তুমি
শহরের ভূগোল জানার আগেই জেনেছি তুমি এক বিষণ্ন হরিণ
মোড়ে মোড়ে যার ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের চিঠি
আর—
তোমাকে ভেবেছি বিভ্রম, যেন গত শতকের অনাবিষ্কৃত পুথি।
হিজল-কড়ইয়ের গ্রাম
গ্রামের কথা মনে পড়লেই আব্বার কবরের কথা মনে পড়ে
একটা অন্ধকার রাতে আরও অন্ধকার কবরে
তাকে রেখে এসেছিলাম আমরা—
বাড়ির কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে
একটা প্রান্তর জুড়ে বিছানো সবুজ কাঁথার কথা
স্নেহের ভাষা ছিল কি না জানি না
কিন্তু প্রাণে ছিল টইটম্বুর বর্ষাকাল—
আর আষাঢ়? সেসব গল্প তো নিজের কাছেও অচেনা
যেন, দৈত্যদানবের গল্প বলতে বসেছি নিজের ছায়ার সঙ্গে
তাই—গ্রামের কথা বলতে চাই না,
গ্রামকে মনে করতে চাই না
বলতে চাই শহরের কথা; শহর আমায় চেনে না—
তোমাকে চেনে কি না জানি না
তবুও হিজল-কড়ইয়ের দিকেই যাই
রহস্যউপন্যাসের মতো সেখানে কোনও নায়ক নেই
পৃষ্ঠা জুড়ে অন্য ভাষার মুখ হয়ে উঠছে মানুষ।
হিজল-কড়ইয়ের গ্রাম।
শীতকালের দিকে তাকিয়ে
এই পথ পেরিয়ে যেতেই ফিরে পেলাম শৈশব
তোমার দিকেই যাচ্ছিলাম, আর নাকে লেগেছিল শিউলির ঘ্রাণ—
শীতকাল আসবে বলে অপেক্ষায় ছিল, সেও এক দুঃখী কবরস্থান
কবরের চেয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে উঠেছে আমার প্রেম
বারবার গুহাবাসীর কাছে,
জনারণ্যের মহাকাব্যে বা পার্থিব পৃথিবীর দিকে
ভুল ঠিকানার সন্ধানে—মানুষের মতো
ভালোবেসেছিলাম
তারপর দীর্ঘ বিরতির দিকে দাঁড়িয়ে
গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত ট্রাফিক
হেমন্তের দিকে গেল—আবারও মৃতদের দুনিয়ায়
শ্মশানঘাট বা কবরস্থানে বসে থাকা বিষণ্ন পেঁচার মতো
সময়কে ধরতে গিয়ে গায়ে মাছেদের ঘ্রাণ নিয়ে ফিরি—
আয়নায় তাকাতেই দেখি তাকিয়ে আছো
আজিমপুর
আজিমপুর যাই মাঝে মাঝে
বিকল্প রাস্তার সন্ধানে অথবা বাধ্য হয়ে
কবরস্থানের সামনে দিয়ে যাবার সময়
নিজেরেও তাদেরই মতো মনে হয়
জীবনে নাই
বাস্তবে নাই
অর্থনীতিতে নাই
প্রেমে নাই
রাজনীতিতে নাই
তবুও বেঁচে থাকার নাম করে বাতাস খাই রোজ
আব্বা
উইন্ডমিল—
গভীর সমুদ্রের মতো গোপন
তার যাত্রার কথা নেই ইতিহাসে—যেন ঘুমন্ত অক্ষর
যাকে ভালোবাসে রহস্যপ্রবণ মাছ
আমাকে বরং অরূপের কথা বলো
আম্মার জানলা এড়িয়ে প্রতিদিন
যেভাবে বাড়ি ফিরে তার বেড়াল!
বুদবুদের মতো বেহিসেবি এই পথে নামুন
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায়
একটি বিষণ্ণ তালগাছ।
শীতকাল
শীতকাল ফুরিয়ে গেলে শুরু হয় ঘ্রাণের জগৎ—
চিরকুটে এইটুকু ঠিকানাই লিখা ছিল
তারপর বংশলতিকা ঘাঁটতে গিয়ে জানা গেল
ঘন কালো জলাশয় ছিল তার পিতামহের আশ্রয়
ব্রহ্মার জন্মেরও আগে যিনি মানুষের জন্য তারই ভেতর
মানুষ নামের একটা দেয়াল তৈরি করেছেন;
কে জানত,
নৃতাত্ত্বিক ছাড়াই আজ যা আবিষ্কার করে বসে আছি আমরা!
চারিদিকে এত মুর্ধণ্য ফুটে আছে—যেন
তোমাদের নগর জুড়ে সব শীতের মাস্তুল ভেঙে ফুরিয়ে যাচ্ছে ঋতু
ঠিকানা হাতে নিয়ে যে-কিশোর পূর্বপুরুষের ঠিকুজি জানতে চাইছে
তাকে বলে দিচ্ছো ঋতুর উদ্ভব ও গন্তব্যের কাছে যেতে
বসন্তের চিঠি
রোদ উঠলেই বসন্তে চলে যাব
মোহগ্রস্ত রূপান্তরকামী শীতকাল আর ভাল্লাগে না;
এরচেয়ে বরং একটা ডাবল ডেকার হয়ে যাওয়া ভালো
ভেতরে শীত ভর্তি করে যাত্রীদের নিয়ে চলে যাব
পিছু পিছু আসবে বসন্তের চিঠি
শহরময় বেড়ে গেছে বুধবার—
তোমার রহস্যের ভেতর থেকে শাখাপ্রশাখা নিয়ে
হারিয়ে গেছে ঋতুর সৌন্দর্য—
কতদূর যেন তার গন্তব্য?
না-জেনেই ভুলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে
আবারো রোদের দিকেই চলে যাই—
রোদ উঠলেই বসন্তে চলে যাব
তোমার নাম কি বসন্ত?
তুমি কি হৃদয়ের কাছে কিছুটা শীত জমিয়ে রেখেছো
শীতেরও কি নাম তোমার কাছে ভুল চিঠির সমান?
ফিরে এসো রহস্যব্রিজ অতিক্রম করে—
বলো শীত-বসন্তে আর হেমন্তের ঘ্রাণে সবারই
মুঠো ভরে যাবে সোনাফলা রোদে।
শীতকালের দিকে তাকিয়ে বসন্তের চিঠি ও অন্যান্য || ইলিয়াস কমল || মার্চ ২০২৬ গানপার
ইলিয়াস কমল রচনারাশি
গানপার কবিতার, কবিতার গানপার
- শীতকালের দিকে তাকিয়ে বসন্তের চিঠি ও অন্যান্য || ইলিয়াস কমল - March 25, 2026
- পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ আসলেই একটা দুর্ঘটনা || ইলিয়াস কমল - March 17, 2026
- সিনেমাতামামি ২০২৫ || ইলিয়াস কমল - March 8, 2026

COMMENTS