বাউল করিম ইন ব্রিটেইন || উজ্জ্বল দাশ

বাউল করিম ইন ব্রিটেইন || উজ্জ্বল দাশ

SHARE:

“স্বচক্ষে দেখিলাম যাহা বিলাতে
তারা সবাই বাস করে এক ভালোবাসার জগতে…”

তাঁকে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। ভাটির পুরুষ শাহ আবদুল করিম সকলের প্রিয় করিমভাই (Shah Abdul Karim)। ১৯৬৮ সালে তাঁর প্রথম বিলেতভ্রমণ; সফরসঙ্গী ছিলেন সিলেটের আরেক লোককবি দুর্বিন শাহ। তাদের গানের ঘোরে বেশ কিছুদিন মাতোয়ারা ছিলেন বিলেতবাসী।

লন্ডনের ক্যামডেন এলাকার সুরত মিয়ার বাসায় একরাতে জমে ওঠে করিম-দুর্বিন দ্বৈরথ। ভোররাত অবধি চলে আসর আর সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ জুরন আলী। সেই আনন্দময় স্মৃতি হাতড়িয়ে সৈয়দ জুরন আলী বললেন, “ভক্ত-শ্রোতাদের জায়গা সংকুলান হচ্ছিল না, আবার কেউ যেতেও চাইছিলেন না। দেশের বাইরে সেই সময়ে এমন সরস গানের আসর আর লোকগানের দুই দিকপালকে কাছে পাওয়াও ছিল বড় ব্যাপার।”

১৯৮৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বিলেত দর্শন করে করিম লিখেছিলেন বিলাতের স্মৃতি। অল্পদিন বিলেতে থেকে সেখানকার মানুষের যাপিত জীবনের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন সুদীর্ঘ গানে। শাহ আবদুল করিম বলেছেন,

“উনিশশো পঁচাশি সনে
বিলাত থেকে কয়েকজনে
হঠাৎ ভাবিলেন মনে
সিলেটের শিল্পী আনতে।

শিষ্য মোর রুহি ঠাকুর,
কাজি আয়েশা, শফিকুন নুর
হাফিজ উদ্দিন বড় চতুর
যোগ দিবে সে তবলাতে।”

সেই সফরে শিষ্যদের নিয়ে বিলেতের নানান শহরে গান করেছেন করিম। কিছু অনুষ্ঠানের ভিডিওচিত্র এখনো ইউটিউব চ্যানেলে দেখতে পাওয়া যায়।

Shah Abdul Karim and Durbin Shahএরপর ২০০৭ সালে পুত্র নুরজালালকে সঙ্গে নিয়ে করিমের শেষ বিলেতভ্রমণ। তবে সাক্ষাৎ করিমের দেখা পাননি তখন বিলেতবাসী। সুযোগ হয়নি প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার। লন্ডনে পৌঁছেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। লন্ডনে বেশ কিছুদিন চিকিৎসাধীন থেকে দেশে ফেরেন করিম।

২০০৯ সালে শাহ আবদুল করিমের সাহায্যার্থে লন্ডনে আয়োজন করা হয়েছিল চ্যারিটি গানের অনুষ্ঠান। তৎকালীন ব্রিটিশ-হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর সহযোগিতায় আয়োজকদের মাঝে একজন ছিলেন বিলেতের সাংস্কৃতিক তৎপরতার পরিমণ্ডলে অত্যন্ত পরিচিত শিল্পী রওশন আরা মণি। অনুষ্ঠান-আয়োজকেরা ফান্ডরেইজিং সেই কর্মসূচির মাধ্যমে করিমের পরিবারকে প্রায় দশ লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

দেশে কিংবা ভিনদেশে বাংলা ভাষাভাষীর মানুষের সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ থাকে করিমের গান। বিলেতে তাঁর অগণিত ভালোবাসার মানুষের আবাস, যারা প্রতিনিয়ত তাঁর গানের বন্দনা করেন। বিলেতে করিমবন্দনার কিছু টুকরো গল্প দিয়েই তাঁর জন্মদিনে স্মৃতিতর্পণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই নিবন্ধ আবর্তিত।

১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যার সময় বিলেতে সফরে এসেছিলেন সিলেটের বেশ কয়জন শিল্পী। সেই শিল্পীদলে ছিলেন বিলেতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী গৌরী চৌধুরী। তার কাছ থেকেই শোনা যাক সেই সময়ের গল্প; গৌরী চৌধুরী বললেন, “বিলেতের নানা শহরে আমরা গান করেছি। শাহ আবদুল করিম তখন খুব-একটা পরিচিত ছিলেন না। তবে আমি তাঁর ‘আমি কুল হারা কলঙ্কিনী / আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী’ গানটি করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াই।

ঠিক একদশক পরে, ২৪ মে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে, বিলেতের খ্যাতনামা উম্বলি কনফারেন্স হ্যলে আয়োজন করা হয়েছিল বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উৎসব। বাংলাদেশ থেকে আসা তারকা শিল্পীদের দলে ছিলেন হ‌ুমায়ূন আহমেদের হিমু হিশেবে খ্যাত অভিনেতা ফজলুল কবির তুহিন। আয়োজকদের মাঝে একজন ছানু মিয়া। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বললেন, “উম্বলি কনফারেন্স হ্যল ও ম্যাঞ্চেস্টারের অ্যাপোলো মিলনায়তনে আমরা দুটি শো করেছিলাম। শুধুমাত্র শাহ আবদুল করিমের গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ফজলুল কবির তুহিনকে। হ‌ুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘জলসাঘর’ অনুষ্ঠানে তুহিনের সুরেলা কণ্ঠে গাওয়া করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি তখন তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

শাহ আবদুল করিম

অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার যে, ২৫ বছর আগের যে-অনুষ্ঠানের কথা জানতে ফোন করলাম ফজলুল কবির তুহিনকে, সেই তিনিই তখন সিলেটে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমেছেন মাত্র! তুহিন বললেন, “করিমের গান গাইতেই আমার প্রথম বিলেত আসা হয়েছিল। উম্বলির মতো বড় মঞ্চে গান গাওয়া আর দর্শকদের ব্যাপক সমর্থন প্রেরণা জুগিয়েছে। হ‌ুমায়ূন আহমেদের জলসাঘরে গানটি গাইতে পারা ছিল বড় ব্যাপার। আজকে শাহ করিমের জন্মশতবর্ষে গান করতে পেরে খুবই গর্বিত।”

২০০২ সালে ‘একতার মিউজিক’ থেকে বের হয় জনপ্রিয় শিল্পী হাবিবের সংগীতে বিলেতপ্রবাসী কায়ার গানের অ্যালবাম ‘কৃষ্ণ’। বাংলা লোকসংগীত নিয়ে হাবিবের ভিন্ন ধাঁচের সংগীতায়োজন অ্যালবামটিকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে নতুন আঙ্গিকে করিমের গান। পরের বছর হাবিবের সংগীতায়োজনে একতার থেকেই বের হয় মায়া। অ্যালবামে গান করেন আরেক বিলেতপ্রবাসী শিল্পী হেলাল। কথা হয় করিমের গান গেয়ে খ্যাতি পাওয়া শিল্পী কায়ার সঙ্গে। কায়া জানান, “করিমের গান গেয়েই আমার পরিচিতি, আমার সৌভাগ্য তাঁর গান প্রচারের এমন সুযোগ পেয়েছি। বাংলা লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ শাহ আবদুল করিম। তাঁর গানই তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

শাহ আবদুল করিম২০১০ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘সিং আপ, সিং আউট’ শিরোনামে বিলেতের নিউহ্যাম এলাকার ২৮টি স্কুলের ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৭৫০জন খুদে শিক্ষার্থী গাইল শাহ আবদুল করিমের গান ‘গাড়ি চলে না, চলে না রে!’ সেই সন্ধ্যায় উপস্থিত থাকায় উপভোগ করেছিলাম করিমের গান পরিবেশনের এক বিশাল চিত্র। লন্ডনের অভিজাত রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলে করিমের গানটি পরিবেশনের সুযোগটি তৈরি করেছেন প্রোজেক্টের এশিয়ান মিউজিক প্রশিক্ষক শিল্পী গৌরী চৌধুরী। শিশুকিশোরদের পরিবেশনপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় প্রোজেক্টের কোঅর্ডিনেটর জেইন হুইলার্সের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন তারা করিমের গান বেছে নিলেন? জবাবে জেইন জানিয়েছিলেন, “আমাদের স্কুলগুলোতে নানা দেশ থেকে আসা বাচ্চারা পড়াশোনা করে। অভিনব অজানা কিছুর দিকেই ওদের আগ্রহ বেশি। শাহ আবদুল করিমের গান, জীবনদর্শন সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত অবহিত হয়েছি গৌরী চৌধুরীর কাছ থেকে। আর নানা পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই গুণী শিল্পীর ‘গাড়ি চলে না’ গানটি জুরি বোর্ড মনোনীত করে। ২৮টি স্কুলের ৭৫০জন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলের সংগীতপ্রশিক্ষকদেরও তাঁর সম্পর্কে জানতে হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা জানার সুযোগ পেয়েছে সুদূর বাংলাদেশের এক বিখ্যাত লোককবির কথা।”

শাহ আবদুল করিম১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ লোকান্তরিত হন ভাটিবাংলার অযত্নলালিত শালুক, গণমানুষের কবি শাহ আবদুল করিম। তাঁর মৃত্যুর তিনদিন পর বিলেতে আসি। ০৪ অক্টোবর পূর্ব লন্ডনের ব্র্যাডি আর্ট সেন্টারে বৈশাখী মেলা ট্রাস্ট ইউকে আয়োজন করে তাঁর স্মরণসভা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে সেদিন জানানো হয় বিলেতপ্রবাসীদের অর্থে সিলেটে নির্মিত হবে শাহ আবদুল করিম ইনস্টিটিউট। সংবাদপত্রের প্রতিবেদক হবার সুবাদে সেই খবর দেশের একটা জাতীয় দৈনিকে সেই-সময় লিখেওছিলাম। যদিও ঘোষণাপরবর্তী উদ্যোগের কোনো অগ্রগতি আর জানা যায়নি।

৩ আগস্ট ২০১৪ যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড শহরে সেলিব্রেশন অফ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কালচার সংগঠনটি আয়োজন করে দুইদিনব্যাপী শাহ আবদুল করিম উৎসব। আয়োজনে যুক্ত ছিল করিমের গানের অন্তপ্রাণ ভক্ত পেরুতে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর বিদায় সংবর্ধনা। করিমের গানের প্রতিযোগিতায় সেরা শিল্পী হিসেবে ১০ হাজার পাউন্ড জিতে নেন প্রবাসী বাউল শহীদ। শাহ আবদুল করিমের গান নিয়ে মাতোয়ারা আনোয়ার চৌধুরীর কথা কমবেশি অনেকেরই জানা। সেই অনুষ্ঠানেই কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। করিমের গান নিয়ে তিনি বললেন, “তাঁরে আমি খুঁজে ফিরি। আমাদের দেখা হয়নি ব্যাপারটা বাকি জীবন পীড়ার কারণ হয়ে থাকবে। করিমের গান আমাকে ভালোবাসায় দোলায়, আমার আমাদের শিকড়ের কথা বলে। শাহ করিম আমাদের অনেক দিয়েছেন আর আমরা তাঁকে যোগ্য সম্মানটুকুও দিতে পারিনি; সেটাই আফসোস।”

শাহ আবদুল করিমএকই বছরের শেষদিকে বিলেতে আসে করিমের জীবন ও দর্শন নিয়ে মঞ্চনাটক ‘মহাজনের নাও’। শাকুর মজিদ রচিত ও সুদীপ চক্রবর্তী নির্দেশিত ঢাকার সুবচন নাট্য সংসদের আলোচিত মঞ্চপ্রযোজনা। পূর্ব লন্ডনের ব্র্যাডি আর্ট সেন্টার কানায় কানায় পূর্ণ। পরপর দুটি সন্ধ্যা হলভর্তি মানুষের উপস্থিতি জানান দেয় বিলেতে করিমপ্রিয়তা। নাট্যমুহূর্তের বাইরেও সকলের প্রিয় করিমভাই, ভালোবাসার মানুষ। দর্শকদের একজন সালেহা বেগমের নীরব কান্না, নাটক দেখে বলছিলেন, “কেমন নাড়িছেঁড়া টান অনুভব করছিলাম। আমার বাপের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়, তাঁর গানের সঙ্গে ভাব অনেক দিনের। এদেশে বেড়ে-ওঠা আমার ছেলেও তাঁর গান শোনে। এমন নিখাদ সরল মানুষ আর হবে না। এটি শুধু নাটক নয়; শাহ আবদুল করিমকে স্মরণের অনন্য প্রয়াস।”

‘সুবচন’-দলপতি গিয়াস আহম্মাদ প্রতিক্রিয়ায় বলছিলেন, “মনে হয়নি ভিনদেশে আমরা নাটক করছি। পৃথিবীজুড়ে করিমের ভক্তকুল। শত ব্যস্ততার মাঝেও মানুষের উপস্থিতি নজরকাড়া। অনেক দর্শক দাঁড়িয়ে নাটক দেখেছেন আর সেটি বাউল করিমের জন্যই।”

বিলেতে বেড়ে-ওঠা নতুন প্রজন্মের শিল্পী শাপলা শালিকের গায়কিতে করিমের ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’ দারুণ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। আর লাখো মানুষের মিলনমেলা ‘লন্ডন বৈশাখী মেলা’ জমে ওঠে না করিমের গান ছাড়া।

বিলেতে এ-সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল কণ্ঠশিল্পী অমিত দে সবসময়ই ব্যস্ত গান নিয়ে। কখনো বাদক কিংবা গায়ক তবে দুই ক্ষেত্রেই সমান জনপ্রিয় অমিত। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানালেন, “করিমের গান ছাড়া বিলেতে খুব কমই গানের অনুষ্ঠান শেষ হয়। ভিন্ন আমেজের আয়োজন হলেও করিমের ভক্তকুল শুনতে চান করিমের গান।”

বিলেত করিমের অগণিত ভালোবাসার মানুষের দেশ। ‘বিলাতের স্মৃতি’ গানের শেষ প্যারায় তিনি বলেছেন,

“বাউল আবদুল করিম বলে
সৎ এবং সরল হলে
ভবিষ্যতে শান্তি মিলে
পরশ মিলে লোহাতে।

জ্ঞানের কমল যদি ফোটে
আলো আসে আঁধার টুটে
বিরাজ করে প্রতি ঘটে
যারে খোঁজে জগতে।”

  • শাহ আবদুল করিম
    শাহ আবদুল করিম

উজ্জ্বল দাশ

মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসের স্মারক সংগ্রাহক, গবেষক ও স্থিরচিত্রানুধ্যায়ী ইতিহাসকথক
উজ্জ্বল দাশ

COMMENTS

Posari IT Solution
error: