প্যারা ৩ || শেখ লুৎফর

প্যারা ৩ || শেখ লুৎফর

তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো


আমার পৃথিবীটা ছোট হতে হতে গুটিকয় মানুষ, বাসা আর বাসার ছাদে এসে আটকে গেছে। তাই সকালটা কাটে ছাদে। কোদাল, ছেনি, দা সব মজুত থাকে সিঁড়িকোঠার টিনের চালের বর্গায়। টবের গাছগুলোর সাথে আমার আত্মা-আত্মায় সর্ম্পক। রাত পোহাতেই তারা বুঝি আমার অপেক্ষা করে। আমি উঠি ঠিক সাতটায়। তারপর কাজ করার প্যান্ট-শার্ট আর রাবারের শ্যু পরে একঢোঁক পানি খেয়ে ধীরে ধীরে ছাদে যাই। পুবের দিকে হাওর। তাই সেইদিকে আগে যাওয়া হয়। সকালের নরম আলোতে কী শীত, কী বর্ষা হাওরটা যেন কতকালের কথা কৈছে।

টবে কাজ করতে করতে আমি লেখার চরিত্র নিয়ে ভাবি। দশ-বিশ মিনিট বাদে বাদে কাজ ফেলে হাওরের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে তাকিয়ে আমার লেখার জগতে হাঁটি। চরিত্র খুঁজি। দুনিয়ার যত আকামের মানুষ হলো আমার বিষয়। একজন একজন করে তাদেরকে নিয়ে আমি খুঁটাখুঁটি করি। সুখ-দুঃখে গড়া জীবনটা তন্নতন্ন করে বাজিয়ে দেখি। যদি সুরটা মনমতো হয় তবে আমি তাদের সাথে আলাপ জুড়ি।

একদিন বউ এসে দেখে আমি কাজ ফেলে হাওরের দিকে মুখ করে হাত নেড়ে নেড়ে ধরাগলায় কথা বলছি। আমার দু’গাল ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। আমি তখন ‘চন্দ্রবতীর পুত্রগণ’ উপন্যাসের মালেকের সাথে কথা বলছিলাম। মালেক একজন মাছশিকারি। ত্রিশ ছুঁই ছুঁই অবিবাহিত মালেকের মাছধরা পেশা হলেও ঘাটুগান করা তার নেশা। রাতের রঙ্গমঞ্চের জোকার মালেক প্রেমিকার সাথে দেখা করার সময় বিষাক্ত সাপের ছোবলে মারা যাবে। মালেককে কীভাবে বাঁচানো যায় সেই ফন্দি খুঁজতে গিয়ে দুইদিন লেখা বন্ধ।

আমাকে একনজর দেখেই বউ নিঃশব্দে সরে যায়। এই মহিলার বিবেচনাবোধ বারবার আমাকে মুগ্ধ করে।

সারাদিন যত কষ্টেই যাক, যত ক্লান্তিই থাকুক তবু রাতে ছাদে এসে মোবাইলের লাইট দিয়ে টবের বাসিন্দাদেরকে না দেখে আমি লিখতে কিংবা ঘুমাতে যাই না। তাদের শরীর-স্বাস্থ্য, লাবণ্য দেখতে দেখতে আমার যন্ত্রণাভরা হৃদয়টা হাওরের মতো বিশাল আর বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। লেখার জন্য তো কম নাজেহাল হইনি তাই এই ফাঁকে সেইসব জ্বালাগুলোও ভুলে যাই। ছাদের দুনিয়াটা যেন আমার কষ্টভরা বুকের মলম।

আজও রাতের খাওয়া সেরে ছাদে গেলাম। আজ আর মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে টবের ফুল দেখি না। উত্তরের বড় টবটায় কী হাইব্রিড-চিচিঙ্গার বীজ ফুটে চারা গজিয়েছে? এই জিজ্ঞাসা আমাকে তাড়া করে না। আজ বুকটা পাথরের মতো ভার আর স্তব্ধ। গলার কাছে রোদনের মতো একটা কী যেন আটকে আছে। তাই বিশাল আকাশের নিচে গিয়ে ক্ষুদ্র একটা পিঁপড়ার মতো চুপচাপ বসে থাকি। বুকের খুব গভীর থেকে তুচ্ছ, দীন একটা মানুষের নিশ্বাস পড়ে। বউ যখন ভেতরে ভেতরে বেশি রেগে থাকে তখন আমাকে লিখতে দেখলে চাপা স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, — লেখা তোমারে কী দিছে?

আমার লেখালেখিটা তার কাছে বুঝি সব নষ্টের গোড়া। চাপা স্বভাবের গম্ভীর মানুষটা যখন তার বড় বড় চোখ মেলে তাকায় তখন তার সেই দৃষ্টিতে অনেককিছু দেখি। তার নরম আর বিবেচক হৃদয়টায় আমার অটুট সিংহাসনটা দিব্যি দেখতে পাই। কিন্তু এইসব বিষয়ে সে মুখে কিছু বলে না। ফোনে কারো সাথে আলাপের সময় যদি আমার লেখালেখির ভালো কিছু শুনতে পায় তবে কখনও কখনও আমার পাশে এসে বলবে, — আমি যে তোমাকে কতটা পছন্দ করি টের পাও?

আমার মনে শত কথা কলকলিয়ে ওঠে। ইচ্ছা করে তাকে সাথে নিয়ে ছাদে চলে যাই। কদমের নরম ছায়ায় বসে বন্ধুর মতো দুইজনে অনেকক্ষণ কথা বলি। সে যেহেতু সরাসরি কোনোদিন কিছু বলে না, তাই আমিও হাজার হাজার কথা দিয়ে গল্পের মতো তাকে একটাকিছু বুঝিয়ে দিতে চাই। কিন্তু তার উজ্জ্বল চোখের তলে অসম্ভব ভদ্র আর তীক্ষè আর দূরদর্শী মানুষটাকে দেখে আমি শুধু উপর-নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দেই যে তার ভালোলাগা আমি খুব ভালোভাবে টের পাই।

আজ তিনদিন ধরে একবারও কম্পিউটার ওপেন করিনি। একবারও রাতের আকাশের দিকে তাকাইনি। ছাদে শুয়ে, বুকের কাছে মুখ নিয়ে মরার মতো পড়ে থাকি। তিনবেলা বউ আর মেয়ের সাখে খাবার টেবিলে নামমাত্র বসি। মেয়েটা পড়ার টেবিল ছেড়ে বারবার আমার কাছে এসে আলাপ জমাতে চেয়েছে। আমার সারাভুবন জুড়ে বোবা কান্না। আলাপ কী আর জমে?

মাঝে মাঝে দু-চোখ উপচে ওঠে পানিতে। আমি চোখ মুছে পাশ ফিরি। ঘুরেফিরে চোখ পড়ে দেয়ালের একটা ছবির ওপর। ছবিটা যে গিফ্ট করেছিল তার নাম অরু। লেমিনেট-করা একটা বাজ কিংবা চিল পক্ষীর ছবি। সে নীল আকাশে দুই ডানা ছড়িয়ে উড়ছে। তার মুক্ত পাখার মাঝে এতদিন আমি অরুর হাসি-হাসি মুখটা দেখতে পেতাম। কিন্তু গত তিনদিন ধরে আমি ছবিটার মাঝে কান্নারত অরুকে দেখতে পাই।

অরুর সাথে আমার দেখা হয়েছিল একটা নির্বাচনের ডিউটিতে গিয়ে। সহকারী প্রিজাইডিং কর্তা হিসাবে তারা আমাকে সব দরকারি জিনিসের সাথে দুইজন পুলিং অফিসারকেও দিয়েছিলেন। তাদের একজন ছিল অরু।

অনেক বছর ধরেই নির্বাচন তো একটা তামশা তাই কেন্দ্রে ভোটারটোটার একদম ছিল না। মাঝে মাঝে এক-দুইজন আসলে ঝটপট তাদের বিদায় করে ফের আমরা তিনজন আলাপে মজতাম। আমার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে অরুর চোখে সারা দুনিয়াটাকে হেসে উঠতে দেখছি সেই সকাল থেকেই।

দুপুরে পাশের বাজারে খেতে গিয়ে তার জন্যও এক প্যাকেট খিচুড়ি নিয়ে এলাম। সে একটু হেসে টাকাটা আমায় দিলো। আমি অবাক হয়ে তার লাল মাড়ি থেকে উঁকি-দেওয়া হীরকের ছোট ছোট দানাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মানুষের দাঁত এত সুন্দর হয়!

সে তার হাতব্যাগ খুলে আমাকে একটা এলাচির গোটা দিলো। জিনিসটা মুখে ফেলে চিবাতে শুরু করলে তার দানার সুগন্ধের মাঝে আমি অরুর সুন্দর মনের একটা গড়ন পেয়ে যাই। চেয়ে দেখি কুঁকড়া কুঁকড়া ঘন চুলের সিঁথিতে সিঁদুরের মোটা রেখা, ছিপছিপে অঙ্গভরা রূপের আগুন। ভোটাররা ভোট দিতে এসে তার দিকে হা-করে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ তার শরীরের মিষ্টি গন্ধে কেমন বেভুলার মতো ত্যাব্দা হয়ে যায়।

বিকালের দিকে বাইরের দুনিয়াটা আবির রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ভোটারটোটার একদম নাই। মাঝে মাঝে আনমনে সামনের জানালা দিয়ে আমার দু-চোখ আকাশের দিকে উড়াল মারে। অরুর আলাপি গলা আমাকে আসরে টেনে নামায়। তার কালো কালো নিবিড় চোখের দৃষ্টিতে আমার বুকের ভেতরটা বারবার পবিত্র আনন্দে নেচে উঠছে। অনেকদিন পর নিজেকে খুব হালকা আর সুখী মনে হয়। মনে হয় আমার চারপাশে হাজার হাজার গোলাপ হাসছে।

ক্ষণে ক্ষণে আমার কানে বাজছে উদাসীভাইয়ের ভরাট গলা। আড্ডার সময় বাউল মকদ্দস আলম উদাসী ভাই মাঝে মাঝে বলতেন, — ‘মেয়েরা হচ্ছে মা ফাতেমার জাত। তারা আমাদের মা। এই জগজ্জননীরা আছে বলেই তো দুনিয়াটা এত সুন্দর, এত মায়ার।’

কথা বলার সময় মাঝে মাঝে আমি সেইমতো তার দিকে তাকাই। তার ঠোঁটে নীরবে জ্বলে একচিলতে হাসি, যা শুধু আমিই দেখতে পাই।

ভোটের সব আনুষ্ঠানিকতা মিটিয়ে টাকা হাতে পেতে পেতে সন্ধ্যাটা উতরে যায়। পথে নেমে দেখি আকাশে চাঁদও উঠেছে জবর-একখানা! আজ বুঝি সে বিদ্যুতের বাতিকেও হার মানাবে!

পথে কোনো যানবাহনের পাত্তা নাই। সারাদিন গরমে দুনিয়াটা সেদ্ধ হয়েছে। এখন ফুরফুরে বাতাস বইছে। গাড়ির অপেক্ষা না করে সেই বাতাসে গা ভাসিয়ে অনেকেই যার যার গন্তব্যের দিকে হাঁটছে। আমিও তাদের সাথে পা বাড়াই। আনমনে একাই হাঁটছিলাম। একটু পরেই দেখি আমার পেছনে সে, — একটু আস্তে হাঁটেন, মা কুলিয়ে উঠতে পারবে না।

বুঝলাম, দেহরক্ষী হিসাবে সাথে মাকে এনেছে। আমি ঘুরে প্রবীণাকে আদাব দেই। তিনি বলেন, — এতটা পথ কী করে হাঁটব?

আমি হাঁটতে হাঁটতেই বলি, — পথেই পাবো। ইলেকশান ভাঙছে তো এখন ড্রাইভাররা গাড়ি নিয়ে পথে নামবে।

আর আলাপ জমে না। আমিও ভয়ে ভয়ে আছি, সত্যি যদি গাড়ি না পাই!

একটু পরেই দেখি সে আমার পাশে। মা একটু পেছনে। আমাদের সামনে-পেছনে বিস্তর লোক। ঠিকমতো খাওয়া নাই, বিশ্রাম নাই তবু আমি বুঝি উড়ছিলাম! এইরকম রাতে আমি লেখা ফেলে বাসার ছাদে আলো-আঁধারিতে রহস্যঘেরা হাওর সামনে নিয়ে বসে থাকি।

কেমন জানি আনমানা হয়ে গেছিলাম। ভুলেই গেছিলাম যে পাশে একজন আছে। সে একটু পরে আস্তে আস্তে বলল, — রাতটা খুব দারুণ!

মিষ্টি গন্ধে মৌতাত একটা টেবিল ঘিরে সারাদিনে একটু একটু করে তার অনেকখানিই জানা হয়ে গেছিল। তবু আমি তার গলার স্বরে চমক খাই।  কিন্তু কিচ্ছু বলি না। সে একই রকম গলায় বলে, — ইচ্ছা করছে গলা ছেড়ে গাই, ‘আজ জোছনারাতে সবাই গেছে বনে’…।

— আপনি গাইতে পারেন?
— একটু একটু।
আমি তার স্বামীর কথা জিগাই, — দাদা আসল না কেন?
— সে জগন্নাথপুরবাজারে একটা কাপড়ের দোকান চালায়।

শেষমেষ একটা খালি ইজিবাইক পাওয়া গেল। সবাই হুড়মুড় করে উঠতে চাইছে। আমি একলাফে পেছনের সিটে উঠে বসি। সাথে সাথেই সে আমার পাশের সিটটা দখল করে ফেলে। তার হালকা শরীরে হরিণীর ক্ষীপ্রতা আমাকে মুগ্ধ করে। আমি আরও চেপে তার মায়ের জন্যও সিট রাখি। কিন্তু সে চট করে আমার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। কাজেই মাকে তার মেয়ের পাশেই বসতে হয়।

সিটের মানুষের চাপে আমাদের দুইজনের শরীরের পাশটা পরস্পরের শরীরে চেপে আছে। ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চলছে হেলেদুলে। তার শরীরের হালকা-মিষ্টি গন্ধে আমার ঘুম চলে আসে। তবু আমি যতটা পারা যায় তার থেকে শরীর বাঁচিয়ে, মাথার উপরের রড ধরে, চোখ বুজে ঝিমাই। মাঝে মাঝে জোরে ঝাঁকি লাগলে চোখ খুলে দেখি শুধু আকাশেই না আমার পাশেও একটা চাঁদ ঝলমল করছে।

তিনদিন পর একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে, — আদাব স্যার। চিনছেন?

আদাব শব্দেই আমি তার গলার স্বর চিনে ফেলেছিলাম। বুঝলাম নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিয়োগপত্র থেকে ফোননাম্বার পেয়েছে। প্রাইমারির টিচার তো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমার উপর  ক্লান্তি ঝাড়বে।

এইভাবে সে চার-পাঁচদিন পরপর ঠিক দুপুর দেড়টায় ফোন দিত। বছরখানেকের মাঝেই অরু তুমিতে নেমে আসে। আমার আরো কয়েক মাস লাগে। হয়তো কোনোদিনই তাকে তুমি বলা হতো না, যদি-না সে এই বিষয়ে আমাকে ক্ষ্যাপাতে শুরু করত।

বউয়ের চোখের তলার সেই প্রচণ্ডরকম ভদ্র আর হৃদয়বান মহিলাটার দিকে তাকিয়ে আমি তার সাথে রফা করে নেই, — স্রেফ আমরা বন্ধু। তুমি আমাকে পুরুষ ভাববা না। যেমন আমি তোমাকে কখনোই নারী ভাবি না। আমরা শুধু মানুষ।

ওপাশ থেকে সে চ্যাঁচায়, — জানি জানি, সেই প্রথম দিন থেকেই জানি। বেশি বাহাদুরি দেখাবা তো তোমার মুচ কেটে ফেলব।

হাসতে হাসতে আমার দম আটকে আসে। সে বলে, — তুমি জানো না, মুচুয়ারা প্রেমিক পুরুষ হয়।

সেই থেকে সে আমাকে মুচুয়া ডাকে।

ওপাশ থেকে সে চেঁচিয়ে জানতে চায়, — বলো তো মুচুয়া, অরু শব্দের অর্থ কী?
আমি গম্ভীর গলায় উত্তর দেই, — রক্তবর্ণ সুন্দর বদন।
সে অবাক হয়। আমোদভরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, — বিয়ের আগে মৌমাছির মতো ছুটে-আসা প্রেমিকদের কাছে জানতে চাইতাম, অরু শব্দের অর্থ কী? তারা হা-করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি বলতাম, — তুমি মূর্খ, তোমার সাথে আমার পোষাবে না।

মাসখানেক ধরে অরুর কোনো পাত্তা নাই। তরশু মনে পড়তেই ফোন দিলাম। ওপাশে ভারী গলা, — এতদিন পর!
— বিশ্বাস করো দোস্ত খুব ব্যস্ত ছিলাম।
— জানি।
জানি বলে সে চুপ করে থাকে।
এপাশ থেকে আমি কাতরে উঠি, — প্লিজ…।
— জানি, লেখাই তোমার সব।
— না, না অরু…

ওপাশটা নীরব। এত নীরব যে মহাশূন্যের মতো সেই নীরবতার ভারে আমার ভেতরটা খাঁ খাঁ করে ওঠে : অরু তো এমন না! ফোন দিলেই ভোরের পাখির মতো হাজার গলায় কলরব করে ওঠে, — এতদিনে মনে পড়ল! — দায় শুধু আমার? — সামনেরবার দেখা হলে মুচুয়া তোমার মুচ যদি আমি না কাটছি…।

সেই অরু এইরকম হয় কেমনে?

এপাশ থেকে আমি ধড়ফড় করে উঠি, — অরু তোমার কী হইছে? সত্যি করে কও…।

ওপাশ থেকে চাপা কান্নার ফোঁপানি ভেসে আসে। আমার বুকটা নীরবে খানখান হয়। আমার গলায় মিনতি ঝরে পড়ে, — প্লিজ! অবুঝ হইয়ো না অরু, তোমার কী হইছে?
— ওর দুইটা কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেছে…!

সেই থেকে আমি আছি কী নাই। ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি মরার মতো পড়েছিলাম। বউ নিঃশব্দে এসে আমার সিথান দিকে বসে, — শরীর খারাপ?
আমি ডানে-বামে মাথা নাড়ি, — না।
— মনখারাপ?
আমি বাধ্য শিশুর মতো মাথা নেড়ে মরা গলায় বলি, — হ।
কাল শান্তিগঞ্জে শাজাহানভাইয়ের কাছ থেকে ঘুরে আসবা।
আমি শুকনা গলায় বলি, — শাজাহান ইন্ডিয়া গ্যাছে ডাক্তার দেখাতে।
সে বলে, — তাইলে ছাতকে আজাদের কাছে চলে যাও। ওদের সাথে আড্ডা দিলে দ্যাখবা সব ঠিক হইয়া গ্যাছে।
আমি পাথর চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে আরো ঘন হয়ে আমার মাথায় হাত রাখে। আমি চোখের পানি আড়াল করার জন্য অবুঝ, অনাথের মতো পাশ ফিরে তার কোলে মুখ গুঁজি।

একটু পরেই আমি ভবেরবাজারের দিকে ছুটি। বাংলাদেশের ডাক্তাররা শুধু অষুধের নাম লিখে দিয়ে টাকা খায়। কিডনিরোগীর কতকিছু খাওয়া নিষেধ! ভবেরবাজারে আমার এক ছাত্রের কম্পিউটারের দোকান থেকে কিডনিরোগীর পথ্য, নিয়মনীতি বিষয়ে তিনজন পুষ্টিবিদের উপদেশনামা ডাউনলোড করে প্রিন্ট দেই। তারপর ফোন লাগাই, — অরু তুমি কৈ?
— উপজেলা শিক্ষা অফিসে আছি।
— প্লিজ, আমি বিশ মিনিটের মধ্যে আসছি।

অরু শিক্ষা অফিসে এসে আমাকে ফোন দিলে উপজেলা অফিসের সামনের প্রাচীন রেন্ট্রিতলায় আমরা দেখা করতাম। তারপর পাশাপাশি আলাপ করতে করতে ‘মডার্ন’ কিংবা ফিজার কেবিনে গিয়ে বসতাম। অরু আমাকে নিয়ে ফাজলামি করত। হাসাত। সবশেষে ফিসফিস করে বলত, — তোমার গোঁফটা একটু ছুঁয়ে দেখি?

আমি নীরবে হাসতাম। সে একদিন সত্যি সত্যি তার হাতব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা কাঁচি বের করল, — আর হাসবা তো বোকা তোমার গোঁফ কেটে নেব।

প্যাকেটটা হাতে দিয়ে বললাম, — এর সব-কটা প্রথমে তুমি তিনবার মন দিয়ে পড়বে। তারপর সেইভাবেই দাদাবাবু যেন চলে।
সে ডানে মাথা কাত করে।
— কীভাবে চিকিৎসা শুরু করছ?
— আপাতত সপ্তাহে একদিন ডায়ালাইসিস। তারপর কিডনি ট্রান্সফার।
— টাকা?
— ওর দোকানটা নিয়ে কথা হচ্ছে। বেচে দিব।

আমি ওকে আড়ে আড়ে দেখছিলাম : রক্তবর্ণ সুন্দর বদনটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ। মাথার কুঁকড়া চুলগুলো পাখির বাসার মতো। এর মাঝেই যেন তার বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল! কথা বললেই কেঁদে ফেলব ভয়ে আর কোনো কথা হলো না। পৌরপয়েন্টে গিয়ে আমি তাকে একটা সিএনজিচালিত অটোতে তুলে দিলাম। হায়! অরু তোমার জীবনটা কী পদ্মার চরের মতো ধু ধু  বালু হয়ে যাবে? তুমি কী আর কোনোদিন আমাকে মুচুয়া বলে ডাকবে না ?

তারার দিকে পাথরচোখে চেয়ে চেয়ে আমি ঠিক দশটায় অরুকে ফোন দিলাম। — হ্যালো?
— হুম…।
— দাদাবাবু এখন কী করছেন?
— ডায়ালাইসিস থেকে এলে প্রথমদিন তো জ্বর থাকে। এখন বেহুঁশের মতো পড়ে আছে।
— তুমি খাইছ?
— হ।
— কিডনি ট্রান্সফার কী ঢাকায় করবা?
— হ।
— ডোনার পাইছ?
— না। তবে চেষ্টা চলছে।

আমি নীরবে ভেবে চলি : আমার জানামতে একজন তার একটা কিডনি তার অসুস্থ ছেলেকে দিয়েছিল। এখন ছেলে ও বাপ দুইজনই সুস্থ। একটু সাবধান থাকলে একটা নিয়েই অনেকদিন বাঁচা যায়। ফোনের ওপাশে অরু অপেক্ষা করছে। কত আর বয়স? ত্রিশ… না-হয় পঁয়ত্রিশ। তার সারাটা জীবন সামনে পড়ে আছে। সবই পড়ে থাকবে। শুধু হারিয়ে যাবে তার মুক্তাঝরা হাসি। আমি আবার তাকে ডাকি, — অরু?
— বলো।
— আমি যদি ডোনার হই?

ওপাশের জন আবার ফুঁপিয়ে ওঠে। অনেকক্ষণ ফোঁপায়। এপাশ থেকে আমিও নীরবে চোখ মুছি। আমার চোখের সামনের তারাগুলো বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। চিত হয়ে শুয়ে থাকার জন্য দুইচোখের কোনা দিয়ে গরম পানির ফোঁটাগুলো দৌড়ে দৌড়ে আমার দুইকানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। অকেক্ষণ পর কান্নার বেগ কমে এলে সে বলে, — না, এইটা হয় না।

আমি শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠি। চিৎকার করে জানতে চাই, — কেন! কেন হয় না?

ওপাশে আবার ফোঁপানি। বুকভাঙা রোদন। অনেকক্ষণ পর সে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, — সবাই আমাকে খারাপ ভাববে। যার জন্য দিবা সেও আমাকে নষ্ট ভাববে। আমি-তুমি যে ভাইবোনের মতো ছিলাম, বন্ধু ছিলাম এই কথা স্বয়ং ভগমান বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না।

আমি আস্তে আস্তে আবার ছাদে নেতিয়ে পড়ি। এই জগতের অলিখিত একটা বিধি আছে। এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। অরু যদি রাজিও হয় আমার বউ মানবে? একটুও না। সে উচ্চকণ্ঠে আমার প্রাণদণ্ড ঘোষণা করবে। মেয়ে তার বাপের চরিত্রের ওপর আস্থা হারিয়ে আর কোনোদিন এসে আব্বু বলে পাশে বসবে না। কারণ দুনিয়ার কিছু কিছু মানুষের জগৎ এইরকম একটা কঠিন প্যারার নিগড়ে আটকা থাকে।

ইসহাকপুর / ২৪.০৩.২০২১


প্যারা ২

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: