জীবনানন্দজব্দ কবিতাপাঠক || আহমদ মিনহাজ

জীবনানন্দজব্দ কবিতাপাঠক || আহমদ মিনহাজ

জীবনানন্দ নিয়ে নাতিদীর্ঘ গদ্যখানা (জীবন ও অন্যান্য জৈবনিকী) সম্পর্কে দু-চার কথা বলার তাড়া বোধ করছি। আগেই লিখব ভেবেছিলাম কিন্তু দিনে কাজের চাপ আর রাত ঘনালে সিনেমা দেখার ভূত মাথায় চাপে বিধায় লিখব-লিখব করে লেখা হয় নাই। রচনাটি আয়তনে হ্রস্বকায়া  হলেও যে-প্রসঙ্গ আপনি টেনেছেন সেটা কিন্তু দীর্ঘদেহী  ও সময়-প্রাসঙ্গিক। জরুরিও বটে। জীবনানন্দের এই যে প্রশ্নাতীত লোকপ্রিয়তা সে এখন তাঁর জন্য শাঁখের করাত হতে চলেছে কি-না এই বিষয়ে ভাবার সময় হয়েছে। কবিতা ও গদ্যে তাঁর মরণোত্তর কামিয়াবি নিয়ে নতুন কিছু বলার নাই। তাঁকে পড়তে গেলে আচ্ছন্নতার অনুভূতি সকলেরই কমবেশি ঘটে আর রচনার ভনিতায় আপনি সেটা কবুল করেছেন। এখন এই আচ্ছন্নতার মোহাবেশ কবিকে পুনরাবিষ্কারের পথে বাধার প্রাচীর তুলে দিচ্ছে কি-না প্রশ্নটি উঠানো দরকারি ছিল। অন্যদের হয়ে কাজটা আপনি করেছেন। নাতিদীর্ঘ এই গদ্যের গুরত্বটা সেখানে। স্তবস্তুতি নতুবা নিন্দামন্দের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তোলা ও আলোচনায় গমনের অবকাশ তো আমরা রাখিনি! ইত্যাদি কারণে গদ্যটি আমাকে ভাবিয়েছে।

বিগত কয়েক দশকের জীবনানন্দপাঠের অভিজ্ঞতা কবির যেসব প্রতিমা গড়ে তুলেছে পাঠক মোটের ওপর সেগুলোয় নিজেকে জব্দ রাখে। যুগবাহিত পালাবদলের সঙ্গে তাঁর কবিতায় নতুন অর্থস্তর সন্ধানের তাড়া অথবা ভিন্ন আঙ্গিকে পাঠবিবেচনার ঘটনা যে-কারণে অধিক চোখে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় তিনি চিত্ররূপময়  কবির তকমা পেয়েছিলেন মনে পড়ে। রবি যে-সময়ে বসে তাঁকে পাঠ করেছেন সেখানে এর অধিক বিশেষণ ও বিশেষত্ব নিষ্কাশন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। শিথিল অক্ষরবৃত্তে বাঁধাই জীবনানন্দের কবিতার বুনোট পাঠকের অনুভবে দৃশ্যের স্রোত বহায় সে তো আর মিথ্যে নয়। নির্মিতিটা এক্ষেত্রে একঘেয়ে হলেও কবিতার অন্তর্গত রহস্য ধারণের গুণে পাঠককে মোহাবিষ্ট রাখে।

চিত্ররূপময়তার স্তর ছাড়িয়ে কবির মনোগহিনে যাঁরা পরে প্রবেশ করতে মরিয়া হলেন তাঁদের পাঠঅনুভবে তাঁর একাধিক ইমেজারি  এভাবেই গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতিলগ্ন ও নির্জন, বিচ্ছিন্ন বা পলাতক, স্মৃতিকাতর ও পরাবাস্তব, বাস্তব জীবনের চাপ সইতে না পেরে প্রত্নপ্রতিম ইতিহাসের কিনারায় জিরান নিতে ব্যাকুল এবং সব মিলিয়ে শিখরস্পর্শী পিছুটান ও নিঃসঙ্গতার স্মারক;—যুগের মতিগতির সঙ্গে তাল দিয়ে পাঠকের এইসব ভাবনা ও অনুভব অবান্তর ছিল এমন নয়, তবে প্রোক্ত অভিধাগুলো কবির যেসব প্রতিমা তৈয়ার করেছে তাকে ভেঙে নতুন জীবনানন্দ অধুনা কতটা আবিষ্কৃত হলেন সেই প্রশ্ন কিন্তু ওঠে।

আপনার বক্তব্যের সারকথার সঙ্গে অগত্যা সহমত পোষণ করতেই হচ্ছে;—জীবনানন্দ বোধ করি সেই বিরল কবি যাঁকে পাঠ যাওয়ার প্রতি মুহূর্তে পাঠকের একইসঙ্গে সম্মোহন ও বিস্মৃতির অভিজ্ঞতাটা হয়। দশকি অনুভবের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে নতুন অনুভব সহকারে তাঁকে পাঠ যাওয়ার উপায় সেখানে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দশকসৃষ্ট ইমেজারি  মস্তিষ্কে একবার প্রবিষ্ট হওয়ার পর নতমস্তকে তাঁর গরিমা স্বীকার করা ছাড়া পাঠকের কোনো কাজ থাকে না। কবি সম্পর্কে নতুন কথা বলা বা ভাবনার গুঞ্জন সে তুলতে ব্যর্থ হয়। পঞ্চাশ পরবর্তী প্রতি দশকে জীবনানন্দের পাঠপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু নবীনতর ভাষ্যে তাঁকে পাঠের পরিসর বাড়েনি। বাংলা ও বিশ্ব সাহিত্যের একজন মহান স্রষ্টার জন্য বিষয়টি সুখের না অভিশাপের হলো সে এক প্রশ্ন বটে!

কোনো কবির পক্ষে বিচিত্র পথে গমন ও সকল স্বরগ্রামে কথা বলা সম্ভব নয়;—আপনার এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ বোধহয় দ্বিমত পোষণ করবেন না। জীবনানন্দও সংগত কারণে সকল পথে হাঁটেননি এবং হাঁটার জন্য আকুলান বোধ করেননি। তাঁর সমসাময়িক বা পরবর্তী প্রজন্মের যেসব কবি অন্য পথ ও গোলার্ধ ধরে হেঁটেছেন, এমনকি জীবনানন্দীয় স্বরগ্রামের স্বাক্ষর বহন করেই শেষাবধি নিজ স্বরগ্রাম কবিতায় জুড়তে পেরেছিলেন, তাঁদেরকে স্পেস  দেওয়ার যে-প্রসঙ্গ আপনি লেখায় টেনেছেন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। একজন কবি মুখ্য না গৌণ এইসব বিবাদে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে কবিতার ভাষায় নতুন স্বরগ্রাম তিনি জুড়লেন কি-না সেটা পরখ করা পাঠক ও আলোচকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বাংলা কবিতার পাঠ-আলোচনায় ঘটনাটি বিশেষ চোখে পড়ে না!

এক কবিকে দিয়ে আরেক কবির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিচারের তুলনামূলক পাঠপদ্ধতিতে নিজে একসময় অভ্যস্ত ছিলাম। কবিতার এমনধারা পাঠে এখন আর মন নেচে ওঠে না। পশ্চিম গোলার্ধের সাহিত্যপাঠের কেতা অনুসরণ করতে যেয়ে বুদ্ধদেব-সুধীন দত্তরা বাংলায় এই পাঠপদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ভাষা দার্শনিকদের জয়জয়কার আর উত্তরাধুনিক মতবাদের প্রভাবে পশ্চিম গোলার্ধ এই প্রবণতা থেকে মোটের ওপর বেরিয়ে এলেও আমাদের নিষ্কৃতি মিলেনি। দশকের-পর-দশক ধরে এহেন আলোচনাপদ্ধতিতে জারি থাকার কারণে রবীন্দ্র-নজরুল ও জীবনানন্দের মাঝখানে যে-ফাঁকা জায়গা বা স্পেস-র ইঙ্গিত আপনি লেখায় দিয়েছেন এবং অন্য কবিরা মিলেঝুলে যেটি ভরাট করছেন…, পাঠকের যোগ্য সমাদরের অভাবে তাঁরা আজো ব্রাত্যই থেকে গেলেন!

তুলনামূলক পাঠবিচারকে এইসব কার্যকারণ দোষে বৈনাশিক মানতে হয়। কবির ওপরে সত্যিকার সুবিচার ঘটানোর প্রশ্নে পদ্ধতিটি মোক্ষম ব্রহ্মাস্ত্র নয়। এর প্রয়োজন ক্ষেত্রবিশেষে হতে পারে কিন্তু নির্বিচার প্রয়োগ গর্হিত অপরাধ। জীবনানন্দ স্বয়ং তার মোক্ষম উদাহরণ ছিলেন সেই সময়। ত্রিশের কবিকুলে (*বুদ্ধদেব বসুকে যদি-বা খানিক ব্যতিক্রম বলে ধরি।)তিনি একপ্রকার অবোধ্য রূপে নিন্দা ও পরিহাসের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর কবিতা বয়নের ধাঁচ ভিন্ন হওয়ার কারণে নতুন স্বরগ্রামকে অনেকে তখন পাঠ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পঞ্চাশ ও তৎপরবর্তী দুই দশক জুড়ে তিনি প্রবল ঘটনা হয়ে দেখা দিলেন ঠিকই কিন্তু বোঝা-না-বোঝার প্রহেলিকা ও সম্মোহনটা তখনো জারি ছিল। শঙ্খ-সুনীল-শক্তি থেকে রাহমান-মাহমুদ-মান্নানসৈয়দরা পরাবাস্তবতার ঘোরলাগা আবেশে তাঁকে পাঠ করতে অভ্যস্ত ছিলেন।

লাগাতার পাঠ অবোধ্য কবিকে এক সময় সরল-সুবোধ করে তোলে। পাঠকের ভাবনা ও অনুভবের রসায়ন থেকে ব্যাখ্যার নতুন পরিসর জন্ম নেওয়ার ফলে কবির পক্ষে অবোধ্য বিস্ময় রূপে বিরাজ করা ও মহিমান্বিত হওয়ার বৃত্ত ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসে। জীবনানন্দের বেলায় সেটা ঘটেছে বৈকি। পঞ্চাশ-ষাট দশকের কবিকুলের কাছে তাঁর বাককুশল রূপময়তা প্রহেলিকার মহিমায় শংসা কুড়ালেও একুশ শতকের যুগবিশ্বে তিনি সেই মহিমা ধারণ করেন বলে মনে হয় না। কবি এখনো সমান পাঠ-সম্মোহক কিন্তু তা-বলে অবোধ্য বা ব্যাখ্যাতীত অ্যালিয়েন  নন। দশকের-পর-দশক ধরে পঠিত হওয়ার কারণে অ্যালিয়েন  হয়ে থাকার স্পেস  কারো কবিতায় জারি থাকে কি-না এই জিজ্ঞাসাকে আলোচনায় প্রাসঙ্গিক করা জরুর। আপনি প্রশ্নটি তোলায় আলোচনার পরিসরটি আগামীতে বাড়তেও পারে।

কবিতার একান্ত প্রাকৃতিক গুণাবলিতে ভাস্বর হওয়ার কারণে আগামী দিনের পাঠকেরও জীবনানন্দকে না পড়ে উপায় থাকবে না। নতুন অর্থস্তর যদি সেখান থেকে নিষ্কাশন করা সম্ভব না হয় তবু পাঠকের তাকে পড়তে ইচ্ছে করবে। তাঁর কবিতায় চোরাস্রোতের মতো বহমান ক্রিয়াপদ আর অনুভূতির একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি এমন এক ভাষাপ্রণালি সম্ভব করে তুলেছে যেটি এমনকি বিশ্ব কবিতার বিচারে অভিনব ঘটনা বলে মেনে নিতে হয়। এই মনোলোগ  ওরফে স্বগতোক্তির প্রভাবক গুণটি এখানে যে, দূর ভবিষ্যতে পাঠকের যখন নিজের সঙ্গে সঙ্গত জুড়তে ইচ্ছে করবে সেখানে জীবনানন্দ তাকে পথ দেখাবেন। কবির এই সাংঘাতিক ক্ষমতাকে প্রণাম জানিয়ে অন্য কবিদের স্বরগ্রাম ও ভিন্ন পথে মোড় নেওয়ার ঘটনাকে বোধহয় দ্রষ্টব্য করা উচিত। অন্যথায় বাংলা কবিতায় বৈচিত্র্য ও বাহার কতটা কী তার কুলকিনারা করা কঠিন হয়।

প্রসঙ্গটি যেহেতু উঠলই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান আশা করি অবান্তর হবে না। কৌতূহলবশে কিছুদিন ফেসবুকে বিচরণ করেছিলাম। ফেবুবাসী লেখককুলের খোঁজখবর নেওয়ার খেয়ালে আমার এক বন্ধুজন ছদ্মনামে একখানা অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। কিছুদিন বাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় অ্যাকাউন্টখানা তিনি আমাকে ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। নীরব দর্শকের ভূমিকায় সেখানে মাঝেমধ্যে ঢুঁ মারতাম। এখন এর কী হাল হয়েছে সে আর বলতে পারব না। সেই সময় শূন্য দশকের এক কবি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় ফ্রি ভার্স  বা মুক্তছন্দ চর্চার বিড়ম্বনা নিয়ে একখানা পোস্ট দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ চর্চিত ফ্রি-ভার্স  হাল জামানার বাংলা কবিতায় কেন সর্বনাশের কারণ হয়ে উঠেছে তার সপক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ  রচনার উপসংহারকে তিনি প্রসঙ্গত স্মরণ করেছিলেন। ‘তপস্যা-কঠিন রবীন্দ্রনাথের পক্ষে যেটা মোক্ষ, আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়তো সর্বনাশের সূত্রপাত।’—বিখ্যাত বাক্যাংশ দিয়ে পোস্টদাতা যুক্তির সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন মনে পড়ে।

সে যা-ই হোক, তাঁর বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে অনেকে মন্তব্য ঠুকছিলেন। ছন্দ বিষয়ে বিলকুল বেকুব হওয়ার কারণে মুক্তছন্দের যথেচ্ছ ব্যবহারে বাংলা কবিতার বারোটা বাজতে চলেছে কি-না ইত্যাদি ক্যাঁচালে অধমের আগ্রহ ছিল না। নব্বই দশকের প্রথিতযশা এক কবির মন্তব্যে কেবল চোখ সেদিন আটকে গিয়েছিল। সুধীন্দ্রনাথকে সংযুক্ত করে ঠোকা তাঁর মন্তব্যের সারকথাটি মোটামুটি এ-রকম ছিল,—সর্বনাশ  সুধীন্দ্রনাথ খেয়াল করলেন কিন্তু নিজে এর মারণ ঠেকাতে পারলেন না! কবিতার যে-জায়গাটি তিনি আঁকড়ে বসে থাকলেন সেটা ইতোমধ্যে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। অন্তত জীবনানন্দের তুলনায় তাঁকে এখন বিবর্ণ দেখায়

কবির করা মন্তব্য আপাত দৃষ্টিতে সত্য ও সঠিক হলেও বিকল্প ভাবনা মনে তরঙ্গ তুলছিল। মনে হচ্ছিল সুধীন্দ্রনাথের বিবর্ণ হয়ে পড়ার ঘটনাকে অন্য আঙ্গিকে বিবেচনার সুযোগ বোধহয় রয়েছে। অগত্যা অযাচিত প্রতিমন্তব্য জুড়ে দিয়েছিলাম। পোস্টদাতা ও মন্তব্যকারীর কেউই অবশ্য প্রতিউত্তর করেননি। লাইক দিয়ে কাম সেরেছিলেন। তাঁদের হয়ত কথাগুলো যুক্তিসংগত মনে হয়েছিল অথবা হতে পারে পাল্টাপাল্টি তর্কে গমনের প্রয়োজন বোধ করেননি। আপনার গদ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সূক্ষ্ম সংযোগ থাকায় মন্তব্যের খসড়াটি যদি উদ্ধৃত করি সেক্ষেত্রে মূল বক্তব্যের ব্যতিচার আশা করি ঘটবে না। বেশ দীর্ঘ হওয়ার কারণে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে লিখে ফেবুতে সেই সময় পেস্ট দিয়েছিলাম। কম্পিউটার ঘেঁটে ফাইলটা যেহেতু পাওয়া গেল ভাষিক পরিমার্জনা আর সঙ্গে নতুন কিছু ভাবনাসূত্র  যোগ করে পুরোটা তুলে দেওয়া সংগত মানছি :—

জীবনানন্দের তুলনায় সুধীন্দ্রনাথের বিবর্ণ হয়ে পড়ার ঘটনাকে বোধ করি অন্যভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সুধীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় যেসব বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করেছেন সেগুলো গ্রহণের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত ছিলাম? তিনি দার্শনিকভাবে মোকাবিলা করতে হয় এরকম সমস্যা নিয়ে কবিতায় কাজ করেছেন। ক্রমশ পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠা নগরবিশ্বে মানব-অস্তিত্বের অর্থ ও যৌক্তিকতার যে-পরিসর টি. এস. এলিয়ট নিজ কবিতায় খুঁজে ফিরেন, ওদিকে অবিকশিত নগরকাঠামোয় বসে সুধীন্দ্রনাথ তার সঙ্গে বোঝাপড়ায় নামতে উতলা বোধ করেছেন। যে-কারণে তাঁর কবিতায় Locality-র (বাংলায় ‘স্থানিকতা’ এর সঠিক ভাষান্তর কি-না জানি না।) চেতনা ও ছাপ প্রখর নয়। কবিতায় দার্শনিক প্রপঞ্চ নিয়ে কারবার ঘটানোর প্রশ্নে তিনি বিশ্ববিহারী। তাঁর সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্ট স্থানকালে গণ্ডিবদ্ধ হওয়ার বিষয় ছিল না। উটপাখি (এবং এরকম আরো নজির রয়েছে।) কবিতার নির্যাস সেটা বোঝার জন্য যথেষ্ট। এই কবিতা যে-সমস্যার সূত্রপাত ঘটায় সেটা বৈশ্বিক। Globality-র অমোঘ চাপে Locality-র ঘেরায়তন সেখানে বারবার ভেঙে পড়ছে। 

সমস্যা হলো পশ্চিমা প্রগতিকে সন্দেহ ও তাকে প্রত্যাখ্যানের বাসনায় সুধীন্দ্রনাথ এখানে এলিয়টের মতো গঙ্গাযাত্রাকে বেছে নিতে পারছেন না। এলিয়টের আধ্যাত্মিক জিগীষায় তার মন সায় জানাতে বিফল মনোরথ হয়। বাঙালি এই কবির বস্তুবাদী মনের বিকার একখানা গীতা বা বেদ-উপনিষদ দিয়ে তৃপ্ত হওয়ার ঘটনা ছিল না। তাঁর মন বস্তুজিজ্ঞাসু পদার্থবিদের। বঙ্গে বসেই তিনি মরমে হোয়াইটহেডের চ্যালা। জীবনকে মরমী ভাবরসে রাঙানোর প্রচল যে-ঘরানায় বাংলা কবিতা বরাবর সফল হয়েছে সুধীন্দ্রনাথে এসে সেটা অচল আনিতে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গীয় ভাবুকতা তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। সে তিনি সায়েবি পোশাকে দুরস্ত ছিলেন বলে নয়, প্রাচ্য থেকে আগত জ্ঞান ও দর্শনের আবেদন তাঁর মনে সতেজ ছিল বলেও নয়, তিনি সোজা কথায় কবিতায় সৃষ্ট ভাবরসকে দার্শনিক প্রপঞ্চ দিয়ে যাচাই করতে মরিয়া ছিলেন। 

তাঁর সওয়াল-জবাবের মধ্যে বাহাসের সুর থাকে, এবং সেটা গদ্যে যেমন প্রকট, কবিতার সংবেদি সুষমার ক্ষেত্রেও সুরটা সমানে বহে। আমাদের কবিতা যে-দেশকালের ঘেরে ভাষা পেয়ে অভ্যস্ত তার বিচারে বিষয়টায় নতুনত্ব ছিল। অস্বস্তিকরও বটে। ভারতীয় পুরাণ ও দার্শনিক ঐতিহ্যের অনুরাগী হলেও সুধীন্দ্রনাথের মনমুকুরে মর্মরিত জিজ্ঞাসাকে সন্তুষ্ট করার আয়ুধ তাদের জানা ছিল না। অনুমানে নয় বরং পর্যবেক্ষণের রসে ডুবে থেকে অস্তিত্বিক সমস্যার কিনারা তিনি করতে চেয়েছেন। এখন সেটা কপালে জুটবে না বুঝে তাঁর কবিতায় ‘নেই-য়ের ডংকা হাহাকার হয়ে বেজেছে। যুক্তি দিয়ে অস্তিত্বিক রহস্য ভেদ করার গণিতে বিশ্বাস যাওয়ার কারণে এই কবি চিরঅসুখী এবং সে-কারণে নৈরাশ্য তাঁর পিছু ছাড়েনি। ঘটনাটি সুধীন্দ্রনাথের কবিতার স্বরগ্রামকে ব্যতিক্রম ও সমৃদ্ধ করলেও অন্যদিকে কারাগারে অন্তরীন হতে বাধ্য করেছিল। দমবদ্ধ গীতলতার দ্বারা শাসিত কাব্যভাষায় প্রতিটি শব্দ নিক্তি মেপে বসানো। গঠনের বিচারে তারা নিখুঁত হলেও মনের ওপর প্রেত হয়ে চেপে বসে। গথিক স্থাপত্যে বোনা প্রাসাদের গরিয়ান সুষমায় যেমন দর্শক বিমোহিত হয় এবং অচিরে সেখান থেকে পালানোর রাস্তা খুঁজে, সুধীন্দ্রনাথের ভাষায় মূর্ত প্রাসাদকে হয়ত এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। 

তাঁর কবিতায় নেতি ও প্রত্যাখ্যানের যেসব সুর অহরহ বাজে সেগুলো নিছক অনুভব তাড়িত মনের বিস্ফার নয়। সুরগুলোর মধ্যে যুক্তিতর্ক ও মীমাংসায় পৌঁছানোর উদগ্র আকাঙ্ক্ষা বহমান। এই কবির সার্থক অনুভূতি বিজড়িত কবিতাও অস্তিত্বিক সংকট আর নিরালম্ব দশাকে কী করে মোকাবিলা করবে সেকথা ভেবে কাবু থাকে। গণিতজ্ঞের আতশকাচ চোখে সেঁটে তিনি উত্তর খুঁজে মরেন। রহস্যে নয় বরং নগদানগদি মীমাংসায় পৌঁছানোর ঝোঁক তাঁকে জ্বালিয়ে মারে। মীমাংসার দেখা যেহেতু শত চেষ্টায় মিলে না কবির জন্য নিষ্ক্রমণের দুটি পথ অগত্যা পড়ে থাকে,—প্রথমত সর্বগ্রাসী নেতি ও নৈরাশ্যের রিক্ত হাহাকারে বিদীর্ণ হওয়া নতুবা ডি. এইচ লরেন্সের আদিম প্রাকৃতিকতাকে ফিরে পাওয়ার বাসনায় নিজেকে সেখানে সমাধিস্থ হতে দেখা। দুয়ের বাইরে তাঁর জন্য দ্বিতীয় প্রস্থানভূমি অবশিষ্ট থাকে না। 

বাংলা ভাষার শরীরে সুধীন্দ্রনাথ যে-কবিতা বোনা করতে চেয়েছিলেন তাঁর Locality একে ধারণের উপযুক্ত ছিল না। বাংলা বা ভারতবর্ষের নাগরিক অভিজ্ঞতার চাপ এতদূর পরিণত হয়নি যে একে ধারণ করবে। এমনকি এখনো আমাদের শহুরে হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা অন্যরকম। কাদামাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা মেঠো জীবনের বাস নাকে যখন-তখন ঢুকে পড়ে। এই নগরকাঠামো নিঃসঙ্গতায় লেলিহান নয়। বিচ্ছিন্নতার যে-বোধ নাস্তি ও নেতিকে চেতনায় অমোঘ রাখে নাগরিকরা এখানে এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার খেলায় চৌকস হতে পারেনি। এখনো তারা অতটা শহুরে নয় যে অস্তিত্বিক সংকটকে দার্শনিক প্রপঞ্চের আরকে চুবিয়ে রাখাকে অন্তিম বলে স্বীকার যাবে। কামু বা কাফকার বয়ানবিশ্বকে প্রাসঙ্গিক করার জন্য যে-নাগরিক জঙ্গলের বাসিন্দা হতে হয় ত্রিশের কবিকুল বিশেষ করে সুধীন্দ্রনাথের কবিতার নাগরিকরা মোটেও এর উপযুক্ত ছিল না। যারপরনাই বাঙালি পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় কবি গণ্য হওয়ার কথা তাঁর ছিল না এবং সেটা হয়নি। কবির সংস্কৃতবহুল Lexis (*মধুসূদনের প্রতি তাঁর প্রাথমিক বিরাগ ও অনীহ স্মরণ রেখেই বলছি।) যে-ছন্দ ও গাম্ভীর্য তৈয়ার করে সেখানে নেতি ও নাস্তির প্রবল চাপ আজন্ম অধ্যাত্মমুখী বাঙালির নোলায় গুরুপাক ঠেকেছিল বৈকি। 

সুধীন্দ্রনাথ ছান্দসিক ছিলেন সে-ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কবিতায় চয়নকৃত শব্দে সুরের মিড় ও ঝংকার অনাবশ্যক খামখেয়াল থেকে ঘটেনি। সুরসঙ্গতি বা Orchastration-র দাবি তারা ভালোই পূরণ করেছে। চলনে-বলনে এই কবি আপাদশির আধুনিক আর মেজাজে ধ্রুপদি। রোমান্টিকতা তাঁকে দিয়ে হওয়ার ছিল না। কুক্কুট নিয়ে কবিতা রচনায় রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাজড়তায় ভুগলেও সুধীন্দ্রনাথ সেটা রাজসিক ছন্দে লিখে ফেলতে ও গুরুদেবকে দেখাতে ইতস্তত বোধ করেননি। তাঁর সার্থকতম প্রেমের কবিতা দার্শনিক সমস্যার সূত্রপাতে নিজেকে রিক্ত করে যায়। এই ব্যতিহার অন্যদিক থেকে ভাবলে তাঁকে অসুখী প্রাণীর উপমায় পরিণতি দান করেছিল। ছন্দের তীব্র শাসনে নিজেকে বেঁধে রাখার চাপ সইতে গিয়ে তাঁর কবিতার ভাষা পরিপার্শ্ব থেকে সুদূরবর্তী জগতে নিজেকে কয়েদ রাখে। কবি তাঁর চেনা পরিপার্শ্বে বিচরণ করেন বটে কিন্তু এর সঙ্গে ব্যক্তি বা সমাজের সংযোগরেখা পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে তুলতে জটিলতার খপ্পরে পড়েন। 

কারাগারে বসে জগৎ দেখার অভিজ্ঞতা সুধীন্দ্রনাথকে বনেদি ও উন্নাসিকের মহিমা দান করেছিল। তিনি সেই কবি যিনি ডায়োজিনিসের পিপেয় ঢুকেছেন কিন্তু সেখানে কীভাবে বসবাস করতে হয় সে-ভাও তাঁর অজানাই থেকে গিয়েছিল। সংবিধিবদ্ধ সুশৃঙ্খলায় অটল ব্যক্তির পক্ষে বিকল্প সর্বনাশ হয়ে আসে। ছন্দের অনুশাসনে নিজের বস্তুবাদী মনকে বাঁধতে আকুল কবির পক্ষে যারপরনাই ফ্রি ভার্সের যথেচ্ছাচার মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই যথেচ্ছাচারকে পৃথক আয়তনে বিচার করার রুচি বা সেই সম্ভাবনা তাঁর মনে উঁকি দিয়ে যায়নি। সর্বনাশের নিশানটাই তিনি কেবল দেখতে পেয়েছিলেন, যদিও ফ্রি ভার্সকে উপলক্ষ করে কবিতার প্রথাসিদ্ধ ব্যাকরণের শাসন থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা অথবা নতুন স্বরগ্রাম জেগে ওঠার ভাবনা তাঁকে তাড়িত করেনি। সময়ের অন্যতম প্রাগ্রসর মনন নিজের অজান্তে হয়ত-বা সংস্কারের ক্রীতদাস হতে সুখী বোধ করেছেন। জীবনানন্দের কবিতার প্রতি তাঁর বিরাগ ও নিস্পৃহ মনোভাবের কারণ হয়ত সেখানেই নিহিত ছিল!  

ত্রিশের বরেণ্য কবিগণের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথের এই দিকটি নিয়ে অল্প আলোকপাত হয়েছে। প্রেম ও রাজনৈতিক নিশানের বাইরে বাংলা কবিতার বৈচিত্র্য, ভিন্নতা, ব্যতিক্রম অথবা সীমাবদ্ধতাকে আমরা এখনো মেনে নিতে প্রস্তুত নই। এটা ভুল তা বলছি না। রাজনীতি জীবনের অংশ ও নানা মাত্রায় প্রতিফলিত। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথের আত্মযন্ত্রণা নিছক নাগরিক অবক্ষয়, অবসাদ, নাস্তি ইত্যাদির মাঝে শতভাগ বাঁধা ছিল না। কলকাতা শহর তাঁকে উতলা করেনি। প্যারিস বা লন্ডনও তথৈবচ। তাঁর সমস্যাটি হাজার বছরের মৌলিক। অস্তিত্বের মৌল কোনো স্বরূপ রয়েছে কি? একে সৃষ্টি করে কোন জনা? তাকে কি ঈশ্বর নামে ডাকা সংগত? অথবা সে এক স্বয়ংক্রিয় স্বয়ম্ভূ? বস্তুর স্বয়ংক্রিয়তা কী কারণে ঘটে? স্বয়ংক্রিয়তার এইসব কার্যকারণ দোষেই কি তবে মানুষ পরাধীন? একালের বিরূপ বিশ্বে মানব প্রজাতির গন্তব্য ও পরিণামকে অস্তিত্বের কোন গণিততত্ত্ব দিয়ে মাপা সম্ভব হবে? এই জিজ্ঞাসাগুলো তাঁকে ভাবিয়েছে ও আজীবন তাড়া করে ফিরেছে। 

উপরের জিজ্ঞাসাগুলো মাথায় নিলে সুধীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষাপ্রণালিকে কেবল ওজনদার শব্দের অপিরিচিতকরণ ইত্যকায় বিশেষণে দাগানোটা অসংগত ঠেকে। ধ্রুপদি মেজাজের স্মারকে এই কবিতারা নিঃশেষিত নয়। তারা একাধারে কবিতা হয়ে ওঠা ও সেখান থেকে নিষ্ক্রমণ নেওয়ার বাসনায় নিজেকে প্রস্তুত রাখে। মুক্ত ছন্দের বাইরে গিয়ে খেলাটিকে কবি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন। যেখানে হেরে যাবেন বলে শঙ্কা জেগেছে সেখানে কবিতা ছেড়ে গদ্যে গমন করেছেন। এই দিকটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। অন্যথায় তাঁর কবিতার প্রতি সুবিচার ঘটে না। 

যে-সমস্যা তাঁকে উতলা করেছে সেটা ভারতবর্ষ কিংবা প্রাচ্যের দার্শনিক কুলিনদের জগতে নতুন কিছু নয়। কবির বেলায় সমস্যাটি কেবল গুরুতর হয়ে উঠেছিল। Locality-র ঘেরায়তনে বসে তাঁর পক্ষে একে কাব্যে ভাষা দান সম্ভব নাও হতে পারত। অগত্যা বিশ্বজনীন সুর তিনি ধার করেছেন। আইনস্টাইন যেখান থেকে স্থানকালের আপেক্ষিকতা নিয়ে কাব্য রচনা করেন, হাইডেগার যেমন হোল্ডার্লিনকে ‘সত্তা’ বিষয়ক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক রাখেন, সুধীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতায় সেই জায়গাটিকে ধরতে মরিয়া ছিলেন। দার্শনিকতার ঐতিহ্য তাঁর পেছনে ঢাল হিসেবে থাকলেও কবিতার সমর্থন সেভাবে ছিল না। সুতরাং তাঁকে নিজের মতো করে সেইসব সুর সংযোজন করতে হয়েছিল যার সঙ্গে বাঙালি পাঠকের অভ্যাস আজো পোক্ত হতে পারেনি। জীবদ্দশায় তাঁর বই বিকোয়নি। এখনো অল্পই বিক্রি হয়। ভবিষ্যতে বিক্রি বা পঠিত হতে পারে যদি নগরজীবী বাঙালি সেই উচ্চতায় পৌঁছায় যেখানে কবির অস্তিত্বিক জিজ্ঞাসাকে নিজের জন্য সে প্রাসঙ্গিক ভাবতে পারে। তাঁর কবিতা বা গদ্যকর্মের ইংরেজি ভাষান্তর হয়েছে বলে জানা নেই। বাংলা ভাষায় আগাম আধুনিকতাবাদ (*অনেকের কাছে যার আবেদন নেতিবাচক ছিল।) আমদানির জন্য এবং প্রতিকূল সময়ে জন্ম নেওয়া কবির নিঃসঙ্গ লড়াই অবধানের জন্য ভাষান্তর হয়ত জরুরি ছিল।

এইবেলা জীবনানন্দের কথায় আসা যাক। একাধিক কারণে তিনি প্রিয়। অনুভূতির প্রগাঢ়তার কারণে প্রিয়; শব্দের অপিরিচতকরণের খেলা দক্ষ হাতে সামাল দেওয়ার সহজাত গুণের কারণে প্রিয়; চিত্ররূপময়তার কারণে প্রিয়; সর্বোপরি আমরা যে-Locality-র বাসিন্দা তার রূপ-রস-গন্ধকে নিবিড় করে পাই বলে জীবনানন্দ তাঁর নৈরাশ্যতাড়িত ব্যক্তিক অনুভব সত্ত্বেও বহুদিন প্রাসঙ্গিক থেকে যাবেন। সমকালের অস্থিরতার মধ্যে সর্বপ্রাণবাদী চেতনার জগতে নিজের নিষ্ক্রমণবিন্দু তিনি খুঁজে নিতে পেরেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথকে এখানে ব্যর্থ নমস্কারের উপমা মানতে হয়। 

প্রকৃতি যেটা বরিশালে ছিল এবং এখন নেই কবি সেই ‍মৃত প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে গুম করার স্বপ্নটি দেখেছেন এবং সেখানে গুম হতে পেরেছেন বলে বিশ্বাস করতেন। বায়বীয় স্বাপ্নিকতা অতীতচারী জগতে তাঁকে আরোহন করায়, যেখানে মৃত বিশ্বরা বারবার জীবন ফিরে পায়। লোকটি প্রত্নপ্রতিমায় বুঁদ হয়ে নিজেকে অবিরত খুঁজে ফিরছে অথবা সেখানে বিলীন হতে চাইছে। তাঁর মুহূর্তিক দেহকোষকে অতটা নয় যতটা সে বাস্তব বলে ভেবেছে মিশর-ব্যাবিলন আর বরিশালে ফেলে আসা নিজের মৃত দেহকোষকে। নাগরিক সভ্যতার বিপরীতে দুটি সভ্যতার অস্তিত্ব তাঁর কাছে বৈধ ছিল, এর একটি প্রকৃতি নিজ হস্তে বরিশালে গড়েছেন, অন্যটি মানুষের হাতে বিরচিত হলেও তার পিরিধি কপিলাবস্তু হয়ে মিশর-সুমেরু-ব্যাবিলন অবধি বিস্তৃত। উক্ত ভুবন দুটির বাইরে জীবনানন্দের কোনো নিষ্ক্রমণবিন্দু ছিল না। হয় স্মৃতিকাতর বরিশাল নাহয় ইতিহাসের ধূসর প্রদোষকালে কবি বারবার ফেরত গিয়েছেন।   

এমনধারা নিষ্ক্রমণের সুবিধা হলো স্মৃতিকাতরতার কাছে কবিমনের নৈরাশ্য ও নির্বেদ শেষতক হার মানতে বাধ্য হয়। জীবনানন্দে আশা নেই তবে নৈরাশ্যও অন্তিম নয়। বাস্তব জগতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করলেও ওটা তাঁর কাছে বিমানবিক এক বিশ্ব বৈ অন্যকিছু নয়। তিনি বেঁচে থাকেন এবং ফেরত যান মৃত সেইসব সাম্রাজ্যে যেখানে জীবন আবিল হতে পারে কিন্তু প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন সত্তা সে নয়। আত্মহত্যা করতে গিয়েও যে-কারণে তাঁর পক্ষে সেটা করা সম্ভব হয় না। কবির মনোগহিনে নদী-পাখি-ঘাস-মেঘ আর নক্ষত্রখচিত গভীর আকাশের জন্য মায়া লেগে রয়। তাঁর কবিতার পরাবাস্তব দ্যোতনার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতে পাঠকের তাই বিলম্ব ঘটে না। ভালো লাগার অযুত উপাদান সেখানে সে অনায়াসে খুঁজে পায়। 

আগামীর পাঠক যারা হয়ত বায়বীয় বাস্তবতা বা মেটাভার্সের মেট্রিক্সে সহসা প্রবেশ করতে যাচ্ছেন তাদের কাছে জীবনানন্দের প্রাসঙ্গিকতা অগত্যা শেষ হওয়ার নয়। ওরা তাকে আক্ষরিক বাস্তবতার পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্ট বায়বীয় বাস্তবতায় সবিরাম জাগিয়ে তুলবে। পরাবাস্তবতার স্বপ্নজালে বোনা অচেনা বিশ্বে কবি ফেরত যেতে আকুল ছিলেন। পুনর্জন্মের প্রসঙ্গ যবে উঠেছে মানুষের পরিবর্তে শঙ্খচিল হয়ে ধরায় ফিরে আসার বাসনা করেছেন। অনু-পরমাণু সহযোগে গঠিত জীবনচক্র কালের নিয়মে অবক্ষয়ের শিকার হলেও মেটাভার্সের জগতে এর বিনির্মাণ আগামীতে সম্ভব। জীবনানন্দের শঙ্খচিল পরিবেষ্টিত বরিশালের মেট্রিক্সকে পাঠক সেখানে স্মৃতিকাতরতার স্মারক রূপে সৃ্ষ্টি করে নেবে। এটা হচ্ছে সেই ফ্যান্টাসির দিকে যাত্রা যেখানে কবির বরিশাল বাস্তব বিদ্যমান না থাকায় পাঠকের কিছু যায় আসে না। কম্পিউটারের সাহায্যে শঙ্খচিল পরিবেষ্টিত বরিশালকে পুনরায় সৃজন করা ও সেখানে যাপনের অনুভূতিকে ইচ্ছে করলেই সে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। প্রযুক্তির কল্যাণে তার মস্তিষ্কের তরঙ্গ মায়াবি মিথ্যেকে সত্য বলে ভাবার প্রেরণায় তাকে রঙিন করে যাবে। সুতরাং কাচের অট্টালিকায় বসে জীবনানন্দের বরিশালে ফিরে যাওয়ার জৈব অনুভূতি এদিক থেকে কবির ভবিষ্যতকে আগামীতে নির্ধারণ করে যাবে বৈকি। 

একইসঙ্গে দ্বৈত বাস্তবতায় যাপনের আকাঙ্ক্ষা কবিকে বিশেষ তাড়িত করেনি। লিনিয়ার বা সরলরৈখিক প্রত্নঅতীতে নিজেকে সদা গুম করতে তিনি আকুল বোধ করেছেন। মেটাভার্সের জগতে ঢুকে পড়া পাঠকের হাতে লিনিয়ার জীবনানন্দ ভিন্ন পরিণতি পেতে যাচ্ছেন বলে ভাবা যায়। এটা সেই বিশ্ব যেটা সুধীন্দ্রনাথের গথিক শৃঙ্খলায় গাথা কবিতার মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে ভয়ংকরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা ছন্দশাসিত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে ছন্দশাসিত বিশ্বটি আবার মৃত সব বিশ্বকে কৃত্রিম উপায়ে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম! ডেভিড লিঞ্চের চলচ্চিত্রের কথা প্রসঙ্গত মনে পড়ে যায়। দর্শক বাস্তবতার সরলরৈখিক কোনো বিবরণ সেখানে দেখতে পায় না। তার এরকম মনে হয়, অভিনয়শিল্পীরা অভিন্ন সময়প্রবাহে বিরাজ করলেও কার্যত ভিন্ন দুই বাস্তবতায় বিচরণ করছে। বাস্তবিক যেসব ঘটনায় তারা এখন অংশ নিচ্ছে সেগুলো স্বপ্ন (*দুঃস্বপ্নও ভাবা যায়।)। ওদিকে অনুরূপ সময়প্রবাহে সংঘটিত অন্য ঘটনাগুলোকে আপাতত স্বপ্ন মনে হলেও সেগুলোই হয়ত বাস্তব ছিল। মেটাভার্সের বিশ্বে ঢুকে যাওয়ার ক্ষণ থেকে জীবনানন্দের কবিতাকে পাঠক লিঞ্চের ক্যামেরায় বোনা প্রহেলিকাঘন বাস্তবতায় যাপন করতে চাইবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সৃষ্ট বায়বীয় বিশ্বে প্রবেশ যাওয়ার পর বরিশাল থেকে মিশর-ব্যাবিলনের স্বপ্নগ্রস্ত পরাবাস্তবতাকে রক্তমাংসে যাপনের অনুভূতি নিতে সে উতলা বোধ করবে। অতঃপর সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার পর যে-বাস্তবতায় তাকে বিচরণ করতে দেখা যাবে সেখানে আলাভোলা কবি নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক গণ্য হবেন। 

এই বিবেচনায় কবি জীবনানন্দ দাশের ভবিতব্য একপ্রকার গৎবাঁধা। পাঠক তাঁর কবিতার জীবনবেদ নয় বরং যে-স্বপ্নগ্রস্ত ঘোর তিনি অবিরত পুনরাবৃত্তি করে গিয়েছেন ও কবিতায় সকর্মক করে তুলতে মরিয়া ছিলেন, পাঠক এখন যেভাবে সেই ঘোরকে দেহকোষে টেনে নিচ্ছে সেদিনও নিজের উপযোগী করে এর ব্যবহার যাবে। সুধীন্দ্রনাথের সমস্যা যথারীতি জটিল থেকে যাবে। কবির বোধি যে-জিজ্ঞাসার দ্বারা স্পৃষ্ট তার সুরাহা মেটাভার্সের কম্মো নয়। এই জীবনবেদকে কোনো ভার্সেই আঁটানো মুশকিল হবে। যারপরনাই তাঁকে দিয়ে পাঠকের বদ্রিলার বর্ণিত হাইপাররিয়েল মেট্রিক্স সৃষ্টি ও সেখানে যাপন সম্ভবপর নয়। অগত্যা তিনি সেইসব পাঠকের খোরাকি হয়ে বেঁচে থাকবেন যারা বিরূপ বিশ্বে মানব-অস্তিত্বের অবিরত শূন্যে পরিণত হওয়ার জীবনবেদকে অন্তিম বলে মানে। দুই কবি তাঁদের যুগবিশ্বের সৃষ্টি এবং সমভাবে যুগান্তের। যারপরনাই একজনকে দিয়ে অন্যজনের শ্রেষ্ঠত্ব বা বিবর্ণতার বিচার ভ্রান্তির জন্ম দিয়ে যায়। তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আমার মনে দ্বিধা নেই। স্বাতন্ত্র্যের কথা মাথায় রেখে পাঠ গেলে দুজনেই সমান উপভোগ্য হয়ে উঠেন এবং সেটাই হওয়া উচিত বোধ করি।

সুধীন্দ্রনাথকে উপলক্ষ করে কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য আপনার লেখার উপসংহারের সঙ্গে সহমত জ্ঞাপন যে, এছাড়া দেবতায়নের  দৈন্যদশা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা মুশকিল হবে। লেখায় আপনি জনা-পনেরো কবির কথা বলেছেন যাঁরা রবি-নজরুল ও জীবনানন্দের মাঝখানে বিরাজিত স্পেসকে ভরাট করছেন। আমার তো মনে হয় সংখ্যাটা অধিক হবে। আজকে এই মুহূর্তে নতুন যে-কবি লিখছে সে ওই স্পেসে ভিন্ন পথ ও স্বরগ্রাম সংযুক্ত করছে না সেটা কেমনে বলি! গণ্যমান্য থেকে অনতি-তরুণের কবিতারচনার পদ্ধতিকে আমরা কতটা কী নজর করছি, পাঠ-উত্তর আলোচনায় গমন করছি ইত্যাদি প্রশ্ন কিন্তু সেখানে থেকেই যায়। সুবোধ সরকারের কবিতার প্রসঙ্গে জয় গোস্বামীর কথাটাকে তাই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়। ছন্দশাসিত আলোচনা হয়ত-বা উপকারি কিন্তু সকল ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ বোধ করি বদহজম অনিবার্য করে। অগত্যা ফ্রি ভার্সের যথেচ্ছাচারকেও খানিক জায়গা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ওটা যদি সর্বনাশের কারণ হয় সে তো আপনা থেকে একসময় বোঝা যাবে এবং এহেন কবিতারা টেঁসে যাবে। কিন্তু এই যথেচ্ছাচার থেকে নতুন স্বরগ্রাম যে বেরোবে না এমন নিশ্চিত বিঘোষণার দিন বোধ করি শেষ হতে চলেছে। আমাদের কবি-লেখক-পাঠকরা সেটা বুঝে নিতে পারলে বাংলা সাহিত্যের মঙ্গল হয়। অন্যথায় দেবতায়নের মার মেটাভার্সের বিশ্বে ঢুকেও ঠেকানো কঠিন হবে।


তাৎক্ষণিকামালা
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি

COMMENTS

error: