চতুর্থ সেলাইয়ের নিচে

চতুর্থ সেলাইয়ের নিচে

SHARE:

দ্বিতীয় দশক হিশেবে পরিচিত সময়খণ্ডে একদল কবি লিখতে আরম্ভ করেছেন নতুন কবিতা, বাংলায়, বাংলাদেশে। পরিবর্তিত সময় এবং সময়হীনতার স্বপ্নকল্পনা, বাস্তবতা, ভাঙাচোরা বাহির ও অন্দর উঠে আসতে লেগেছে নবতর বয়ানে এবং বিন্যাসে তাদের কবিতায়।

গেল ২০১৭ বইমেলায় বেরিয়েছে বেশকিছু বই নবীন সময়ের সওয়ার কবিদের। বেরিয়েছিল গতবছরও যেমন, বেরোচ্ছে এইবারও, আসছে বছরেও হবে বেশকিছু অভিষেক কবিতাবইয়ের প্রকাশ নিশ্চয়। বাংলা কবিতার আবহমান শুভানুধ্যায়ী ও সন্ধিৎসু পাঠক এই বইগুলোর জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন। তরুণ কবির ডেব্যু বইটির জন্য অপেক্ষা। পাঠকের এই অপেক্ষা শাশ্বত, শুভ, অভিনন্দনীয় দুঃখিনী বাংলা কবিতার জন্য।

ফয়সাল আদনান এই সময়ে লেখায় ব্যাপৃত মগ্নচৈতন্য কবি। লিখছেন কবিতা ও অন্যান্য গদ্যপত্তর, কবিতাই মুখ্যত, বছর-পাঁচ/ছয় হলো মোটামুটি। লিখে থাকেন অল্প, বলা ভালো ফয়সাল প্রকাশ করেন অল্প, অভিনিবিষ্ট যদিও, প্রচুরপ্রসূ ও প্রচারলিপ্সু নন কবিতাসাহিত্যে এই সময়ের সাধারণ প্রবণতামাফিক। ওয়েবম্যাগ ও অন্যান্য সংযোগমিডিয়ার সুবাদে বেশকিছু কবিতা পাঠকের পড়াও হয়েছে এরই মধ্যে। সেসব অবশ্য খুবই বিচ্ছিন্নভাবে। এই প্রকাশনার মাধ্যমে ফয়সাল আদনানের একবই কবিতা অনবচ্ছিন্ন পড়ার মওকা পাঠক প্রথমবারের মতো পেয়েছেন। প্রকাশের সমস্ত জোগাড়যন্ত অত্যন্ত সমৃদ্ধিশ্রীসম্পন্ন হয়েছে, এই বিবৃতিটা কাব্যবইটা হাতে নেয়া মাত্র বলে দেয়া যায়।

কেমন কবিতা আছে এখানে? সেইটা ভালো বলা যাবে বইটা হাতে নিলে পরে। এখন অবশ্য প্রকাশিত বইয়ের কন্টেন্টের ব্যাপারে একটা আঁচ পাওয়া যায় এমনকি বই হাতে না নিয়েই বিভিন্ন ওয়েবম্যাগের বদৌলতে। এইসব ওয়েবপত্রিকা পাণ্ডুলিপি থেকে একগুচ্ছ কবিতা ছাপায় এবং আসন্ন অথবা পাব্লিশড বইটা বাবতে সেসব সোর্স থেকে একটা আন্দাজ করে নিতে পারে ক্রেতা বা পাঠকেরা। আলোচ্য বই সম্পর্কে এই কায়দায় যাবে বেশ-একটা তালাশ করতে পারা। তারপরও গোটা কাব্যকরণকলাটা আদনানের কেমনধারা তা জানতে চাইলে ‘চতুর্থ সেলাইয়ের নিচে’ একাধিক পাঠের জন্যে সামনে রাখা ছাড়া বিকল্প কিছুই নির্ভরযোগ্য না।

আদনানের একটি কবিতায় যেমন দেখা যাচ্ছে এই স্বরগুচ্ছ :

যুদ্ধ হচ্ছে, বাতাসে সীসার ঘ্রাণ, আর ভারী হয়ে আসছে মেঘদল, যুদ্ধ হচ্ছে, নেভার মাইন্ড। বাতাস! বুক ভরে নাও সীসা, ক্ষয়ে যাও গলন্ত কামানের নিচে, হাড় ও হাড়ের সংগীত এমনই সময়ে এইসব বিবমিষা! যুদ্ধ হচ্ছে, নেভার মাইন্ড।

অন্যতর কণ্ঠস্বরের সমাবেশনে একই বইতে যেমন রয়েছে :

তারপর তারা বাতাসে ছড়িয়ে দিলো যৌনবর্ণনা, শিশ্নের দৈর্ঘ্য ও যোনির গভীরতা। পাঠ হলো সমবেত শোকপ্রস্তাব। সেই সম্মোহিত প্রেমিকাদের ভাবি, যারা স্কুলপালানো শিশুদের চুমু খেত অননুযোগে। রাত্রিকালে এমন সব স্বপ্নে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। পুষ্পগন্ধ আড়াল হয়ে যায়। সকাতর সব মাস্টারবেশন খুলে খুলে পড়ে প্রেমিকাদের শরীরে — আমার মাঝেই যারা সমাহিত ও সম্মোহিত, যাদের উদ্দেশ্যে এই স্তোত্রপাঠ, এই সমবেত শোকপ্রস্তাব।

সমুজদার কবিতাপাঠকের আগ্রহপারদ চড়াতে এরচেয়ে বেশি নিদর্শন নিশ্চয় নেসেসারি না।

আদনান নিজের প্রথম বই প্রকাশের প্রাক্কালে এক ফেবুবার্তায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেই সময়টায় লিখেছিলেন কবিতাগুলো রচনাকালীন বন্ধুসুহৃদদের স্মরণ করে :

লুকানো ডায়েরির ফাঁকে টুকটাক লেখা থেকে এই বই পর্যন্ত আসা আমার কাছে কিছুটা অদ্ভুত এবং কিছুটা অসম্ভব মনে হয় এখনো। এইটুকুর জন্য কিছু মানুষের কাছে চিরঋণী থাকা হবে।

উলুখড়  প্রকাশিত বইটি নিশ্চয় পাঠক খুঁজবেন মনে মনে, এবং প্রকাশ্যে, পেয়ে যাবেন কোথাও-না-কোথাও। কবির দ্বিতীয় কোনো বই রিলিজের খবর পাওয়া যায় নাই।

‘চতুর্থ সেলাইয়ের নিচে’ প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। উলুখড়  প্রকাশনালয়ের পক্ষে বইটির প্রকাশক সাগর নীল খান দীপ।

প্রতিবেদন / সুবর্ণ বাগচী

… …

COMMENTS

error: