মেঘদল, মাই লাভ … || বিজয় আহমেদ

মেঘদল, মাই লাভ … || বিজয় আহমেদ

SHARE:

যে-গল্পের নামঠিকানা
আমার কাছে আজো অজানা …
সেই গল্পে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে গাইছি এ-গান!

এসো আমার শহরে, না-বলা গল্পে …

সেই কবে যেন একটা টিভির লাইভে শুনেছিলাম এই গানটা।

কত কত দিন মাথায় থেকে গেছিল এই ক-লাইন। কী অদ্ভুত লাইনগুলো! কী বিষণ্ণ! কান্নাভেজা। মূলত যে-গল্প নাই-ই এ-পৃথিবীতে। যে-গল্পের কোনো এক্সিস্টেন্সই নাই। সেই গল্পে কেউ-একজন দাঁড়িয়ে আছে। সেই দাঁড়িয়ে-থাকা পুরুষটা আসলে এক অজানা-মানুষীর ছায়া! আর সেই বিপন্ন পুরুষই কিন্তু এই গানে চাষ করছে, এক চরাচরবিদীর্ণ-করা আকুতি, কোনো-এক মানুষীর জন্য। আর এটা তো বুঝি আমরা, এই না-থাকা গল্প আসলে অধিকার-হারিয়ে-ফেলা সম্পর্ক। যে-সম্পর্ক একসময় ছিল প্রবল ও বাঁধনহারা। তা যখন নাই হয়ে যায়, তখন তাকে এভাবেই বলা হয়, “যে-গল্পের নামঠিকানা / আমার কাছে আজো অজানা …” তারপরেই সেই অধিকারহীন সম্পর্কের জমিনে দাঁড়িয়ে ভীরু ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে পুনরায় যে-কথা বলা হচ্ছে, তার মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, পুরুষটি এখনো সেই প্রাচীন সম্পর্কের জমিনেই দাঁড়িয়ে আছে। কার জন্যে! সেই মানুষীর জন্যে। আবার উল্টোও হতে পারে। এ কোনো মানুষীর কথাও হতে পারে। যে তার পুরুষের জন্য এখনো অধিকার-হারিয়ে-ফেলা কোনো জমিনে দাঁড়িয়ে আাছে।

আর, তারপর, পুরো গানটি, এক জর্জর আকুতি ছড়ায়। যে এখন নাই, যে এখন অতীত, তার জন্যে বেদম কান্নার হুল্লোড় তুলে আনে।

মূলত এই গান আর কিছু নয়, এক ভীষণ আকুতি ও চাওয়ার কথা বলে, যে-আকুতি কখনো পূরণ হবে না। যে-চাওয়া কখনো গন্তব্য পাবে না!

Meghdol Banner

০২
এই আকুতিকে প্রকাশ করার জন্যে যে-গল্পটা রচনা করা হয়েছে, তা এই শহরের। শহরের কারো। আমরা জানি, ‘মেঘদল’ প্রথম থেকেই এই শহরকেই উদযাপন করতে চায়! কখনো-বা তা বেদনাবোধ দিয়ে কখনো-বা মুহূর্তের কোনো স্মৃতি বা শুধু মুহূর্ত নিয়েই। এ এক অসাধারণ স্মৃতি আমাদের জন্য। যে, একটা ব্যান্ডদল, এই ভাঙাচুরা শহরের ইট-কাঠ-এসি, জ্যাম, ঘাম, কাম ও কনক্রিটের ভিতরে চাপা-পড়ে-থাকা, মরে পচে হেজে যাওয়া আমাদের আর্তি আর মুহূর্তগুলো নিয়ে কথা বলে।

আমাদের বয়েসের সাথে সাথে বাড়ছে মেঘদলের বয়স। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ব্যান্ডদলটি আরো গভীর হতে গভীরতর কোনো জগতের দিকে যাচ্ছে। ক্রমে আলো আসার মতো, ক্রমেই মেঘদল গভীর জীবনবোধের দিকে যাচ্ছে। যার দাপ্তরিক নমুনা, বহুদিন পর, ‘এসো আমার শহরে’ গানটিতে পাওয়া যায়!

আর এই গানে ‘মেঘদল’ অনেক ধীর, শান্ত কিন্তু ধ্যানী! অনেক গভীর। গভীরতর নীলের খোঁজে ভ্রমণরত! বাংলা ব্যান্ডের একজন গরিব শ্রোতা হিসাবে, মেঘদলের এই অবাক জার্নিকে আমি নতমস্তকে স্যালুট জানাতে চাই!

আমাদের মনে পড়ে, প্রিয় কোনো মানুষের সাথে হেডফোন ভাগাভাগি করে, মেঘদলের গান শুনে কাটিয়েছি দুপুর! মনে পড়ে, “ফিরবে না গতকাল জানি / ফিরবে না আগামীকাল / তবু চাইছি তোমাকে / ফিরে পেতে অঞ্জলিতে / রোদের ফোঁটা।” শুনে কেঁদেছি একা। কিম্বা নেফারতিতি। কিম্বা কুমারীর, “কুমারী উত্তর দাও তুমি / যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার!”  অথবা আরো কত ছোট ছোট কবিতার বাক্যে লেখা অসাধারণ সব গান।

এইসবই মনে আসে, ‘এসো আমার শহরে’ গানটির উপলক্ষ্যে। গানটা এসব মনে করায়ে তার শক্তিটা দেখায়ে দেয় আমাদের।

Meghdol Banner

০৩
‘এসো আমার শহরে’ গানটি বোধহয় সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত-হওয়া সবচে জনপ্রিয় ও আলোচিত গান। তা এই গান অথবা ভিডিও, উভয় নিয়েই। ভিডিও প্রসঙ্গে কবি ও ফিল্মমেকার জুয়েইরিযাহ মউ, উচ্ছ্বসিত একদিন প্রশংসা করলেন, বললেন, “এটা তো ফিল্ম।” আমি তারপর পুনরায় দেখলাম। দেখলাম একটা চমৎকার ও গ্রেট ভিডিও। চোখ আরামও পেলো। দেখলাম সুন্দর ক্যামেরার কাজ।

বুঝলাম এটাতে দেখনদারিত্ব আছে। ফিল্মমেকারের কৃৎ-কৌশল আছে। আনন্দ আছে। কিন্তু কি-যেন একটা নেই বলে, বুকে খচখচ শুরু হলে, ভাবতে বসলাম, কি নেই? কি নেই? এই না-থাকা জিনিসটার তালাশে যা মনে হলো, অনুপস্থিত জিনিসটা হলো গানের প্রাণটা। তার মানে, এই ভিডিওতে গানটির প্রাণটাই পেলাম না খুঁজে।

এখন প্রশ্ন আসে, কি সেই প্রাণ? তাইলে বলি, সেই প্রাণটা হলো আকুতি। পুরো ভিডিওতে আকুতি জিনিসটাই নাই। দৃশ্যের সৌন্দর্য আছে। সিনেম্যাটিক ভাষা আছে। কিন্তু গানটির ভিতরকার আকুতিটা নাই দেখেই, আমার খাপছাড়া মনে হতে লাগলো! আর ভিডিওটা কেমনে হলো, গান থেকে দূরের কোনোকিছু!

গান আর ভিডিওর উদযাপন দুটো একই বিন্দুতে না ছেদ করার কারণে অসাধারণ এই ভিডিওটি তার মিনিং হারায় আমার কাছে। আভিজাত্য হারায়। কেবলি মনে হতে থাকে অসাধারণ একটা গানে, বুক-বিদীর্ণ-করা আকুতি নয় সিনেমা নামের একটা উৎসব চলছে। তারপরেও প্রিয় শ্রোতা, আসুন বুক বেঁধে বলি : মেঘদল, মাই লাভ …

… …

গানপারে প্রকাশিত মেঘদল বিষয়ক অন্যান্য লেখা

সাম্প্রতিক মেঘদল || শফিউল জয়

:  দ্রোহমন্ত্র শহরগরাদে || মেঘদল

:  শিলাঝাপ্টায় মেঘদলের দুর্দান্ত নীল মিউজিক্যাল মত্ততা 

বিজয় আহমেদ

COMMENTS

error: