আনাড়ি
‘আমি ফুল না-হয়ে কাঁটা হয়েই বেশ ছিলাম’
কাঁটা হয়েই ছিলে বেশ
ফুল হইতে গেলে কেন আবার —
(বোকারাম বৎস্য!
লোকে এলায় লিচ্চিন্তে শিকার করিয়া যাউক মৎস্য;
তব স্কন্ধে স্থাপিয়া পা আর গুম্ফে দিয়া তেল
করোটিতে ভেঙে খাক পক্ক বেল, ঝুনা নারিকেল)
জলসা নীরব এখন, লেটোর দলের, যাত্রাপালাটিয়ার
ময়দান থেকে ভেসে আসছে বাজনা দামামার
বাতাসে কেশর-ফোলানো অভিমান — কার!
নার্গিস — না প্রমীলার!
আই হেইট ল্যভ স্টোরিস
‘পৃথিবী আমারে চায়’
বেঁধে রেখো তবু ওগো দজ্জালিনী প্রিয়তরা
যেতে নাহি দিও গো আমায়
এ-ই তো জন্ম, ওগো, জন্মান্তর নগদে এ-ই
নাচে মৃত্যু — নাচে জরা — চারিপাশে নেচে বেড়ায়
মৃদঙ্গ-মন্দিরা ছাড়া কালের কল্লোল ধেই-ধেই
দিলে যদি খুলে বাহুডোর —
পশ্চাতে কেন তবে বেজে ফের উঠিল নূপুর!
রিনিকিঝিনিকি — নিটোল পায়ের বোল — মহামায়ামাদলের সুর …
মাটির ময়না
‘তার ভবের বেড়ি পায়ে জড়ানো
উড়তে গেলে পড়িয়া যায়’
ভবের বেড়ি পায়ে-জড়ানো
পাখি
উড়তে গেলে পড়িয়া যাইবা
জানিয়াও তুমি দিবার চাইছ উড়াল
উড়ালের বেলা মাটিতে-ঝোঁকানো
আঁখি
ফিরে দেখতেসো ব্যাকুলা এ-পার্থিবা
ডানাহীনতার বেদনাই ইহকাল
পাখিটা
‘পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়’
পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়
দেহ শুধু উল্টাপাল্টা বাজনা বাজায়
পাখিটা নাই জিরোবার বিজন ভিটা
দানা খায় যখন যা পায় খাট্টামিঠা
বাতাসের সঙ্গে তাহার গাঁটছড়া আর
চুপিচুপি দিওয়ানা সাঁই নিরঞ্জনার
প্রেমে ফেঁসে নাস্তানাবুদ এই পাখিটার
ত্রিভুবন গনগনে এক অগ্নিগিটার
সে-গিটার উগরাইছে একের পরেক
ড্রাগন আর ডাইনি বিয়ে এবং নিষেক
জন্মিছে রাত্তিরে রোজ রঙিন পেরেক
পেরেকের পিতামাতা ডাইনি-ড্রাগন
সারাদিন ত্রয়ীর তুমুল প্রলয় মাতন
এরই নাম জীবন সখা যাতনাযাপন
পাখিটা মানছে না আর শাসন-বারণ
লোকে বলে এইগুলো সব ট্র্যাশ রাইটিং
ভাবেসাবে বাঘ যদিও হাওরফড়িং
এ-ই তো করছ তুমি ভুল অনুবাদ
এইগুলা আমার তো নয় পাখির প্রমাদ
এইগুলা আমার তো নয় পাখির প্রমাদ
পাখিটার ফুরাইছে দিন … ফুরাইছে রাত …
নয়নের আলো
‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’
কিন্তু চোখদুটো রেখেই-বা কী হবে —
খেয়ে নিও বরং পয়লাবারেই, ঝটাপট, অ্যাপিটাইজারের মতন
ওই দুটোতেই তো সমস্ত স্বাদনির্যাস জমা করে গেছি জীবনভর
কাজেই কিছুমাত্রও যদি ভোজনরসিক হও তুমি
গিলে ফেলো ও-দুটো হামানদিস্তায় বেরেস্তা বানিয়ে
এবং শুরুতেই, বিসমিল্লায়, দিরং না-করে অবিলম্বে
তাতে চেখে নিতে তোফা লাগবে দ্যাখো অন্যান্য অঙ্গগুলো
রয়ে-সয়ে খেয়ো, ভগ্নি ও বৎস্য, হুড়াতাড়া না-করিও
প্রণয়পাখি, প্রিয়!
তল-উপর দেখেশুনে খেয়ো তারিয়ে-তারিয়ে
বলতে চাইছ দর্শনেন্দ্রিয়ের সাধাহ্লাদ, অচরিতার্থতা
আর চড়ুইভাতির অভিলাষ — এইসব নিয়া মাতম করব আমি!
“কী-বা হায় আসে-যায় তারে যদি কোনোদিন না-পাই”
বা ধরো যদি পেয়েও যাই আবার — মম চিত্ত থোড়াই তৃপ্ত হবে তাতে
কেননা আসমুদ্রবিন্ধ্যাচল জুড়ে খেলানেলা করে যায়
দেখারাম-খেলারাম নামের দুই ভায়রাভাই
উহাদের সনে যেন কোনো না-হয় আশনাই
এইটুকু শুধু চাইছি, সখা, চাই শুধু এইটাই
নিশ্চক্ষু অথবা চক্ষুষ্মান — ব্যাপার না আদৌ
গোটা দুনিয়াটাকে যেন অবিকল প্রথমবার পাবার মতন প্রত্যেকবার পাই
না-হলে নাক-চোখ দিয়া আমার হয় আমড়াটাই
ক্যাক্টাস
‘ক্যাক্টাস তুমি কেঁদো না
আমারও কান্না আছে
কাঁদি না তোমারই জন্য
তুমি ভেসে যাও পাছে’
ক্যাক্টাস কাঁদছে
যেমন পাথর ও তথাগতবচন
অথবা বাংলা গানের কবীর সুমন
অবসর বুঝে একটু রোদন ও রঙঢঙ
করে নিতেসে ঘনানো সন্ধ্যাপ্রাক্কালে একটা ভাঙা ভায়োলিন
যেহেতু তুমি নিঃসামর্থ্য মুকুটের কাঁটা বা পাখনাদাহ অপনোদনে —
এসব নিয়ে একটা গানও গলায় নাই কি না;
গাইতে পারতেসো না পাঁচালির ধাঁচে একটা শান্তিসুবচন
বরং অক্রিয় অক্ষমের আস্ফালন করে যাও
ওর মুখপৃষ্ঠায় এর পাঁচিলে দেগে রাখো দগদগে ঘেন্না
গালিগালাজ ও অনভিপ্রেত অহং প্রকাশিয়া ভাবো খুব হলো
সভ্যতাসান্ত্রীর দায়িত্বপালন, দমকলকর্মীর কাজ
খোলনলিচা সারাইগৃহে তোমার নিজেরই সর্বাগ্রে যাওয়া দরকার আজ
তবলা
‘তুই হাততালি দিলে জাকির হোসেন
তবলা বাজানো ছেড়ে পায়রা পোষেন’
আল্লারাখাতনয় না-হলেও তবলা আমি ঠিকই বাজাই
আঙুলে ও ওষ্ঠাধরে, মুখজ মধু ও আগুনে, তুলতে পারি
বোল মাতোয়ালা
একাগ্র অভিনিবিষ্ট শ্রমে-ঘামে-প্রেমে
কুশলী শিল্পীর কায়দায় করি আলাপ ও ঝালা
তুমি জানো তবলা বাজাতে যেয়ে কোনোদিন আমি
নিঃশেষে তৃপ্ত ও শ্রান্ত হই নাই
চিরকাল আমি ঘুমনিদ্রা হারাম করে তবলা বাজায়া যাই
তারপরও যদি বলো আমার আঙুলে ও ওষ্ঠে
ফোটে না তবলজোড়ের কুঁড়ি ও বোঁটা —
ডাহা মিথ্যা শুনে দ্যাখো দুয়োধ্বনি দিয়ে ওঠে ওই
পাঁচিলের পাতিকাউয়াটা
আপাতত এটুকুই বিবরণ পরিস্থিতির
এইবেলা কারণ দর্শাও
পায়রা পুষতে কেন যাবে না ভারতশ্রেষ্ঠ উস্তাদ জাকির?
পারমিতা
‘সাবধান হও পারমিতা
আমার গানের দেহ চিরে
আগামীর সমালোচকেরা
তোমাকেই পেয়ে যাবে ফিরে’
তোমারে নিয়া আমি
বাঁধিনি গান কোনো
অথচ দিবাযামী
দোনোমোনো
তোমারে ছাড়া আর
কী আছে বাঁধিবার
পাষাণে বানালে যে
প্রসন্ন
তোমারে এইভাবে
রচিয়া যাই যদি
হৃদয়-কিংখাবে
বনৌষধি
দুনিয়া ভেবে সারা
কে তুমি তুতুতারা
নাকি শ্রী গৌতমের
তরুবোধি?
তোমারে হেরিলেই
শিল্প মূর্ছা যায়
ধৃতিসামর্থ্য কই
ভূবাংলায়?
আশায় বাঁচি তবু
ধরিতে মধুধারা
রাধিকাহন্তা এই
অশ্লেষায়
দিতেছে যারা আজি
তোমার গায়ে ধূলি
বিপুল হিংসাগান
পদাবলি
তাদের জন্য থাক
ধার্য মহাকাল
সমসাময়িকের
অঞ্জলি
কিন্তু তুমি দিও
ওদেরে উপমা
তারা তো হতে চায়
তিলোত্তমা
দাসেরে দিও শুধু
গোপনে পদমধু
করিতে দিও তব
তর্জমা
না-চাহি কিছু আর
গীতা বা সংহিতা
চপলাধুনিকতার
ওজস্বিতা
চাইছি থাকো তুমি
ফলাতে প’ড়ো জমি
যে-তুমি কবীরের
পারমিতা।
সুমনভাঙা গান
‘সেইখানে হবে দেখা…’
তার আগে এইখান পেরোনো দরকার
এইখান পেরোনো সহজ কথা নয়
তেমন কঠিনও নয় বোধয়
পগারের পার হইতে চাইলে তো উত্তম অতিশয়
এইখানে এইসব হইতেই পারে এবং হয়
এইখানটা খানিক দুঃখ-জরা-ধান্দামান্দা-জালজুচ্চোরময়
এইখানে কেবল জগাখিচুড়ি দিনরাত আর রাত্রিদিনের জয়
এইখানে থাকাথাকি নিয়া পাকাপাকি চিন্তাভাবনা আদৌ সম্ভব নয়
তবু সকলে প্রত্যেকে তাহা করে নিশ্চয়
এইখানে টেম্পোরারি টাল্টিবাল্টি দিয়া দুনিয়া জিনিতে হয়
এইখান থেকে সেইখানে যাইবার ট্র্যানজিশন স্মুথ নয় সবসময়
এতকিছুর পরে এইখান ছাড়িয়া যাইতে কেউ সহসা রাজি নয়
সেইখানে — হেন হট্টমেলা ফালায়া — আমার যাইতে মনে লয়
যেইখানে হবে দেখা
তোমার সঙ্গে একা…
জাহেদ আহমদ
জাহেদ আহমদ রচনারাশি
গানপার কবিতার, কবিতার গানপার
- ছায়াছন্দ - February 16, 2026
- ফুলঝরি - February 4, 2026
- উইথ অ্যাপোলোজিস টু ইদম শাহ - February 3, 2026

COMMENTS