ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভিমালা

ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভিমালা

SHARE:

আউট-ল্য, ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন, অ্যামেরিক্যান, রেড-ইন্ডিয়ান প্রভৃতি বিষয়ানুষঙ্গ লইয়া আমরা আকৈশোর উত্তেজিত। অসংখ্য ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভি দেখা হয়েছে এ-জীবনে স্রেফ পাহাড়ের কাঠিন্য ও রুক্ষতা ভালোবেসে। কেমন করে খরখরে পাথুরে মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একেকটা মানুষের শাঁস, শুধু এইটুকু দেখতে আজও ওয়েস্টার্ন ম্যুভিস্ক্রিনে রাখি নিবদ্ধ চক্ষুজোড়া।

হাজারেবিজারে হয়তো নয়, কিন্তু শ-খানেক ওয়েস্টার্ন ম্যুভির নাম তো এক-নিঃশ্বাসেই লিখে ফেলতে পারব। ‘ব্যুচ ক্যাসিডি’, ‘দি আনফর্গিভেন’, ‘দি গ্যুড্, দি ব্যাড, দি আগ্লি’, ‘ওয়ান্স আপ্যন অ্যা টাইম ইন অ্যামেরিকা’, ‘থ্রি-টেন টু জ্যুমা’, ‘ফোর্ট অ্যাপাচি’, ‘প্যাট গ্যারেট অ্যান্ড বিলি দ্য কিড’, ‘দি ম্যাগ্নিফিসেন্ট সেভেন’, ‘দ্য আউট-ল্য হোস্যে ওয়েইল্স’, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’, ‘ফর অ্যা ফিয়্যু ডলার ম্যোর’ কিংবা ‘হাই ন্যুন’ প্রভৃতি সিনেমাকীর্তি দেখেই জীবনে মানুষের মতো এহেন মানুষ হয়েছি যে দ্যাখো ভল্লুকেও মুখের কাছে এসে শুঁকে শেষে মরা লাশ ভেবে ফিরিয়া যায়, খায় না, গাছে-উঠে-বসা বন্ধুটি পয়গম্বরের মতো মগডালে বসে বসে দ্যাখে আর হাসে। অ্যানিওয়ে।

এইসব মহান — অবশ্য মহাকালীন কি না বা কুলীন বংশজাত কি না তা জানি না, আমি কি আইএমডিবি না ওই তোমার রটেন টোম্যাটো নাকি যে হড়বড়াইব অ্যাওয়ার্ডগ্রাফ আর টপচার্টে রেকর্ডর‌্যাঙ্কিং দেখে? — এইসব রঙিন ও শাদাকালো ম্যুভির অনেক অংশ ঘুরিয়েফিরিয়ে বহুবার দেখেছি জীবনে। যেসব ছবি-বইপত্তর জিন্দিগির একটা-আধটা মুহূর্তও রৌশন করেছিল কোনোদিন, সেসবের পানে দুনিয়া যতই-না খাপ্পা থাকুক যায়-আসে না তাতে কিচ্ছুটি আমার। এর বাইরে ধুমধাড়াক্কা হার্ডকোর ওয়েস্টার্ন ঘরানার ম্যুভি দেখাদেখির তো সত্যিই ইয়ত্তা নাই।

বীরত্ব ও লড়াইদৃশ্যের যেনতেন ম্যুভি দেখার বয়স তথা ম্যাজিক্যাল স্টেট অফ কনশ্যাস্নেস্ পেরিয়ে এক-সময় কিঞ্চিৎ ক্রিটিক্যাল কনশ্যাস্নেস্ গ্রো করে ভেতরে। টের পাই যে এ-ধারার ম্যুভিগুলোতেও বহুরঞ্জিত পোলিটিক্স রয়েছে। বেশিরভাগেরই ইন্টেনশন দখলদার শ্বেতকায়দের জয়গাথা গাওয়া। আজকের যে-অ্যামেরিকা, তামাম জাহানের সর্দারি ও খবরদারি করুয়া অ্যামেরিকা, যা-কিছু ভালো আর যা-কিছু মন্দ সমস্তকিছু মনোপোলি ডিসাইড করা অ্যামেরিকা, তা-সবের ছাঁচ ওই সিনেমাগুলোতে এবং বাংলায় সেবা/প্রজাপতি প্রকাশনের ছাপানো বইগুলোতে মেলে। এক-সময় এটুকু বোধবুদ্ধিরও উদয় হয় যে, সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরির অজুহাতে জুলুম-জবরদস্তিমূলক উপায়ে রেড-ইন্ডিয়ানদের একঘরে করার পর শাদা আদমিদের তরফ থেকে ইন্ডিয়ানদের কন্ট্রোল/শায়েস্তা করার জন্যে অ্যাজেন্ট নিযুক্ত করত সরকার। এইসব অ্যাজেন্ট সরকারের আগ্রাসনস্বার্থ রক্ষা করত। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রে বা কাহিনিব্যঞ্জক বইপত্রে এই অ্যাজেন্ট মহোদয়দিগেরে আমরা প্রায়শ শেরিফের ভূমিকায় দেখে থাকব। বংশপরম্পরাসূত্রে বসবাসরত ভূমিজ ইন্ডিয়ানদের ন্যায্য অধিকার থেকে একের-পর-এক কূটকৌশল ও ছুঁতোনাতায় ঠকায়ে অ্যামেরিক্যানরা কালক্রমে পরাজিত ও পদানত করে সেই মানুষগুলোকে।

এইসব জেনেছি ধীরে ধীরে, একগাদা ওয়েস্টার্ন বই-সিনেমা সাবড়ানো হয়ে গেছে তদ্দিনে, এবং প্রচুর অন্যায় স্তোকবাক্য সমর্থন করা হয়ে গেছে সেটলার অ্যামেরিক্যানকৃত। সহসা ‘বাস্তবে ওয়েস্টার্ন কাহিনির পশ্চিম’ শিরোনামে একটা বই পড়ে এই ক্রিটিক্যাল কনশ্যাস্নেসের পত্তনি। বইটা কাজী মাহবুব হোসেন প্রণীত, প্রজাপতি প্রকাশন থেকে বেরোনো। প্রসঙ্গত উল্লেখ কর্তব্য, গত শতকের নব্বইয়ের দশক মধ্যভাগে একটা বইয়ের ধারাবাহিক অনুবাদ ছাপা হচ্ছিল ‘জনকণ্ঠ’ নামে বাংলাদেশী এক দৈনিকের পাতায়। সেই পাঠাভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যক্তিগত ওয়েস্টার্ন সিনেমা বাছবিচারের ক্ষেত্রে।  সেইটি Bury My Heart at Wounded Knee শিরোনামে একটা আশ্চর্য বইয়ের বঙ্গানুবাদ, ‘আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে’, অ্যামেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড-ইন্ডিয়ান ইতিহাস, ইংরেজি ভাষায় Dee Brown প্রণীত বইটি বাংলা করেছেন দাউদ হোসেন। মূলত উত্তর-অ্যামেরিক্যার পশ্চিম ভূখণ্ড দখলের ঘটনাবলিই বর্ণিত হয়েছে বইটিতে। এক মর্মস্পর্শী ও তথ্যপূর্ণ বই। মিসিসিপি-মিসৌরি পারায়ে, দিগন্তবিস্তীর্ণ প্রেইরিহৃদয় চিরে, রকি-পর্বতমালা ডিঙিয়ে মহাসাগরের অন্যপার থেকে অনুপ্রবেশকারী ইউরোপীয় ধবলাঙ্গরা পঙ্গপালের মতো দখল করে নিচ্ছিল একে একে ব্ল্যাক হিল্স ও ক্যালিফোর্নিয়ার স্বর্ণখনি, বনাঞ্চল, গবাদি ও ঘোড়ার চারণক্ষেত্র, আবাদযোগ্য জমিজিরেত সহ সমগ্র ভূভাগ। ধ্বংসবিষাদময় সেই সময়টায় ব্যর্থ হতে থাকে রেড-ইন্ডিয়ানদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের যাবতীয় প্রচেষ্টা, যার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ‘উন্ডেড্ নি’ নামের এক পার্বত্য খাঁড়ির বাঁকে, সেটি ছিল ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকের একটি দিন। এই দিনটিরই পূর্বাপর ডক্যুমেন্টারি ডি ব্রাউনের গোটা বইটা। ছাপা হয় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে। অসংখ্য গোত্রগুরু-ধর্মগুরুর মর্মন্তুদ লড়াই-পরাজয় ও যুদ্ধ/সন্ধির ঘটনা, টালবাহানা, অ্যামেরিক্যান কর্তৃক সন্ধিশর্ত লঙ্ঘন এবং আদিবাসীদের স্বভূমি ও স্বগোত্র রক্ষার মরিয়া প্রচেষ্টার বয়ান বইটির প্রতিবেদনোপজীব্য। বইটি পড়ে এতদবিষয়ে একপেশে অ্যামেরিক্যান প্রোপ্যাগ্যান্ডা সম্পর্কে প্রথম সজাগ হওয়া এবং ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভি নির্বিচারে দেখনোপভোগ থেকে সতর্ক-সবিবেক সাবধান হওয়ার শুরু।

যদিও ক্রমশ ওয়েস্টার্ন ঘরানার ম্যুভিজগতে টেক্সট্যুয়্যাল অল্টার্নেইট পার্সপেক্টিভ হাজির হতে শুরু করে। যেমন, স্মরণ হচ্ছে, টারান্টিনোম্যুভি ‘ডি-জ্যাঙ্গো আনচেইন্ড’ তেমনই একটা ছবি, কিংবা নাম করা যাক অপেক্ষাকৃত রিসেন্ট ‘দ্য ল্যোন রেইঞ্জার’ ম্যুভিটার। মোদ্দা কথা, নায়কের ও প্রধান প্লটের পজিশন শিফ্টিং ঘটছে এবং নাট্যিক ঘটনা/অ্যাকশনও পরিবর্তিত হতেছে এ-তাবৎকালীন প্রচারধন্য ওয়েস্টার্ন পপ্যুলার ন্যারেটিভগুলোর। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ধাঁচ এক্সপ্লোর করে টেক্নিক্যালি ইংরেজি সিনেমায় এইটে ইউটিলাইজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে বিভিন্ন সব উপায়ে। এন্তার ম্যুভির নাম নেয়া যাবে মেমোরি থেকে; যেমন : ‘ড্যান্সিং উইথ দ্য উল্ফস’, ‘দ্য পোস্টম্যান’ — দুইটাই কেভিন কস্টনারের সিনেমা; সাই-ফাই সিনেমাতেও অধুনা ন্যারেটিভের ফর্ম্যাট হিশেবে এইটে ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে : ‘অ্যাভাটার’, ‘রিড্ডিক’, ‘ইলিসিয়্যম’ প্রভৃতি সিনেমার নাম ঝটাপট মনে পড়ছে।

মোদ্দা কথাটা হলো, দুষ্ট হঠিয়ে শিষ্ট প্রতিষ্ঠা। তা, মানবেতিহাস তো এই দুই বাইন্যারি অভিজ্ঞতার বাইরে বেরোতে শেষমেশ পারছে না, চাইছে যদিও খুব করে, কিন্তু মনুষ্য অভিজ্ঞতা বাইন্যারি শিষ্ট-দুষ্ট মন্দ-ভালো যুগ্ম থেকে বেরোতে পারবে বলেও মনে হয় না; তাহলেও, তৎসত্ত্বেও, পরিসর বাড়ানো সম্ভব এ-দুইয়ের, তথা যাবতীয় যুগ্ম-বৈপরীত্যের, অস্তিত্ব মেনে নিয়েও। হচ্ছেও আজকাল, পরিসর সম্প্রসারণ, যুগ্ম-বৈপরীত্য প্রকল্পনা পাশ কাটায়েও। মনে করা যাক ২০১২ সালে রিলিজ-পাওয়া অ্যামেরিক্যান ‘গ্যালোয়াকার্স’ ম্যুভির কথা। আদৌ লিনিয়ার নয় এর ন্যারেটিভ, ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন টেক্নিক প্রযুক্ত হয়েছে এখানেও অভূতপূর্ব মুনশিয়ানার সঙ্গে, এবং অপরাপর অনেক ম্যুভিই সৃজিত হয়ে চলেছে ইদানীং ইন্সপায়ার্ড বাই ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভিটেক্নিক। ‘ম্যাশেট’ ম্যুভিটার নামও মনে পড়বে, এবং একই ম্যুভির নির্মাতা ভ্রাতৃদ্বয়ের যাবতীয় ম্যুভিকর্ম, রোড্রিগ্যেজ ব্রাদার্স, অথবা টারান্টিনোসমগ্র, অথবা জ্যাম্বো ম্যুভিগুলো। রক্তারক্তি, নৃশংসতা, বিস্তর যুক্তিবিচ্যুত দৃশ্যকলার উপস্থাপন, নৈতিকতা-ধসানো মন্তাজ প্রভৃতি মিলিয়ে এইধারা ছায়াছবিগুলো শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক ক্ল্যাসিফিকেশনের আওতায় আবহমান মেরুদূরত্ব নস্যাৎ করতে চেয়েছে। এর অভিঘাতও পড়তে শুরু করেছে সিনেমায়, শিল্পকলার অন্যান্য ঘরগেরস্তালিতেও।

রচনার সঙ্গে ব্যবহৃত প্রচ্ছদ ও অন্যান্য ছবিগুলা ‘লাল জীপের ডায়েরী’ থেকে নেয়া হয়েছে ।। লেখা : জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: