ভালোবাসার বাঘ, বৃশ্চিক ও বিছুটিলতা

ভালোবাসার বাঘ, বৃশ্চিক ও বিছুটিলতা

যা নাই তা দেওয়ার নাম ভালোবাসা।
— জাক লাকাঁ

বাক্যটা, উপরোক্ত, পড়েছিলাম অনেককাল আগে একটা বাংলা বইয়ের উত্সর্গপৃষ্ঠায়। সলিমুল্লাহ খান লিখিত আমি তুমি সে : জাক লাকাঁ বিদ্যালয়  নামীয় বইবিসমিল্লায়। এই জেলাশহরে, যেখানে মুই গোঙাইছি রভসে দিবারাতি, কথিত মননশীল পাঠকের একটি বইদোকানে রেগুলার সান্ধ্য ঢুঁ দিতাম এককালে। এখন বই দেখলেই ভল্লুকজ্বর ভর করে শরীরে। সেই দিনগুলায় ছিলাম আমি সিসিফাসের চেয়েও দু-চামচ বাড়া, মানে, পাথর নিজহাতে ঠেলে তুলে ফের নিজহাতেই শীর্ষপর্বত থেকে নামায়ে আনতাম সমতলে। সেই দিনগুলা ছিল এমনতর যুক্তিহীন তর্কমুখর, চুক্তিহীন কর্মযজ্ঞের, মধুরতম মর্মযন্ত্রণার। দিনগুলা কবেই বিলীন লোলচর্ম বয়সগর্ভে, জীবিকাবাঘের পেটে!

যে-কথা বলছিলাম, আজ্ঞে, সেই বইদোকানের বারান্দায় ফেলে আসা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আড্ডার অপরাহ্ন ও সন্ধ্যাগুলোর ধূসর দৃশ্যাবলি। ঠিক এমনই এক গাড়িঘোড়া-হুড়োহুড়ি সন্ধ্যায় সেই বইদোকানে রুটিনচক্করের একফোকরে দেখতে পাই বইটি, এবং দু-চারপাতা এদিক-ওদিক নেড়েঘেঁটে ফিরে আসি ঘরে। ফিরে আসি, কিন্ত তার আগে পেয়ে যাই ওই বাক্যটি। পাওয়ামাত্র পকেটস্থ করি হৃদয়ের, অথবা উল্টে বললে হৃদয়স্থ করি পকেটের। পকেটের কোনো হৃদয় কিংবা হৃদয়ের কোনো পকেট আছে কি না আদৌ, সে-তর্কে যাওয়া যারা উচিত কাজ মনে করেন, তাদের সনে এই পত্রে আপাতত কোনো কথালাপ হবার নয়। তারা বরং অন্যত্র চেষ্টা করুন; — বদ্বীপা বাংলাদেশে আর-যা-ই হোক, টকশোজাতীয় খাজুইরা আলাপ জুড়বার টেলিপ্ল্যাটফর্মের অভাব নেই নিশ্চয়ই। অতএব, তাদের অসুবিধা হবার কথা না, আমারে উনারা যেন ক্ষেমাঘেন্না করেন। আমি বরং চেষ্টাচরিত্তির করে দেখি আশেপাশে কোথাও চন্দনের বনটন খুঁজে পাই কি না। কখন কে ডাক দেয় ভ্রুপল্লবে, বলা তো যায় না! ভ্রুপল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে… আহা! আমি বরং দেখি দেওয়া যায় কি না তাকে, মম সুখদুঃখজাগানিয়া মধুহৃদিটিকে, যা নাই তা।

যা নাই তা তৈরি করায় থাকি বরং রত, মগ্ন, ততক্ষণ!

বিষ ভালোবাসা বিষয়ে একটি বিতর্কিত সদ্যপ্রসূত ছদ্মদর্শন
বিষের মধ্যেও কি ভালোবাসা থাকে? কিংবা ভালোবাসার ভেতরে বিষ? কঠিন প্রশ্ন, মুশকিল-কা-সাওয়াল। দ্বিতীয় প্রশ্নের একটা উত্তর নিশ্চয়ই অনেকের কাছ থেকে আসবে, এবং হুড়মুড় করে, — যে হ্যাঁ, ভালোবাসায় রয়েছে মারাত্মক বিষ। কূটাভাসপ্রিয় যারা, বলে উঠবেন : মারাত্মক মধুরতাময় বিষ! আর কে না জানে, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে এবং চেতনে বা অবচেতনে, আমরা প্রত্যেকে প্রেমিক একেকজন, অন্তত নার্সিসাস তো অবশ্যই। আর প্রেমে-পোড়-খাওয়া — সোজা মুখে ছ্যাঁকা-খাওয়া — সংখ্যায় তারাই তো বেশি। নয় কি? অতএব, সংখ্যাগুরুর উত্তর অভিন্ন হবে — এ আর আশ্চর্য কী!

কিন্তু প্রথম প্রশ্নের বেলায়? ওই যে, বিষের মধ্যেও ভালোবাসা থাকে কি না — এমন শিকওয়ার কেমনতর জওয়াব কাঙ্ক্ষিত? সহসা আশাও করছি না উত্তর। তবু মনে হয়, হ্যাঁ, থাকতে পারে। বিষের মধ্যেও ভালোবাসা থাকতে পারে বৈকি। উদ্ভট উত্তর, সন্দেহ নেই। তবে প্রমাণ-যুক্তি দেখালে পরে কেউ আমাকে আর-যা-ই-হোক উন্মাদ ঠাওরাবেন না। কি, ঠিক বলছি তো? ওয়েল, একটা হাল্কা উদাহরণ ভাবা যাক। ধরুন, কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিলেতফেরত মোলাকাতের সময় কিংবা আপনার প্রেমিকা আলোবাতাসের কোনো দুপুরবেলায় আপনাকে একপ্যাকেট চুরট উপহার দিলেন, বিদেশি সিগার অথবা দেশি বিড়ি — এবং আপনি অধুমপায়ী নন, বলা বাহুল্য। তখন? এইবার বুঝলেন তো, — যদিও এইটা অতি সরল একটা যুক্তি, — বিষে ভালোবাসা বেশ ভালোভাবেই বিরাজ করে কি না?

হ্যাঁ, বিষেও ভালোবাসা থাকে। একটা বাড়তি ইঙ্গিত অবশ্য প্রকাশ থাকা জরুর যে, কেবলই বিষাক্ত কিংবা আস্ত মধুভাণ্ডের মতো কোনো জায়গায়, নির্বিষ মধুর বা নির্মধু বিষধর কোনো ক্ষেত্রে, এই জিনিশ তথা ভালোবাসার অস্তিত্ব মুমূর্ষু ও সন্দেহসংকুল। মধু ও বিষের সমন্বিত এক আজব যৌগ হলো ভালোবাসা, আর এর অ্যালক্যামি নিরূপণ করার জন্যই তো জন্ম হয়েছে আমাদের। ভালোবাসা নামের এই চিচিংফাঁক রসায়নবিক্রিয়াটি মানুষ যেদিন ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারবে, সেই দিন সেই মুহূর্তেই পৃথিবী নিঃশ্বাসবান্ধব হয়ে উঠবে, বেশিরভাগ দুনিয়াবি ফিৎনা আপনাআপনি নিরসন হতে শুরু করবে, জগৎ হয়ে উঠবে জলের মতো সাবলীল। এই এক সমুদ্র, নাম তার ভালোবাসা, যেখানে মানুষ ডুবে যেয়েও মরে যায় না, বাঁচে বেশি করে বরং।

লোকে এত ভালোবাসা-ভালোবাসা করে, বেহুদার তরে এত মাথা কুটে মরে — সখি, ভালোবাসা কারে কয়? — সে কী কেবলি মেকি ও মিষ্টি বিষময় নয়? সে কী নয় ভীষণ বোকাহাঁদা বনবার আবহমান প্রক্রিয়া? সে কী কেবলি মতিভ্রম, মোহ ও মনোরোগ, কেবলি পিছল পথভ্রমণ? সকলি ধান্দা আসলে, কিছু-না-কিছু হাতানোর/হাসিলের কোশেশ কেবল, লাইফ হেল্ করার পরিকল্পিত প্রাচীন পাঁয়তারা — আমাদের এক বন্ধুর সখেদ বিবৃতি ছিল এই-প্রকার, যে একটা ছ্যাঁকা সামলে উঠে তৎকালে বলদিয়া ভিসা নিয়া অ্যারাব কান্ট্রিতে এক্সাইলে চলে যায়। এই ঘটনা বারো বছর পূর্বেকার, যুগপূর্তি পালন করা যেতে পারে একটা ভালোবাসা সম্পর্কিত থিসিসের, চলতি বছরে বন্ধুটি দেশে ফিরে বিয়ে-থা করেছে বলে খবরে প্রকাশ। পর সমাচার, বক্ষ্যমাণ অভিসন্দর্ভে সেই বন্ধুটির কোনো গোপন কাহিনি ডিসক্লোজ করব না, এখানে কেবল কতিপয় অসমর্থিত সূত্রে প্রাপ্ত কথাবার্তা টুকে যাব। অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে গেলে এর স্যুপার্ভাইজার সন্দর্ভকারীকে রেকমেন্ড করবেন, অন্যথায় একটা অ্যারেইঞ্জমেন্টে যেতে চাইবেন, উপায় একটা বেরোবেই যা-হোক তা-হোক। চরৈবেতি ইজ্ দি বেস্ট পলিসি।

যখনই কাউরে চেঁচাতে শুনি ভালোবাসা-ভালোবাসা তারস্বরে, ভারি সন্দেহ হয়, শুনে ভারি সন্দেহ হয় আমার। রবীন্দ্রনাথ সন্দেহতালিকার শীর্ষে তবে? আলবৎ! অমরতার ধান্দা, — ঠাকুর তাতে সফল। ইন্ট্রেস্টিং! হ্যাঁ। এই সময়ে এসে, এই বর্তমানে, এই দুই-হাজার-তেরো সৌরঅব্দে, ভালোবাসা এক বিরাট ধাপ্পাবাজি এবং নতুন সহস্রাব্দের সর্ববৃহৎ কিংবদন্তিপনা। নারী-পুরুষ মধ্যকার বিশেষ একটা ব্যাপার এই থিসিসের বাইরে রাখা যাক আপাতত। অন্য অধ্যায়ে এইটা আলোচিতব্য। ওকে, ফাইন। ওই একটা ব্যাপার ছাড়া যাবতীয় অন্য সমস্ত জাগতিক বিষয়ব্যাপার এই থিসিসের আওতাভুক্ত বলে সন্দর্ভপ্রণেতার অভিমত। সন্দর্ভকর্তার বিবৃতি ধর্মগ্রন্থোক্ত অমোঘ আয়াত মনে করে মেনে নেয়ার কোনো স্কন্ধ-মটকানো জোরজবরদস্তি-চাপাচাপি এইখানে নাই, বরং সকলেই বাজায়ে দেখে নিন। বিনা বাক্যে মাল সমঝিবেন না, মালসামান দর-কষাকষির ভিত্তিতে টেপেটুপে খরিদ করিবেন, বাণিজ্যমন্ত্রীর বুলিতেও কভু মজিবেন না। কাজেই, প্রিয় ক্রেতাসাধারণ ভাইবোনবন্ধু-কলিগেরা, ভালোবাসা বুঝিয়া লউন! বিকিকিনির এই বিন্দাস সভ্যতায় সবচে সুলভ যে-পণ্যটি, এবং সবচে বেশি কাটতি যার, এবং আপনি খরিদ করে চলেছেন যারে ভক্তিভরে দিনের-পর-দিন, তারে নিয়া কথা তোলা হচ্ছে এই সন্দর্ভে! আপনি সাবধান হউন, কর্ণ-চক্ষু খরশান ও খোলা রাখুন!

দেখুন, বাঙ্গালা সাহিত্যে ধুন্দুমার চুটিয়ে চলিতেছে যত ভালোবাসাবাদী কবিদের পরাক্রমী কাল, যারা করে বেড়ায় সোচ্চার ভালোবাসার জয়স্লোগ্যান! অবশ্য পলিটিশিয়্যানদের বুকে টেনে নিন, উহাদের ভালোবাসা সাচ্চা, ঘন ঘন এনজিওগ্রাম করান। এনজিওর ভালোবাসা সারে-জাহাঁ-সে-আচ্ছা! আর নোবেল-নাইট এনজিও হলে তাহাদেরে আপনারা তামাম তালুক তুলিয়া দিন, তাহারা নিশ্চিন্তে ভালোবাসাব্যবসায় মনোনিবেশ করুন, দেশে ভালোবাসার গ্যুডপ্র্যাক্টিস রেপ্লিকেইটেড হোক জোরেশোরে। কবিদের কাজ কবিরা করুক, কবিদের পাশে আপনি কিংবা আপনার পূর্বসূরি প্লেটো কোনোদিনই ছিলেন না, তাদের কাজ অপ্রশংস ভালোবাসা বানানো ও সবার মাঝে শ্রেণি-নির্বিশেষে ডিসেমিনেইট করে যাওয়া আমৃত্যু।

ভালোবাসা অ্যাগেইন
ভালোবাসা নিয়ে আসি আজ আমি মেঘে মেঘে সারাক্ষণ…
(গানপঙক্তি : প্রেয়ার হল)

রাত জেগে বড়জোর এই পাতাটি ভরে প্রার্থনা করা যায়। প্রার্থনা, যাতে আসন্ন সুপর্ণা শীতকালটা ভালো কাটে মানুষের। অনাগত কিন্তু অবশ্যই আসবে যে-শীতগুলো, বর্ষাগুলো, শরৎ ও বসন্তগুলো, যেন কাটে সুন্দর ও সাবলীল। দুঃখ থাকবে, দৈন্য থাকবে, কান্না ও কারুণ্য থাকবে, তবু আনন্দ ও আমোদ যেন থাকে পাশাপাশি। যেন মানুষের মর্মে কোনো হিংসা না-থাকে, যেন ঘৃণার উল্টোপিঠে প্রতিদিন মুখ দেখে মানুষ, যেন সহুজে লোকের ন্যায় দেখিবারে পায় ত্রিভুবনের তরিতমগুলো। যতই আসুক বিপদাপদ, অগ্ন্যুৎপাত ও ভূকম্পন, সবই যেন অচিরে সরেও যায়। এই দোয়া, প্রার্থনা, এই প্রেয়ার করি। সমস্ত কলুষ, সকল ম্লানিমা, সর্বঈর্ষা ও অসূয়া ভুলে যেয়ে মাছের মতন পারে সাঁতরাতে যেন জীবনের অগাধ জলে — সে — মীনমুখ সে-মানুষটি। নিকটের ও দূরের আর্শিসম্মত পড়শিটি। যেন তার সকল সঙ্কট সমাধা হয় ঠিক সময়মতন, সমস্ত আততি মকুব হয় এক-লহমায়। যেন তার তরী গিয়ে ভেড়ে তীরে উপদ্রবহীন। যেন তার চোখের পলকে চলে আসে সামনে যে-কোনো অথৈ ক্ষণে জাহাজমাস্তুল। যেন সে না-পায় ভয় কোনো দুর্বিপাকে। যেন সে যেতে পারে আরও ভালো কাজবাজ করে। যেন সে লিখতে পারে ভালো লেখা আরও — কয়েকটা পাখিনোট, খরগোশের স্ট্যাটাস আর তার বাড়ির পুশিবিড়ালটার অভিমানে-ফোলা গালে ব্লাশিং স্মাইল ফুটাতে কিছু জরুরি ইমোটিকন; … এইসবই কাফি, এরচেয়ে একচুল বেশি কিছুই নেই ডিভ্যাস্ট্যাইটিং অ্যাকাডেমিক কোনো ডিস্কোর্সে, বহুবিজ্ঞাপিত কোনো মনীষীও নন ততোধিক মহান কিছু। ভর না-করতে পারে যেন কোনো নস্ত্রাদামাস বা এরিক ফন দানিকেন কি আল্লামা শাফি তার ওপর, যেন তার বাক্যাবলি শাসন না-করে কোনো ফ্রয়েড-লাকাঁ-দারিদা বা আদ্দিকালের রদ্দি ম্যাক্লুহান-ম্যাকিয়াভিলি। যেন তার দিনগুলো হয় সৃষ্টি ও শান্তিশীল, মধু ও মাধুর্যে মুখর। যেন তার কাছের মানুষেরা তারে রাখে কাছে কাছে। যে তারে দুঃখ দিয়াছে, যারা তারে পুড়ায়েছে পৃথক পাবকে, ব্যবহারজীর্ণ হাড়ের মালার মতো ফেলে রেখে চলে গেছে যে, নেভায়েছে যারা তার বিশ্বাসের আগুন — সে ও তাহারা যেন তার কাছে এসে চায় বিনীতজানু করজোড়ে ক্ষমা। পায় যেন ক্ষমা তারা তার কাছে এসে চিরকাল। আর তার হাতিশাল থেকে হাতিগুলো, আস্তাবল থেকে তার ঘোড়া, যেন তার আগামী দিনের ভার বহনে স্বেচ্ছায় সম্মত হয়। যেন সে না-কাঁদে আর, কোনোকিছু না-ঘটে যেন জীবনে তার কাঁদার, কিছুতেই যেন তার নাহি আসে জল দুইচোখে। যেন তার জলের মতো স্বচ্ছ নয়নে খেলা করে আলো চিরদিন। চান্নিপসর যেন তার কাটে চিরকাল। এই-ই তো, অলমোস্ট, উইশ ইটার্ন্যাল।

মঙ্গল ঝরুক জীবনভর, তোমাদের আমাদের তাহাদের সকলের দুনিয়ায়, মঙ্গল ঝরুক জগতের সর্বজীবের প্রাণে। মঙ্গল ঝরুক রাশি রাশি ভারা ভারা মানুষের মানুষীর মনে। নিদারুণ কর্কট, অতিকায় মিষ্টি মেষ, বিপুলা বৃশ্চিক, সহাস্য সিংহ ও প্রাণান্ত পর্যুদস্ত মিথুন সকলের মনে মঙ্গল ঝরুক তরল-কঠিন-বায়বীয় সর্বাবস্থায়। নিখাদ মঙ্গল হোক, সহস্রমাইল শান্তিকল্যাণ হোক প্রতিটি দিন মানুষের। সুপুরিবনের সমাহিত স্বস্তি বিরাজ করুক সর্বপ্রহর। অনাগত অচেনা দিনগুলো অপলক চেনা-চেনা হয়ে ধরা দিক মানুষের হাতে, এঁচোড়ের বাছুরের বৃহতের হাতে, শৈশবের মতো কৈশোরের মতো ছেলেবেলার মতো ঘনিষ্ঠ ও চেনা চেনা। গান হয়ে ফেরে যেন বিস্মৃতিবিক্ষত গতস্পৃহ উল্লাস ও খুশিদিনগুলো। যেন হাসি হয়ে, বাঁশঝাড়ে পাতাঝরা হাওয়ার বাঁশি হয়ে, শারদাকাশ হয়ে, শীতের শিশিরভরা সব্জিখামার হয়ে, বর্ষাবিলের হাঁস হয়ে ফেরে দিনগুলো। অচেনা আগত দিনগুলো সহজিয়া সুরে যেন অভিজ্ঞতার অন্তর্গত হয় মানুষের। সমস্ত নক্ষত্র এসে বিষাদগ্রস্ত মেয়েটির নাকের-চিবুকের কাছে জড়ো হয় যেন। ঝলমলিয়া ওঠে যেন তার সমূহ সত্তা, মর্মরিয়া ওঠে যেন দুঃখরাতের গান, অচিরাৎ ঘটে যেন তার দুঃখশোকের সকল অবসান। এই সুরভিত সুন্দর, এই অনিন্দ্য অকলুষ অবয়ব যেন অটুট থাকে, যেন অনাবিল থাকে চিরদিন। যেন না-হারায় কোনোদিন এই নিরবধি বৃষ্টিস্নিগ্ধা হাসি, এই অপরূপ বিষাদ, এই ক্রন্দন-থেমে-থাকা মুখের মিরর।

বেঁচে থাকো, কলমিলতার ফুল, তুমুল তুখোড়ভাবে বেঁচে থাকো। প্রথম দেখার সেই জারুলফুলের ঝুলন্ত লতা, ভাটিয়ালি-উত্তাল সেই বৃষ্টিবিলোল দুপুর, অবিকল থাকো। ক্রমাগত বুড়িয়ে যাচ্ছি ও বুড়িয়েই যাব প্রতিদিন ক্রমাগত, বুড়িয়ে যাওয়াই নিস্তারহীন নিয়তি জীবনের, তোমরা থাকো তরুণ পল্লবভরা রাস্তাপার্শ্বের হে সার সার শিশুগাছগুলো! অর্জুনগাছের হে সুদর্শন রক্তবর্ণা কাণ্ডগুলো! মনে রেখো না আগের জন্মের জঙ্গক্ষত, শকূনিকৌটিল্য, গতজন্মের দাহস্মৃতিসমূহ। ভুলে যাও, অবিলম্বে ঝেড়ে ফেলো মন থেকে সমস্ত, ভুলে যাও সমুদয় ভুল পদপাত। তোমাকে যে দুঃখ দিয়েছে তাকে রেখো না মনে, তুমি যারে দুঃখ দিয়েছ মনে রাখো তারে। যে এসে চলে গেছে, যে এসে যন্ত্রণাপানিতে তোমায় গলাঅব্দি ডুবিয়ে রেখে চলে গেছে দূরে, তারে আজি ভুলে যাওয়া চাই। মন থেকে মুছে ফেলা চাই আখছিঁবড়ে বিষাদবোধগুলো, পরিত্যক্ত দিন ও রাতের পর্যুদস্ত দশা, ফেরানো চাই মনে ফের ইক্ষুগুড় আর খেজুরের রস। নইলে নিশ্চয়ই, নিশ্চিতভাবেই, বঞ্চিত হবে জীবনের অভাবিত বৈভব থেকে। জীবন তোমাকে যা যা দিতে চায়, মনে রেখো, তুমি সিকিভাগও তা নিতে পারো নাই। জীবন অপেক্ষা করছে, — তুমি হাত বাড়াবে কখন তার পানে। জীবন অসহ্য এক মাধুর্যের নাম, একে ঠিকঠাক বুঝে ওঠা চাই। জীবন তো আর কেবল নমঃনমঃ যাপনের নয়, কিড়িমিড়িদন্ত কোনোমতে কাটানোর নয়, জীবন তো উপভোগের। জীবনের ভোগ থেকে, জীবনের উপভোগ থেকে, দূরে সরে থাকা অমার্জনীয় অপরাধ। জীবন সকলের প্রতি সমান সদয় নয়, এইটা ডাহা মিথ্যা বুলি যে জীবন সবার জন্য সমান দয়াদাক্ষিণ্যভরা; — জীবন তার প্রতিই কেবল সদয় যে জীবনের প্রতি সদয় ও সৎ থাকে, সচেষ্ট ও সঙ্গপ্রীতিপূর্ণ থাকে। জীবন হোক সূর্যালোকে সয়লাব, সকলের, চন্দ্রালোকে চনমনে মৃদুমন্দ সুবাতাসবহ। সুন্দর ও সম্পন্ন হোক সংসার সবার।

আজি প্রাতে সূর্য ওঠা, ভালোবাসা ও বাগানে ফুল ফোটা সফল হোক তোমার।

ভালোবাসাবাঘ ও চিরকালীন বন
মেঘলাদিনে দুপুরবেলা যেই পড়েছে মনে / চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুলো বনে … তারপর? “আমি কাছে গেলাম, পাশে বসলাম, মুখে বললাম : খা / আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ, নড়ে বসছে না। / আমার ভয় হলো তাই দারুণ কারণ চোখ দুটো কৌতুকে / উড়তে-পুড়তে আলোয়-কালোয় ভাসছিলো নীল সুখে / বাঘের গতর ভারি, মুখটি হাঁড়ি, অভিমানের পাহাড় … / আমার ছোট্ট হাতের আঁচড় খেয়ে খোলে রূপের বাহার। / মেঘলাদিনে দুপুরবেলা যেই পড়েছে মনে / চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুলো বনে … / আমি কাছে গেলাম, পাশে বসলাম, মুখে বললাম : খা / আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ, নড়ে বসছে না।।” আর বোধহয় আগানো যাচ্ছে না। তাই, অগত্যা, শক্তি দিয়া সেরে নিলাম বিদায়বারতা।

নির্বিশেষ দ্রষ্টব্য :  পোপ ফ্র্যান্সিস সম্প্রতি (নভেম্বর ২০১৩)  একটি বিশেষ ভালোবাসাবাণী দিয়েছেন আমাদের বিপর্যয়ে কেঁপে, তাই-না দেখে আমাদের সেই বিশ্বখ্যাত ভালোবাসামালিক ও প্রেমের পাওয়ারটিলার সহসা ধ্যান ভেঙে ভোদড়ের ন্যায় নেচে উঠেছেন। অরিন্দম কহিবার আগে একটু বিষাদপর্ব অতিক্রম করেন, অস্বাভাবিক না ব্যাপারটা বরং পুরাণসম্মত মহৎ, অরিন্দম বরাবরের মতোই বিশিষ্ট হয়ে রইলেন। উহার বিশিষ্টতা জানিতে কিছুই বাকি নাই, আমরা বিশিষ্টের কদর করব নিশ্চয়ই, ইতিহাসে। চেনা চেনা লাগে যেন, তবু নহে চেনা বলে মনে হয় কেন? ১৭৫৭ সালের মামলা, আর আমাদের স্মৃতিও খুব ফলফ্রুট-খাওয়া নয় তো, তাই। ঠিক আছে, সেমিনার শেষ এবং ঘুমও জবর পেয়েছে, এবার বাড়ি যাই।

লেখা : জাহেদ আহমদ ।। নভেম্বর ২০১৩

… …

COMMENTS

error: