রবি ঠাকুরকে ঠাকুরপুজো করা বাঙালির অনেকদিনের অভ্যাস। এই ফুল বেলপাতায় যদি মনের অশান্তি বন্ধ থাকে খারাপ হয় না। কিন্তু মনের অশান্তি শুধু রবীন্দ্রসংগীতে যাবে বলে মনে হয় না। সেজন্য ব্যাপারটা ভেবে দেখছিলাম।
রবীন্দ্রনাথ বলতে বাঙালির মনে দু-রকম লোক আছেন। এক রবীন্দ্রনাথ অনেক গান লিখে গিয়েছেন, সময়-অসময় গাওয়া চলে। অনেক কবিতা লিখেছেন, সময়-অসময় বলা চলে। গল্প নাটকও লিখে গিয়েছেন, বিয়েশাদিতে কাজে লাগে। সাহেবরা বোধকরি এই রবীন্দ্রনাথকে কী একটা পুরস্কার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের খ্যাতিতে বাঙালির খ্যাতি হয়। সেইজন্য এই রবীন্দ্রনাথকে আমরা মাথায় করে রাখি।
কিন্তু অন্য একজন রবীন্দ্রনাথ আছেন। তিনি ঈশ্বরের ভক্ত, কী যে বলেন ঠিক বোঝা যায় না। বিজ্ঞানের নিয়মটা মেনে চলেন বিশ্ববিধান বিজ্ঞান মেনে চলবে বলেই বোধহয়। কিন্ত তা হলে হাত দেখা কি উঠে যাবে? এসব কথা ভাবতে বাঙালির বড় একটা ভালো লাগে না। উপনিষৎ বলেছে এবং রবীন্দ্রনাথও বারবার বলেন : সেই আনন্দ হইতেই এই ভূতগুলি উৎপন্ন। বাঙালি না-হয় মানুষ হয়নি, সেজন্য তাদের ভূত বলা উচিত নয়। নেহাত সংস্কৃত জানি না বলে চুপ করে থাকি।
এই রবীন্দ্রনাথই আবার শহরের লোককে গ্রামে যেতে বলেছেন। মুক্তি যদি হয় তা হলে গ্রাম থেকে হবে এরকম অভিসন্ধি। কিন্তু গ্রামের জীবনে অনেক অসুবিধা সেকথা কাউকে বলতে হয় না। শহরের লোক গ্রামে ভিড় জমালে গ্রামের সমস্যার কোনও সমাধান হবে বলে মনে হয় না। অথচ রবি ঠাকুর এই গ্রামের গীতাটা কখনও ছাড়েননি। বাঙালি তাঁর এই নির্দেশকে কিন্তু চিরকালই পাশ কাটিয়েছে।
এ ছাড়া আর একটা কথা এই দ্বিতীয় রবি ঠাকুর বলেছিলেন, সেটা কিন্তু বাঙালি কোনও দিন মানতে পারেনি। পরীক্ষা আর চাকরি না হলে বাঙালির চলে না। রবি ঠাকুর একটা শিক্ষার প্রথা ভেবেছিলেন যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে না। খুব স্বাভাবিক কারণেই এর মধ্যে বাঙালি নেই। গাছের তলার ক্লাস ভালো জিনিস কিন্তু পরীক্ষা থাকবে, ডিগ্রি আসবে, পরে চাকরি মিলবে। এ না হলে সেই ক্লাসে বাঙালিকে পাওয়া যাবে না।
এর পরের কথাটা আরও মারাত্মক। বাঙালি বলতে আমরা তো ভাগীরথী তীরের উচ্চবর্ণের শহুরে মধ্যবিত্ত বুঝি। পদ্মাপারে যে অনেক উৎকৃষ্ট বাঙালি আছেন, তারা তো এই বর্ণনায় থাকেন না। আবার সত্যকার গ্রাম-সমাজও এই গণনা থেকে বাদ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের একের সাধনায় এ সবই মিলবে। ভাগীরথী আর পদ্মা এক হবে। গ্রাম আর শহর মিলে যাবে। সেই সমাজের বাঙালি বোধকরি এই সমাজের বাঙালি হবে না। কিন্তু সেকথা ভাবার আগে অন্য দুটো কথা একটুক্ষণ ভেবে নিই।
রবি ঠাকুরের জীবনবোধে একটা সৌন্দর্য ছিল যেটা ভাগীরথী তীরের বাঙালি বোঝে। বাঙালি জীবনের সমস্ত শ্রীটুকু এক জায়গায় করে বাড়িয়ে তোলার পথ বলে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই পথ নেওয়া না হলে বাঙালির রাগ তো হতেই পারে। ভগীরথ সমাজের বাঙালি রবীন্দ্রনাথের কিছুটা নিয়েছে কিছুটা নেয়নি। যেটুকু নিয়েছে তার মধ্যে এই সৌন্দর্য পড়ে। সেজন্য মনে হয় সুন্দরের অবক্ষয় দেখলে বাঙালি রাগ করতেই পারে।
অন্য একটা জিনিস এই সূত্রে মনে আসে। সেটা বাঙালি বা রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন কি না জানি না। কিন্তু সেই ঘটনা ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মধ্যে একটা ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, ভালো-মন্দের বোধ তৈরি করতে পেরেছেন। এই বোধটুকু নিয়ে বাঙালি কী করবে সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। খুব যে একটা বীরত্ব দেখাবে এমন মনে হয় না। আবার অনলসভাবে কাজ করবে সেটাও ঠিক না। কিন্তু ভালো জিনিসকে ভালো বলে বুঝতে শেখাও একটা মস্ত লাভ। রবি ঠাকুর বাঙালিকে সেই বোধটা দিয়ে গেছেন।
ছোটর মধ্যে অল্প কথায় রবি ঠাকুর ও বাঙালিদের কথা বলা হলো। এবারে একটু হিসাব করি। রবি ঠাকুরকে পুরোপুরি কখনোই বাঙালি নেয়নি। কিছুটা নিয়েছে, কিছুটা নেয়নি। যেটুকু নিয়েছে, মনে হয় এখন সেটুকুও রাখা যাচ্ছে না। আর যেটুকু নেয়নি তার মধ্যে থেকে মস্ত একটা নালিশ উঠেছে। অর্থাৎ এই যে বিয়েবাড়ির রবি ঠাকুর, ইনিই বাঙালির নতুন সৃষ্টি। যে রবি ঠাকুরকে বাঙালি নিয়েছিল তাকেই শেষ পর্যন্ত এই মূর্তিতে দাঁড় করিয়েছে। আর অন্য রবি ঠাকুরটির সঙ্গে একেবারেই বাঙালির বনিবনা হয়নি। বাঙালি ডিগ্রিও চায়, নিশ্চিন্ত চাকরিও খোঁজে। রবি ঠাকুর এর বিরুদ্ধে কিছু বললে বাঙালি মানবে না। সেজন্য ঠাকুরপুজোটা ইদানীং খুব বেড়ে গিয়েছে। ফুল বেলপাতার পরিমাণ যদি বেশি হয় তা হলে মনের অশান্তিটা চাপা থাকে।
বাঙালি যদি ঘটা করে রবি ঠাকুরকে পুজো করে তা হলে এই সন্দেহ ওঠে না যে বাঙালি রবি ঠাকুরকে ঠিকভাবে নেয়নি। তবে কিনা একথাও সত্য যে ইদানীং রবি ঠাকুর থেকে বাঙালি বেশি করে সরে আসছে। বাঙালি রবি ঠাকুরকে পুরোপুরি নিক বা না-ই নিক, এখন যে একেবারে দরজা দেখিয়ে দেওয়ার মতন মেজাজ দেখি, এটা আগে ছিল না। কাজেই মনে হয় দুটো কথাই সত্যি। বাঙালি কোনোদিন রবি ঠাকুরকে নেয়নি সেটাও যেমন সত্য তেমনই সত্য যে এখন বাঙালি জীবনে রবি ঠাকুরের বড়ই দুর্দশা। এর জন্য দায়ী অবশ্য সাধারণভাবে সমাজের সংকট। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য দুটি কথা আর-একবার ভেবে নিই।
রবি ঠাকুর বাঙালি জীবনে সৌন্দর্য খুঁজে ছিলেন। এই সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায় যদি জাতি তার ঐতিহ্য খুঁজে পায়। ‘সুন্দর’ আছেন জাতির জীবনে, সকলের অন্যমনস্ক ব্যবহারে, সেই সুন্দরকে সজ্ঞানে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই জাতির মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ঐতিহ্য খুঁজে পাননি (মনে পড়ে ‘না করে অভিবাদন, না পুছে কুশল / পিতৃনাম শুধাইলে উদ্যত মুষল’?)। কলকাতায় বসে ঐতিহ্য কোথাও চোখে পড়ে না। বরঞ্চ গুজরাটে বা তামিলনাড়ুতে তাকালে ঐতিহ্যের সন্ধান চারদিকেই দেখি। রাজস্থানের তো কথাই নেই। সেখানে বিদেশিরাও এসে ভারতবর্ষকে দেখে যান। এই ধরনের ঐতিহ্য বাঙালির কোনোদিন ছিল কি না সন্দেহ জাগে। মনে হয় উত্তর ও মধ্য ভারতের ধারা পূর্বভারতে পৌঁছোয়নি। সেজন্য বাঙালির ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অন্য একটা চমকপ্রদ কাজ করেছিলেন। ঐতিহ্যের সুন্দরকে যখন খুঁজে পাওয়া গেল না, তিনি তখন বাঙালি জীবনে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিলেন। সমস্ত বাঙালি জাতটার মধ্যে তাই রবীন্দ্রনাথের একটা ছাপ ফেলা আছে। মনে হয় বাঙালি জীবনে যা-কিছু সুন্দর সবকিছুই যেন কবির সৃষ্টি। এর থেকে সরে আসার চেষ্টা যখনই দেখি তখনই মনে হয় সেটা খুব পীড়াদায়ক।
রবীন্দ্রনাথ অন্য একটা কাজও করেছিলেন। ইচ্ছা করে করেছিলেন কি না বলতে পারব না। আগেই বলেছি ন্যায়-অন্যায়ের বোধ কবির থেকে পাওয়া। এখন বলি রুচিবোধও তাই। সুন্দরকে সুন্দর বলে চিনতে পারার রুচি, সেটা রবীন্দ্রনাথই বাঙালিকে দিয়েছেন। এর ফলে কিন্তু বিলাপ বাড়ছে। ব্যবহারের ত্রুটি বড্ড বেশি চোখে পড়ে। জীবনের যতকিছু গ্লানি মনে হয় জীবনের টুঁটি চেপে ধরছে। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটা সহজ আনন্দ ছিল। সেই আনন্দই তাঁর গানে ফুটে বেরোত। সেই আনন্দ তিনি বাঙালিকে দিয়ে যাননি। কেউ এই সহজ জিনিস কাউকে দিতে পারে না। সেজন্যই বোধহয় নিরানন্দ বাঙালি ভাবছে আমরা এখন রবি ঠাকুরের থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি।
এইবার শেষ পর্যন্ত একটা কঠিন কথায় আসি। বাঙালি বলে একটা জাতি অতীতে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এখন যাদের বাঙালি বলে ভাবি তারা হয়তো এই সমাজে আর নেতৃত্ব দেবেন না। বাঙালি বললে এখন আমরা ভাগীরথী তীরের সমাজকে বুঝি। এই সমাজ উচ্চবর্ণের হিন্দুসমাজ। আগেই বলেছি শ্রেষ্ঠ বাঙালি অনেকেই পদ্মাপারের লোক। এ ছাড়াও গ্রামের লোক রয়েছেন। নিম্নবিত্ত এবং বিত্তহীন মানুষেরাও রয়েছেন। ভগীরথ সমাজ এদের সকলকেই কাছে চায়, কিন্তু কী করে কাছে টানবে সে-উপায়টা জানে না। রবীন্দ্রনাথ এমন একটা ভবিষ্যৎ চাইছিলেন যখন এরা সকলে এক হবে। ভগীরথ সমাজ এই কাজ করতে পারে বলে মনে করি না।
কিন্তু নতুন সমাজ উঠছে। তারাও বাঙালি, কিন্তু ভগীরথ নয়। রবীন্দ্রনাথ সেই সমাজেও থাকবেন। পদ্মা এবং ভাগীরথী সেই সমাজে একত্রে মিলবে। বিত্তহীন মানুষ মধ্যবিত্তের পাশাপাশি দাঁড়াবে। সেই সমাজটা কেমন হবে এখন আর আন্দাজ করা যায় না। কিন্তু সেই সমাজে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা হবে। বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে ছাড়বে না কিন্তু ঠাকুরপুজো ছাড়বে। রবীন্দ্রনাথের সত্য মূর্তি দেখা দেবে।
গানপারটীকা
যাদের পূর্বপরিচয় নাই অশীন দাশগুপ্ত রচনাভঙ্গির সঙ্গে, এই লেখা তাদের জন্য পুনর্মুদ্রিত হলো। প্রবন্ধের বক্তব্য ইত্যাদি অতটা না, চাই প্রবন্ধশৈলীর ভিতরে যে একটা আমোদে অথচ অবিচল সরস ভাব — এই জিনিশটা লক্ষণীয় হোক। অশীন দাশগুপ্ত মূলত ইতিহাসবেত্তা।
ভারতীয় উপমহাদেশে পনেরো থেকে আঠারো শতকের সময়সীমায় সমুদ্রপথে যে বাণিজ্য ও বিনিময় হয়েছে, সেইটাই বিষয় তার ইতিহাস প্রণয়নের। ওলন্দাজ, ফরাশি ও ইংরেজ কোম্প্যানিগুলোর দলিলদস্তাবেজ নির্ভর করে গড়ে উঠেছে অশীনের ইতিহাসচর্চার বিদ্যাভাণ্ডার। খ্যাতি ও সমীহ লভেছেন তিনি এই কাজের সুবাদে। ইংরেজি ভাষাতেই লিখেছেন মূলত, যদিও তার বাংলা স্বাদুতায় এত উপভোগ্য যে একটানে পড়ে ওঠা যায় ইতিহাসের কচকচানিও। ‘প্রবন্ধসমগ্র’ নামে একটা ঢাউশ বইয়ের ভিতরেই তার বাংলা রচনাসম্ভার পাওয়া যায়, যেখান থেকে এই রচনাটা গানপারে নেয়া হয়েছে। প্রবন্ধসমগ্র, অশীন দাশগুপ্ত, সম্পাদনা উমা দাশগুপ্ত, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ২০০১। সমগ্র ছাড়া দাশগুপ্তের একক কোনো প্রবন্ধবই বাংলায় বের হয় নাই সম্ভবত। অশীন দাশগুপ্ত জন্মেছেন কলকাতায়, দেশেবিদেশে অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন গোটা ক্যারিয়ার জুড়ে, শেষদিকটায় ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে জীবনাবসান। অশীনের বাংলা প্রবন্ধসমগ্র বইটাতে অন্যান্য রচনার চেয়েও সমুদ্রেতিহাসভিত্তিক আমাদের এই অঞ্চলের বিকাশ ও ভাঙাগড়া বিষয়ক সুদীর্ঘ অথচ সুখদ রচনাগুলো পড়ে যে-কেউ উপকার ও আনন্দ দুনোটাই পাবেন বলিয়া আশ্বাস দেয়া যায়।
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS