সুরমাসায়র ৮ || পাপড়ি রহমান  

সুরমাসায়র ৮ || পাপড়ি রহমান  

আব্বা আর দাদাজান মিলে আমাকে একেবারে ছোটকাল থেকেই পায়জামা-সালোয়ার-কামিজ পরাতে শুরু করেছিল। মানে পা ঢেকে রাখা আলখাল্লা টাইপের কাপড়চোপড়। ফলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই সালোয়ার, পায়জামা বা চোস্তপায়জামা হয়ে যায় আমার চিরকালের সাথি। এদিকে আমার ইশকুলের বন্ধুরা বা হাঁড়িপাতিল বা জোলাভাতি খেলার দোসররা হাফপ্যান্ট পরে দিব্যি হেসেখেলে বেড়ায়। আর আমার পা ঢেকে রাখা পায়জামার দিকে বেশ আড়নয়নে তাকায় —
তুমি তো বেশ বয়সী হয়ে উঠেছ, নইলে কি আর হাফপ্যান্ট ছেড়ে পায়জামা ধরেছ?

এইসব কটাক্ষে আমার মন বিষণ্ণ হয়, কান্না পায়। রাগে-দুঃখে আব্বার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে জাগে। কিন্তু আর যা-ই করি না কেন, আব্বার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না বা ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না। আব্বার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে না পারলেও আমি পায়জামার পা দুটো ঘ্যাচাং করে কেটে দিতে পারি। এবং তা দেইও। সেই কাটা সালোয়ারের মুড়ি ভেঙে নিলে দিব্যি হাফপ্যান্ট হিসেবে পরা যায়।

আমি খেয়াল করতে থাকি — আমি যতই গায়েগতরে বড় হচ্ছি, লায়েক হয়ে উঠছি — আমার প্রতি আব্বা আর আম্মা দুইজনই প্রচণ্ডরকম বেরহম হয়ে উঠছে। আব্বা যখন-তখন আমার গায়ে হাত তুলছে। দিবারাত্রি খামাখাই বকাবাহ্যি করছে। আব্বা-আম্মা যেন মুখিয়েই থাকে কোনো উছিলার জন্য। যেন তারা তা পাওয়া মাত্রই আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আব্বার নিষ্ঠুরতা, হাতের মার — সেসব ভাবলে এখনও আমার চক্ষে জল ঝরতে শুরু করে।

অত্যধিক শাসন আর মারধরের মাঝেও আম্মার যে কীসব বাই চাপে। আম্মা আমাকে শার্ট পরাতে শুরু করে। আমি এর সঠিক কারণ এখনও উদ্ঘাটন করতে পারি নাই। হতে পারে নায়িকা সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন, সুপ্রিয়া, শবনম বা শাবানার পরনে আম্মা শার্ট দেখে থাকবে। সেই দেখা থেকেই হয়তো আমার জন্য শার্ট নির্ধারিত হয়। শার্ট বলতে হাবরজাবর টাইপের শার্ট নয়, একেবারে কলার দিয়ে, খানিকটা লম্বা ঝুলে বানানো হাফশার্ট। সেই শার্টের পেছনে একটা নকল বেল্ট আটকে দেয়া, যাতে দূর থেকে মনে হয় কোনো বেল্ট পরে আছি।

করটিয়া থেকে চলে আসার সময় আম্মা আমার জন্য এক ধরনের মিক্সড কাপড় কিনে এনেছিল। সেই কাপড়ের অদ্ভুতুড়ে নাম — ‘আলমাস টেট্টন’! সুতির সাথে পলিস্টারের মিশেলে বস্ত্র। আব্বা অনেক খুঁজেপেতে তা ভালো দর্জিবাড়িতে পাঠিয়ে আমার জন্য শার্ট বানিয়ে আনে। আমিও ঢোলা পায়জামার সঙ্গে শার্ট পরে অনায়াসে ঘুরে বেড়াই। আজ ভেবে বিস্ময় জাগে — পায়জামা আর শার্টের কম্বিনেশনে কী-একটা জোকার ল্যুকই না আমার হতো! আমি কিন্ত সেসবের কিচ্ছুটি কেয়ার করতাম না।

আমার পায়জামা-শার্টের দিনগুলির মাঝে আব্বা একদিন অন্যরকমের কাপড় কিনে আনল। ন্যায্যমূল্যে দেয়া এই কাপড়ের নাম ‘টাফেটা’। রাধা-নীল রঙের কাপড়। একরঙা কাপড়ে্র পায়জামা-কামিজে আম্মা দিলো শাদা চওড়া লেস বসিয়ে। ন্যায্যমূল্যের দোকান থেকে চাচাজানও আমাকে একপিস কাপড় উপহার দিলো। গোলাপি-কালো-সবুজের ফ্লোরাল ভারী কাপড়। আর আব্বা আমাকে ওই কাপড় দিয়ে বানিয়ে দিলো কোট, কিন্তু ভেতরে লাইনিঙ ছাড়া। কোটের মতোই সামনের দিক খোলা ও শেরওয়ানি কলার।

ওই সময়টায় সিলেটে তেমন কোনো ভালো দর্জিবাড়ি ছিল না। মেয়েদের জামাকাপড় সেলাই করা বড় ঝক্কির কাজ ছিল। তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য টেইলার খুঁজে পাওয়া যেত না। আম্মা খুব খেয়াল রাখত পরিচিত কেউ ভালো কাটছাঁট জানে কি না। তেমন খোঁজ পেলেই আমি আর আম্মা ছুটে যেতাম তার কাছে। আধুনিক ও নতুন ডিজাইনের কাপড়জামা বানানোর আশায় আমাদের যেতেই হতো।

বাবরি চুল আর শার্ট পরতাম বলে পেছন থেকে আমাকে একেবারে ছেলেদের মতো দেখাত। তখনো শরীরের কোথাও চড়াই-উৎরাই প্রকট হয়ে ওঠে নাই। আমি ওড়না পরতে শুরু করি নাই। পলিস্টার কাপড় কিনে এনে আব্বাকে দিয়ে আমার জন্য আম্মা আরও দুই-তিনটা শার্ট বানিয়ে দিলো। আমি সেসব পরেই বেড়াতে যেতাম। কচিকাঁচার আসর করতাম। আসরের ড্রিল করতাম। গান গাইতাম।

চাচাজানের পাশের বাসায় শেফালি-দুলালি নামে দুইবোন থাকত। তারা দুইজনই আমার শার্ট পরা নিয়ে অযথাই হাসাহাসি করত। নানা ধরনের ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা বলত। কারণ আমার আশেপাশের কেউই শার্ট পরত না। শেফালি-দুলালি তো নয়ই। আমি দুলালিআপার সাথে ম্যালাদিন ইশকুলে গিয়েছি। এরা দুইবোনের আজব সব কারবার ছিল। দুইজনই প্রচণ্ড ঝগড়াটে ছিল। খিস্তিখেউড় করে একে অপরকে ভাবলেশহীন গালিগালাজ চালিয়ে যেত। ইশকুল-কলেজে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সাংসারিক যাবতীয় কাজবাজ সমাপ্ত করত। রান্না করা, কাপড় কাচা, ঘরদোর মুছেটুছে একেবারে ফিটবিবি হয়ে ঘরের বাইরে বেরোত ওরা। অথচ ঘরে থাকত একেবারে শাকচুন্নী হয়ে। ময়লা ঝুলঝুলে জামাকাপড় পরে।

ওরা যখন ইশকুল-কলেজে যেত ওদের দেখে বাসার অবস্থা কিছুতেই বোঝা যেত না! দুইবোনই বাসায় নানান পত্রিকা রাখত। নানান পত্রিকায় লেখা পাঠাত। লেখার দিকেও খুব ঝোঁক ছিল ওদের।

আমিও ওসব দেখে দেখে লেখার জন্য হাত মকশো করছিলাম।

শেফালিআপা রান্না করত বলে তার হাতে হলুদ-মরিচের দাগ স্পষ্ট হয়ে ভেসে থাকত। আপা সেই হাতেই লিখত গল্প আর কবিতা। তার হস্তাক্ষর ছিল অদ্ভুত সুন্দর! গোটা গোটা মুক্তাদানার মতো। দুইবোনই লিখে হলুদ খামে পুরে তা লেটারবক্সে ফেলে যেত। তাদের সাথে মেলামেশার ফলে আমিও বেশ ইঁচড়ে পাকা হয়ে উঠছিলাম। আমি তখুনি চিনতাম লেটারবক্স। তবে ইনভেলাপের সাথে আমার ছোটকাল থেকেই পরিচয় ছিল। দাদার নামে হলুদখামে চিঠিপত্র আসত। আব্বা আর চাচাজানের চিঠিও আসত হলুদ খামে ভরে।

আমাদের বাসায় আম্মা নিয়মিত রাখত ‘বেগম’, ‘চিত্রালী’ আর ‘পূর্বাণী’। সিনেপত্রিকার দিকে আম্মাদের সবিশেষ মনোযোগ ছিল। রাখা হতো ‘বিচিত্রা’ ও পরবর্তীকালে ‘সাপ্তাহিক রোববার’।

আমি চোরাচোখে নায়িকাদের রঙিন ছবি দেখতাম। তাদের অদ্ভুত সুন্দর চেহারা, দেহবল্লরী। মেনিকিউর-করা লম্বা নখের ফ্যাশন। এসব দেখে দেখে আমিও লম্বা নখের অনুরাগী হয়ে উঠেছিলাম। আব্বা আমাকে এজন্য বহুবার সাবধান করেছে, বলেছে বড় নখের ভেতরে রোগজীবাণু বাসা বাঁধে। আব্বার বারণ আমি শুনেও শুনতাম না। সুস্বাস্থ্যের চাইতে আমার কাছে তখন ফ্যাশন গ্রহণযোগ্য মনে হতো। লম্বা নখের নেইলপলিশ-দেয়া হাতের আঙুলগুলি বড় বেশি মনোহর মনে হতো।

কোনো-কোনো দিন আব্বা নিঃশব্দে আমার পেছনে এসে দাঁড়াত। সজনে গাছের হলদেটে পাতারা যেমন নিঃশব্দে ঝরে পড়ে, আব্বা ঠিক ততটাই নিঃশব্দে এসে দাঁড়াত। তার হাতে লুকানো থাকত নেইলকাটার। আলোগোছে আমার হাত তুলে নিয়ে সূচালো নখগুলি কেটে দিত। আব্বার হাতে জবাই হয়ে যেত আমার শখের নখ। নেইলপলিশ সমেত নখের শবদেহদের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে আমি অঝোরে কাঁদতাম। আমার দুই চোখ বেয়ে রাগ, অভিমান আর দুঃখের অশ্রু ঝরে ঝরে শার্টের কলার ভিজিয়ে দিত। বাড়তি নখবিহীন বিবর্ণ ভোঁতা আঙুলগুলি দেখে আমি একসময় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতাম। কিন্তু আব্বা নির্বিকারভাবে আমার নখ-জবাইয়ের কাজটি সম্পন্ন করত।

আমার সবরকম স্বাধীনতা হরণ করার জন্য আমি ক্রমে জেদি ও মরিয়া হয়ে উঠছিলাম। তাছাড়া আমার চাইতে বাসার পুরুষ সদস্যদের বেশি সুযোগসুবিধা দেয়া, তাদের সব ভালোর জন্য খেয়াল করা আমাকে কেমন যেন একটু কর্নার্ড করে ফেলছিল!

নিজের অজান্তেই সামনের কোনো কঠিন হার্ডলসের জন্য অত ছোট বয়সেই আমি তৈরি হয়ে উঠছিলাম।

COMMENTS