কোয়েলো ও অন্যান্য অনুবাদানুবাদ

কোয়েলো ও অন্যান্য অনুবাদানুবাদ

কোয়েলো প্রথম পড়েছিলাম ২০০৫ সালের দিকে, এক সহকর্মীর উপর্যুপরি প্রশংসায় বিপর্যস্ত হয়ে, এমনিতে ইংরিজি রিডিঙে নেহায়েত ঠেকা ছাড়া হাউশ করে যাওয়া আমার ধাতে নেই। রিপোর্ট ইত্যাদি লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারার জন্য যৎসামান্য যেট্টুক ইংরিজি দরকার, কাট-পেইস্ট কারিগরিশিল্পের জন্য অত্যাবশ্যক যট্টুকু বোধগম্যতা, তারচে বেশি ইংরিজিস্কিল লভিতে পারিনিকো মুই, কিন্তু কম্ম সমাধার গরজে, নেহায়েত রুটিগৃহের চোখ-রাঙানি সামাল দিতে একটুখানি ইংরিজি তো কপ্চানো লাগে আপনারে-আমারে ছাড়াও পণ্ডিত-পামর নির্বিশেষে সবেরেই। এইটুকু অ্যাংলো-বঙ্গাল হওয়া আমলে না-নিলে মোটামুটি আমি বাংলায় হাসি বাংলায় ভাসি বাংলাতেই ফাঁস লাগিয়া মারা যাই যুগে যুগে ক্ষুদিরামের ন্যায়। কিন্তু বাংলায় ভালোবাসি কি না, তা বলা ডাইরেক্টলি কিছুটা-বা কম্পলিকেইটেড। ফোর্টিন্থ ফেব্রুয়ারি বিকেলবেলা আমি প্রীতিশুভেচ্ছা ও প্রচুর পার্ফিয়্যুম শরীরে স্প্রেপূর্বক গোটা-তিন ফেবুস্ট্যাট ও জোড়া পদ্য লিখিবারে উপগত হই ফি-বছর অধুনা ল্যাপ্টপে এবং অতীতে এক্সার্সাইজ খাতার পাতায়। এইটুকু অতি সংক্ষেপে আমার বাংলা সাংস্কৃতিক অ্যাকশন-রিফ্লেকশন। বছরে ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখে একসময় ইশকুলছুটির সুবাদে বেলা-বারোটায়-নিদ্রোত্থিত প্রভাতফেরি নিয়া কাব্য লিখিতাম, বর্তমানে চৌদ্দ ফেব্রুয়ারিতে ইনিয়েবিনিয়ে লিখিবারে বসি ল্যভস্যং অফ মাইসেল্ফ। তো, দুনিয়ায় ইংরিজি শিখিয়া না-শিখিয়া আমরা আরও কতভাবেই-না থাকি ইংরিজিবিভোর!

কথা হলো, কোয়েলো পড়ে কেমন লেগেছিল অথবা পাওলো কোয়েলো বিষয়ে আমার পজিশনপেপার আমি আশু প্রকাশিব নাকি এইধারা ধানাইপানাই গীত গাইয়াই যাইব — উত্তরমালা আপাতত অফলাইনে রাখা যাচ্ছে। কেবল বলতে বসেছিনু যে, একটা ওয়েবপত্রিকা হাতড়াচ্ছিলাম ওখানকার কোনো অপঠিত রচনা ফাঁকতালে গেল কি না রয়ে, পেলামও কয়েকটা, তার মধ্যে একটা পাওলো কোয়েলো কথামালা বাঙ্গালা তর্জমায়। সেই শুরুতে দ্য আলকেমিস্ট  পড়ার অব্যবহিত পরপর দ্য ইলেভেন মিনিটস্,  তারপর ‘মরিবার তরে ভেরোনিকা’, মানে, ভেরোনিকা ডিসাইডস্ টু ডাই, তারপর দ্য উইনার স্ট্যান্ডস্ অ্যালোন  হয়ে লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট পড়েছিনু ব্রাইডা । পাঠে জ্ঞানবুদ্ধি বাড়ে নাই একফোঁটা, আবার কমেছে বলেও বুঝতে পারছি না। পাওলো কোয়েলো পড়ে জ্ঞানীগুণী হইতে পারা যাবে এমন আশাও মনে ছিলনাকো বটে। অ্যানিওয়ে। ফুর্তি মিলেছে, বটে, শান্তি মিলেছে। এই লেখকের ইতিউতি ইন্টার্ভিয়্যু পড়ে একটা ব্যাপার মনে হলো, সংক্ষেপে ব্যাপারটা এ-ই যে, হুমায়ূন আহমেদও লৌকিক-অলৌকিক নিয়া আলোআঁধারিবিচ্ছুরক কথাবার্তা বলতেন, ম্যাজিক-ব্ল্যাকম্যাজিক নিয়া কায়কারবার কৌশলে গ্লোরিফাই করতে চাইতেন আলাপাড্ডায়-লেখায়জোখায়, এবং কমিবেশি দুনিয়ার বেস্টসেলার সমস্ত লেখকদের মধ্যে এইখানে একটা সাধারণ সাদৃশ্য গোচরীভূত হয় নিশ্চয়।

কোয়েলোর ননফিকশন একটা বই আমি ভিন্নতর মুগ্ধ নয়নে পড়েছিলাম — লাইক দি ফ্লোয়িং রিভার  — পড়ে ট্রায়াল দিয়েছিলাম কয়েকটা অনুচ্ছেদ বাংলাইতে বা বঙ্গানুবাদিতে, শেষে সেই চেষ্টায় দিয়াছি জলাঞ্জলি, সিরাতুল মুস্তাকিম ব্যাপারটা-যে কেমন ডিফিকাল্ট তা আবার আরেকবার পেন্সিল ভোঁতা করে টের পেয়েছিনু। বঙ্গীয় বইয়ের বাজারে একদিন অবাক হয়ে দেখতে পাই যে একাধিক ব্যক্তির অনুবাদে বেশ কয়েকটা পাওলো কোয়েলো আইটেম শোভা পাচ্ছে, পেপারব্যাক এডিশন দেখে বুঝতে পারি যে বৃহত্তর পরিধির পাঠক ধরার একটা সাধু উদ্দেশ্য নিয়াই আইটেমগুলা অ্যারেঞ্জ ও মার্কেট করা হয়েছে, একাধিক আইটেম কৌতূহলবশত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নেড়েচেড়ে দেখেছি কী কাণ্ড ঘটেছে ভেতরবাগে। এক তো হলো অনুবাদগন্ধ, দুই আড়ষ্ট বাংলা, তিন বুকিশ ভাবভঙ্গিমা, চাইর নম্বরে যেইটা সেইটা আরও গুরুতর, গল্পকিচ্ছা অনুবাদের জন্য যা মাস্ট, প্রবন্ধটবন্ধ অনুবাদে এইটা না-হলেও চলে কিংবা পাঠক নিজদায়িত্বে চালায়ে নিতে পারে, সেইটা এ-ই যে, যে-জায়গাটার গল্প সেই জায়গার হিস্ট্রি-জিয়োগ্র্যাফি-কাস্টম-কাল্চার-রিচ্যুয়াল-রঙ্গঢঙ্গ সম্পর্কে একটা আন্দাজ না-নিয়ে ট্র্যান্সল্যাশন লিখতে বসে যাওয়া জাব্দাখাতার বোন্দা সামনে নিয়া। পাওলো কোয়েলোর যত অনুবাদ বাজারে বেরিয়েছে, একবার সেইগুলা ভালোমতো এক্সামিন করে এখানকার চালু ট্রেন্ড অনুবাদহিড়িক নিয়া ইনভেস্টিগেইটিভ ও প্রব্লেম-সল্ভিং লেখালেখি করা গেলে একটু উপকার হইত হয়তো, কে জানে, অপকারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেবার নয়।

অ্যানিওয়ে। যে-হারে এখন অনুবাদিত হচ্ছে গল্প-উপন্যাস, এবং যেই ধাঁচে ও যেই মানে, এরচেয়ে ইংরেজি টেক্সটগুলো সুলভ করে তুলতে পারলে এই-মুহূর্তের যারা পাঠকগোষ্ঠী তারা নিজেরাই অনুবাদক হয়ে উঠতে পারতেন বলিয়া আমার একটা আন্দাজি বিশ্বাস দৃঢ়মূল হচ্ছে দিন-কে-দিন। কথাটা আন্দু নয় কিন্তু! আমাদের যারা পাঠকগোষ্ঠী, এখন অব্দি, এরা ইংরেজি জানে অ্যাট-লিস্ট বাংলার চেয়ে বেশি। আমাদের পরবর্তী সময়ে যারা ইশকুলে পড়ে বেরিয়েছে তারা তো বাংলা বলতে গেলে গীতা-কোরানের ন্যায় নমঃনমঃ করে সেরে এসেছে, এরচেয়ে ইংরেজিটা ভালো শিখুক না-শিখুক অন্তত ভ্যালু দিয়ে জেনেছে যেটুকু জানুক, এদের একটা প্র্যাক্টিসপ্যাড হইতে পারত কোয়েলো; বা তার আগের জ্যাক লন্ডন বা আগাথা ক্রিস্টি প্রমুখের ইংরেজি টেক্সট চোখের সামনে রেখে দেয়ার ব্যবস্থা করলে অনেক বেশি লাভবান হইত আমাদের সমাজ, আখেরে আমাদের গোটা সাহিত্যটাই।

একই কথা খাটে ইভেন কবিতার বেলাতেও। কবিতা পড়েন মূলত কবিতাচারী তথা কবিরাই, কাজেই কবিদের ইংরেজিটা ভালো জানা হয়ে গেলে নিজেদের লেখাপত্রগুলা আরও সহজতর হইত, অনেকার্থদ্যোতক হইত সহজেই, কিন্তু বইয়ের বাজারে এখন কিছু টেক্নিক্যাল বইয়ের ইংরেজি টেক্সট ছাড়া কাহিনি-খোশগল্পের ইংরেজি বইগুলো প্রথমত সহজলভ্য নয়, দ্বিতীয়ত অগ্নিমূল্য, তৃতীয়ত বইতাকিয়ায় বিরাজমান ইংরেজি বইগুলা নামজাদা রাইটারদিগের মশহুর প্রাইজ-বাগানো ফেমাস ও অ্যাম্বিশ্যাস প্রোজেক্ট, সাহিত্যের হার্ডকোর পাঠক না-হলে পরে একেবারে কমন রিডারের হজমের পক্ষে যা রিয়্যালি ডিফিকাল্ট। তবে একটা কথা হলো যে, — না, থাক, ব্যাকপেইনেরে একটু সমীহ করা দরকার এবার, টাইম তো ‘দি এন্ড্’ কার্ড দেখাইবার নিকটতর প্রায় — এইখানে আর না বরং, বাদ-মে বাতচিত হোবে, ফির বোলেঙ্গে।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৪

… …

গানপার

COMMENTS

error: