সমস্তই সেতু সম্বন্ধীয়। কবেকার কোন সাড়ে চব্বিশের তরুণ নীরবে লোপাট হয়ে গেছে, তার আর বয়স বাড়ছে না। দু’হাজার ছাব্বিশের এক বাদ-আসরে তার জন্য মন উদাস করে। কতগুলো কবিতার মতো সেতু রেখে যাওয়ার অবসর ঘটেছিলো যার। “জানো না আমার মনে কতো কথা পড়ে আর ঝড়ে / উড়ে যায় / মনোনিবেশিক হাওয়া ব্যগ্র হ’লে ঝড় হয় তবে / কয়েক সরল ছাতা খাড়া থাকে / দেবদারু কৃষ্ণচুড়া বট / আর কিছু ধাতুখন্ড আবেশী মাতাল…(নভেরা)।” আদরণীয় মাংসের যথারীতি বিলোপ ঘটে, কিন্তু কবিতা থুয়ে যাওয়া হলো হাড়-মজ্জার ভেতরকার, মাংসধারীদের জন্য এই হাড়-মজ্জার ভেতরকার গূঢ় হদিশ, বাদ-আসরের পাণ্ডুরতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে উঁকিঝুকি মারার ফুরসত। কেননা মাংসধারীদের মনের ভেতর কিছু অসাধ্য ব্যাধি রয়েই যায়। তখন একজন শামীম কবীরের প্রয়োজন ধরে। সেতুতে সেতুতে তার শব্দের গাঁথুনি দেখে দেখে যেতে যেতে যাওয়া হয়। “একজন দিবস কালে একজন নিকষ কালে / কে তোদের সঙ্গ দিবি / দূরে ঐ চক্রবালে? (চন্দ্রিমা ও ঊষা)।”
যে-কোনো কিছু নিয়ে লেখার নামই কবিতা। শর্ত একটাই, লেখাটির ভেতর থেকে কবিতার সৌন্দর্য উঠে আসতে হবে। নভেরা, জুয়া, মিনিবাস ঘরে ঢোকার পর থেকে শুরু করে হিজড়ে, সককাম, নকশা, আতপ চাঁদকেও কবিতা করা যেতে পারে। শামীম কবীর করে দেখিয়েছেন আর তার কবিতার আকৃতি তো তারই মতো হবে। শামীম কবীর গোল না চৌকো, ষড়ভূজাকৃতি না চ্যাপ্টা? “অশুভ গাছ” শিরোনামের এক কবিতায় কতিপয় “ছয়পেয়ে অনাথ গাছেরা”-র কথা উল্লেখ করেছেন, ও বলেছেন “আর আমি অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে পাহারা বসাই্।” বোঝা গেল কবি ও কবিতার আকৃতি বড়ো গোলমেলে। সাড়ে চব্বিশের তরুণের সাথে অন্তত এক বসায় তার মীমাংসা করার উপায় নাই।
অশুভ গাছ
গ্রীবা থেকে নরগন্ধ ফেলে দেব : দিনের মতোন
উজ্জ্বল ঝাঁঝালো আর ছায়াবহ
মানবেরা শোনো
আমার মাথায় আজো সেইসব ভূমিরেখা আছে…
গভীর পাহাড়ে থেকে—অন্ধ কালো বোবা—বহুদূর
সূঁচালো শব্দের দেশে স্বপ্নক্রমে সাজিয়েছি
দোলনা তিন সারি তাক
দেয়ালে কমলা আভা
ধরে রাখে ছয়পেয়ে অনাথ গাছেরা আর আমি
অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে পাহারা বসাই
হদিশ কিছু পাওয়া গেল? দুই হাজার দশে ‘অ্যাডর্ন’ থেকে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত কবিতা’ সংকলনের ভূমিকায় নভেরা হোসেন লিখেছেন, “সেঁকোবিষ আর পোড়া মদ দিয়ে তৈরি যার তারুণ্য : করতোয়ার স্রোতহীন জলের সাথে অন্তর্গত বাক্যালাপের পর নিরন্তর সে গেঁথে চলেছিল একটার পর একটা কবিতার ব্রীজ। একমুখী সে ব্রীজে ভরশূন্য পরিভ্রমণ। নিজস্বতায় ঋদ্ধ নাগরিক ব্যক্তির নৈঃসঙ্গ, যন্ত্রণা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি আর বিচ্ছিন্নতাবোধের চর্মহীন কঙ্কাল যেন শামীম কবীরের কবিতা” নয় কেন? এইরূপ সমগোত্রীয়দের আমরা আলবৎ চিনি। বাঙলা ও বিশ্ব সাহিত্যে বিরাজমান। উদ্যম ও স্পর্ধাকে তারা এমনভাবে চাউর করে দিয়ে গেছে তাতে পঙ্গপালের মতো আমরা আক্রান্ত হই। চষে বেড়াই তাদের কবিতার জমিন এবং এ বিভ্রম অন্তহীন; দিনশেষে সকলেরই ঘাড় শক্ত হয়ে আসে, কেননা “তোমাকে যে কথা বলা হবে / তার সব নিয়ে গ্যাছে চান্দ্র ড্রাগনেরা / চান্দ্র ড্রাগনেরা কালো ভদ্র সদাচারী / কেবল তোমার জন্য কথা আনতে গিয়ে / ড্রাগনের শ্বাসে পুড়ে শক্ত হ’লো ঘাড়।”—বিভ্রম রয়েই গেল, ঘাড় শক্ত হবার অমন খবর জেনেও কথাদের পিছু নেওয়ার একবিন্দু ইচ্ছাও কমলো না। কথারা বেড়েই চললো, কেননা “সারাক্ষণ হতে চাই গানের বাকশো।”

কথাদের ভার আছে, বিস্ময় আছে। যত বিপুল কথারাশি তত বিপুল ভার তত বিস্ময়। কবিতার অনেক বাজির একটি হলো বিস্ময়কে ঘনীভূত করে তোলা। অসমান শব্দের আকৃতি-প্রকৃতির ভেতর পিঁপড়ের সারির মতো বিস্ময় চলাচল করে। তারপর কোনো এক অলক্ষ গুহার ভেতর জমাট বাঁধে। শামীম কবীরের কবিতা পড়তে গিয়ে এইরকম অনুভূতির মুখোমুখি হতে হয়। তারা অসমান সারিতে আনাগোনা করতে করতে দীর্ঘায়িত হয়ে ওঠে এবং যত তারা দীর্ঘ হয় তত তাদের বার্ধক্য বাড়ে, কিন্তু তারা কখনোই পটল তুলবে না, কোনো এক উপলক্ষ্য দেখে ঢুকে পড়বে কোনো অলক্ষ গুহায়। সেখানে বিস্ময় আছে। বিস্ময়ের আধিক্য দেখে কেউ হয়তো ভাবতে পারে আমি হয়তো কিছু ঢেকে দিচ্ছি, বা এড়িয়ে যাচ্ছি। বিস্ময়ের বদলে দু’একবার দূর্বোধ্যতাও হয়তো বলা যায়। শামীম কবীরে কিছুমাত্রায় দূর্বোধ্যতা রয়েছে। কিন্তু সেটা আরোপিত শব্দ বা বাক্যের চাতু্র্যে নয়, বরং চেতনার বহমানতায়। ভাষার প্রকাশক্ষমতা সবসময় কবির প্রকাশক্ষমতার সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারে না। তখন কবিকে ভাষার ভেতরেই ভাষার সন্ধান করতে হয়, অথবা ভাষাকে মুড়ে দিতে হয় আরওতর ভাষা দিয়ে। এভাবে কাঙ্ক্ষিত বৃত্তের সূত্র বা গোলকের সূত্রের সন্ধান পেলেও পাওয়া যায় বা পাওয়ার প্রস্তুতিতে অন্তত কবির কোনো খামতি থাকে না।
আমি বাহান্নজন বালকের মুখ তৈরি করি
আদলে আদলে বিদ্যুৎস্পৃহা চমকায়
আর হাত নিচু করে যখন সরে আসি
সন্ধ্যার সুবাস রেখে চলে যাওয়া রুমালের
অগোচরে জীয়ে থাকা অজস্র কাণ্ডের সাথে
গলাগলি আর খাড়া থাকবার উন্মাদনা
শেকড়ের গুপ্ত স্ফিতির চেয়েও
উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে
আমি এই পৃথিবীর নই
(কাঁপন, বৃত্তের সূত্র অংশ হতে)
সাড়ে চব্বিশে থেমে যাবার আগে মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ সেরে নিতে হয়। অমোঘ সেই বাক্যালাপ জন্মেই খোলা চোখ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বিন্দু থেকে অনিঃশেষ গোলকের প্রান্তরে। যেখানে কবির সমস্ত ইন্দ্রিয়সমূহ আস্বাদ করে যাবতীয় কোলাহল ও সারাক্ষণ হতে চায় গানের বাকশো। যে যা-ই বলুক আকণ্ঠ পান করে কবিকে জীবন ও জগৎকে নিজের মতো করে দেখার স্পর্ধা দেখাতে হয়। তার সবটুকু প্রকাশযোগ্য ভাষায় হয়ে ওঠে না। কবির আত্মিক নৈঃসঙ্গ্য, যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতাবোধের ভাষা হয়ে ওঠে অনির্ধারিত, অসংজ্ঞায়িত এবং থেমে যাওয়া এবং কিছুতেই আর বয়স বাড়ে না।
তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে
কোনোখানে এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে
তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ
আর আমি
ভয়ে ভয়ে
মানুষ হ’য়ে
উঠে দাঁড়াই
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ, অংশবিশেষ)
গানপারে শামীম কবীর
শামীম কবীর সংক্ষিপ্ত : কবিতার সংকলন
- মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান - April 12, 2026
- শামীম কবীর : দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান || শাহ মাইদুল ইসলাম - April 12, 2026
- সংক্ষিপ্ততম করে টুকে রাখা ছায়াপাঠ || শুভ্র সরকার - April 9, 2026

COMMENTS