ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৪ / তোমার স্থিতিশীলতা, ধৈর্য ও অন্তর্ভুক্তিমুখিতা || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৪ / তোমার স্থিতিশীলতা, ধৈর্য ও অন্তর্ভুক্তিমুখিতা || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

প্রিয় পৃথিবী মা,
অসীম সুন্দর এই নীল গ্রহ তুমি সুগন্ধময়, শান্ত ও সদয়। অপরিসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা তোমাকে এক মহান বোধিসত্ত্ব করে তুলেছে। আমরা যত ভুলই করি না কেন, তুমি সবসময় আমাদের প্রতি ক্ষমাদৃষ্টি বজায় রাখো। যখনই আমরা তোমার কাছে ফিরে আসি, দেখতে পাই, আমাদের আলিঙ্গন করতে তুমি  হাত বাড়িয়ে দিয়েছ।

অস্থিরতায় ভুগলে, নিজের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেললে, অথবা বিস্মৃতি, বিষণ্নতা, ঘৃণা বা হতাশায় জর্জরিত হলে, আমার মনে হয়, একমাত্র তোমার কাছেই ফিরে যাওয়া যায়। তোমার সংস্পর্শ আমাকে আশ্রয় দেয়; শান্তি, আনন্দ ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। কোনও বৈষম্য ছাড়াই তুমি আমাদের সকলকেই ভালোবাসো, রক্ষা আর লালনপালন করো যত্নের সাথে।

তোমার দিকে নিক্ষিপ্ত সকল কিছু, তা বিশালাকৃতির গ্রহাণু, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, বিষাক্ত ধোঁয়া বা তেজস্ক্রিয় বর্জ্য যা-ই হোক না কেন, সেসব গ্রহণ করা, সামলানো এবং রূপান্তর করার এক বিরাট ক্ষমতা তোমার মধ্যে বিদ্যমান। আর সময় তো বরাবরই তোমার সহায়। তোমার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এতে লক্ষ লক্ষ বছর লাগলে পরেও, তুমি সর্বদাই সফল হও। ভয়াবহ সেই সংঘর্ষের পরেও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলে তুমি, যার ফলে জন্ম হয়েছিল চাঁদের। কমপক্ষে পাঁচটি বড়ো ধ্বংস অতিক্রম করেছ, আর প্রতিবারই নিজেকে দিয়েছ নবজীবন। তোমার নিজের নবজীবন, রূপান্তর এবং আরোগ্য লাভের একটি অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এবং তুমি আমাদেরকেও—তোমার সন্তানদেরকেও—তা দাও।

তোমার আরোগ্যদানের মহাশক্তির প্রতি আমার আস্থা আছে। অন্যদের চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস নয়, বরং এটি আমার নিজের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ফল। আর সেজন্য আমি আমি তোমার মধ্যে আশ্রয় নিতে পারি। আমি যখন হাঁটাহাঁটি করি, বসি কিংবা নিশ্বাস নিই, আমি তখন তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি, তোমার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি এবং আমার আরোগ্যলাভের জন্য  নিজেকে তোমার হাতে সঁপে দিতে পারি। আমি জানি, আমার কিছুই করার প্রয়োজন নেই। আমি স্রেফ শিথিল হতে পারি, আর আমার শরীরের সমস্ত উত্তেজনা, মনের সমস্ত ভয় ও উদ্বেগ দূর করতে পারি। বসে থাকি বা হাঁটাহাঁটি করি, শুয়ে থাকি বা দাঁড়াই, আমি নিজেকে সর্বদা তোমার আশ্রয়ে সঁপে দিই, আর তোমার স্নেহস্পর্শে আমি বিশ্রাম পাই এবং আরোগ্য লাভ করি। আমি তোমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি, হে পৃথিবী মা।

আমাদের প্রত্যেকেরই একটি আশ্রয়ের জায়গা প্রয়োজন, কিন্তু আমরা হয়ত জানি না কীভাবে এটি খুঁজে বের করা যায় বা কীভাবে সেখানে যেতে হয়। হে আমার প্রিয় গ্রহ, আজ গভীরভাবে অনুভব করছি, তুমিই আমার প্রকৃত বাড়ি, তুমিই আমার আসল আশ্রয়স্থল। আমি তোমার আশ্রয়ে থাকি, হে পৃথিবী মা। তোমাকে খুঁজতে আমার কোথাও যেতে হয় না; তুমি আমার মধ্যে এবং আমি তোমার মধ্যে বিদ্যমান।

প্রিয় মা, প্রতিবার যখন আমি শান্ত হয়ে তোমার বুকে বসি তখন অনুভব করি তুমি আমার মধ্যে আছ বলেই আমি দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, ধৈর্য ও সহনশীলতা; গভীরতা, সহিষ্ণুতা এবং স্থায়িত্ব; বিশাল সাহসিকতা, নির্ভীকতা, ও অক্ষয় সৃজনশীলতার মতো তোমার চমৎকার গুণগুলিকে মূর্ত করতে পারি। আমি আন্তরিকভাবে প্রতিজ্ঞা করছি—এই গুণগুলিকে জীবনে উপলব্ধি ও বাস্তবায়ন করার জন্য সর্বান্তকরণে প্রচেষ্টা চালাব। কারণ, আমি জানি, তুমি ইতোমধ্যেই আমার হৃদয় ও মনের মাটিতে এই সম্ভাবনার বীজগুলো নীরবে বপন করে দিয়েছ।


তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you