দলবদ্ধ দলছুট || কাইফু আলম তারা

দলবদ্ধ দলছুট || কাইফু আলম তারা

[রচনায় বিতরিত তথ্য পুরনো হলেও রচনাটা টাটকা লাগতে পারে তাদের কাছে যারা অকালপ্রয়াত সংগীতজীবী সঞ্জীব চৌধুরীর সুরগ্রাহী। ঠিক প্রবন্ধ তো নয়, রিপোর্টের আদলে এই নিবন্ধ প্রতিবেদিত করছে এক অন্তরঙ্গ সঞ্জীব চৌধুরীকে। এবং স্পষ্টত তখনও দলছুটের পয়লা অ্যালবাম এসেছে মাত্র।

সম্ভবত ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বইমেলাকালীন দুইটা অ্যালবাম বেরোয় যা বাংলা গানে একটা স্থায়ী ছাপ রাখতে সক্ষম হয়। এর একটা জেমসের একক ‘দুঃখিনী দুঃখ কোরো না’ এবং অন্যটা ‘আহ্’ দলছুট ব্যান্ডের ডেব্যু ‘আহ্’ প্রথমোক্ত সংকলন দিয়ে জেমস্ ননব্যান্ড শ্রোতাদেরেও অনুকূলে নিয়ে নেন একঝটকায়; ‘আহ্’ যদিও শ্রোতানুকূল্য গোড়ার দিকটায় পায়নি, ক্রিটিক সংগীতসমুজদারদের নজর কেড়েছে যদিও, অচিরে একটি টিভিশোতে ‘রঙ্গিলা’ গান দিয়া বাপ্পা-সঞ্জীব ডুয়োর জয়যাত্রা আরম্ভ হয়।

সাতানব্বই থেকে দ্বিসহস্রসাত অব্দি সঞ্জীবপ্রয়াণের আগে একদশক দলছুট উপহার দেয় একে একে ‘হৃদয়পুর’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনাবিহার’ শীর্ষক শ্রোতামাতানো সংকলনগুলো। সঞ্জীবের একটা সোলো সংকলনও প্রকাশিত হয় এরই ভিতরে ‘স্বপ্নবাজি’ শীর্ষক এবং পায় ব্যাপক লোকপ্রিয়তা। বাপ্পার সোলো ক্যারিয়ারও এই একদশকে একদম চূড়ায় যেয়ে ঠেকে। ব্যান্ডের অগ্রযাত্রাও অব্যাহত রয়। এবং ২০০৭ নভেম্বরে সিডর ঘূর্ণিঝড়ের রাতে দলছুটপ্রাণ সঞ্জীবের আকস্মিক প্রস্থানের মধ্য দিয়ে ‘দলছুট’ থমকে যায়।

না, বাপ্পার উদ্যোগে সঞ্জীবস্মারক একটা অ্যালবাম বেরোয় মৃত্যুর অল্পদিনের ভিতরেই ‘টুকরো কথা’ নামে একটামাত্র ট্র্যাক সম্বল করে। এরপর ২০১০ সনে এসে ‘আয় আমন্ত্রণ’ শিরোনামক দলছুটের একটা অ্যালবাম বেরোয়, সঞ্জীবছাড়া ব্যান্ডের পয়লা অ্যালবাম, কিন্তু যুৎ হয় না। তারচেয়ে সঞ্জীবস্মৃতিকেন্দ্রী কিছু কর্মসূচি ফি-বছর সংগীত-ও-সঞ্জীবপ্রেমীদের উজ্জীবিত করে চলেছে নিয়মিত। ‘সঞ্জীব উৎসব’ কার্যক্রমের আওতায় দেশের রাজধানী এবং বিভাগীয় জেলাশাহরিক পরিসরে বেশকিছু সংগীত-অন্তপ্রাণ মানুষের তৎপরতা আশাব্যঞ্জক নিশানা হাজির রাখছে নিত্য আমাদের সামনে।

অ্যানিওয়ে। এইখানে যে-লেখাটা ছাপা হচ্ছে, এইটা সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট্যাজ্; সঞ্জীবের সঙ্গে কথালাপের মাধ্যমে দলছুটের দ্বিতীয় সংকলন প্রকাশপ্রাক্কালে এই রচনা ছাপা হয়েছিল ‘প্রতিচিত্র’ পত্রিকায়। সাপ্তাহিক প্রতিচিত্রের সেটি ছিল প্রথম ও একইসঙ্গে বর্ধিত কলেবরে ঈদ-উদযাপনী বিশেষ সংখ্যা। সাপ্তাহিকটা কয়েক মাসের পরেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এইচআরসি মিডিয়া লিমিটেডের ঘর থেকে এইটা বার হয়েছিল। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘দলবদ্ধ দলছুট’ শীর্ষক এই রচনার লেখক কাইফু আলম তারা। ‘গানপার’ থেকে লেখকের সাম্প্রতিক সাকিন-অবস্থান আমরা জানতে পারি নাই।

সঞ্জীবস্মারক রচনাগুলো উদ্ধার ও সংরক্ষণ করার চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব পরবর্তী দিনগুলোতেও। — গানপার]

sanjeeb.jpg

হৃৎপিণ্ডের দুই কামরা অলিন্দ আর নিলয়। দলছুটের দুই ভোমরা সঞ্জীব আর বাপ্পা। এর মধ্যে বাপ্পা আবার দেশছুট হয়ে ভারতে আছেন কিছুদিন হয়। রেকর্ডিঙের কাজে। কথা বলা যায়নি তাই তার সাথে। অবশ্যি অলিন্দের কাছেই মিলে গেছে নিলয়ের খোঁজ।

সঞ্জীব চৌধুরী। দলছুট এই গায়কের আক্ষেপ তার কণ্ঠস্বর নিয়ে। বললেন, “আমার কণ্ঠ কেন যে আরো ভালো হলো না! অনেকেই বলেন, এটি আর আগের মতো নেই। মেটালিক হয়ে গেছে নাকি।” এখন কি-আর-করা, মেটালিক কণ্ঠ সম্বল করেই সামনের পথ পাড়ি দেবার প্রস্তুতি চলছে সঞ্জীব চৌধুরীর।

‘দলছুট’। নামটা একটু অন্যরকম। ব্যান্ডের চলতি ধারাবহির্ভূত। আহ্! এদের প্রথম অডিয়োপ্রকাশনার শিরোনাম ‘আহ্’ হতে পারে আনন্দসূচক, বেদনাসূচক, বিরক্তিসূচক, পুলকসূচকও হতে পারে। বহুবর্ণিল শব্দ। অনেকটা আলু তরকারির মতো। সব তরকারিতেই ওয়েল-ফিট।

আর এই দলছুটদেরই একজন সঞ্জীব চৌধুরী। সংগীতের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই তার। গাইতে গাইতে গায়েন তিনি এই গানের ভুবনে। তার অপর দুই গায়েন দলছুটসঙ্গী শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা এবং মিঠু।

সঞ্জীব চৌধুরীর সাথে আমাদের আলাপ জমে ওঠে গত ১১ জানুয়ারি (১৯৯৮) নগরীর একটি পানশালায়। এতে উঠে এসেছে সংগীত নিয়ে তার ভাবনাচিন্তা। এবং এই সূত্র ধরে শিল্প, সমাজ, রাজনীতি, ব্যক্তিমানুষ ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ।

পেশাগতভাবে সঞ্জীব চৌধুরী একজন সাংবাদিক। তার এই পেশাগত অবস্থান সংগীতচর্চার ক্ষেত্রে কতটুকু কি ভূমিকা রাখছে? তিনি বলেন, সাংবাদিকতা পেশায় আছি বলেই আমি নিজে থেকে কাউকে দলছুট বা আমাদের ক্যাসেট সম্পর্কে কিছু লিখতে বলতে পারি না। তারপরেও বিভিন্ন পত্রিকায় আমাদের যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, মূল্যায়ন করা হয়েছে, তাতে আমি খুশি।

সঞ্জীব চৌধুরীদের দলছুটের প্রথম প্রকাশনা ‘আহ্’। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন সঞ্জীব ছাড়াও বাপ্পা এবং মিঠু। কথা এবং সুর সঞ্জীব চৌধুরীর। সংগীত : শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা। বাঁশি : বারী সিদ্দিকী। তবলা ও ঢোল : সাত্তার। মনোরম প্রচ্ছদটি অশোক কর্মকারের করা।

সাধারণত কোনো ব্যান্ডের প্রথম প্রকাশনা তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে না। সেই বিবেচনায় দলছুটের ‘আহ্’ যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে গত নবেম্বরে (১৯৯৭) বিটিভিতে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘শাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে আউলা বাতাস খ্যালে’ গানটি প্রচারিত হবার পর দলছুটের ক্যাসেট বিক্রি বেড়ে যায়। জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে গানগুলোর।

যেভাবে ‘দলছুট’ এবং ‘আহ্’
আসলে নামকরণের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে এই দল গড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের সময়টাতে দলবদ্ধ হয় এই দলছুটরা। সঞ্জীব চৌধুরী তখন এবং তারও আগে গান গেয়ে বেড়াতেন বিচ্ছিন্নভাবে। ছিলেন তিনি ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের সাথে। অতঃপর একদিন সমমনা বাপ্পার সহযোগে গড়ে ওঠে ‘দলছুট’। ক্রমে এরা সুসংহত হয়ে উঠলে কয়েক বছরের মাথায় প্রকাশ পেল প্রথম অডিয়ো ক্যাসেট প্রকাশনা ‘আহ্’!

অল্প কথায় বাপ্পা ও মিঠু
ওস্তাদ বারীন মজুমদারের ছোটছেলে বাপ্পার সংগীতে হাতেখড়ি ওর বাবার কাছেই। বাপ্পা সংগীত পরিচালনা করছেন। দুটো সোলো ক্যাসেট বেরিয়েছে ওর। শেষটির নাম ‘কোথাও কেউ নেই’। গিটার, কিবোর্ড সহ অন্যান্য যন্ত্রেও তিনি দক্ষ।

চারুকলার ছাত্র মিঠু দলছুটের অতিথি সদস্য। গান ওর নেশা। এবারের অ্যাশিয়্যান বায়েনিয়্যালে (১৯৯৮) ওর একটি ছবি ঠাঁই করে নেয়। কালিক নাট্যদলের তিনি সদস্য।

এবং সঞ্জীব
একজন শিল্পী এই সমাজের বাইরের হতে পারেন না। সে-অর্থে তিনি রাজনীতিরও বাইরে নন। দলছুট সঞ্জীব চৌধুরীর সংগীতসাধনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ধারণ করেই। কেবল গান করার জন্যই গান করায় তিনি বিশ্বাসী নন। তিনি মনে করেন সংগীত হতে পারে হাতিয়ার।

সংগীতে দুনিয়া জুড়ে চলছে এখন ফিউশনের কাল। আমাদের এই অঞ্চলেও ফিউশনের এই প্রক্রিয়া বেশ সচল বলা চলে। এ-ব্যাপারে সঞ্জীব চৌধুরীর ভাষ্য হলো, “ভাব ও দর্শনের ফিউশনকেই আমি বেশি গুরুত্ব দিই। সেক্ষেত্রে কথা ও সুরের ফিউশন তো ঘটছেই।” তার ভাবনাচিন্তা থেকে বোঝা যায়, সংগীতের ওপর এক্সপেরিমেন্টাল কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছেন এই শিল্পী।

সঞ্জীব চৌধুরী জানালেন, দলছুটের দ্বিতীয় ক্যাসেটের জন্মপ্রক্রিয়া চলছে। ওটির জন্য বেশিরভাগ গানই নাকি হতে হবে প্রেমের। এটি তার ওপর এক-ধরনের প্রেশার মনে করছেন সঞ্জীব। কারণ তিনি প্রেমের গান লিখতে পারছেন না। কেন? এর উত্তর মেলে তারই স্বীকারোক্তি থেকে, “বলতে লজ্জা নেই আমি অহরহ প্রেমে পড়ি।” আসলে এখন প্রেম ও অপ্রেমের ফারাকটাই বুঝতে পারছেন না তিনি।

… …

গানপার

COMMENTS

error: