আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম

আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম

‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ হুমায়ুন আজাদের বইয়ের নাম। প্রবন্ধের বই। গোটা বই জুড়ে একটানা একটাই রচনা। আসলে এই বইটা আশ্চর্য প্রকরণের এক টেক্সট আগাগোড়া। আজাদের এই বই পড়ে মেদুর হয়ে আসে দৃষ্টি। ভিজে যায়, ভেসে যায়, থেমে যায় আমাদের দেখনপিয়াসী চোখ।

অথচ উপন্যাস নয়, নাটক নয়, কবিতা নয়। একটানা ধারাভাষ্যের ন্যায় এক প্রবন্ধের বই। রাষ্ট্রীয় মদতে যে-বছর খুন হলেন আজাদ, এর বছর-দুই আগে বেরিয়েছিল বইটি। আগামী প্রকাশনী থেকে, বরাবরের মতো, শ-দেড়েক পৃষ্ঠার বই। প্রথম মুদ্রণের প্রচ্ছদ ছিল, যতটুকু মনে পড়ে, সমর মজুমদারের। ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ — প্রশ্নবাক্য দিয়েই প্রচ্ছদ ছিল কি না, আজ আর মনে নাই অবশ্য; তবে বাক্যটি ইন্টারোগেইটিভই তো। কোনো ক্যালিগ্র্যাফি নয়, স্রেফ সুতন্বীবিজয় টাইপসেটের বর্ণ পরপর বসিয়ে যাওয়া কাভার। আমরা / কি / এই / বাঙলাদেশ / চেয়েছিলাম? উপর-নিচ শব্দপঞ্চক বসানো। বইনামের শীর্ষে একলাইনে লেখকনাম।

হুমায়ুন আজাদের বইগুলো সাইজে এবং ভেতরগত বিন্যাসে একটা আলাদা ধারা তৈরি করেছিল। প্রচ্ছদের দিক থেকেও স্বতন্ত্র ঘরানা এনেছিল হুমায়ুন আজাদের বই। বিশাল টাইপফন্ট দিয়ে লেখকনাম ছাপা হতো বইগুলোর প্রচ্ছদে এ-মাথা ও-মাথা। কবিতাবইয়ে যেমন, উপন্যাসেও, প্রবন্ধবইতেও অনুরূপ। তবে এই বইটাতে এক ব্যত্যয় দেখা গিয়েছিল। রচনানাম গোটা কাভার জুড়ে, লেখকনাম তুলনামূলক ছোট ফন্টে।

হুমায়ুন আজাদ চাপাতিকোপে পতিত হন বইটি প্রকাশের বছর-দুই পর। ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটা ছাপা হবার অব্যবহিত বাদে। এইটা আমাদের পড়া হয়েছিল কোনো-এক ঈদসংখ্যায়। ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটার কথা বলছি। কিন্তু ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ পড়েছি গ্রন্থশরীরেই। কোনো-এক হৃদয়বান বন্ধুর দৌলতে।

যেদিন হুমায়ুন আজাদ চলে গেলেন, খুন হয়েছিলেন যদিও এর বেশ কয়েক মাস আগে, সেদিন এই বইটা আমাদের এক সহকর্মীর সামনে আদ্যোপান্ত পড়ে গিয়েছিলাম। ঘণ্টা-দেড়েক লেগেছিল পুরাটা খতম দিতে। সেই সহকর্মী হাউমাউ শব্দে খেদ করছিলেন লোকটার জন্য। খুন-হয়ে-যাওয়া আজাদের জন্য। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে আজাদের লেখা তার অপছন্দের চিরদিন, লোকটার সর্বদা দাম্ভিক আচরণ আর সর্ববিধ বিষয়ে উন্নাসিকতার জন্য, সমস্ত বিচারবিবেচনায় একদেশদর্শিতার জন্য, অহেতু বিদ্বিষ্ট মনোভাবের লেখক মনে হতো হুমায়ুন আজাদকে তার কাছে, এবং আজাদ তার গদ্যে প্রচুর বিজ্ঞাপনী বিশেষণ ব্যবহারপূর্বক তিলকে তাল এবং ভাইস্-ভার্সা বানাইতে ছিলেন ওস্তাদ, তবে এই-সমস্তকিছু সত্ত্বেও হুমায়ুন আজাদের অনির্বচনীয় কিশোরসাহিত্যের জন্য এবং আলোচ্য ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ মহাকাব্যিক প্রবন্ধগ্রন্থের জন্য তিনি চিরদিন পাঠকের বুকে হাহাকার এবং চোখে অশ্রু ঝরাবেন। সহকর্মীটিও কবুল করেন কথাটা।

ঢাকায় ২০১৬ জুলাইয়ের প্রথম দিনে হোলি-আর্টিস্যান বেকারিতে সেই নিরীহ মানুষগুলো জিম্মি হবার রাতে তন্নতন্ন খুঁজছিলাম পড়ার লাগিয়া ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ বইটা। পাই নাই। নিশ্চয় কেউ নিয়েছিল পড়তে, পরে আর ফেরত দেয় নাই কিংবা আনাও হয় নাই চেয়ে। এইটা, ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ কথাটা, খালি-যে সেই কিলিং নাইটে মনে উদয় হয়েছে এমন নয়। লাস্ট ফাইভ ইয়ার্স, মিনিমাম্, অথবা খাস্ করে এরও আগের বছর-তিন ধরে, স্পেশ্যালি ২০১৩-অনোয়ার্ডস্ দিনগুলোতে, এই বাক্যটা বারবার মনে পড়ছিল। ‘প্রগতিশীল’-‘দুর্গতিশীল’ নির্বিশেষে সকল মহলের উদ্ভট উটগ্রীবা-বাড়ানো ঝগড়ুটে খাসলত দেখে এই দেশের কথিত ‘শিক্ষিত’-‘দীক্ষিত’ লোকসমষ্টির উপর ভরসা হারিয়েছি ইদানীং। তবে এই বইটা, ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ বইটা, আজ হাতের কাছে পেলে, একবার উল্টেপাল্টে দেখে গেলে, বাষ্পরুদ্ধ বুকটা হাল্কা হতো হয়তো-বা। আলোচনা করা যেত, বইটা, যদি রিয়্যালি রাইটার হতাম আমি।

হুমায়ুন আজাদ খুন হবার পরের যে-বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নাই। নিশ্চয় পারব একদিন, আশা ছিল। ক্রমশ ভরসার দীপগুলি নিভে আসছে। ডিসেম্বর ২০১৮ পার করে এসে এখন মনে হয়, হ্যাঁ, এই বাংলাদেশই নিশ্চয় চেয়েছি আমরা, নাইলে এমন তো হবার কথা না। আপাতত লজ্জায় জিভ কাটা যাবার কথা বলে ন্যাকামিটা না করি।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: