সন্ধ্যারাতে সহজিয়া || প্রান্তর চৌধুরী

সন্ধ্যারাতে সহজিয়া || প্রান্তর চৌধুরী

SHARE:

সহজ কথা, সহজ ভাব, সহজ চলন, সহজ সুর ও সহজ বাদ্য, সহজ চিন্তাভাবনা থেকেই ‘সহজিয়া’। টঙের চা-আড্ডা থেকেই জন্ম হয় সহজিয়ার।

টিএসসির মোড়ে সন্ধ্যারাতে আড্ডা জমায় একদল তরুণ। তখন ২০০৯ সাল। দৃঢ় বিশ্বাস আর গানের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে শুরু তাদের পথচলা। পাঁচ সদস্যের এই ব্যান্ডটি চমৎকার সব গান নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করে।

সহজিয়ার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় সিলেট রেলস্টেশনে। তারা হেডব্যাংয়ের প্রোগ্র্যামে শো করতে আসে। সিলেটে অবস্থিত ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়াম’-এ প্রথম শুনি তাদের গান। অসাধারণ সব লিরিক্সের গান সহজেই সবাইকে মুগ্ধ করে দিতে পারে। বলা যায় সেদিন থেকেই আমি তাদের প্রতি, তাদের গানের প্রতি, নিরুপায় নিরুপম আসক্ত হয়ে যাই।

আমি নিতান্ত ছোটবেলা থেকেই সবসময় ব্যান্ডের গান শোনার প্রতি নিবিড় মনোযোগী ছিলাম। শোনা হয়েছে গেল-শতকের শেষ দশকের স্বর্ণগণ্য প্রোমিনেন্ট সমস্ত ব্যান্ডনাম্বারগুলো। সহজিয়া স্তব্ধ করে দিয়েছিল সেদিন পুরো অডিটোরিয়াম। সবাই নির্বাক হয়ে সহজিয়াগান শুনছিল। সন্ধ্যারাতে, সেদিন, সেই সিলেটট্যুরে একদম মাতোয়ালা করে তুলেছিল তারা গোটা মিলনায়তনতল্লাট। সময়ের অভাবে প্রোগ্র্যাম শেষে আর দেখা করতে পারিনি দৃপ্তচৈতন্য সংগীতস্রষ্টা গানদলটির কলাকুশলী শিল্পী-কাণ্ডারিদের সঙ্গে। দেখা হয়েছিল অবশ্য, অচিরেই, অনুষ্ঠানহুড়োহুড়ির বাইরে একপশলা আটপৌরে আড্ডায়। সেই গল্প বর্তমান ঝটিতি নিবন্ধে এঁটে তোলা যাবে না হয়তো।

19190819_1871852516409708_1686718737_n.jpg

‘বোকাপাখি’, ‘ছোটপাখি’, ‘শবনম’ সহ অসাধারণ সব গান উপস্থাপন করে সেদিন দর্শকের মাঝে। সেই সিলেটসন্ধ্যাটা তাদের সুরের ও বাজনার মূর্ছনায় ছিল মুখরিত। দর্শক মুগ্ধ হয়ে আগাগোড়া গানবাদ্য শুনছিল। সুরের ঘোর কাটার পর দেখি অনেক আগেই গান শেষ।

সময় গড়ায় আঙুলের ফোকর দিয়া। আসে দিন, যায় একের-পরে-এক দুপুর, অনেক অপরাহ্ন হয় অপসৃত। কোনো-একটা কাজে এরই মধ্যে একদিন ঢাকা যাওয়া হয়, যেমন যেতে হয় হামেশা নানাবিধ ছুঁতানাতায়, রাজধানীতে, একদা ভাগ্যচক্রে দেখা হয়ে যায় সহজিয়ার সাথে। টিএসসিতে বসে আড্ডা জমাই মিউজিকগ্রস্ত প্রতিভাদীপিত দলটির গাইয়ে-বাজিয়েদের সমভিব্যহারে। গানগল্পে কেটে গেছিল সময়। জানতে পারি তাদেরই জবানিতে ‘সহজিয়া’ ব্যান্ড সম্পর্কে। ব্যান্ডের পত্তনি, বিকাশ, মিউজিক্যাল ফ্লাইটপ্ল্যান এবং সর্বোপরি তাদের সংগীত-ও-সমাজভাবনা সম্পর্কে বিশদে।

ব্যান্ডের ভোক্যাল রাজুভাই। লিডগিটারে সজিবভাই। ব্যেসগিটারে জাফরীভাই। রিদমগিটারে শিমুলভাই। ড্রামসে রাব্বিভাই। শুরু থেকে ব্যান্ডের রিদমগিটারে ছিলেন সৌম ভাই, যিনি পরে জীবিকাসূত্রে প্রবাসে চলে যাওয়ায় তার জায়গায় শিমুলভাই ইন্ করেন। গোড়া থেকেই তারা গানের ভিতর দিয়া যাপিত জীবনের টানাপোড়েন, স্বপ্নকল্পনা, প্রকৃতির প্রণয় এবং পীড়া ও পরাজাগতিকতা সমস্তই ধারণ করে চলেছে সহজিয়া বাদ্যিবাজনায়, বাংলাদেশের ব্যান্ডসাংগীতিক বৈভবের বিভাঝরা খান্দান ও পরম্পরা মেনে।

“একটা বোকাপাখি
হয়ে বসে আছি
ভাবনা রাখি
শুকনো ডালে
এলোমেলো হাওয়া”

গানের কথাগুলো সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করে ফেলে। সহজিয়া গানে গানে সুর ও সংগীতের বিপ্লব ছড়ায়ে যেতে চায় মানুষের মাঝে। যে-কোনো উৎকর্ষসন্ধিৎসু মনুষ্য-সামাজিক গতিশীলা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার প্রতি নিবিষ্ট সহজিয়া। তারা বিশ্বাস করে গান সমাজকে পাল্টে দিতে পারে। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তারা আগুয়ান আগামীর সাংগীতিক বন্দর নিশানা করে।

বেশিদিন হয়নি ব্যান্ডটির পথপরিক্রমা। তারপরও অর্জন তাদের নগণ্য নয়। এরই মধ্যে স্টেজে তারা দীপ্তি ছড়িয়ে চলেছে যেমন, অন্যদিকে তেমনি স্টুডিয়োঅ্যালবামেও সমুজদার হার্ডকোর ব্যান্ডশ্রোতৃমণ্ডলীর সমাদর কুড়িয়েছে। লিরিকের কোয়ালিটি, মিউজিকের মেধাদীপ্ত যোজনা, গায়নশৈলীগত অভিনবতা এবং সর্বোপরি রকস্ফূর্ত স্বভাবচারিতা দিয়ে ব্যান্ডটি ইত্যবসরে মনস্ক তরুণ ও উল্লেখযোগ্য মধ্যবয়সী মিউজিকলিস্নারদের ফেব্রিটলিস্টে জায়গা করে নিয়েছে।

19190966_1871851543076472_1590937394_nব্যান্ডের ডেব্যু-অ্যালবাম ‘রংমিস্ত্রি’। ৯টি গানের এই অ্যালবামে অ্যাভেইলেবল চমৎকার কিছু সুরের সান্নিধ্য আর সিম্বোলিক্যালি সিগ্নিফিক্যান্ট কতিপয় লিরিক্স। গানের মাঝে আবহমানের সঙ্গে অধুনার দ্বন্দ্ব, প্রকৃতির অমেয় ঔদার্য ও প্রকৃতিবিনাশী কৃত্রিমতার কূট সংক্রাম, স্বপ্নসম্ভব সমাজের অভিপ্রেত রূপান্তর প্রভৃতি ইশারা আধুনিক বাংলা নাগরিক গানের পরিসরটাকে ব্যাপকতায় এবং গভীরতায় বাড়িয়ে চলেছে ইতিবাচক বিবর্তনের আশাকরোজ্জ্বল দিগন্তে। অ্যালবামধৃত অসাধারণ কম্পোজিশনের গানগুলো লিখেছেন ব্যান্ডের ভোক্যাল রাজুভাই।

দিনানুদৈনিক জাগতিকতায় মানুষ অহেতু কঠিন পথে ধাবিত হয়। বেহুদা বানোয়াট শত্রুতায় মানুষের দুষ্কৃতি অনভিপ্রেত। সহজ ভুলে গিয়ে অন্যায়-অত্যাচারে লিপ্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা পরিসংখ্যানগত গণনায় অল্প হলেও সমকালে এদের দৌরাত্ম্য ও দর্প অসহনীয়। সহজিয়া সহজ ভাবতে, সহজ ভাবাতে এবং সহজের সন্নিধান ভালোবাসে। ব্যান্ড হিশেবে একপ্রকার যূথচারিতায় ভিন্ন সব চিন্তাভাবনা থেকেই তাদের পথচলা। সহজিয়া স্টেজে আরোহণের পর দর্শকশ্রোতাদের সাড়া ও সংবেদনদোলা আশ্চর্য ছন্দে স্বতশ্চল হতে দেখা যায়। তারা তাদের পরিবেশনা দিয়ে যেমন অডিয়েন্স স্পর্শ করে, তেমনি শিল্পীদেরেও অডিয়েন্স সোল্লাস সমর্থন জুগিয়ে ফেরায়ে আনে গানের ভুবনে, শ্রোতা আর শিল্পীর সামবায়িক প্রয়াসে সৃজিত হয় প্রেক্ষাগৃহে-মুক্তমঞ্চে মেলবন্ধের ম্যাজিক মুহূর্তগুচ্ছ।

“দেখো নেই বলে কিছু নেই
একবার চেয়ে দেখো
সবকিছু এখানেই”

মানুষ কিছু পাওয়ার আগেই তা হারিয়ে ফেলার ভয়ে থাকে, আবার সহজভাবে বাঁচাটাকে মানুষ অনেক সময় কঠিন করে দেখে। হাতের কাছেই রেখে সবাই খুঁজতে বেরোয় হন্যে হয়ে গভীর অরণ্যে। এবং বাঁচাটাকে বেদিশা ভানবিপর্যস্ত করে তোলে। এহেন ঐহিক লোকায়ত কথারাশির অনুরণন ছড়ায় এই দশকের দোরগোড়ায় আবির্ভূত নবতর সংগীতবিশ্বের দূত সহজিয়া।

… …

প্রান্তর চৌধুরী

COMMENTS

error: