শিশুকাল মানে একেবারেই ডিমকালে, যখন নতুন নতুন স্কুল, বইখাতা, বন্ধুবান্ধব সবই নতুন। নতুন নতুন পরিবার, সমাজ, সম্পর্ক, প্রথা, অনুষ্ঠান, উৎসব এগুলো বুঝতে শিখছি। তখন আনন্দের উপলক্ষগুলি শিশুমন ঠিকই মনে রাখত। সেই দিনগুলোতে আমরা সবাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আনন্দের দিন-খনের খবর রাখতাম, হোক সে পূজা, হোক সে ঈদ।
রোজার ঈদটা ছিল সার্বজনীন। বিধিনিষেধের সমাপ্তির উদযাপন, সকলের জন্য। এখনকার মতো মোরাল পুলিশিং না থাকলেও সামাজিক সীমাবদ্ধতা বা দায়বদ্ধতা কারণ যা-ই হোক,অরোজাদাররা লুকিয়ে খাবার গ্রহণ করত। তাই রোজার শেষে প্রকাশ্যে খাবারের স্বাধীনতা সকলেই উদযাপন করতাম।
কুরবানির ঈদ আমাদের অঞ্চলে “বখরা ঈদ” নামে পরিচিত। বখরা মানে ছাগল। গড় সাধারণ ছাগল কুরবানি দিত বলে হয়তো। বিত্তবানরা ছাগল, গরু দুইই কুরবানি দিতেন। অমুসলিমরা এই দিন স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী থাকতেন। গো-হত্যা হয় বলে নয়, বরং যে প্রক্রিয়ায় হত্যা হয় তার জন্যে। প্রথমত পশুটি জবাই হতো যত্রতত্র, উন্মুক্ত স্থানে, “পশু জবাই”-এর মতো পারফর্মিং আর্ট সমাজের সকলের জন্য উপভোগ্য নয়। বিশেষ করে শিশু ও দুর্বল চিত্তের মানুষের জন্য। কুরবানিপরবর্তী ময়লা পরিষ্কারের জন্য আমরা বৃষ্টির অপেক্ষা করতাম। সেই সময়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক ধারণা ছিল না বললেই চলে। পৃথিবীর নানা স্থানে প্রাণিহত্যা ঘেরা দেয়া জায়গায় হয়, আমাদের এখানেও হতে পারত “কুরবানস্থান”। যেখানে একসাথে শত পশু জবাই করা যাবে, অটোমেটিক মেশিনে চামড়া খোলা যাবে তিন মিনিটে। ওখানেই ব্যবস্থা থাকবে ব্যবসাবাণিজ্যের। যারা বিক্রি করবেন নগদে পাবেন, যারা দান করবেন আখেরাতে পাবেন। দানের চামড়ার অর্থ সমানভাগে এলাকার সব মসজিদ-মাদ্রাসায় ফিরতে পারত। সমাজে এক ধরনের সাম্য আসত, বিশেষত মাদ্রাসা-এতিমখানার শিশুদের জন্য দিনটি আরো আনন্দময় হতো।

শিশুকালে কুরবানিটা মেনে নেয়া কষ্টের ছিল। তার প্রধান কারণ পশু যারই হোক, হাট থেকে কুরবানি অব্দি সকল শিশুই পশুটাকে যত্ন করার সুযোগ পেত। কেউ পাতা পেড়ে আনত, তো কেউ গোসল করাতো। একটা মায়া হতো পশুটার জন্য। প্রাণিটার সাথে সাথে শিশুমনেরও কুরবানি হতো।
চাঁদ দেখা কমিটি তখন ছিল কি না মনে নাই, তবে একফালি “উৎসবচাঁদ”-এর জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম রমজানের ঊনত্রিশতম দিন থেকে। ঝাঁকে ঝাঁকে কইতরের সাথে আমরা ডিম, আন্ডা, ছানা সবাই ছাদে জড়ো হতাম হাইঞ্জাকালে। কোনো বছর বৃষ্টির কারণে চাঁদ দেখা না গেলে তখন ভরসা টিভি ও “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে”। আমরা দুই ভাই পিঠাপিঠি বড় হয়েছি, যখন তখন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতাম। আমরা শিখলাম আরো এক ধরনের জড়িয়ে ধরা আছে যাকে বলে “কোলাকুলি” এবং তা ঈদের নামাজের পর করতে হয়! ঈদের দিন বড়দের সালাম করলে “সালামি” পাওয়া যায়।
পায়েশ ও ফিরনির তফাৎ তখনো বুঝতে শিখিনি। হরেক রকমের সেমাই, জর্দা নামক মিষ্টিভাত, ফিরনি আমাদের জীবনে প্রথম ঈদের থেকেই পাওয়া। “অল্প খাইতে হয়, অল্প পরতে হয় / মানবজন্ম লইলে অল্প ঘুমাইতে হয়”—জীবনে সংযমের এই বোধ প্রথম রমজানই শিখিয়েছে। আর না-পাওয়ার সব বেদনাই কুরবানি।
ঈদ কল্যাণময় হোক, ঈদ মোবারক হোক।
রচনাকাল : ২০ মার্চ ২০২৬
মনোজ দাস রচনারাশি
গানপার গদ্যসম্ভার
- কেন লিখি? || হামীম কামরুল হক - April 17, 2026
- মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান - April 12, 2026
- শামীম কবীর : দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান || শাহ মাইদুল ইসলাম - April 12, 2026

COMMENTS