চন্দ্রাবতীর পুত্রগণ :: পর্ব ৭ || শেখ লুৎফর

চন্দ্রাবতীর পুত্রগণ :: পর্ব ৭ || শেখ লুৎফর

ইয়াহিয়া খানের মানসপুত্র


মাটির দেওয়ালের উপর ছনে ছাওয়া নিচু রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে খেলা উবু হয়ে দাঁড়ায়। পেছনে সকালের নরম সুরুজটা হাঁসের মতো গা-ঝাড়া দিয়ে আসমানে উঠতে চাইছে। খেলার চওড়া-দিঘা শরীরে দরজাটা ভরে গেছে। তাতে ঘরের ভেরতটা হয়ে উঠেছে ঝাপসা। সেই আবছা আলোতে খেলা দেখে, একটা তুবড়ানো মুখাবয়বে ক্লান্ত দুইটা চোখ স্নেহ-মমতায় জ্বলছে। সেই চোখে তুচ্ছ এই সংসারের কোনো মলিনতা নাই।

তিলেক খেলার ব্যস্ততায় ভাটা পড়ে। সে চটপট একটা পিঁড়ি টেনে মায়ের কাছ থেকে একটু তফাতে বসে। এতক্ষণ শুকনা, ময়লাভরা ছোট ছোট দুইটা হাত দিয়ে মা বটিতে কীসব কুটছিল। ছেলেকে দেখে নীরবে উঠে যায়। পাকঘরের কোণার দিকে মেলা হাঁড়ি-পাতিলের মাঝ থেকে সানকি-দিয়ে-ঢেকে-রাখা একটা চিনামাটির থালা এনে খেলার সামনে রাখে। খুব কষে চিপে ফেলা পান্তা ভাতের সাথে বাসি দুধ, সর আর দুইটা পাকা কলা। খেলা হাত ধুয়ে চটকাতে শুরু করে। মা বসে-বসেই ছেলের দিকে দুই-কদম এগিয়ে আসে। দেড়দিনের বাসি ঘন দুধসর, কলা আর আধপচা ভাতের মণ্ডটা থেকে অদ্ভুত একটা সুঘ্রাণ বেরোচ্ছে। এর মাঝে হঠাৎ মেটে মেটে একটা গন্ধ নাকে লাগতেই খেলা মাথা তোলে। তার মা নিবিড় চোখে তাকে দেখছে। মায়ের চোখের মমতায় খেলা চুপসে যায়, — কিছু কইবা?
— কৈয়্যা লাভ কী?
খেলা খাওয়া বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাবাদে ফের আরেক মুঠি ভাত পাকাতে পাকাতে বলে, — কও হুনি।

খেলার মা তার বিয়ের আলাপ, ঘাটুগানের আলাপ, কিছুই না মাড়িয়ে সোজা অন্য কিসিমের একটা বিষয় তোলে, — মানুষটার দিল-কৈলজা কিছু আছে? সব ছ্যাঁদা অইয়া গ্যাছেগা। একে একে সব ঝি-পুত কব্বরে গেছে। শেষটারে দাফন কইরা আয়া বারিন্দাত্ বইয়া তামুক টানতে টানতে খোদারে কয়, — আল্লা…আল্লা গ, আমার ঘরে বাতি জ্বালাইবার একটা মানুষ দ্যাও।

স্বাদে-তৃপ্তিতে খেলা সারাগতরে একটা আনন্দের লহর তুলে খাচ্ছে। এর মাঝেই সে মনে মনে ভাবে, আজ তার মা আলাপটা অনেক পেছন থেকে শুরু করছে। হয়তো কেরমে কেরমে আসবে তার ভাইবোনদের জন্মকথা, একে একে মরে যাওয়ার কথা। শীতের খাটো বিকালের মতো বিষণ্ণ আবহে মা ওইসব বলতেই থাকবে। কিংবা শেষকালে তার জন্ম ও টিকে যাওয়ার কথা আসতেও পারে না-ও আসতে পারে। খেলা এইসব আগাম ভাবনা ভাবছে অভিজ্ঞতা থেকে। বিয়েতে রাজি করানোর জন্য খেলার আঠারো বছর বয়স থেকে তার মা তাকে খেতে দিয়ে কতভাবে যে এইসব আলাপ করেছে তার কোনো কূলকিনারা নাই।

খেলা খাওয়ার ফাঁকে আড়ে আড়ে মাকে পরখ করে। মা মাথা নিচু করে বটিতে রসুন কুটছে। গজার মাছের শুঁটকি কেটে একটা সানকির পানিতে ভিজিয়ে রেখেছে। জিনিস দুইটা থেকে দুই কিসিমের গন্ধ ভকভক করে বেরোচ্ছে। মা বলতে থাকে, — তুই পেডে আইতেই তর বাপ বালিজুরির সানু কবিরাজরে আনল। আমার শরীর বন্ধ করল, ঘর বন্ধ করল। আঠারো মাসের নিয়ম দিলো। হেই দেড়টা বছর আমি চান-সুরুজের মুখ দ্যাখছি না। চব্বিশ ঘণ্টা ঘরের মাঝে বন্দি। বাইরে যাওনের জন্য যহন ভিত্তে ছৈটফৈট উঠত তহন ঘরের ভিত্তে খালি হাঁটতাম। হাঁটতে হাঁটতে সারারাইত মরা ঝি-পুতের লগে কতা কৈতাম। তর বাপ ত বিছনাত হুইত্যাই শেষ।

খেলার খাওয়া শেষ হয়ে এসেছিল। সে হাত ধুয়ে গামছায় মুখ মোছে। হাতে লেগে থাকা দুধসরের মাখন পায়ের গোছাতে ঘষে ঘষে সাফ করে। ঠিক সেই সময়েই মা তার একটা হাত চেপে ধরে। খসখসে ঠাণ্ডা, ছন-বনের মতো পলকা সে-হাতে একটুও তাকদ নাই। — বাজান, আমার দিন শেষ অইয়া আইতাছে। নাতি-নাতকরের মুখ দ্যাখবার বড় সখ। বাজান…বাজান গ, তুমি একটা বিয়্যা করো।

আচমকা এই হামলায় খেলা পাথরের মতো জমে যায়। এর উত্তর তার জানা নাই। দলের পালামাস্টার বিকাশবাবু বলে, মেকাপে নাকি খেলার হাত সবচে ভালো। সে গানের দল করে। এতেই তার সুখ। খেত-গিরস্তি কিংবা সংসারের পঞ্চ-তরফের ফিকিরে তার কোনো আক্কলজ্ঞান নাই। ইচ্ছাও নাই। মাঝেমাঝে যুবতী নারীর শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে লাগলে তার জান-গতর কেমন কেঁপে ওঠে। সেটা তিলেকের জন্য। তারপর সেই আগের মতো একরোখা বাই। ঘাটুদল আর পরীকে নিয়েই তার পৃথিবী। কোনো-কোনোদিন মা-বাপের কথায় ত্যাক্ত হয়ে জমিনে নামে। ঘণ্টা-কয়েক ক্ষেতে টিকতে পারলে খেলার বাপ ভাত খেতে বসে তার মায়ের কাছে ছেলের কাজের খুব তারিফ করে।

খেলা তার মায়ের দিকে না তাকিয়েই বলে, — অইবনে।
মা হাতে আসমান পাওয়ার মতো খলবলিয়ে ওঠে, — কহন অইব ?

কখন বলে মা হা-করে খেলার দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ের দুই চোখের পুতলিতে মস্ত একটা খোয়াব। মায়ের এইসব ঠাহর করতে করতে খেলার ভেতরটা কেমন ভোঁতা হয়ে আসে। সে তড়িতে নিজেকে শক্ত করে আনে, — আর কয়ডা দিন সবুর করো।

সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে সে চটপট উঠে পড়তে চায়। কিন্তু তার মা তার চোখে চোখ রেখে শিশুর মতো তাকিয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে খেলার আর যাওয়া হয় না। সে আবার পিঁড়িতে বসে পড়ে, — আর কিছু কইবা?

উঠানে সকালের মিঠা রোদ। একটা হাঁস প্যাঁকপ্যাঁক করে দলবলকে ডাকছে। ঘরের পিছনের বাঁশঝাড়ের একটা বাঁশ বারবার বাতাসে ধাক্কা খেয়ে আরেকটাতে ঘষা মারছে। তাতে শব্দ উঠছে কেড়…কেড়…। এই সবকিছু মাথায় নিয়ে খেলা মায়ের তুবড়ানো মুখের দিকে তাকায়। তার মা হাতের বাটিটা রেখে, হাতখানেক লম্বা একটা পুরানা ঝাড়ু দিয়ে বসে বসে ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে উত্তর দেয়, — হ।

মায়ের দিকে তাকিয়ে কুঁকড়া চুলে ভর্তি খেলার বিশাল মাথাটা নুয়ে পড়তে চায়। তেজি ঘোড়ার মতো ছিপছিপে শরীরটা ভেতরে ভেতরে ছৈটবৈট করে। এখনও মুখের ভেতরটায় কলা আর দুধসরের স্বাদ রিনরিন করছে। মন-গতরের এইসব চেপে রেখে সে তার মায়ের দিকে ফের তাকায়। মা-ও তার ছেলেকে গভীর চোখে পরখ করে। ছেলের গতিক ধরতে অপারগ হয়ে আরো বেশি মনখারাপ করে। তবু ছেলের দিকে নরম চোখে চেয়ে থাকে। ছেলের মস্ত বড় মাথা, চওড়া কপাল, ভাসা ভাসা চোখ দুইটা ঠিক তার দাদার মতন। বিরাট ছাত্তির বুক গশগশা লোমে ভর্তি। হাঁটাচলাও দাদার মতন। কথা কয় ঘাপুর-ঘুপুর করে। গতরে তিন মরদের ত্যাজ। মুখে আল্লা-খোদার নাম নাই, মসজিদ-জুম্মায় যাওয়া-আসা নাই। তার দাদাও তেমনি ছিল। থপথপ করে মাটি কাঁপিয়ে হাঁটত। দিনমান কামে-কাজে থাকলেও বিকাল হইলেই পালবাড়ির দিকে চলে যেত। জগদীশ পালের সাথে আমে-দুধে খাতির ছিল। সারা জিন্দিগিতে চিড় ধরে নাই। এক শুক্কুরবার ছাড়া জুম্মাঘরে যেত না। জগদীশকে সাথে নিয়ে মাছশিকারে যেত। এ্যায়সা বড় বড় বোয়াল, বাউশ, আঁইড়, গজার নিয়ে বাড়ি আসত। নিজের জন্য দুই-একটা রেখে আশপড়শীকে সব বিলিয়ে দিত। কুরবানির ঈদের পরের দিন রুটি দিয়ে গরুর গোস্ত খেতে বসলে তিরিশ-চল্লিশটা রুটি আর একবোল গোস্ত খেয়ে ফেলত।

মা বেজার মনে খেলার দিকে ফের তাকায়। তার বাপে যে কয় ঠিকই কয় : এই ছেলে জমিনে কাম করলে এক নাস্তার বেলায় দশকাঠার একটা আস্তা খেত হাল-মই দিয়ে ফিরবে। মা নিজের মনে ভাবে, — ছেলেরে আইজ বিয়া করাইলে দশমাস দশদিনের মাথায় তার কোলে নাতি আইব। আর দ্যাহ, তার ঘরে লক্ষী নাই। পুতে তার বনে-বাদাড়ে টু টু কৈরা দিন কাটায়। রাইত অইলে ঘাটু লইয়া ঘুমায়। খবিশটারে বউয়ের মতন তোয়াজ করে। এই সংসারে তার মতন দুঃক্কিনি মা কয়জনা?
খেলা উসখুস করে, — কি কইবা কও।
— বাইগুন খেতের খবর রাহস?

খেলা হা-করে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তো খেত-খলার খবরদারিতে নাই! এখন মাকে কী বলবে! যদি জানত মা তার এই আলাপ জুড়বে, তাহলে নাকে-মুখে নাস্তাটা গুঁজে চম্পট দিত। সে মিনমিন করে একটা পাল্টা প্রশ্ন করে, — ক্যান কি অইছে?
— সাতকাঠার বাইগুন খ্যাতটা ঘাসে গিল্যালাইছে।
— কামলা রাখলেই অয়।
— তুই জানস না, আমলা-কামলায় সব কাম কি অয়, না তর বাপ পছন্দ করে?
— আইচ্ছ্যা দ্যাহি।
— দ্যাহি না, অহন দ্যাখ।

দেখি বলে খেলা উঠে পরীর কাছে যায়, — তুই আরেকটু ঘুমা। আমি আইতাছি।
— কই যাইবা?
— এই যায়াম আর আয়াম, তুই ঘুমা। সাবধান কইলাম, একলা একলা কোনোহানে যাইছ না। আমজাদ ঢালী জাগামতো পাইলে হিয়ালের মতন খপ্ কৈরা ধইরা লইয়া যাইবগা।

পরীর পাতলা ঠোঁটে চিকন হাসি। ঘন-কালো চোখের গভীরে কৌতূহল। খেলা চিনে; এ-হাসিকৌতুক রাতের রঙ্গমঞ্চের। পরী মাঝে মাঝে তারও বুদ্ধিনাশ ঘটায়। তখন সে ধন্দে পড়ে, কোনটা যে পালাগানের দর্শকমাতানো পরী আর কোনটা যে তার সামনের পরী, তা মালুম করতে বেজান বেজান লাগে।

খেলা কান্দিগ্রামের দিকে হাঁটছিল। আসার সময় সে দেখে এসেছে গত কয়দিনের কড়া রোদে বেগুনক্ষেতের মাটি মচমচা হয়ে উঠেছে। যদি সে একদল মাগনি কামলা পায় তাহলে একদিনেই ক্ষেতের ঘাস বাছা হয়ে যাবে। গতকাল রাতেও সে দেখেছে, চাঁদের মুখে মেঘের সভা। তার মানে এখন না তখন হুড়ুমহুড়ুম করে কয়টা ডাক দিয়ে আকাশটা মেঘে ঢেকে যাবে। তারপর ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে। এইসব ভাবতে ভাবতে খেলা দলের কর্তা মানু মিয়ার বাড়ির সামনে চলে আসে। বাহিরবাড়িতে খড়ের মস্ত মস্ত তিনটা গাঁদা। ফসল ঝাড়াই-মাড়াইয়ের জন্য বিশাল খলা। পনেরো-বিশটা গরু। মানু মিয়া চারজোড়া বলদের চাষি। ঘরে দুই বউয়ের সংসার। আণ্ডাবাচ্চা সহ হালি-তিনেক ছেলেপুলে। দিনরাত বাড়িটা গমগম করে। মানু মিয়া ব্যস্ত চাষী। নিজে ক্ষেতে না নামলেও বাতরে বসে থাকে। সে আশপাশ থাকলেই কামলারা দেড়া খাটে। একটু উল্টাপাল্টা হলেই মানু মিয়া খাটাশের মতো খ্যাকখ্যাক করে ওঠে। একটা লাল পৈসা খরচ করতে পাঁচবার ভাবে। খুঁটে খুঁটে সারাবছর জমিন কিনে। ত্যান্দর মড়লগুলাকে চেপে রাখতে ঘাটুদলটা বছর-কা-বছর জমিয়ে রাখে। আর কেউ না বুঝুক মানুর এইসব ভেলকিবাজি খেলা খুব ভালো করেই বোঝে।

বাড়ির ভেতরে মানু মিয়ার ভোমা গলাটা মাইকের মতো চলছিল। এই লোকটাই দলে-বলে-সমাজে মুখে তালা দিয়ে থাকে। তালগাছের মোথার মতো বিরাট শরীরের মানু মিয়া বেশিরভাগ সময় গোমড়া হয়ে বসে থাকে। খেলা জানে, মানু মিয়া নিজেকে তালুকদারদের মতো অভিজাত ভাবে। তাই সে দলের এইসব আমলা-কামলা আর ছোটলোকদের সাথে কথা বলে আরাম পায় না। আবার গ্রামে নিজের দাপট শতভাগ কায়েম রাখার জন্য ঘাটুদলটাও টাইট হাতে ধরে রাখে। আর এইসব ভেলকিতে পড়েই দলের সকলে ভেতরে ভেতরে কাঁটা হয়ে থাকে।

খেলা একটু ভাবে। একবার ঘাড় তুলে সুরুজ দেখে। মনে মনে হিসাব করে। সুরুজটা মধ্যআকাশ পার হলেই দিনটা ফসকে যাবে। আর এখন বেলা আটটা-নটার কাছাকাছি। ঢিলেমি করলে আজকের দিনটাও মাটি হবে। সব দ্বিধা কাটিয়ে সে হেঁকে ওঠে, — কর্তা বাড়ি আছুন? কর্তা, অ কর্তা…
বাড়ির ভেতর থেকে তড়িতে জবাব আসে, — ক্যাডা রে…?

মানু মিয়ার হাঁকে বাড়িটা কেঁপে ওঠে। গাব্দাগোব্দা গড়নের বিশাল গতরটায় অসুরের শক্তি। মাটি কাঁপিয়ে হাঁটে। বাইরে থেকে মানুষটা তালামারা সিন্দুকের মতো। ভেতরের মালছামানা মুখ দেখে বুঝবার জোগাড় নাই। পাটখড়ির দেউড়ি পেরিয়ে ছোটখাটো একটা দানব এসে খেলার সামনে দাঁড়ায়, — হঠাৎ এই বেটাইমে?

খেলা গামছা দিয়ে মুখ মোছে, বুক মোছে। বুকের ছাত্তি ভরা ঘন লোমে গশগশ আওয়াজ ওঠে। কড়া রোদের মাঝে বেগে হেঁটে আসার জন্য তাগড়া চেহারার তরুণের জুলফিতে ঘামের ফোঁটা চকচক করছে। মানু মিয়া এইসব দেখেও দেখে না। এদের কোনোকিছু দেখা মানে পাত্তা দেওয়া। গুরুত্ব দেওয়া। তালুকদারদেরকে দেখে দেখে মানু মিয়া এইসব শিখেছে।

মানু মিয়া তার বাংলাঘরের দিকে হাঁটে আর মনে মনে ভাবে, এই হচ্ছে তার বিভীষণ। একরোখা, ফুর্তিবাজ বোকাটা যতদিন ঘুমে থাকবে ততদিন সে নিশ্চিন্ত। আর অই কাদু-কালুদেরকে যতদিন পায়ের নিচে চেপে রাখতে পারবে ততদিন শান্তি। এইসব ভাবতে ভাবতে মানু মিয়া বলে, — ল, বাংলাঘরে যাইগা।
— জে, চলেন চলেন।
— কোনো অসুবিধা ?

মানু মিয়া থপ করে বীরের ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ায়। লোকটার চাটকির মতো ছোট্ট কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। খসখসে ফর্সা ত্বকে একটা কৃত্রিম উত্তেজনা, — কোনো অসুবিধা অইছে?
— না না, অসুবিধা অইত ক্যা।

খেলা মানু মিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসে। লোকটা সবসময় একটা কর্তা কর্তা খোলস পরে থাকে। দলের কেউ কথা বলার সময় এমন ভাব করে যে সে শুনছেই না। কিংবা কথাটা আদপেই শোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ না। তাবাদে যদি কথাটা তার মনমতো না হয় তবে চোখ পাকিয়ে নীরবে তাকিয়ে থাকবে। তবে মানু মিয়া খেলা কিংবা ঘোড়ামোবারকের বেলায় এমনটা করে না। ঘোড়ার সাথে তার গোপন একটা বিত্তান্ত আছে।

মাঝে মাঝে খেলার রাগ লাগে। ইচ্ছা করে একটানে মানুর সব খোলস ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু তাতে নানান ঝামেলা আছে। সে-তো আর আমজাদ ঢালীর মতো ঝামেলাবাজ না। যেখানে ঝামেলা সেখানে ক্ষমতা আর খ্যাতি যতই থাকুক অন্তত সুখ নাই। এইসব ভাবতে ভাবতে খেলা মানুর পিছে পিছে এসে বাংলাঘরে ঢোকে।

মাটির দেয়ালের ওপর টিনে ছাওয়া বড়সড় বাংলাঘরটায় পাশাপাশি মস্ত দুইটা চৌকি। ঘরের বাকি অর্ধেকটাই নাঙল-জোয়াল, খুন্তি-কোদালে ভরতি। গিরস্তির সিজনে জমিনে তিন-চার গণ্ডা কামলা খাটে। এই বাংলাটা কামলাদের জন্য বরাদ্দ। মানু মিয়া একটা চৌকিতে বসতেই চৌকিটা ক্যাতকুত মটমট করে ডেকে ওঠে। হাতের খাটো গাব্দাগোব্দা আঙুল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে লোকটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কী যেন দেখে। তারপর খেলার দিকে একনজর তাকায়। মানু মিয়ার সাথে খেলাদের চলন-বলন অনেকদিনের। তাই তারা লোকটার চোখের চাওয়া, হাতনাড়া কিংবা মস্তকের ঝাঁকানিতেই সব বুঝে ফেলে। এই মুহূর্তে খেলার দিকে তাকানোর অর্থ হলো, তার সামনের চৌকিটাতে বসতে বলা।

খেলা চৌকিতে বসতে বসতেই বলে, — বাগুনখেতে সুলা (মাটি ঝুরঝুরা করে নিড়ানি দেওয়া) দিবার বাত নষ্ট হইয়া যাইতাছে। বাজান একলা মানুষ, অহন কী করি?

মানু মিয়া ছোট ছোট লালটিবরন চোখদুইটা মেলে খেলার দিকে তাকায়। ষাঁড়ের মতো এই একরোখা জোয়ানটা তার কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী, ভবিষ্যতের কাঁটা। হয়ত সেই দিন খুব দূরে না যখন খেলা নিজেই এই দলের কর্তা হয়ে তার বুকের ওপর দুইপা তুলে দাঁড়াবে। কাদু-কালুরা সহ দলের সব-কটা হারামজাদা খেলার যা ভক্ত তাতে সেই বদনসিবটা কূটচালে আর কতদিন সে আটকে রাখতে পারবে?

শেখ মুজিবের গলার সাথে গলা মিলিয়ে সারা পূর্বপাকিস্তানের উনিশআনা মানুষ হুঙ্কার ছাড়ছে। ইয়াহিয়া খান এইসব আলতুফালতুদের পায়ের নিচে চেপে রেখে আর কতদিন এদের গলা বন্ধ রাখতে পারবে?  বাংলার মাটিতে আর কতদিন পাকিস্তান কায়েম রাখতে পারবে? দেশের যা-ই ঘটুক কিন্তু তার ঘাটুদলের সবচে জনপ্রিয় আর তুখোড় এই জোয়ানটাকে মানু মিয়া ছলে-বলে-কৌশলে বাঁয়ে ফেলে রাখবেই। দরকার পড়লে ঘোড়ামোবারককে দিয়ে সায়েস্তা করে নেবে। দশটা কুকুরের সামনে একটা মুগুর অনেক অনেক বেশি ফলবান।

মানু মিয়া ফের খেলার দিকে চোখ ফেরায়। ছোট, কুতকুতে চোখদুইটাতে জিজ্ঞাসা, — কী চাছ, খোলাসা কৈরা ক।
— আফনের ত অজানা কিছু না। সাতকাডার…
— জানি ত, অহন কী করতাম?

মানু মিয়া খেলার দিকে আর তাকায় না। জানালা দিয়ে তার চোখ চলে গেছে কালাইবিলের দিকে। খেলার শরীরটা জ্বলে। মানুষকে নিশব্দে অবহেলা করার এই বাজে কৌশলটা খেলার সহ্য হয় না। তাই সে খামাখা গলা খাকারি দেয়। এতে মানু মিয়া তার দিকে তাকায়। খেলা মাগনি কামলার কথাটা ঠিক খোলাসা করে বলতে পারছে না। দলের সবাই আড়ালে আড়ালে মানু মিয়াকে নিয়ে যতই তাচ্ছিল্য করুক কিন্তু সামনাসামনি তো মানু মিয়া মানু মিয়াই। তাই ইঙ্গিতে বোঝানোর ভাষাটাও এখন তার জবানে আসছে না। পাশে কাদু-কালুরা থাকলে খেলা মঞ্চের ভাষায় লম্বা ডায়ালগ দিয়ে জানিয়ে দিত, — বান্দার গোস্তাকি মাপ হয় জাহাঁপনা… ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সামনের লোকটা ত মানু মিয়া। তিন-চারটা বিল আর দেড় গণ্ডা টেক-টিলা নিয়ে সে সত্তর একর জমির মালিক। কিন্তু এখন সে বাদে মানু মিয়া, কাদু-কালু সহ গোটা দলটা অবসরে। আঘুন মাসের আগ পর্যন্ত এরা নির্ঝঞ্জাট। তখন বুনা আমন, রোপা আমন দুইটাই ঘরে তোলার ধুম পড়বে। সাথে থাকবে বরোখেতের দল (জার্মনি কচু, হেলেঞ্চা, কলমি ইত্যাদি আগাছা) সাফ করার হাঙ্গামা। আসলে মানু মিয়াদের জমি আর কৃষি আপনা বৌ-বেটির মতো একপেশে। পাঙসা। কিন্তু খেলাদের ক্ষেত-গিরস্তির ধরনটাই আলাদা কিসিমের। মানু মিয়াদের জমি বিল আর বিলপারের আন্দাকান্দা। খেলাদেরটা নদীর পারের বেলে দোঁয়াশ। তাদের গিরস্তি বারোমাস। ধানের পরে আলু, ডাল, সরিষা, পেঁয়াজ-মরিচ, তামাক। তাবাদে চৈতে আবার আউশ আর পাটের চাষ। আষাঢ়ে রোপা আমন। শাওন-ভাদ্দর পাটকাটা, পাট লওয়া। দম ফালবার ফুরসুৎ নাই।

খেলা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সোজা মানু মিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, — একদল মাগনি কামলা অইলে যুইত অইত।

মানু মিয়া খেলার কাছে এতটা আশা করেনি। বলতে গেলে খেলাই এখন ঘাটুদলের অলিখিত কর্তা। খরচের বেশিরভাগটাই এই হুজুগে ছোকরা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাবাদে খেলার এই বিনয় দেখে মানু মিয়া অনেকটাই নিশ্চিত যে, তার কর্তাগিরিতে সাম্বার দিতে সহসা কেউ আসছে না। তাই সে হাসিমুখে খেলার দিকে পিটপিট করে তাকায়। থোম্বা থোম্বা আঙুল দিয়ে লম্বা লম্বা পিঙলা চুলগুলা কপাল থেকে সরায়, — মাগনি কামলা কবে দরকার?
আমোদে খেলার চোখ দুইটা জ্বলে ওঠে, — আউজক্যা অইলে ভালা অয়।
— ঝক্কিত ফাললে দ্যাহি। টাইমত কইলে না?
— আমি কী ক্ষেতগিরস্তির খবর রাহি?

খেলার এই কথায় মানু মিয়া মনে মনে খুব খুশি হয়। গিরস্তের পোলা হয়ে খেলা ক্ষেতগিরস্তির খবর রাখে না! মানু মিয়ার জন্য কী অসাধারণ সুখের সংবাদ! তৃপ্তির সংবাদ! অপরিণামদর্শী মানুষরাই ধনবান থেকে খুব সহজে নির্ধন হয়। যার ধন নাই তার জনও নাই। যেমন আমজাদ ঢালী ধনে-জনে দিনে দিনে নির্মূল হয়ে আসছে। আমজাদ ঢালী চিরদিন তার প্রতিপক্ষ ছিল, আছে এবং আর কিছুদিন পর থাকবে না। খেলাও থাকবে না যদি সে হিসাবি না হয়ে ওঠে। মানু মিয়ার ইচ্ছা হচ্ছে একটা লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে কাদু-কালুর মতো গলা ছেড়ে ডায়ালগ দেয়, — এসো! এসো! হে তরুণ! জানি তুমি মোর লাগি বিভীষণ, তবু তুমি এক্ষণে মোর পঞ্জরের ভাই।

চন্দ্রাবতীর পুত্রগণ : আগের পর্ব
শেখ লুৎফর রচনারাশি

COMMENTS