গ্রুপ ইয়োরাম আর তাদের গানসংগ্রাম || সাইনুর রহমান শুভ

গ্রুপ ইয়োরাম আর তাদের গানসংগ্রাম || সাইনুর রহমান শুভ

হেলিন বোলেকের পর তুর্কি গানের দল গ্রুপ ইয়োরামের আরেক সদস্য মুস্তফা কোচাক ২৯৭ দিন অনশনের পর আজ শহিদ হলেন।

“আমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে দায় মেনে নেয়ার জন্য। একটানা এ-সকল নির্যাতনে সবচেয়ে নিরীহ হয়তো ঐ শারীরিক আঘাতগুলোই। আমাকে পেছন থেকে হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দড়িতে ঝোলানো হয়েছে, জামাকাপড় খুলে মাথায় বস্তা বাঁধা হয়েছে এবং তার উপর চাপানো হয়েছে একটা টিনের বাকশো। তারা সেই বাকশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঘাত করেছে । আমার মা, বাবা, বোনকে নিয়ে তারা অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে, আমার গর্ভবতী বোনকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। এই নির্যাতন আমার উপর টানা ১২ দিন ধরে চলেছে। আমাকে ৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখ গ্রেফতার করা হয়।”

গ্রুপ ইয়োরাম  ব্যান্ডের সদস্য, ২৮ বছর বয়সী মুস্তফা কোচাক, টানা ১২ দিন পুলিশের হেফাজতে থাকার পর চিঠির মাধ্যমে তার আইনজীবীকে তার উপর চালানো এই নির্মম নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন।

মুস্তফা কোচাককে গ্রেফতার এবং আদালতের রায়
তুর্কি পুলিশ মুস্তফা কোচাককে গ্রেফতার করেছিল ‘সংবিধানবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে। আদালতে এই সংগীতশিল্পীর বিরুদ্ধে তুর্কির নিষিদ্ধ বামপন্থী সংগঠন রেভোল্যুশন্যারি পিপলস লিবারেশন পার্টি-ফ্রন্টকে অস্ত্র সরবরাহ এবং তুর্কি প্রসিকিউটর মেহমাত সেলিম কিরাজের অপহরণ ও হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বার্ক এরকান নামক এক সরকারি গুপ্তচরের বয়ানের উপর ভিত্তি করে মুস্তফা কোচাকের উপর এই অভিযোগ আনা হয়। এই একটি মাত্র লোকের বয়ানকে ভিত্তি করে এরদোগান সরকার এই পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৪৬ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করেছে, যারা কিনা বিভিন্ন সময় এরদোগান সরকারের বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছিল।

এই মামলায় বার্ক এরকান ছাড়াও আরেকজন ব্যক্তি যাভিত ইলমাজের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছিল, যিনি ছাড়া পাওয়ার সাথেসাথে তুর্কি থেকে পালিয়ে যান এবং বলেন যে মুস্তফা কোচাকের বিরুদ্ধে তার দেয়া সাক্ষ্য মিথ্যা ছিল এবং হুমকির মুখে তিনি সেই লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এছাড়াও মুস্তফা কোচাকের বিরুদ্ধে আনা অস্ত্র মামলা তদন্তের কেসফাইলে সংযুক্ত ক্যামেরারেকর্ড ও ফোনরেকর্ড সহ বস্তুনিষ্ঠ একটি প্রমাণেও তার বিরুদ্ধে সন্দেহ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। না কোথাও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে, না কোনো ক্যামেরাফুটেজে তাকে দেখা গেছে, না তার কোনো ফোনরেকর্ড পাওয়া গেছে।

এরদোগান সরকারের গুপ্তচর বার্ক এরকান কোর্টে সাক্ষ্য দেয় যে, ২০১৫ সালের শেষের দিকে কোনো-এক রাতে দোকানে বার্গার খেতে খেতে মুস্তফা কোচাক তাকে বলেছিল যে সে রেভোল্যুশনারি পিপলস লিবারেশন পার্টি-ফ্রন্টকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। কেবল এই এক ব্যক্তির বয়ানের উপর ভিত্তি করেই মুস্তফা কোচাককে ইস্তাম্বুল আদালত শাস্তি লাঘবের অযোগ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

কিশোর বারকিন এলভান হত্যা এবং প্রসিকিউটর মেহমাত সেলিম কিরাজ অপহরণ
২০১৩-র জুনে ইস্তাম্বুলের তাক্সিম গেজি পার্ককে মিলিটারি শপিং ম্যল ও আবাসনে রূপান্তর করার একটি পরিকল্পনা নেয় এরদোগান সরকার। এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনগণ আন্দোলন শুরু করলে এরদোগান সরকারের পুলিশবাহিনী জনগণের উপর নির্মমভাবে হামলা শুরু করে। পুলিশের এই হামলায় প্রায় সাড়ে-আটহাজার মানুষ আহত হন, বারোজন তাদের চোখ হারান এবং আটজন নিহত হন। নিহতের মধ্যে একজন হলো কিশোর বারকিন এলভান। চৌদ্দ বছর বয়সী এলভানের মাথায় পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারশেল ক্যানিস্টার আঘাত করে। তিনি কোমায় চলে যান। সারাদেশে আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে। ২৬৯ দিন কোমায় থাকার পর ২০১৪ সালের ১১ই মার্চ এলভান মারা যান। তুর্কি সহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলভানকে হত্যাকারী পুলিশদের বিচারের দাবিতে মানুষ বিক্ষোভ শুরু করে।

তুর্কি সরকারপ্রধান এরদোগান কিশোর এলভান সম্পর্কে দাবি করে যে সে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্য। যেহেতু আন্দোলনের মাঝে পুলিশ যখন অবিরাম টিয়ারশেল এবং জলকামান ছুঁড়েছে তখন স্কার্ফ দিয়ে এলভান মুখ ঢেকে রেখেছিল।

এলভানের মৃত্যুর পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটিতে প্রসিকিউটর ছিলেন মেহমাত সেলিম কিরাজ। এলভানের মৃত্যুর একবছর পর, প্রসিকিউটর মেহমাত সেলিম কিরাজ অপহৃত হন। তাকে ইস্তাম্বুল কোর্টহাউজে জিম্মি করে রাখা হয়। রেভোল্যুশনারি পিপলস লিবারেশন পার্টি-ফ্রন্টের দুইজন সদস্য তাকে জিম্মি করে এবং তুর্কি সরকারের কাছে কিশোর এলভানের খুনীদের বিচার দাবি করে। এর ছয় ঘণ্টা পর নিরাপত্তা বাহিনী বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে। এ-সময় সকল মিডিয়ার সরাসরি সম্প্রচার জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়া হয়। অপারেশন শেষ হলে পুলিশ জানায়, অপহরণকারী দুজন এবং প্রসিকিউটর মেহমাত সেলিম কিরাজ গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন।

গ্রুপ ইয়োরামের সদস্য মুস্তফা কোচাককে এই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কারাদণ্ড দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি তুর্কির নিষিদ্ধ বামপন্থী সংগঠন রেভোল্যুশনারি পিপলস লিবারেশন পার্টি-ফ্রন্টের সদস্যদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন, সেই অপহরণের মিশনটি বাস্তবায়নের জন্য। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগের একমাত্র ভিত্তি ছিল বার্ক এরকানের বয়ান।

কারাগারে মুস্তফা কোচাকের আমরণ অনশন
২০১৭-র সেপ্টেম্বরে মুস্তফা কোচাককে গ্রেফতার করা হয়। গত দুই বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার উপর আনীত অভিযোগ স্বীকার করানোর জন্য পুলিশি হেফাজতে তার উপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়, তার গর্ভবতী বড় বোনকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়। এ-সময় তাকে পুলিশের গুপ্তচর হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হলে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। ২০১৯-এর জুলাই মাসে আদালত কতৃক তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলে তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে কারাগারে বসে অনশন শুরু করেন। অনশনের নব্বইতম দিন পার হয়ে গেলেও ন্যায় বিচারের জন্য কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হলে কারাগারে বসেই তিনি আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন। বিভিন্ন সময় তার সাথে তার বাবা-মা, বোন, বন্ধুবান্ধব এবং আইনজীবীরাও অনশনে যুক্ত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।

কারাগার থেকে মুস্তফা কোচাকের বক্তব্য
বিভিন্ন সময় মুস্তফা কোচাকের সাথে বাইরের দুনিয়ার যোগাযোগের উপায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মুস্তফার চিঠি বাইরে যেতে দেয়া হয়নি সেগুলোকে প্রোপাগান্ডা বা গুজব বলে অভিহিত করে। আবার বাইরের কারো চিঠি মুস্তফার কাছে পৌঁছাতে দেয়া হয়নি কারণ তাতে মুস্তফার মনোবল বৃদ্ধি পেতে পারে বলে। আমরণ অনশনের ঘোষণার পর মুস্তফার আইনজীবীর মাধ্যমে মুস্তফার একটি চিঠি পাওয়া যায় এবং সেই আইনজীবী তা সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এই চিঠির শুরুতেই মুস্তফা কোচাক তুর্কি কবি আতাউল বেহরামুগ্লোকে উদ্ধৃত করে বলেন,

‘আমাদের এ-সময়টাতে মানুষ হতে হলে
দিতে হয় ভারি মূল্য।
হয় তোমাকে হতে হবে ভীরু
নয় তাদের আঘাতে হতে হবে ছিন্নভিন্ন।
হয়ে উঠতে মানুষ, অন্যদের সাথে করেই
শক্তিশালী হয়ে উঠতে হয়।
অন্যের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হলে
যখন তোমার হৃদয় কেঁদে ওঠে,
তখনই তুমি মানুষ, আর নাহলে নয়।’

মুস্তফা তার চিঠিতে বলেন, —

“সংগ্রাম ও প্রতিরোধ একজন মানুষের সবচেয়ে সেরা বৈশিষ্ট্য। এগুলোই একটা সুন্দর জীবনের উৎস। অন্যায়কে প্রতিরোধের যে ঐতিহ্য, আমরা তা পেয়েছি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই।

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা আমার অধিকার। সেই অধিকার থেকেই ৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে আমি যে-অন্যায়ের শিকার হয়েছি, তার প্রতিবাদস্বরূপ, ন্যায়বিচারের দাবিতে আমি আমরণ অনশনের ঘোষণা দিচ্ছি।

আমি বারোদিন পুলিশ কাস্টোডিতে ছিলাম। আমার চোখ বেঁধে মাথায় টিনের বাকশো পরিয়ে পেটানো, আমার গর্ভবতী বড়বোন সহ সকল বোনকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া থেকে শুরু করে সকল ধরনের নির্যাতন আমার উপর প্রয়োগ করা হয়েছে। আমি যেন আমার আইনজীবীর সাথে না দেখা করতে পারি সেজন্য ১১০ জন আইনজীবীর পরিদর্শনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এতসব নির্যাতনের পিছে কারণ হলো আমি তাদের দেয়া দালালের মিথ্যা কথায় ভরা, মিথ্যা অভিযোগে পরিপূর্ণ টেস্টিমনিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হইনি।

কবি যেমনটা বলেছিল, ‘হয় তোমাকে হতে হবে ভীরু, নয় তাদের আঘাতে হতে হবে ছিন্নভিন্ন।’ আমি তাদের এই ভীরুতার অংশীদারি হওয়ার, তাদের গুপ্তচর হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি। তাই আমাকে প্রসিকিউটর মেহমাত সেলিম কিরাজ হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। পুলিশের গুপ্তচর বার্ক এরকান বলেছে আমি নাকি এই হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র সরবরাহ করেছি বলে তার কাছে স্বীকার করেছি। আমার বিরুদ্ধে একমাত্র বক্তব্য কেবলমাত্র এটাই! আর কোনো তথ্য, প্রমাণ, সাক্ষ্য, দলিল কিচ্ছুমাত্র নেই।

আমার এই চিঠিতে আমার সাথে ট্রায়ালে কি হয়েছে, কোর্টরুমে কি ঘটেছে, সেই স্টুপিড স্টেটমেন্টের সত্যমিথ্যা এসবের কোনোকিছুই আমি বলব না। এসবের সবটাই ঘটেছে সারা দুনিয়ার সামনে, সবাই সবটা দেখেছে এবং সবাই জানে সেদিন সেই রুমটাতে কোন তিনজন ছিল, তাদের প্রত্যেককে কারা হত্যা করেছে।

সবাই জানে এই মামলার সত্যিকারের আসামী আমরা কেউ নই। এই সরকার তার নিজের ইজ্জত বাঁচাতে, প্রতিশোধ নিতে এর দায় আমাদের উপর চাপাচ্ছে। উইন্সটন চার্চিল বলেছিল, ‘যুদ্ধের সময় সত্য এতটাই মূল্যবান যে একে সবসময় মিথ্যা কথাদের দ্বারা কড়া প্রহরায় রাখতে হয়।’ নামমাত্র বিচারক আর প্রসিকিউটররা সত্যকে সামনে আনতে বিন্দুমাত্র চেষ্টা তো করেইনি বরঞ্চ করেছে উল্টোটা। সরকারের প্রয়োজনীয় সেই মিথ্যেটাকেই আঁকড়ে ধরেছে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় কোর্টহাউজটাতে ওরা আমার ন্যায়বিচারের দাবিতে তোলা আওয়াজকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছে। ন্যায়বিচারের দাবি তা যত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতরই হোক না কেন, তাকে চুপ করিয়ে দেয়ার জন্যই এইসব কোর্টহাউজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের উপর এ-সকল অন্যায়-অবিচার করে ওরা আমাদের সকলের অন্তরে ত্রাস সৃষ্টি করতে চায়, আমাদের ভয় পাওয়াতে চায়। আমি এ-সকল অন্যায়, অবিচার এবং হামলার বিপরীতে আমার এই অভুক্ত দেহকে রূপান্তর করলাম প্রতিরক্ষা ব্যুহে।

আমার এই দেহ নিয়ে, যা কিনা নব্বই দিন ধরে অভুক্ত আছে, আমি ন্যায়বিচারদাবিতে আমার সংগ্রাম জারি রাখছি। শুধু আমি একাই না, ন্যায়বিচারের দাবিতে এই চারদেয়ালের বন্দিশালার বাইরে : আমার মা, আমার বাবা এবং আমার বোনেরা কুরবান বায়ারামের (ঈদ-উল-আযহার) প্রথম দিন থেকে পালাবদল করে অনশন করে যাচ্ছে। শুধু আমার পরিবার না, আমার বন্ধুরা, আমার আইনজীবীরা অনশনের মাধ্যমে বা অন্য যে-কোনো উপায়ে আমার আন্দোলনে শরিক হচ্ছে, মানুষের কাছে এই অন্যায়-অবিচারের ঘটনাটি পৌঁছে দিচ্ছে।

সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে ভেসে আসা মানুষের এই কান্না, রাগ, ক্রোধ না শুনতে পাওয়াটা অসম্ভবপর। কিন্তু এইসব অবিচাররের নায়কেরা নিজেদের কানে তালা পরিয়ে দিয়েছে। তাদের কানের এইসব তালাকে ভেঙে চুরমার করার জন্য এক তীব্র প্রতিবাদের আওয়াজ দিতে আমি আমার শরীরে ক্ষুধার বিধান চাপিয়েছি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরণ অনশনের।

অনির্দিষ্টকালের এই অনশন ধর্মঘট, যা কেবল আমি আমার জন্য শুরু করিনি, শুরু করেছিলাম তাদের জন্যও যারা প্রতিনিয়ত অবিচারের স্বীকার হচ্ছে এবং ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ, অনশনের নব্বইতম দিন থেকে আমি তা আমরণ অনশনে রূপান্তরের ঘোষণা দিচ্ছি।

ন্যায়বিচারকে ঐ কোর্টরুমগুলোতেই দাফন করা হয়েছে। প্রত্যেকটা মামলায় বিচারক ও কৌঁসুলিরা ন্যায়বিচারের এই কবরে আরেক মুঠো করে মাটি ছুঁড়ে দেয়। তাই এখন অন্ধকার কবর থেকে ন্যায়বিচারকে আলোতে ফিরিয়ে আনতে, আমি আমার জীবনের এই বসন্তকে কুরবান করছি, আমার জীবনকে বাজি ধরে, মৃত্যু পর্যন্ত আমার প্রতিবাদ জারি রাখার ঘোষণা দিচ্ছি।

ন্যায়বিচারের প্রতি যেই আঘাত এসেছে তার বিরুদ্ধেই আমার সংগ্রাম।

ন্যায়বিচারের ধারণা বাঁচিয়ে তুলতেই আমার এই সংগ্রাম! সংগ্রাম সেই ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে যার জন্য হাজার বছর ধরে আমাদের অগণিত বীরেরা জীবনকে উৎসর্গ করেছে। মৃত্যুর বিনিময়ে হলেও আমি ন্যায়বিচারকে রক্ষা করে যাব। অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াব, জীবন দিয়ে তার দাম পরিশোধ করতে হলেও।

‘আমি হব এক নবপ্রভাতের সূর্য,
যেন আর কাউকে অন্ধকারে জেগে উঠতে না হয়।’

আমারণ অনশন জিন্দাবাদ!
ন্যায়বিচার চাই, ন্যায়বিচার আনবই!
আমাদের সংগ্রাম সার্থক হবেই!
আমি তোমাদের ভালবাসি!
তোমরা তোমাদের আশা হারিয়ো না।
মুস্তফা কোচাক
(সংক্ষেপিত)

গ্রুপ ইয়োরাম — বিপ্লবী বামপন্থী গানের দল
১৯৮৫ সালে ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে পথচলা শুরু করা গানের দল গ্রুপ ইয়োরাম, তুর্কির সবচেয়ে জনপ্রিয় গানদলগুলোর একটি। তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শুরু থেকেই তারা তুর্কি সরকারের নজরদারিতে পড়ে এবং নানান টানাপোড়ন ও পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়। প্রায় চারশতবার গ্রেফতার ও বিচারপ্রক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়া, তাদের কন্সার্ট ও অন্যান্য আয়োজন নিষিদ্ধ হওয়া এবং পুলিশ কতৃক অ্যালবাম বাজেয়াপ্ত হওয়া এর মাঝে উল্লেখযোগ্য।

তুর্কি সরকারের এত দমন-নিপীড়নমূলক আচরণের মাঝেও প্রগতিশীল তুর্কি ও কুর্দি জনমানুষের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা নিরন্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, যার স্বরূপ দেখা গেছে ২০১৫ সালের বাৎসরিক উন্মুক্ত কন্সার্টে হাজারো মানুষের সমাগমে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রুপ ইয়োরামের উপর তুর্কি সরকারের দমন ও নিপীড়ন আরো বৃদ্ধি পায়। তাদের ২০১৬ সালের বাৎসরিক কন্সার্টটি শেষ মুহূর্তে জোর করে বন্ধ করে দেয়া হয়, গত দুই বছরে তাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আটবার পুলিশ হামলা করে এবং ব্যান্ডের ন্যূনতম ৩০ জন সদস্যকে গ্রেফতার করে।

সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রুপ ইয়োরামের ছয় সদস্যের নামে হুলিয়া জারি করা হয়। তাদের নাম তুর্কির কুখ্যাত ‘গ্রে লিস্টে’ যুক্ত করে তাদেরকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য মাথাপিছু প্রায় তিনলক্ষ লিরা (প্রায় তিনকোটি আশিলক্ষ টাকা) পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তাদের অন্তত দশজন সদস্য কারাগারে রয়েছে।

তাদের পাঁচজন সদস্য অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। ইতোমধ্যে অনশনরত অবস্থায় ৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে হেলিন বোলেক এবং ২৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে মুস্তফা কোচাক শহিদ হন। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদের দাবি, তাদের উপর এসব পুলিশি নির্যাতন বন্ধ করা হোক, সদস্যদের নামে জারিকৃত হুলিয়া তুলে নেয়া হোক, গ্রুপ ইয়োরামের কন্সার্টের উপর নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হোক এবং তাদের নামে করা মামলা ও অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হোক।

পরিকল্পিত হত্যা
কমরেড হেলিন বোলেক এবং কমরেড মুস্তফা কোচাক দুজনকেই পরিকল্পিতভাবে ফ্যাসিস্ট এরদোগান সরকার হত্যা করেছে। সত্য ও ন্যায়কে দমিয়ে রাখতে এমন অন্যায়, অবিচার, হামলা, মামলা, খুন স্বৈরাচারীদের জন্য অপরিহার্য। এটি বিশ্বের যে-কোনো স্বৈরাচারী শাসকের বেলাতেই সত্য।

২৯৭ দিনের অনশনে মুস্তফা কোচাকের ওজন নেমে এসেছিল মাত্র ২৯ কেজিতে। মৃত্যুর বহুদিন আগেই সে হাঁটাচলার শক্তি হারায়। সারাদেহে জ্বালাপোড়া, ফুলে-যাওয়া শরীর, ফোসকা-পড়া পা নিয়েও সে তার কথামতো প্রতিবাদ জারি রেখেছে। এ-সময় তার দাঁত পড়ে-যাওয়া শুরু হয়েছিল, শ্বাসকষ্ট হতো এবং শারীরিক যন্ত্রণায় সে ঘুমাতে পারত না। এমন অবস্থাতেও জোরপূর্বক তার অনশন ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে শারীরিক অবস্থা আরো খারাপের দিকে যায়। অনশনকালে বিভিন্ন সময় তাকে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করা হয়েছে। কখনো তাকে লগুড় দ্বারা যৌননিপীড়ন করা হয়েছে, কখনো হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তাকে টয়লেটে যেতে দেয়া হতো না। সারাবিশ্বে এই ভয়াবহ করোনার প্রকোপেও করোনা  থেকে নিরাপত্তা দিতে তার জন্য কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

কমরেড মুস্তফা কোচাক এবং কমরেড হেলিন বোলেকের এই মৃত্যু স্বেচ্ছামৃত্যু নয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও ফোনে কথোপকথনের সময় কমরেড মুস্তফা তার পরিবারকে বলেছিলেন, “জীবন খুব সুন্দর, আমি বাঁচতে চাই।” কিন্তু তাদেরকে বাঁচতে দেয়া হয়নি। খুনি এরদোগান সরকার তার অন্যায় শাসন টিকিয়ে রাখতে তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

গ্রুপ ইয়োরামের আরেক সদস্য ইব্রাহিম গোকচেক এখন মৃত্যুশয্যায়। তার অনশনের আজ ৩১৩তম দিন চলছে। তার বাবা আহমেত গোকচেকের চোখের সামনে দিন দিন তার শরীর বিছানার সাথে মিশে যাচ্ছে। তার বাবার কাছ থেকে জানা যায়, কমরেড ইব্রাহিম এখনো আশাবাদী, সে চায় মানুষ তাদের সাধ্যমতো তুর্কি সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করুক।

তার বাবা বলেন, “এই বাচ্চাগুলো আমরণ অনশন করছে তার কারণ এই না যে ওরা মরে যেতে চায়। ওরা শুধু স্বাধীনভাবে গান গাইতে চায়, কন্সার্ট করতে চায়। রাষ্ট্রের কাছে ইব্রাহিমদের কিছুই চাওয়ার নেই, ওদের চাওয়া কেবল গণমানুষের কাছে। ইব্রাহিমরা গত চার-পাঁচ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কোনোকিছুতে কাজ হয়নি বলেই তারা আজ আমরণ অনশনে বসেছে।”

তিনি আরো বলেন, “এই বাচ্চাগুলো জীবনকে ভালোবাসে, মৃত্যুকে নয়। হেলিন বোলেক জীবনকে ভালোবেসেছে, তবুও আমরা তাকে হারিয়েছি। ইব্রাহিমও সেই কথা সবসময় বলে। ও বলে যে ওরা আবার কন্সার্ট দেবে, লাখ লাখ মানুষ সেখানে গান শুনতে আসবে। ও কখনো আশা হারায়নি। ওদের দাবি মিটে গেলেই ওরা অবশ্যই অনশন বন্ধ করে দিবে। কারণ ওরা বাঁচতে চায়। ওরা আবার গান গাইতে চায়, ওদের কন্সার্টে ফিরে যেতে চায়।”

… …

গানপার

COMMENTS

error: