সমালোচনাপুরাণ

সমালোচনাপুরাণ

SHARE:

‘…আমরা সেই দেশে জন্মেছি, যেখানে অন্নপ্রাশনে শিশুর সামনে রাখা হয় একদিকে টাকা-পয়সা অন্যদিকে বই। উপুড় শিশু যদি বই ছোঁয় প্রথমে — সারা বাড়ি উল্লাসে হইহই করে ওঠে। এই সেই দেশ, পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে শবযাত্রার সঙ্গী হয় একটি বই। আর তার নাম গীতা।’ [সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ।। আগুন মুখোশ পরচুলা ইত্যাদি । সৃষ্টি প্রকাশন, কলকাতা ২০০১]

এই একটা বই — ‘আগুন মুখোশ পরচুলা ইত্যাদি’ — একটানে পড়ে উঠেছি প্রায় পুরোটাই। দীর্ঘ প্রায় একদশক আগের পঠিত বলতে হবে। এত আনন্দপ্রদ আর এত উত্তেজক বই, নিঃশ্বাসের মতো অঘটনঘটনপটু, পড়ে একেবারে টইটম্বুর হয়ে থাকা যায় ভেতরে ভেতরে। এই বইখানি লিখেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। ইনি ফিকশনরাইটার হিশেবে জিন্দেগি গুজরিয়ে ২০০৫ নাগাদ ইন্তেকাল করেন। মোটামুটি প্রিয় উনি বাংলায় লেখালেখি করেন এমন অনেকেরই কাছে।

একটা কথা তো সর্বৈব সত্য যে, আমাদের অঞ্চলে সমালোচনাসাহিত্য বলে কোনোকিছু গড়ে ওঠে নাই আদৌ। কিন্তু দু-এক অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রম, আমার মতো অল্পপড়া ন্যাক্কারজনক মানুষেরও পাঠ-অভিজ্ঞতায় এসেছে, যা ঐ সর্বৈব-সত্য খেদোক্তিটিকে টলায়ে দিতে পারে। এর মধ্যে একটি নাম শঙ্খ ঘোষ, বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রঘরানারই ঋষি অবশ্য। খোদ রবীন্দ্রনাথ কি ক্রিটিক হিশেবে হার্কিয়্যুলিস্ নন? সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আলাদা জাতের মাল্ অবশ্য। সবাই, সক্কলেই, চিরস্মরণীয় যারা তাদিগের সকলের ভঙ্গি ও ভাবসাব সম্পূর্ণত আলাদাই।

কিন্তু কথাটা আসলে একেবারেই খামাখা চিল্লানি মনে হয় আমার কাছে, সবসময়, চিরদিনই, এরপরও অভ্যাসের বশে আমিও ভুলটা সানন্দেই করি চিল্লানি দিয়ে। যে, বেঙ্গলি লিট্রেচারে ভাই সমালোচনাটা ঠিক দাঁড়ায় নাই। বাংলা সাহিত্যে সমালোচনা সাবালক হয় নাই, হাজার বছর ধরিয়া শুইয়া-বসিয়া আছে, দাঁড়াইতে পারে নাই। ইংরিজিতে দাঁড়াই গিয়াছে? কেমন গোছের সেই স্ট্যান্ডিং, ইংরিজি দাঁড়ানো, দুনিয়ার সমস্তকিছুতেই আমরা আংরেজি গুরুমারা বিদ্যায় বিদ্বান হইলাম আর খাড়াইতে পারলাম না আলোচনাশাস্ত্রে, — হাউ কাম্! ঘটনাটার প্যাঁচপয়জার অন্যত্র। বর্তমানে নয়, ফিউচারে এই ইশ্যু নিয়া আমরা আলোচনায় খাড়াইব। ততদিন দি নিউ সোনার বাংলার সমালোচনাশাস্ত্রজ্ঞরা আরামে খাড়াও, পতাকা উঁচাও, সোজা হও।

সর্বৈব-সত্য কদাচ সর্বৈব-সত্য হয়, ইফ য়্যু ইন্টার্প্রেট মি রাইটলি, ইহাই সর্বৈব-সত্য। সমালোচনা সাহিত্যটা আমাদের ভাষায় আজও শুইয়া আছে বলিয়া যারা আক্ষেপ করেন, তারা কেউ কলেজের ছাত্তর বা কারখানার মজদুর নয়, সক্কলেই লেখক। সোজাসাপ্টা কাণ্ডজ্ঞান দিয়াই বিচার করেন তো দেখি, ইজ্ ইট প্যসিব্যল্? দশকের পর দশক ধরে এত গোব্দাগাব্দা প্রাবন্ধিকী আইটেম বারাচ্ছে মেলামূলাসরিষার মাঠে, সেইগুলা যদি ক্রিটিক না-হয় তবে ক্রিটিক কোনগুলা? আংরেজ কোন বইটাকে আপনি ক্রিটিসিজমের বুক্ অফ এক্সেলেন্স বলবেন? ওই টিএস এলিয়ট তো? দৌড় দিয়া ম্যাথু আর্নল্ড তো? অথবা আরেকটু পণ্ডিতি মেরে স্যামুয়েল জন্সন বা রবার্ট লোয়েল তো? উদ্দিষ্ট উত্তরকারী স্পিচলেস্ রহেন, অথবা কহেন কমন্ দুই-তিন বইয়ের নাম যেখানে একই তো বাংলার ভুলগুলাই বিরাজিত লক্ষ করবেন আপনি। কিন্তু, তবুও, মুখস্ত স্লোগ্যান্ চলতেই থাকছে, এবং বলা আর থামতেসেই না যে, ভাই, বাংলায় ক্রিটিকটা আজোব্দি ঠিক লৌহদণ্ডের ন্যায় খাড়াইতে পারে নাই। চিকন গোড়া আর মোটা আগা বলবার মতো অপমানকর ঔদার্যটুকুও এ-বাবতে কারোর নাই।

জীবনানন্দবর্ণিত কবিতাসংজ্ঞার মতো সমালোচনাও তো অনেক-রকম, নয়? দেখেন, সমালোচনা যেমনটা ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্দৃষ্টিজাত হতে পারে, এবং সৎ, সত্যি, সততা-সম্বলিত আর দরদোৎসারিত হতে পারে, সৃজনসম্ভব হতে পারে, তেমনি রিভার্সও হতে পারে। এবং ডাইভার্সিফায়েড সমালোচনার রাস্তা আপনি রুখবেন কেমন করে? যেইটা দরকার, হরেক অ্যাপ্রোচের সমালোচনা অ্যাবজর্ব করার সামর্থ্য। সমালোচনাপাঠক হিশেবে আপনার হজমশক্তির রেইঞ্জ বাড়ানো দরকার। পরিবর্তিত ও প্রযুক্তিস্ফীত পড়ালেখার ফেসবুকিশ জমানায় এই রেইঞ্জ বাড়ানোর নেসেসিটি তো বলা বাহুল্য। সন্দীপন পড়ে টের পাওয়া যায় তার দীপনক্ষমতা। কী তীক্ষ্ণ আর তীব্র আর আক্রমণাত্মক বাক্য একেকটা! অথচ কোনো রচনাই থান-ইট সাইজের নয়। এই এক-দেড় পাতা। আকস্মিক বজ্রবিদ্যুৎগর্ভ। অতর্কিত আততায়ীর মতো।

বিস্ফোরক ভাবনা ও লিখনশৈলীর গদ্যকার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই ‘আগুন মুখোশ পরচুলা ইত্যাদি’ বইটিতে চমৎকার ও চাঞ্চল্যকর কিছু — না, কিছু নয়, অনেক — মন্তব্য পেয়ে যাচ্ছি পড়তে পড়তে, একেবারেই জাত-লেখকের কথাকামড় একেকটা। যার বা যা-কিছুর গায়ে গিয়ে হুলটি বিঁধছে, সে বা তা-কিছু সাময়িক বেদনা পাচ্ছে হয়তো-বা, তবে আলোয় আসছে সঙ্গে সঙ্গে উল্টোপিঠ কিছু, যা-কিনা ছিল এতকাল বিবরে লুকানো। কারো বা কিছুর মুখপানে চেয়ে মায়াবশত রেয়াত নাই তার। আবার, তাঁর এই আক্রমণস্পৃহাকে কোনোভাবেই বিতর্ক-জারি-রাখা বা বিতর্ককেন্দ্রে নিজেকে রেখে বিমলানন্দ ভোগ করার লেখকসুলভ বদমতলব বলা যাবে না। বাবু সন্দীপনের ক্যারেক্টারে এই জিনিশ ছিল না তা বলছি না। অ্যানিওয়ে। এ একেবারেই অন্য জাতের অন্য ধাতের কিছু। আমার অব্জার্ভেশন অমনটাই।

কুল্লে এক-দেড়পাতার লেখা প্রত্যেকে, প্রত্যেকেই। কেবল দু-তিনটে লেখা লভ্য ঐ-দৈর্ঘ্য ছাড়ায়া-যাওয়া। আর সে-সমস্তই জীবনানন্দ বিষয়ক। সন্দীপন পড়েই পয়লাবারের মতো সবিস্ময় জেনেছিলাম, ধূসর ধূসরতর বছর কুড়ি আগে, সন্দীপনের মতো স্মার্ট গদ্যকার জীবনানন্দকে কবি হিশেবে যতটা-না তারচেয়ে বেশি সমীহ করেন পথিকৃৎ গদ্যকার হিশেবে! শ্বাসরুদ্ধকর সুন্দর কিছু সন্দীপনীয় উপলব্ধি পাওয়া যায় জীবনানন্দ বিষয়ে, এ-বইতে। বাবু সন্দীপনের প্রায় ৪৫ বছরের লেখক-জীবনের অজস্র লেখালেখির মধ্যে এ-গ্রন্থধৃত লেখাগুলো পত্রিকান্তরে ছিটানো-ছড়ানো — বিভিন্ন লিটলম্যাগেই মূলত — ছিল এতকাল। সকলেই ননফিকশন্যাল/না-কাহিনিমূলক রচনা।

প্রায় বারো-তেরো বছরের দূরে এসে এই বই রিক্যাপ করবার একটা চান্স মিলে গেল বন্ধুগৃহে বেড়াইতে যাবার সুবাদে। না না, যা ভাবছেন তা নয়, মার্ক টোয়াইনের মারিংকাটিং ফর্ম্যুলা অ্যাপ্লাই করি নাই। মিন্তি করে চেয়ে এনেছি। ফিরিয়েও দিয়েছি ছাপোষা ব্যাঙ্কলোনির মতো অতি-সচেতন সক্রিয় হয়ে মেয়াদস্বল্প সময়ের ভিতরে। যেটুকু উল্টেপুল্টে দেখতে পেরেছি এ-যাত্রা, তাতে এমনটা বারেবারেই মনে হচ্ছিল যে যেন পড়ি নাই আগে। দেখি নাই ফিরে বেশিদিন, দিয়েছি ফিরিয়ে। ফের ধারে এনে দেখব হয়তো অদূর কোনোদিন। অথবা মার্ক টোয়াইনের ধর্মকাহিনি মোতাবেক হয়তো বইটার মালিক হব একদিন। ততদিন শুধু মনে রাখি যে এই বইয়ের একটা গদ্য ‘বুটপরা রামচন্দ্র’ পড়ে এই বিবস্ত্র ধর্মন্যুব্জ দিনকালটাকে যেন অন্য দর্পণে দেখে উঠলাম। যদিও রচনাটা চ্যাটার্জিমশাই লিখেছেন ধর্মষণ্ডামির স্বর্গরাজ্য ইন্ডিয়ার প্রেক্ষাপটে, যেই দেশে সাম্প্রদায়িক হিংসার বলী হয় নিরীহ অন্যধর্মীয় লোকেরা প্রায় প্রতিদিন, যেই দেশে মুসলমান মেরে সাধুর তকমা পায় হিন্দু ভদ্রসন্তানেরা, আমাদেরই লাইফটাইমে আমাদেরই চোখের সামনে গুজরাট কিলিং হয় যেই দেশে, সেই কিলিঙের হোতা পাঁঠাদেহ নরেন্দ্র মোদী রিওয়ার্ডেড হয় টানা দুই মেয়াদে দেশপ্রধান নির্বাচনে ডেমোক্রেসিদীক্ষিত শাইনিং ইন্ডিয়ার জনতাভোটে, সেই দেশের ফিউচার যে এই দিকেই যাবে এমন ফোর্কাস্ট করেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সেই বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির বানাইবার ইন্ডিয়ান আধুনিকতার ঊষালগ্নে এই রচনায়।

এই বই ফিরে পড়তে যেয়ে একটা ব্যাপার মাথায় খেলতেসিল, বইটা যদি ফেসবুকবাসী অ্যাক্টিভিস্টদিগের নেক নজরে নেয়ার ব্যবস্থা করা যেত! অন্তত আমার মতো গুহাশান্তিপ্রিয় লোকের তাতে এক মস্ত সুবিধা হতো এ-ই যে এত হুদা মান-ফান ভাষা নিয়া ফালাফালি করা লোকেদের হাত দিয়া বানানবিপ্লবের বাইরে বেশকিছু সত্যিকারের সাবভার্সিভ লেখা বাইরাইত এবং তা পাঠ করে প্রভূত হর্ষও লভিতাম। শুধু ‘দুচে’ দেয়া আর কথায় কথায় ‘বাল’ বলা ছাড়াও যে এই দুই জিনিশ লেখায় লাইনে লাইনে রেখে যাওয়া যায়, এইটা ভাষাসাহিত্যিক বাংলাদেশি পঞ্চাশোর্ধ্ব কবিতারাইটারদের স্কালে কে ঢোকাবে? লেটারে লেটারে ‘দুচে’ দিলে তো দুচেই দিলেন লেটারে, লেখায় দুচবেন কবে? লেটারে ‘দাচু’ তো আর লেখায় ‘দাচু’ না রে ভাই। ইন্ডিয়ান বাংলা কাব্য কপিপেস্ট করে কবিনাম লভে এখন পরিণত বয়সে এসে অপরিণত উপমায়-উৎপ্রেক্ষায় গ্রামবাংলার প্রশস্তি গেয়ে ক্যালকাটা থেকে ভেন্ন হবে! এত্ত সোজা, পাব্লিকেরে ফাঁকি দেয়া, চান্দু তরুণকবি হে!

এই বইয়ের প্রচ্ছদছবিটি হিরণ মিত্র অঙ্কিত। নামলিপিও উনার করা। সামনের প্রচ্ছদে জোড়া আণ্ডাকোষের এক পুরুষ ফিগার, ব্যাকপ্রচ্ছদে মিররপ্রিন্ট ফিমেইল ফিগার ও জননাঙ্গ। দুনিয়া বলতে এ-ই তো। পুং-নাং বিশ্ব। ২০০১ সনে এই বই সৃষ্টি প্রকাশন পাব্লিশ করেছে।

এই বই নিয়া আর বেশিদূর আগানো যাবে না। রাজ ও অন্যান্য কবিনৈতিক সমস্যা আছে।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: