচারের পরিবর্তে ইমরুল হাসান তার যাত্রাপুস্তকের প্রস্থানভূমিতে যা করেছেন তা কাট-পেইস্ট মেরে দিচ্ছি এইখানে, এইটা আমাদের কারো কারো কাজে লাগবে : “একজন কবি বিশেষ একজন, এ কারণে নয় যে, তার গোপন একটা কিছু আছে, যা অন্য মানুষের নেই। প্রত্যেক মানুষেরই থাকে গোপন, গভীরতর কিছু অনুভূতি। একটি কবিতা বা একজন কবি এ কারণেই গ্রহণীয়, কারণ সে জানে এই বলবার পদ্ধতিটি; আর অন্য কেউ যখন তা পড়ে, উপলব্ধি করতে পারে তার অনুভূতির অংশকে; ভাবে, এও এক মহৎ সৃষ্টি। এই পৃথিবী, যেমন আমরা জানি, অথচ বলতে পারছি না। ভাবছি; ঈশ্বর, তুমি তো জানো। একজন কবি আবিষ্কার করেন অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের সত্তাটিকে, মানুষের ডানা আর দেবতার হাত দুটিকে।” এমন একটা ট্র্যান্সপ্যারেন্ট অবস্থানপত্র পেশ করে জেনেসিস যার, তার ফিউচার নিয়া সাস্পিশাস হওয়া আমাদের সাজে না। আজ্ঞে, সেইটাই।

মার্জিনে হেথা মন্তব্য লিখি একটা : গাবো, আই মিন, গার্সিয়া মার্কেজ যদি তাঁর অজস্রপঠিত ওই উপন্যাসটি লিখতে কয়েকটা বছর বেশি সময় নিতেন, তাইলে আমরা দেখতাম যে সেই কর্নেল বারান্দায় ইজিকেদারায় আধশুয়ে ফেসবুকে বেহুদা বাক্য ও ভূতকাঁচা বয়ানে একের-পর-এক নোট লিখে চলেছে! ভাগ্যিস, মার্কেজের আমলে ফেসবুক ছিল না। আজকাল আমার মনে হয়, চিঠিলিখনকালীন রিল্যাক্সড ও ক্যাজুয়াল ভঙ্গিটির লুপ্ত সুবিধা রিভাইভ করা সম্ভব নোটের মধ্য দিয়া। কারো কারো নোটরচনাকালীন ক্রিটিক্যাল ফ্যাকাল্টি খুব ভালো তৎপর থাকে দেখতে পাই, যেমন ইমরুল হাসানের, এবং উপভোগও করি আমি। কিন্তু বেশিরভাগের ক্ষেত্রে যে-ফ্যাকাল্টি ক্রিয়াশীল দেখা যায়, সেইটার নাম আমি জানি না, বিদ্যাবুদ্ধির অভাবে সেইটাকে সিউডো-ক্রিটিক্যাল স্টেইট নামে মার্ক করে রাখছি আপাতত। এই সিউডো-ক্রিটিক্যাল টেন্ডেন্সিটাই স্ট্রিম হিশেবে মেইন দেখতে পাই। কিন্তু ইতিহাসে ফেবুকমেন্ট থাকবে, অথবা ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা ও লাইকা থাকবে, নোট থাকবে না। হা হা হা…! হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড-এর একটা সিক্যুয়েল লেখার সময় এসে গেল, সম্ভাব্য নাম ‘অ্যা ডিকেড অফ ক্রাউড’ বা এইরকম কিছু হইতে পারে… অট্টহাস্য… আগে লিখলে আগে নোবেল পাইবেন ভিত্তিতে আসেন লিখতে শুরু করি… অট্টহাস্য পুনরায়… এই ভিড়ের জীবন উদযাপনের একটা রাস্তা খুঁজে চলেছি দিবারাতি… একা আমি তো নই, নিশ্চয় আরও অনেকেই, নিশ্চয়ই হে কবিতায়-আত্মহারা পাঠক আপনিও…

ভীষণ বিচ্ছিন্নতার বোধে তাড়িত-পীড়িত মানুষ চিঠির ভেতর খুঁজে পেত আশ্রয়, একদিন, নিত মধু ও মননের রস খুঁজে। আজ আর নেই তারা, নীল-নীল শামিয়ানার তলে শাদা পাতায় কৃষ্ণাকালো অক্ষরভরা চিঠিরা — হারায়ে গিয়াছে তারা হাওয়ায়, কালের কারসাজিতে। ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হয়েছে কি তাতে? হতো যদি, তবে তো সেই অবসরস্তব্ধ বুড়ো কর্নেলের মতো চিঠির প্রতীক্ষায় ভারাতুর হয়ে ব্যালকনিতে করুণ নৈঃসঙ্গ্যনীল বসে থাকবার কথা সকলের। খুঁজে পাওয়া যাবে তেমন একজনও কাউকে? নেই, একজনও তেমন, চিঠির প্রতীক্ষামাধুর্য কোত্থাও নেই আজ আর। নাকি কেউ কেউ…

কথা আর কিছু নয়, কথা হয়, দ্য ফ্যাক্ট ইজ, ইমরুল হাসান একজন কবি, সিনেমাআলোচক, পোলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট, আর্টঅ্যানিম্যাটর, ক্রিটিক ও নোটক। ঋতুচিহ্নগুলি  তার প্রথম কবিতাবই। রয়েছে আরও কবিতাবইয়ের মধ্যে কালিকাপ্রসাদে গেলে যা যা দেখতে পাবো, অশ্বত্থ বটের কাছে এসে, তোমার কথাগুলি আমি অনুবাদ করে দিতে চাই, রাঙামাটি   প্রভৃতি। কিন্তু ইমরুল হাসান কেমন কবি, মাপজোখ তথা ভাইটাল-স্ট্যাটিস্টিক্স কেমন, জিগাবেন না। টাইম লাগবে বলতে। এত টাইম সহসা করে উঠতে পারব না, আর ইচ্ছাও নাই নিজের অল্পবিদ্যা নিয়া হাতেনাতে ধৃত হইতে প্রকাশ্য বসুন্ধরাধামে। আর এত লম্বা জারি পিটানোর পরও যদি আখ্যানের কাণ্ড নিয়া আপনারা প্রশ্ন উত্থাপেন, তাইলে ক্যামনে হয়! ইমরুল হাসান ইজ নট ওনলি অ্যা কবি-চিন্তক-নোটক-ক্রিটিক, সেইসঙ্গে তিনি এক সর্বভূক ম্যুভি-ইটার, সর্বাগ্রাসী ব্যাখ্যাকার। নিজের প্রাত্যহিক দেখাশোনাজানাবোঝা তিনি ইন্টারপ্রেট করতে পারেন অনন্য একটা কায়দায়। ইউনিক সেই কায়দায় চিন্তার প্রচুর জাম্প-কাট থাকে, উল্লম্ফন থাকে যতটা-না বাক্যের তারচেয়ে বেশি ভাবনার, ফলে স্পেস পাওয়া যায় উদ্ভাবনার। পাঠককে এই ডিগ্নিটিটুকু দেন তিনি, জায়গাটা রাখেন পাঠক-পার্টেইকিঙের, তার গদ্যে। সেইটা তার গদ্যের গদ্যে যেমন, তদ্রুপ কবিতারও গদ্যে। হ্যাঁ, কে না-জানে যে, কবিতাতেও গদ্য থাকে। এবং অন্তঃস্রোতা এই গদ্যের কারণেই ছড়া বা পদ্য থেকে একটা কবিতা সিগ্নিফিক্যান্টলি ডিফ্রেন্ট হয়ে ওঠে। এবং এসবের ফলে একপ্রকার অবস্কিউরিটি, কাইন্ড-অ্যা অ্যাম্বিগ্যুয়িটি, হয়তো তৈয়ার হয় লেখায় তার, ইমরুল হাসানের, বিশেষত গদ্যশরীরে, অ্যাজ অ্যা রেজাল্ট ইমরুলের গদ্যে পাঠকের কোয়ালিটি পার্টিসিপেশন অনেকগুণে বেড়ে যায় বলেই ধারণা করি। রিসেন্ট অনেকেই লিখতে লেগে, দেখতে পাই, এমনধারা কায়দাকানুন এস্তেমাল করেন লেখায় যেন তারা সাবভার্সিভ লেখার নিশানবর্দার। কিন্তু গোলমালটা হলো, মোস্টলি সেইসব লেখা না-হয় সাবভার্সিভ, না ডিস্কার্সিভ। একটা এন্টার্টেইনিং ইম্প্রেশন নিয়ে সেসব লেখা পড়ে বেরিয়ে আসে পাঠক, এরচেয়ে বেশি কিছু না। ফান আর ফান, সবই যেন দুনিয়াজোড়া আলপিন আইটেম, সবাই আমরা শ্যাম-রাধা ফানরাজ্যের একেকজনা ভাস্কো-দা-গামা। বারোমাসী বিনোদিনী পিরিতির লাগিয়া আদৌ টপফেব্রিট হবার কথা না, তা ডন জুয়ান হইলে এন্টার্টেইনমেন্ট মুখ্য হতেও পারে কারো কাছে। অ্যানিওয়ে, ঠিক বলতে পারছি না আমি এরচেয়ে বেশি। কিন্তু একটা জিনিশ আমি ক্লিয়ার, যে, লেখার সাবভার্সিভিটি কিংবা সাবভার্সিভনেস বাক্যস্থ নয় বরঞ্চ থাকে ভাবনাস্থ। খুনোখুনি-রক্তারক্তি ইত্যাদি মায়াবী নৃশংসতা ভাবনায় না-ঘটিয়ে বাক্যে নিয়ে এলে একটা ফার্স ক্রিয়েট হয় কেবল। সাবভার্সিভিটি সিন্ট্যাক্সে নয় রেদার চিন্তায় থাকতে হয়। এইটার স্কার্সিটি দেখি ইদানীংকার লেখাদিতে, এই চিন্তার ক্যু ভাঙার স্কার্সিটি। কিন্তু প্রিটেন্ড করেন অনেকেই যে, মেট্রোসিটির অলিতে গলিতে বসে তারা খালি চিন্তাক্রমের বেড়া ভাঙছেন ইয়া-আলি চিৎকারে, দিবারাতি চিন্তাদেয়ালে গাঁইতি-শাবল চালিয়ে যাইছেন। উপরে উপরে মনে হবে তা-ই, কিন্তু তলিয়ে দেখলে কেবল ভঙ্গি ও ভান, কেবল এন্টার্টেইনিং এফোর্ট ও গোপীবল্লভী ইনিশিয়েটিভ। তো কী! কৃষ্ণ-রাই বিনোদন তো খারাপ না নিশ্চয়ই! নো, খারাপ না ভালো—কথা সেইটা না, কথা হচ্ছে একটা পার্টিক্যুলার দাবি ও প্রবণতা নিয়া। যা-হোক, কয়েকজনের লেখায় দেখতে পাই ভঙ্গি ও ভাবের সঙ্গতিবিধান। পরে এই নিয়া আরও সবিস্তার ভাবা যাবে। ইমরুল হাসান গদ্য লেখেন, কবিতাতেও এই গদ্যের সুশীলিত ছায়াপাত ঘটে তার হাতে, ঝড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার সঙ্গতি সাধনের একটা চেষ্টা থাকে তার গদ্যে। এইরকম মনে হয়েছে আমার। আর আমার ওপর আস্থা রাখার যৌক্তিক কোনো কারণ আপনি খুঁজে পাবেন কি পাবেন না তা আপনার মামলা, আমার দয়াময়ীও আমারে ট্রাস্টওয়ার্দি মনে করেন না, এই আফসোসধ্বনি আমি কোথা রাখি জায়গা নাহি পাই। কিন্তু এ-ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ হতে পেরেছি যে, এবং হয়েছি যথাকালেই, ইমরুল হাসান কবি।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য নয়, কিন্তু তবু লক্ষ করি :

নিবন্ধটা পার্ট বাই পার্ট নোটের আকারে ফেইসবুকে দুইহাজারতেরোয় লেখা। তারপর চোদ্দয় একত্রিত ফর্মে এই শিরোনামের ব্যানারে এইটা ‘লাল জীপের ডায়েরী’ সাইটে পাব্লিশ হয় আলোচ্য কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’ (লালজীপ সিলেকশন) পোস্টের জোড় হিশেবে। এই নিবন্ধের জন্মেতিহাস বলতে এইটুকুই। বিজয় আহমেদ ও অর্পণ দেব তাড়া না দিলে এই নিবন্ধটি বিলম্বিত হতো। অনির্দিষ্ট হতো। ওইসময় ‘লাল জীপের ডায়েরী’-র মধ্যে একটা ভালো  ও নতুনতর রচনা ভালো ও নতুনতর কবি চিত্রশিল্পী ভাস্কর গল্পকার আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা ছিল। পরে অ্যাস্পিরেশনটা আর-কোথাও ওইভাবে দেখা যায় নাই। অব্যবহিত পরের বছর থেকেই বোধহয়, চাইর পাঁচ বছর চলার পরে একটা সময়, লালজীপ সঞ্চালনা ব্যাহত হয়ে যায়। সাইটটা আর্কাইভ হিশেবে ওয়ার্ডপ্রেসে দেখে নেয়া যায়, চাইলে। এখনও তরতাজা লাগে দেখতে। অ্যানিওয়ে। এই নিবন্ধ প্রথমবার প্রকাশের একযুগপূর্তিকালে এর অ্যাভ্যাইল্যাবিলিটি রিনিউ করে নিচ্ছি শুধু। উল্লেখ করার মতো কোনো পরিবর্ধন পরিসৃজন করা ছাড়া টাইপোগুলো শুধরে নেয়া যাচ্ছে। এর বাইরে তেমন কিছু করার ছিলও না। কারণ, পরবর্তী একদশকে এই নিবন্ধের উপজীব্য কবি বিব্লিয়োগ্রাফির বিবেচনায় যেমন তেমনি ইন্টার্নাল পোয়েটিক এফিশিয়েন্সির দিক থেকেও অনেক ইভোলভ করেছেন। সত্যি বলতে, শেষের দশকটায় ইমরুল হাসানের কবিতা আরও অভূতপূর্ব অনেক উপাদানে এনরিচ করেছে। এই নিবন্ধ গোড়া থেকেই ভিন্ন হবে, এখন লিখলে। যেভাবে এই নিবন্ধ গড়িয়েছে, কেবলই চিঠির ছুতা ধরে, সে-সময় পর্যন্ত কবির প্রকাশিত বইসংখ্যা পাঁচ, দুইহাজারপঁচিশ-ছাব্বিশে এসে শুধু কবিতাবইয়ের সংখ্যা প্রায় ষোলো, রয়েছে আরও ননফিকশন ও ফিকশন ছাড়াও তর্জমার বই, চিঠিযুগের পরের যতটা ভাষিক সংযোগকৌশল অ্যাপ্সযুগে এসেছে সেসবের এন্ট্রি ইমরুল হাসানের কবিতায় এসে যুক্ত হলেও বর্তমান নিবন্ধের আওতায় তা হাজির করার উপায় নাই। দ্বিসহস্রচব্বিশের ফেব্রুয়ারিতে এসে এই কবির ‘কালেক্টেড পোয়েমস’, কবিতাসংগ্রহ, প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে রয়েছে ষোলোটা কাব্যবইয়ের বাইরেও ‘বইয়ে না-রাখা কবিতা’, সব মিলায়া যার কলেবর ছয়শচব্বিশ পৃষ্ঠা। কাজেই, ইনিশিয়্যাল ইমরুল হাসান বিবেচনাবাহী নিবন্ধটি ঠিক আজকের কোনো বার্তা বহন করছে না, তা বারো বছর আগের, কবির উন্মেষকালের, হওয়া সত্ত্বেও জনসমক্ষে এর হাজিরা থাকা দরকার বলে মনে হয়েছে। সেহেতু পুনর্মুদ্রণের, ও পুনর্পাঠের, এই ব্যবস্থা।

পাঠসহায়ক হবে ভেবে এই নিবন্ধের আদিপ্রকাশকালে এর সঙ্গে যোজিত ইমরুল হাসানের নির্বাচিত কবিতা পোস্টটি লিঙ্কড রইল। সৌজন্য, বলা বাহুল্য, লাল জীপের ডায়েরী। ইন অ্যাডিশন, এই নিবন্ধের ফার্স্ট অ্যাপিয়্যার‍্যান্সটাও।

জাহেদ আহমদ

গানপারে ইমরুল হাসান

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you