নারীর পায়ে ফুটবল ও তদানুষাঙ্গিক || ইমরান ফিরদাউস

নারীর পায়ে ফুটবল ও তদানুষাঙ্গিক || ইমরান ফিরদাউস

SHARE:

One is not born, but rather becomes, a woman. ~ Simone de Beauvoir[]

এই ধরাধামে প্রচলিত চিন্তাহীনভাবে বাঁধাধরা আচরণবিধিই একজন শিশুকে (সামাজিক) ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ রূপে গড়ে তোলে। এরপরের কথা তো আমাদের জানাই আছে … এই নারীকে তৈরি করা হবে এমনভাবে যেন সে আর ফুরসতই না পায় নিজেকে ‘মানুষ’ হিসেবে ভাববার। নারীকে একটি ‘সাংস্কৃতিক পুতুল’ হিসেবে গড়বার কারখানা প্রত্যেক সমাজে চালু আছে এবং এত এত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কালেও বহাল তবিয়তে চলছে তা বলাই বাহুল্য। এই সংস্কৃতিকে আরো বেশি করে লালন করতে দেখা যায় ভিনদেশি অভিবাসী সমাজে! সেখানে হৃদয়ে একটুকরো ‘নিজ দেশ’-কে প্রতিপালনের চিহ্নগুলো প্রকাশিত হয় পরবর্তী প্রজন্মকে বড় করে তোলার প্রক্রিয়ার বরাতে। কিন্তু ঐ পরবর্তী প্রজন্মকে বাপ-মায়ের দেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় গল্প ছাড়া অন্য কোনো সত্যি হয়ে জড়িয়ে ধরে না। সে বরং সম্মুখীন হয় অন্যতর সাংস্কৃতিক বাস্তবতার, যেখানে চামড়ার রঙ, মুখের বুলি, অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি ইত্যাদি তাকে অবচেতনে বারংবার মিসড্‌ কল দিয়ে যায় বহুত্বের সংস্কৃতির। তার পরিবারের চাইতে সে নিজের অস্তিত্বের জাহির করতে আরো বড় পরিসরে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়; যেখানে অভিবাসী পরিবার অচেতনেই বেছে নেয় ‘অপর’ করে রাখার রাজনীতি বা অর্জন করতে চায় ‘অন্যঘরে অন্যস্বর’-এর অধিকার সেখানে ঐ প্রজন্ম চায় ‘একই ঘরে স্বাধিকারের শ্লোগান’ জারি রাখার স্বত্ব। এমতাবস্থায়, সংঘর্ষ অনিবার্য! কিন্তু, সংঘর্ষ মানেই বেদনার করুণ রস আর অধিকারের বলাৎকারের অনিবার্য ছড়াছড়ি নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ন রেখেও এই কোন্দল জারি রাখা সম্ভব।

‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’ কী বস্তু
আর এমনটাই আমরা দেখতে পেলাম ভারতীয়-বৃটিশ ছায়াচিত্রনির্মাতা গুরিন্দর চাধা-র ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’[] (২০০২)-এ। হিথ্রো বিমান বন্দরের অদূরেই লন্ডনের উপকণ্ঠে বাস করে জেস ভামরা (পারমিন্দর নাগ)। অভিবাসী পাঞ্জাবি পরিবারের দুই কন্যার মধ্যে সে কনিষ্ঠজন। জেসের জীবনের যাবতীয় অর্থ নিহিত রয়েছে ‘ছেলেদের খেলা’ ফুটবলের মধ্যে। কিন্তু জেসের মাতাপিতা চায় সে এবং তার বড় বোন পিঙ্কি যেন একজন আদর্শ ভারতীয় কন্যার মতন লন্ডনের রাস্তায় চলাফেরা করে। তো, পিঙ্কির বিয়ের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসতে শুরু করে জেসের উপরেও চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। জেসের এই অস্বস্তিকর পারিবারিক জীবনে ফুরফুরে মিঠে সমীরণ হয়ে আসে জুলস (কাইরা নাইটলি); শুধু তা-ই নয়, জুলস জেসকে সাহস যোগায় নারীদের স্থানীয় ফুটবলদল হাউন্সলো হিথ্রো-তে যোগ দিতে। ফাইন্যালি, একটা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জেস লঘুপদে তাড়াতাড়ি তা-ই করতে চলে যায়, যা তার করতে ইচ্ছা হয় স্বপনে-জাগরণে! হাউন্সলো হিথ্রোর সাথে সে প্রীতিম্যাচের তরে পাড়ি দেয় জার্মানির হামবুর্গ শহরে। এই ভ্রমণের অবকাশে জেসের সাথে টিমকোচ জো-এর অনুরক্ততা তৈরি হয়। আড়চোখে দেখা জেস-জোয়ের, কুসুম-কুসুম চোখাচোখি আরেকদিকে জুলসের মর্মে বেদনার উদ্রেক করে। ফলাফল দুই বন্ধু ও নর্মসখার মনোমালিন্য। এদিকে বাসায় জেসের মিথ্যে ছল ধরা পড়ে যায় এবং খেলাধুলার উপর খড়্গ নেমে আসে — যেমন নেমেছিল ‘কলঙ্কিনী রাধা’-র উপর। সহদোরা পিঙ্কির বিয়ের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে পরিবার থেকে সাচ্চা ভারতীয় হবার চাপটা জেসের উপর সমানুপাতিক হারে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। কারণ, শাদি মোবারকের দিনেই যে আমেরিকা থেকে আগত ফুটবলস্কাউটের সাথে সাক্ষাতের দিন ধার্য হয়েছে! তাহলে … কি, জেসকে ফুটবলখেলোয়াড় হবার আশা জলাঞ্জলি দিতে হবে!? জেসের তখন শচীন কত্তার গানের কলির মতন ‘বল রে সুবল বল দাদা, কি করি আমি, কি করি আমি’ দশা!! পাঠক-পাঠিকা বা ভাবী দর্শক চাপা উত্তেজনার পীড়ন থেকে মুক্তি নিন … কেননা এইখানেই গুরিন্দর চাধা তাঁর মারফতি দেখিয়েছেন এবং মিহি করে যাবতীয় উত্তেজনা একটি চূড়ায় এনে পরিতোষজনক সমাধান উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রকাশ থাকুক, ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’ একটি বৃটিশ সিনেমা যা জার্মানির সহ-প্রযোজনায় নির্মিত হয় ২০০২ সনে। ২০০২ সনে বৃটেনে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাসমূহের মধ্যে এটি সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে ১১ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যবসা করে। শুধু বৃটেন নয় আমেরিকা ও ইউরোপের দর্শক-সমালোচকদের নজর কাড়তেও সক্ষম হয়। হাউন্সলো, সেন্ট্রাল লন্ডন ও জার্মানির হামবুর্গে চিত্রায়িত এই সিনেমার চিত্রনাট্য যৌথভাবে লিখেছেন পল্‌ বার্জেস এবং গুলজিৎ বিন্দ্রা।

থিম ও ইশ্যু
‘ইস্ট ইজ ইস্ট’ (১৯৯৯), ‘ভাজি অন দ্য বিচ’ (১৯৯৩), ‘আনিতা এন্ড মি’ (২০০২)-এর ন্যায় বৃটিশ-এশিয়ান সিনেমাসমূহের মতো এটিও কমেডি ঘরানার সিনেমা যেখানে ঘটনাপরম্পরার আবর্তন ঘটেছে পরিবার-পরিজনবর্গ, প্রজন্মগত ব্যবধান এবং কৃষ্টিগত বিবাদকে ঘিরে। বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যামকে আলোচ্য বিষয় ও সমস্যাবলির নিক্তিতে এভাবে ব্যবচ্ছেদ করে দেখানো যেতে পারে —

জেস — ফুটবল খেলা নিয়ে তার বেপরোয়া মনোভাব এবং পরিবারে পুরুষানুক্রমিকভাবে চলে-আসা নারীদের ভূমিকার অনুবর্তী না হয়ে বরং আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে হাজির থাকার গল্পের পিঠে সওয়ার হয়ে ছুঁয়ে গেছে জেন্ডারবৈষম্য, বর্ণবাদ, ধর্ম ও সামাজিক বৈষম্যের মতো ইশ্যুগুলিকে; যা পুরুষ এবং নারী হিসাবে সব বয়সের, সব ধর্মের সাধারণ সংগ্রাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে — হাউন্সলো হিথ্রোর ড্রেসিংরুমে জেস টিমমেইটদেরকে যখন বলছে — “ভারতীয়রা মনে করে মেয়েদের ফুটবল খেলার দরকার নেই”, ঠিক তখনি একজন টিমমেইট টিপ্পনি কেটে বলে, ‘এ কেমন পশ্চাৎ-অপসরণ’। আর জেসের প্রত্যুত্তরটা ছিল, “ইটস্‌ জাস্ট কালচার দ্যাটস অল!”

অভিবাসী মাতাপিতার কন্যা ও একজন নারী হিসেবে ডেভিড বেকহ্যামের বাঁকানো ফ্রিকিক যেমতি প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যুহ ছিন্নভিন্ন করে গোল করে; সেমতি জেসও আপাত সোজা তথাপি সমাজের বক্র নিয়মগুলি লাইনে আনতে ব্যস্ত হয়। পুরো সিনেমা জুড়েই জেস চেষ্টার পর চেষ্টা করে যেতে থাকে সাধারণ্যে স্বীকৃত অথচ নারীর জন্য অমর্যাদাকর সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মগুলির বিরুদ্ধে তার মতো করে প্রতিবাদ করতে। জেসের কথা হলো, কেন একজন নারীর অভিমত, অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে না! প্রকৃতির সর্বত্র যখন একই রীতির চর্চা করা হয় তখন নারীদের জন্য কেন তা গন্দম ফলের হুমকি হয়ে থাকবে। তার এই প্রতিবাদ যেমন ভারতীয় নারীর চিরাচরিত পোশাক সালোয়ার-কামিজ বদলে তার জন্য আরামপ্রদ পোশাক নির্বাচনের মধ্যে প্রকাশ পায় তেমনি পোশাকের স্বাধীনতাই যে মুক্তির নিদান নয়, তা আমরা দেখতে পাই তার যাপন নিয়ে পরিবারের সাথে বাহাসের দৃশ্যগুলিতে।

প্রায় সকল ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির প্রাণভোমরা রক্ষিত থাকে/আছে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিতে নারীদের ভূমিকা, চাল-চলনের বিধি-বিধানের মধ্যে। এই বিধিমালার বক্ষ জুড়ে থাকে নারীরা কি করতে পারবে এবং কি কি করতে পারবে না সেসবের তালিকা। নারীবাদী দার্শনিক উমা নারায়ণের মতে, “রন্ধনকার্য বিশেষভাবে ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রতীকায়িত করে থাকে সেইজন্য প্রত্যেক ভারতীয় ললনাকে শুদ্ধতাবধারণের প্রমাণস্বরুপ অবশ্যই রাঁধতে জানতে পারতে হয়।”[] জেসের মা মিসেস ভামরা আদর্শ ভারতীয় নারীর একটি চমৎকার উদাহরণ যাকে সারাদিনই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় খাবার প্রস্তুত, পরিবেশনা বা অন্যদের উদরপূর্তিতে নিয়োজিত থাকতে। এই রন্ধনকর্ম বা খাবার পরিবেশনা আসলে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার একটি চিহ্নমাত্র, যার মূলে রয়েছে কন্যাকেও একজন আদর্শ ভারতীয় নারী হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস। তাই, জেস যখন ফুটবল নিয়েই রসুইঘরে ঢুকে পড়ে তখন মিসেস ভামরার আর কোনো সন্দেহই থাকে না যে জেস নিজ হাতে নিজের এবং পরিবারের সুনামের নিকুচি করার প্রকল্পে রত হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে, ফুটবলটি শুধু বল নয় বরং জেসের চেতনার বহিরাংশও বটে। ঠিক তার সন্নিহিত দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই মিসেস ভামরার খেদোক্তিমূলক সংলাপ, “What family will want a daughter-in-law who can run around kicking football all day but can’t make round chapattis?”

বাপ-দাদার সংস্কৃতির রিলে-ব্যাটনটি পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সোপর্দ করার বাসনায় অনুপ্রাণিত মিসেস ভামরা মনে করেন — রাঁধতে পারার গুণের মধ্যেই রমণীর সংসার সুখের হয় তথা এটিই উত্তম ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। তাই, বৃটেনবাসী মিসেস ভামরার মঙ্গলকর অভিপ্রায়গুলি জেসের কাছে সাংস্কৃতিক অনুশীলন নামক জগদ্দল পাথরের চেহারায় প্রতিভাত হয়।

উল্লেখ্য, পুরুষতান্ত্রিকতা বিষয়টার দেশে দেশে নিজ নিজ বিগ্রহে বিরাজ করে। যেমন, উন্নত বিশ্বের আধুনিক নারীর প্রতিনিধি হিসেবে জেসের সখা জুলসের আম্মাজান মিসেস প্যাক্সটন যখন জুলসের অ্যাথলেটিক ফিগারে নারীসুলভ কমনীয়তার ফোঁটা ছাড়া ছিটে দেখে মনে মনে শঙ্কিত হন তার মেয়ে কি সমকামী হয়ে গেল? বা এই মেয়েকে কোনো ‘প্রিন্স চার্মিং’ কোলে তুলে নেবে? মিসেস ভামরার মতন তিনিও চান জুলস যেন আরেকটু মেয়েলী রূপে নিজেকে উপস্থাপন করে। তো, দেখা যাচ্ছে যে পুরুষতান্ত্রিকতার তন্ত্র থেকে আসলে নারীর রেহাই নাই। ইউরোপিয়ান গার্ল হবার কারণে জুলস কোনো ছাড় তো পাচ্ছেই না বরং জেসের মতো তাকেও প্রচলিত নর্মের মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

যদিও, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সিনেমার পুরোভূমিতে ফুটবলটাকেই প্রধানভাবে দেখা যায় পরন্তু এর উপর ভর করেই জেস এবং জুলস নিজেদের জীবনের আমলনামা নিজেরা লেখার স্বাধীনতা উদযাপন করতে চায়, মানুষ হবার সুযোগটুকুন কাজে লাগাতে চায়। ভাবী দর্শকরা জানবেন — জেস বা জুলস কেউই কিন্তু পরিবারে বা সমাজে ঐতিহ্যবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায় নাই; তারা তাদের পরিবারকে যারপরনাই ভালোবাসে। সিনেমার বালিকারা বেশি কিছু চায় নাই … চেয়েছে মাত্র নিজেদের নামে বাঁচার জন্মগত অধিকার। এক কথায় বললে — ব্যাষ্টিক প্রত্যাশা আর ব্যক্তিক বাসনার দ্বন্দ্বের এক মধুর, হাস্যরসাত্মক সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে এই ছায়াচিত্রের দৃশ্যমালা জমে ওঠে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে।

ঘরানা ও শৈলী
স্পন্দনশীল এবং আনন্দময় বৃটিশ কমেডি ফিল্ম হিসেবে বেন্ড ইট লাইক বেকহামকে আখ্যায়িত করা যায়। কমেডি ঘরানার এ সিনেমার মূল উপজীব্য বিষয় পরম্পরাগত ভারতীয় মূল্যবোধ ও সমকালীন বৃটেনে আধুনিক ভারতীয়দের অভিজ্ঞতার চাপান-উতোর।

ফুটবলদলের সহকর্মী, পরিবার, বন্ধুবর্গ এবং ভাইবোনের মধ্যকার একটানা রসাত্মক মিথষ্ক্রিয়া ইংরেজ ও ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে ভেদরেখা না টেনে বরং সেলুলয়েডের ফিতায় প্রস্ফুটিত করে প্রত্যেক জাতিগত এবং/অথবা জাতি অংশের একদেশদর্শি বাস্তবতা, ধর্মীয় ঐতিহ্যের পবিত্রতার অর্পণ এবং ক্রীড়ায় নারীদের বৈষম্যের মতো চিরাচরিত প্রসঙ্গগুলি।

সিনেমার সৃজনশীল কাহিনিসূত্র বা চিত্রনাট্যেও আমরা উদারনৈতিক নারীবাদী দৃষ্টিকোণের ছায়া দেখতে পাই। চিত্রনাট্যের পরতে পরতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান কীভাবে পৃথক জাতি ও ধর্মের অনুসারীরা উপেক্ষার পথে না গিয়ে, পারস্পরিক কদরের চর্চার মাধ্যমে নিজেদের ভিন্নতাগুলি উপভোগ করতে পারে; এবং খুঁজে নিতে পারে সংস্কৃতি পরিবর্তনের গৌরবান্বিত সরণি। একইসাথে চিত্রনাট্যে ঘটনার নিগূঢ়তার কারণে হাস্যরসাত্মক আলাপগুলি বিরক্তিজনক হয়ে ওঠে নাই।

চিরাচরিত এবং আধুনিক সংস্কৃতির ভেদ বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যামের পোশাকপরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সিনেমাজুড়ে বিসদৃশ ধাঁচের ফিল্মশট এবং প্রয়োগকৌশলের অর্থপূর্ণ ব্যবহার দৃশ্যগুলির মধ্যে চাক্ষুষ আখ্যান গড়ে তুলেছে। ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজের যথাযথ প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে নির্মাতা দুই সংস্কৃতির প্রভেদগুলি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন ধরা যাক — সাংস্কৃতিক ব্যবধান রূপায়ণে ভারতীয় ও ইংরেজ পরিবার এবং ফুটবলমাঠের একাধিক দৃশ্যের ব্যবহার। উপরন্তু, বিভিন্ন ধরনের ফিল্মিক শটের ব্যবহার সিনেমার গতিপ্রবাহকে জোরদার করেছে … যেমন — ময়দানে খেলোয়াড়দের চরণযুগলের ক্লোজ-আপ শট, এরপরেই ওয়াইড শটে পুরো দলটিকে আমরা দেখতে পাই। চরিত্রগুলির উপর দর্শকদের নজর ধরে রাখতে মিড শট ও মিড ক্লোজ-আপ শটের চতুর ব্যবহারের জন্য নির্মাতা গুরিন্দর চাধা বাহবা পেতেই পারেন। ফিল্মিক শটের এহেন সুবিবেচনাপূর্ণ প্রয়োগের ফলশ্রুতিতে সিনেমার মানুষগুলির জীবনের বহমানতার সাথে দর্শকদের অন্তর্দৃষ্টির সংস্থাপনে কোনো বিঘ্ন ঘটে না।

বাকিটা পর্দায় দেখা যাক
সবশুদ্ধ, আমার মনে হয় পারিবারিক উম্মিদ, সু্যোগের অভাব, লিঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক বাধার দরুণ মাঠে-ময়দানে, রাজপথে বা গৃহকোণে নারীদের প্রতিনিয়ত যেসব অসুবিধা, চাপ ও কুসংস্কারের সম্মুখীন হতে হয়েছে, হচ্ছে বা হবে (হয়তো) — সেসবের একটি বাস্তবসম্মত দেখনের চিহ্নাবলি এই সিনেমাতে হাজির আছে। যেমন বলছিলেন সোশ্যাল ক্রিটিক সারাহ হেস, “…as opposed to taking a serious approach to a very serious topic, Bend it like Beckham depicts the multicultural scene of social clashes, gender restraints and religion in a humorous, entertaining, light-spirited, energetic way.”[]

তো, বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম   শুধুমাত্র স্বপ্নতাড়িত দু’জন অগ্রণী নারীর বিজয়গাথা উপহার দেয় না বরং পরিবার, বন্ধুদের শুভকামনা সাথে নিয়ে লালিত স্বপ্নকে কীভাবে সাকার করতে হয় সেই আলোও ছড়িয়ে দেয় অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গির বাতায়নে।


দোহাই

১. Simon de Beauvoir, The Second Sex, P. 301, New York: Vintage Books, 1973.
২. Bend It like Beckham
৩. Jamie Rees, Bend It Like Beckham and “Bending” the Rules
৪. Sarah Hesse, Bend It like Beckham (Kick it like Beckham)
প্রথম প্রকাশ : নারী ও প্রগতি, সম্পা. রোকেয়া কবীর, বর্ষ ৯। সংখ্যা ৮। জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৩, ঢাকা।

… …

COMMENTS

error: