তিনবই

তিনবই

পাশাপাশি রেখে একসঙ্গে একতালে তারিয়ে-তারিয়ে পড়বার মতো বেশকিছু বই নিজের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। সে-রকম একজোড়া বইয়ের কথা বলি আজ। দুটোই বাংলা বই, বাংলার বিষয়াশয় সম্বলিত বই। স্মৃতি হিসেবে বছর-অনেক হয়ে গেল বইদুটো অম্লান হয়ে রয়েছে আমার এই বাচালতাভরা বাগাড়ম্বরময় জীবনে। এদের একটি হলো কথা সামান্যই, প্রণেতা সৈয়দ শামসুল হক, অন্যটি একটি অভিধান — কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী প্রণীত ক্রিয়াভিত্তিকবর্ণভিত্তিক বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ

প্রথমোক্ত বইটি সম্পর্কে একশব্দে পরিচয় জিগ্যেশ করলে বলা যায়, এইটা অনেকটা আংরেজিতে যে-ধরনের বুক গ্লোসারি  হিশেবে জানি আমরা সে-রকমই। তবে এর ভুক্তিগুলো গ্লোসারির চেয়েও অধিক বিশদ, ব্যাখ্যালোকিত, ব্যক্তি ও লোকস্মৃতিবিধৃত মোটিফ দ্বারা রক্তমাংশমজ্জাময়। এখানে যে-জিনিশ সবচেয়ে কম অথবা একেবারে নেই, তা হলো পরগ্রন্থাহৃত উদ্ধৃতি কিংবা যাকে আমরা বলি রেফারেন্স। ফলে এটি আমার বিবেচনায় একটি দিগদর্শী ও আলোপ্রক্ষেপী বই। কিংবা, আউলফাউল ব্যতীত সোজাসাপ্টা, আনন্দবই।

দ্বিতীয় বইটি ঠিক কেজো অভিধান গোছের কিছু নয়, এই কাজটির পূর্ণাঙ্গ অবয়ব দেখার অপেক্ষায় ছিলেন তারাই বিশেষ করে যারা আগের দুই দশক ধরে কলিম খানের অভিনব ওই ব্যাখ্যাপদ্ধতির আলোকে লেখা বইপত্র পড়ে আসছিলেন এবং কলিম ও রবি চক্রবর্তীর অভিধানপ্রকল্প সম্পর্কে বিভিন্ন ছোটকাগজে খবরাখবর পাচ্ছিলেন। অবশেষে বেরিয়েছে এর পয়লা বালাম। সুপরিসর, সমীহজাগানো, বিস্তৃত ও অত্যাবশ্যক কলেবর। স্ব-উদ্ভাবিত ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধি প্রয়োগপূর্বক কলিমের রচনারাজি ভীষণ আদৃত হয়ে আসছে শুরু থেকেই, বিশেষত ছোটকাগজ পড়েন নিয়মিত এমন পাঠক কলিমের প্রথমদিনের দুরুদুরুবক্ষ শব্দার্থবিধির প্রস্তাবনা লক্ষ করেছিলেন মনোযোগ সহকারে। এটা নব্বইয়ের মাঝামাঝি হবে, আমার স্পষ্ট মনে আছে।

এরপর এই ক্রিয়াভিত্তিক নবদিগন্তপ্রসারী ভাষাবিদ্যার বই পেয়েছি একের-পর-এক, মনে পড়ছে কয়েকটি নাম : নিখিলের মৌল বিবাদপরমভাষার সংকেতদিশা থেকে বিদিশায়কার হাতে দেবো আসমানদারীজ্যোতি থেকে মমতায়  প্রভৃতি। ঠিকঠাক নাম বলেছি কি না আমি সন্দিহান। যা-ই হোক, বইটির ব্যাপক ভূমিকাংশ উপভোগ করতে তেমন পণ্ডিত হওয়া আদৌ শর্ত নয় বলেই আমার মতো গণ্ডমূর্খও জবর উপভোগ করতে পেরেছিল। যে-দুটো বইয়ের কথা বললাম, সত্যি, দুর্দান্ত সৃজনসম্ভ্রান্ত দুটো কাজ, পাশাপাশি পড়ে গেলে আনন্দ দুগনা হয়। এইটা আমার মনে হয়েছে। এবার তথ্য হিশেবে কেবল এইটুকু টুকে রাখি যে এই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডটাও প্রকাশিত হয়েছে, এবং কলিম খানের মৃত্যুর অব্যবহিত আগেই, দেখেছি বইদোকানে, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া বা পাতা উল্টায়া যদিও।

পড়ার ক্ষেত্রে আরেকটা অভিজ্ঞতা, রীতিমতো আবিষ্কার বলাই সঙ্গত, অশীন দাশগুপ্তের প্রবন্ধসমগ্র। মূলত তিনি ইতিহাসবেত্তা, নামজাদা, ভারতবর্ষের জলপথে ব্যবসাবাণিজ্যের ইতিহাস বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সুপণ্ডিত। মূলত ইংরেজি ভাষাতেই তাঁর আজীবনের লেখাজোখা। ভারতীয় উপমহাদেশের সমুদ্রেতিহাস বিষয়ক অশীন দাশগুপ্তের গবেষণা সারা জাহানে মশহুর। আংরেজ বিদ্যায়তনিক পণ্ডিতরা খুব কদর করে তাঁর। কিন্তু তিনি যে এত অনন্যসাধারণ বাংলায় লিখতে পারেন, অসম্ভব ভিন্ন ও স্নিগ্ধপ্রকারের এক ভঙ্গিতে, এটা তাঁকে না-পড়লে মেহসুস হবে না। আমি ওই প্রবন্ধসমগ্র রুদ্ধশ্বাস ক্ষুধার সঙ্গে একটানা কয়েকদিনে পড়েছিলাম মনে আছে। এখনও খুব জট-পাকানো কোনো মুহূর্তে যে-কয়টা বই শিথানে টেনে রিলিফ পেতে চেষ্টা করি, তন্মধ্যে অশীন দাশগুপ্ত একটি।

কিছু উদাহরণমূলক কথা বাড়াই ঠারেঠোরে, এ-মুহূর্তে আপিশের সবাই বাড়ি ফিরে গেলেও আমি বাড়ি ফিরছি না যেহেতু রজনী নিঝুম হওয়ার আগ তক, অতএব লিখি কেমন লেগেছিল অশীন দাশগুপ্ত। বই নাকের ডগায় ধরে কোটেশন-মারা লেখা আমার আঙুলে ঠিক ফোটে না যুৎসই। ফলে অ্যাপোলোজিটা আগেভাগেই চায়া রাখছি।

কিছু নিবন্ধাকৃতি প্রবন্ধ রয়েছে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক, অশীনসমগ্রে, পড়ে দেখুন, মোটেও রম্য নয় কিন্তু রমণীয় সরস লিখনভঙ্গিমা আপনাকে তাক লাগিয়ে দেবে। আমি লেগে গিয়েছিলাম, তাক, তব্দা; ঠাকুরভজা হাজারেবিজারে রচনা পড়ার পরও অশীন যেভাবে ধাক্কা মারেন তা স্মরণীয় হয়ে রয়। তেমনি গান্ধী বিষয়ে কিছু রচনা। আমাদের মহাত্মা নিয়া কম রচনা তো পড়া হয় নাই, নয়-নয় করেও মহাত্মাজীবনের বহুকিছুই জানি। কিন্তু অশীনবাবুর কলমে একটা অবাক রচনা পড়েছিলাম, রচনার নাম মনিয়া। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বাপুজির ছেলেবেলার নাম মনিয়া। আমি জানতাম না যদিও। অশীন পড়েই জেনেছি পয়লা। ছেলেবেলায়, তখন তো-আর তিনি গাঁধিজি/বাপুজি হয়ে ওঠেননি, তাঁর মা তাঁকে ডাকতেন মনিয়া আর বাবা ডাকতেন মনু নামে। সেই মনু বা মনিয়া সারাজীবন ধরে মাতৃমূর্তি খুঁজে বেড়িয়েছেন, এটা আলোচ্য প্রবন্ধের একটা — একমাত্র নয় — প্রতিপাদ্য।

সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে যে-কথাটা আমায়, তা হলো : নোয়াখালীতে গান্ধী এসে কয়েকজন সফরসঙ্গী শিষ্যা নারীকে একই কক্ষে নিয়ে একই খাটে রাত্রিযাপন করেছেন, কামভাবে তথা কোনোপ্রকার রিপুতাড়নায় উর্দ্রিক্ত হন নাই, এই গল্প আমরা জানতাম আগে থেকেই এবং হাসাহাসি করতাম এ নিয়ে। এই রচনায় জানলাম, জীবনের শেষদিকে গান্ধী যখন একলা ও চারদিকের নানাকিছুতে পর্যুদস্ত লবেজান, তখন নাকি তিনি কিশোরী কয়েক মেয়েকে তাঁর পাশে শুয়ে থাকতে বলতেন তাঁকে জড়িয়ে ধরে। এটা আর কিছু নয়, এত মহামহিম গান্ধী সর্বক্ষণ মাতৃস্নেহ-মাতৃওম খুঁজে বেড়াতেন কাঙালের ন্যায়! নানান আত্মজীবনসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে এই ব্যাপারটা, আমার মনে হলো, অশীন দাশগুপ্ত খুব সুন্দরভাবেই বোঝাবার প্রয়াস পেয়েছেন। খুব সুন্দরভাবে লেখা একটা স্বচ্ছ ও সৎ রচনা মনে হবে এটি পড়তে যেয়ে আপনার কাছেও, আমার বিশ্বাস, আপনি হয়তো সবাইকে অবাক করে অশ্রুউদাস হয়ে উঠতে পারেন, আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মতো না।

আর, আরেকটা কথা, এইখানে যে-বইত্রয় দেখানো হয়েছে, এইগুলায় যে ভুলচুক কিছু নাই তা তো নয়। কিন্তু ভুলচুক নিয়াই তো বইয়ের এবং জীবনের জ্যান্ত পথচলা। আমরা কেবল পড়ার গরবে আ মরি ক্রিটিকবড়াই করব, না খানিকটা আনন্দোদযাপনও করব, সেলিব্রেইট করব মরণশীল এই ক্ষীণ বইজীবন, গর্তান্বেষী ক্রিটিক-রিডারদেরে এই জিনিশটাও অবসরে ভেবে দেখতে ব্যাকুল রিকোয়েস্ট করি।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: