আড্ডায় হাওয়াবঞ্চিত যুবকেরা

আড্ডায় হাওয়াবঞ্চিত যুবকেরা

রাগীব আলী মেডিক্যাল প্রান্ত দিয়া লাক্কাতুরা চা-বাগানের গভীর ভিতরে যেয়ে একটা কালভার্ট, তল দিয়া বয়া যায় পানি। চিকচিক করা বালি, ঝিলিমিলি জলঝোরা, সিলেটের লোকালে এইটারে বলে ছড়া। এই জিনিশ সিলেটে পাবেন, আর পাবেন হিলি খাগড়াছড়ি বান্দরবানের দিকটায়।  বৃহত্তর সিলেটের বড় অংশটাই ছিল ছড়াবেষ্টিত, টিলা আর টুনটুনির নিসর্গমণ্ডিত, অন্য বড় অংশটায় নিধুয়া পাথার তথা হাওর। বর্তমানে এই টিগার্ডেনগুলা ছাড়া আর কোথাও ছড়া দৃষ্ট নয় সেভাবে, কেবল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ আর রাজনগর এবং শ্রীমঙ্গলের কিছু লোকালয়ে এ-ধারা বালিঝিরিঝিরি প্রাকৃতিক পানির প্রণালি দেখতে পাওয়া যায়।

দিনগুলা ভারি হিউমিড, ঘর্মাক্ত রৌদ্রকোলাহলের পূর্ণদৈর্ঘ্য চব্বিশঘণ্টা, বৈদ্যুতিক ও বিবিধ অনর্থরাজনৈতিক সঙ্কটাপন্ন মারী ও বন্যাকবলিত বছর। শহরের আশপাশের টিগার্ডেনগুলায় উইকেন্ডে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় লোকে একটু হাওয়া খাইতে যায়, খায়, হাওয়া ও হাওয়াজাত দ্রব্যাদি, ইতিউতি ঘুরিয়া বেড়ায়, কেউ সন্ধ্যার আজান হলেই ফিরবার তোড়জোড় করে ঘরে তথা দাবদাহপর্যুদস্ত খোঁয়াড়ে, কেউ অধিক সময় ধরে বসে থাকে জোনাকপুচ্ছস্ফুরিত তুলতুলা হাওয়ায়। আমরা জনাতিনেকের একদল গরমতাড়িত শহুরে কেরানি জ্বালানিক্রাইসিসের এই সময়ে গেসলাম মোটরের বাইক হাঁকায়া হাওয়া  রিলিজের দিনটায়, উনত্রিশ জুলাই দুপুরবেলায়, লাক্কাতুরা চায়ের বাগিচায়। যায়া দেখি কালভার্টসংলগ্ন ওজনঘরের চালার তলায় পাঁচ-ছয় যুবক হাওয়ায় মাতোয়ারা। কথা বলতেসে উঁচা গলায় হাওয়ার গতিক নিয়া। কালভার্টে পা ঝুলায়া পাৎলা পানিপ্রবাহ দেখতে ও শুনতে থাকি, টাট্টু ঘোড়ার মতো ছড়ার পানি জিগজ্যাগ যাইতেসে পশ্চিম থেকে পুবে, কানে পশে যুবকদের হাওয়াসংক্রান্ত বচসার আওয়াজ।

বোঝা যায় হাওয়ার টিকেট পায় নাই যুবকদল, তাই তারা হাওয়ার উপর মহাখাপ্পা। তার আগে বলে রাখা প্রাসঙ্গিক হবে যে এইখানে সিলেটে রেগ্যুলার সিনেমাহ্যল আছে একজোড়া মাত্র, নন্দিতা  আর অবকাশ। সম্ভবত এর মধ্য থেকে ‘অবকাশ’ অলরেডি মৃত। গত দুইদশকে গণতান্ত্রিক গদিনশিনদের প্রয়োজনে সিলেটের ৭/৮টা প্রেক্ষাগৃহের সবই ভ্যানিশ। যে-২/১টা আছে সেইটায়/সেগুলায় আসনব্যবস্থা ছারপোকার দখলে। একহপ্তা পর্দা চালু থাকলে দেড়হপ্তা বন্ধ। মহামহিম মধ্যবিত্ত বই দেখতে হ্যলে যায় না আর, ব্ল্যাকে টিকেটের সেই রমরমা নাই, সবাই যার যার পকেটে সিনেমা নিয়া ঘোরে। ক্যাপিট্যাল সিটির কায়দায় এখন সমস্ত মানবিক মফস্বলে জেলাশহরে ট্রেন্ডি সিনেপ্লেক্স বানাইবার ডিম্যান্ড। কুলিমজুর আর রিকশাপুলারদের লগে এককাতারে বসে সিনেমা দেখব না আমরা। তাই সিলেটের এক টাইকুন ফ্যামিলি সিটি কর্পোরেশনের বাইরে সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের বড়শালায় এয়ারপোর্ট রোডের ধারে পেল্লায় এক দালানগুচ্ছ তুলেছে, যেইটার নাম গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। এইটা পাঁচতারা মানের হোটেল, দাবি কর্তৃপক্ষের, আমরা সার্ভিস নিয়া তারপর রায় দিতে পারব মানসম্মত কি না। আর এই হোটেলেরই একটা ফ্লোরে গ্র্যান্ড সিলেট সিনেপ্লেক্স, যার দর্শকধারণক্ষমতা ১৭০ মাত্র, হাওয়া দিয়া যার শুরু হয়েছে যাত্রা এবং তা ২৯ জুলাই ২০২২ থেকে।

যুবকদলের বচসার বিষয় হাওয়ার গুণমান নয়, টিকেটের দরদাম। হাওয়ায় মুগ্ধ তারা, না-দেখেই। ঠিক না-দেখে মুগ্ধ, বলা যাবে না; কারণ, ইতোমধ্যে এর ট্রেলার-টিজার বাইর হইসে, একটা গান ‘সাদাকালা’ তো মহাহিট, মহাভাইরাল, তদুপরি আছে মেঘদলের ‘এ হাওয়া’ গানের আবেদন ও আহ্বান। প্রায় একইসঙ্গে রিলিজ পাইসে ‘পরান’ নামে একটা, ‘সাইকো’ আরেকটা, আর ‘দিন দ্য ডে’। শেষোক্ত বইয়ের ব্যাপারে ব্যাপক হাসিঠাট্টাট্রল ছাড়া আর কোনো কথা নাই অন্য দুই সিনেমা নিয়া। বাংলা সিনেমা আদতে সেই তিমিরেই থেকে যাবে কি না কে জানে, সেই হুজুগের তিমিরে। এখন দুনিয়া হাওয়াময়, তীব্র গরমে তেষ্টায় নির্বাতাস গুমটে ব্যাপারটা আয়রনির মতো শোনালেও দুনিয়া হাওয়াময় এতে সন্দেহ নাই।

যুবকদলের একজন বলতেসে, — বাল, ঊনত্রিশ-ত্রিশ-একত্রিশ সোল্ড-আউট, পরে দেখে আর কী হবে! ধুর, থ, পরে একটা-কোনো ওটিটিতে দেখা যাবে।
একজন বলে, — না বে, এইটা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর এইটার টেইস্ট পাইতে গেলে তোমারে মামা বড়পর্দায় দেখতেই হবে। নন্দিতা-অবকাশে এই সাউন্ড তো পাবা না। আর নন্দিতার পর্দাগুলা ঘোলা, ময়লা, ঘামে গরমে জ্বরে পড়বা আর পরিশেষে, বুঝলা, পরিশেষে করোনায় মরবা মামা ডাক্তার পাইতায় না।
আরেকজন তখন মিনমিনায়া বলে, — কিন্তু দোস্ত পাঁচশ টাকা মানে তো অনেক টাকা। আমরা ফ্যামিলি নিয়া মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে গেলে তো ফতুর হয়া যাইতে হবে এক সিনেমায়। বাংলা সিনেমার ভূতভবিষ্যতের কোন ফায়দাটা হবে যদি পুরা ফ্যামিলি সিনেমা না দেখতে পায়? পাঁচশয় আমি হাওয়া  দেখলাম মনে করো, শহর থেকে অত দূরে যাওয়াআসা কৃচ্ছতা সাধন করেও ধরো আরও পাঁচশ, খাওয়াদাওয়া বাদই দিলাম। সরকারি ডিসি-অ্যাডিসিগুলা ছাড়া আর কে দেখতে পারবে একনাগাড়ে এত পয়সা খর্চে একের-পর-এক বছরভর সিনেমা? আমরা ব্যাটা যেই ইনকাম করি তা দিয়া ফ্যামিলির পাঁচ/ছয়জন মিলে দেখতে গেলে এক সিনেমার টিকেটেই লাগবে হাজারতিনেক আর বাকি খাইখর্চা মিলায়া পাঁচহাজার নিয়া টান দেবে। রেস্ট অফ দ্য মান্থ যাবে ক্যাঙ্কা করে?

এই কথাবার্তা যখন চলতেসে তখন হাওয়ার ফার্স্ট স্ক্রিনিং ডান। অনলাইনে টিকিটের লাইনঘাট পাইতে পাইতে দেরি হয়া যাওয়ার ফলে এই যুবকদল পয়লা-দিনের টিকেট মিস করে ফেলসে। এরপরে দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনের টিকেটও বুকড হয়া যায় দেখতে দেখতে। এখন তারা খানিক ক্রিটিক্যালি দেখতেসে ব্যাপারটা। আঙুরফল না পায়া তারা আঙুরের অম্লত্ব লইয়া আলোচনায় বিকাল কাটাইতেসে।

একজন বলে, — নন্দিতায় আসবে নিশ্চয়, একটু অপেক্ষা করলে রেগ্যুলার হ্যলেই সিনেমাটা দেখবার চান্স আছে।
— সেক্ষেত্রে টিকেটের দাম কম পড়লেও সিনেমার মান পড়ে যাবে, — এই কথা আরেকজন বলে।
— আচ্ছা, দ্যাখ মামা, আমরা ১৩টাকায় সিনেমা দেখতে শুরু করসিলাম। সর্বশেষ যখন দেখসি তখনও ৪৫/৫০ ছিল প্রবেশ-ফি। এইসব সাধারণজনের সিনেমাহ্যলে এখন তো কম করেও শ/দেড়শ হবে টিকেট, আমি শিউর।
— কিন্তু আমার কথা হইতেসে একটা মানুষ যদি সিনেমা দেখতে যেয়ে এককিলো চাউলের দামেও টিকেট না পায় তাইলে সেই সিনেমা দেখার দরকারটাই-বা কী, ক দেখি!
— কী আর এমন হবে, চল ট্রাই করি টিকেট মিলাইবার, দ্যাখ ছাত্রলীগের মহানগর শাখার সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক অমুকভাইয়ের একটা ফোনেই টিকেট পায়া যাব।
— মনে হয় না ভাই, আপনে দেখতে পারেন ট্রাই করে। আমার মনে হয় নাদেলভাই বা এই-রকম লেভেলের লোকের ক্ষেত্রে কার্টেসি টিকেট অ্যাভেইলেবল হলেও বাকিরা আমাদের মতো অন অথবা অফ কোনো-একটা লাইনেই কিউ দিতে হবে দেখতে চাইলে।

স্ট্যান্ডিং-আড্ডার এক পর্যায়ে একজনের আইডিয়া শুনে হাসি পায়। সে ঘোষণা করে, — ইউরেকা! পাঁচশ টাকায় একলগে ফ্যামিলির সবাই মিলেই সিনেমাটা দেখা যাবে।
— অ্যাই অ্যাই কী কয়! — একযোগে বাকিরা তাকায় প্রস্তাবকারী যুবার দিকে।
— হ্যাঁ! ধর, তুই গিয়া মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমাটা দেখে এলি। ফিরে এসে ফ্যামিলির সবাইরে দেখাইলি।
— ক্যাম্নে! এই ব্যাটা, স্পয়লার তো স্পয়লারই, গালগল্প শুনে সিনেমার স্বাদ পাবি কী করে?
— সেলফোন তো পকেটে থাকবে, সিটে হেলান দিয়া হাঁটুর কাছে দুই উরুর চিপায় সেলফোনরেকর্ডার অন রেখে মনে করো যে পাঁচশট্যাকায় পুরা হাওয়া  ফ্যামিলিশো অর্গ্যানাইজ করতে পারবা।
— বালের প্রস্তাব তোমার, গার্ড থাকবে না মনে করসো? মোবাইলে রেকর্ড করতে যায়া কট খাবা আর কেলেঙ্কারির একশেষ হবে। এইগুলা নিয়া তুমি লীগের কোন বড়ভাইরে গিয়া ধরবা? লাজশরম নাই আমরার?
— তাইলে একলাই সিনেমা দেখবা? ফ্যামিলিরে দেখাইবা না?
— ভাই রে, আপ বাঁচো তো বাপ নিয়া ভাববা। পাঁচশট্যাকায় হাবিগোষ্ঠীরে দেখাইবার চিন্তা বাদ।

এইসব শুনতে শুনতে মাগ্রেবের আজান হয়। চারপাশ থেকে হাজার হাজার মসজিদের মাইকের ধরিত্রীবিদারী আওয়াজে ভড়কে যেয়ে শেয়ালেরা আচমকা বাড়িয়ে দ্যায় চিল্লাপাল্লা একযোগে। যুবকদের বচসা থেকে কান ফিরায়া আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় ব্যাপৃত হই। কী করে ফ্যামিলিরে রেখে একলা হাওয়া দেখতে যাই, বিবেকরে জিগাই। বিচ্ছিন্ন না হয়া বাংলাদেশে সাহিত্যশিল্পকলা উপভোগের কোনো পন্থা নাই? সিনেমাহ্যল শাটডাউন করে মিডলক্ল্যাসি সিনেপ্লেক্সই কী সিনেমা বাঁচাইবার একমাত্র উপায়? এই বিত্তভিত্তিক বিভাজন কই নিয়া যাবে আমাদেরে, এইসব ভাবতে ভাবতে এবং হাওয়ার হাইপ নিয়া আরও খুচরা আলাপের একপর্যায়ে উইকেন্ডশেষে অ্যাট-লিস্ট নিজেরা অন্তত বড়পর্দায় হাওয়া উপভোগের বন্দোবস্ত করা যায় কি না চিন্তা করতে করতে বাইক কিকাইতে থাকি। মিডলক্লাসে থেকে মিডলক্লাসের স্ট্যাটাসবঞ্চিত হবার তো কোনো লজিক নাই। ১৭০ সিটের মাল্টিপ্লেক্সনৌকায় একটা আসনব্যবস্থা না করতে পারলে সমাজে মুখ দেখাব কেমন করে? ভ্যানওয়ালাদের লগে মেশামেশি-ঘেঁষাঘেঁষি করে ফিলিম দেখার জন্য তো মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিত্ব জন্মায় নাই।

মিল্টন মৃধা

গানপার

COMMENTS

error: