কোনো এক কালে প্রবাসী লন্ডনির দান মসজিদ কমিটি গ্রহণ করত না। কারণ তাদের রেস্টোরেন্টে মদ বিক্রি হয়। মদের টাকায় তো আর মসজিদ হতে পারে না। তখনও সমাজে-ধর্মে নৈতিকতা ছিল। অন্যায় উপার্জন ভালো কাজে খরচ করলে অন্যায় উপার্জন হালাল হয়ে যায় না, এই বোধটুকু সমাজে উপস্থিত ছিল। মসজিদকে মনে করা হয় আল্লাহর ঘর, তাই তখন মসজিদগুলো তালাবিহীন থাকত দিনের বেশিরভাগ সময়। মুসাফিরের জন্য খোলা থাকত সারাদিন। কৈশোরের ছুটির দিনগুলোতে দুপুরের রোদে ঘেমে জলতৃষ্ণা মেটাতাম মসজিদের চাপকলে আর বিশ্রাম নিতাম বারান্দায়। এই দলে আমি সহ গুটিকয়েক অন্য ধর্মাবলম্বী থাকলেও মৌলানা সাহেব (আমরা বলতাম “মিয়াছাব”) কিছুই বলতেন না। তখন বিশ্বাস করা হতো, শিশুদের ধর্ম হয় না। পৃথিবীর সব ধর্মের সকল ভালো কিছুই আমাদের জন্য (তখনকার শিশুদের জন্য) বরাদ্দ ছিল।
এরশাদের আমলে আমরা অনুভব করলাম রাষ্ট্রেরও ধর্ম থাকা উচিত। আমরা যেদিন রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করলাম সেই দিন থেকে ধর্ম চলে গেল একদল ভন্ডের হাতে। মানুষ যা ধারণ করে তা-ই ধর্ম। আমরা ধারণ করলাম বাটপারি। বাটপারেরা ফতোয়া দিতে থাকল তাদের মনমতো। নিজের হাতের ব্যাসার্ধে বৃত্ত বানালো। প্রবাসীদের মদের টাকা তখন থেকে হালাল হতে শুরু করল। বিদেশি ভাইজানেরা সম্পদের নিশানা স্বরুপ বাড়ির কোণে মসজিদ বানালেন। সরকারি সম্পত্তি দখলের প্রথম পদক্ষেপ, সেখানে জোরজবরদস্তি করে মসজিদ নির্মাণ এবং তাকে ঘিরে ভিক্ষাবৃত্তি চালু করা। এভাবেই ধর্ম আস্তে আস্তে ব্যবসায় রূপান্তরিত হলো। মসজিদ কমিটির নিজস্ব মার্কেট হলো, ভেতরে টাইলস লাগলো, এসি লাগলো, কর্মচারী নিয়োগ হলো এবং মুসাফিরের জন্য মসজিদ চিরতরে বন্ধ হলো।
সমাজের ভালো মুসলিম গরিব আর ভন্ডরা ধনী, কাজেই কবরে বা হাশরের দিনে এসি থাকবে না জেনেও ইবাদতের ঘরে আরামআয়েশের কমতি নাই। পরিবেশবান্ধব নান্দনিক স্থাপত্যের মসজিদ হতে পারে তা আমাদের চিন্তাতেও নাই। আলোবাতাসহীন দেয়াশলাইবাকশ সদৃশ বদ্ধ ঘরে ফরজ আদায় হয়, ইবাদত হয় না।
আমাদের দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, মোক্তারের অভাব নেই; কিন্তু আফসোস, এদের মধ্যে কোনো আলেম বা ধর্মীয় বক্তা নেই। আর ওয়াজগুলোতে নারীরা এত মাত্রায় আক্রমণের শিকার যে তারা ধরেই নিয়েছেন ধর্মের বয়ান তাদের কর্ম না। ফলে ধর্মের বয়ান পুরোটাই পুরুষতান্ত্রিক। ওয়াজের বাজার পুরোটাই অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মৌলানাদের দখলে। এদের না আছে দুনিয়াদারির জ্ঞান, না আছে ইসলামের জ্ঞান। চিৎকার ছাড়া এই মোল্লারা কথাই বলতে পারে না। যে-কোনো মিথ্যা বক্তব্যের পরপরই এরা গর্জন করে “কি, ঠিক না বেঠিক?” তখন তাদেরই ব্যবসায়িক অংশীদাররা দোহারকি দিয়ে বলে ওঠে “ঠিক, ঠিক”। এরা ধর্মপ্রচার করে এদের মনমতো।
একদল অশিক্ষিত ভন্ড যখন নিজের রচিত ফতোয়া দিয়ে ধর্মজ্ঞান দেয় তখন শিক্ষিতরা জেনেবুঝেও চুপ থাকেন। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা হারাম জেনেও, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার প্রতিবাদ না করে ধর্মকে নষ্ট হতে দিয়েছেন, নিজেদের ঈমানি দায়িত্ব পালন করেন নাই, তারাও হাশরের দিনে প্রশ্নবিদ্ধ হবেন। এইসব জালেমদের হাত থেকে ধর্ম রক্ষা করুন। দখলী জায়গা থেকে মসজিদ স্থানান্তর করুন। মসজিদ উন্মুক্ত হোক, তবেই ধর্ম ব্যবসায়ীমুক্ত হবে।
হিন্দুবিদ্বেষের কারণে আমরা যেন ভুলে না যাই যে ফুল নবিজির অতি পছন্দের। ফুলগাছে ভরে দিন মসজিদ অঙ্গন। পাখিরা খেলুক, সঙ্গে শিশুরাও। আল্লাহকে ভালোবাসুন ভালোবেসে, ভয় দেখিয়ে নয়। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ না হলে যারা এখন জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে, তারাই দুইদিন পর দেশটা জাহান্নাম বানাবে।
২১ জানুয়ারি ২০২৬, লন্ডন, ইউকে
মনোজ দাস রচনারাশি
- স্মৃতিগদ্যে এক নতুন বয়ানরীতির বই || রেজাউল করিম - March 7, 2026
- মুসাফিরের মসজিদ || মনোজ দাস - March 7, 2026
- সুরমা নদীর স্রোতধারার মতো কবিতা || সাজিদ উল হক আবির - March 6, 2026

COMMENTS