বিভিন্ন সময়ে এই প্রশ্ন করা হয়েছে, আমি কেন লিখি? কখনো উত্তর দিয়েছি, অন্য কিছু করতে পারি না বলে লিখি; কখনো বলেছি, না লিখলে অন্যকিছু করতাম, এবং সেটা হয়ত ভালো কিছু হতো না (লিখেও যে ভালো কিছু হচ্ছে কে বলতে পারে?), নেশা বা উন্মত্ত ভোগ-বিলাসে মেতে কাটিয়ে দিতাম কি না এই জীবন বা এঁকে খুঁচিয়ে ওঁকে রক্তাক্ত করতাম কি না, তার চেয়ে লিখি বলে, বহু কিছু আমার হাত থেকে এবং একইসঙ্গে আমি বহু কিছুর হাত থেকে বেঁচে যাই|
একবার লিখেছিলাম লেখাটা হলো কখনো আমার ললাটলিখট, কখনো রক্ষকবচ, কখনো জীয়নকাঠি|—বলাবাহুল্য এসব উত্তরের কোনোটাই কি যথাযথ, যখন ফের নিজেকে, বা অন্য কেউ জিজ্ঞাসা করেন, কেন লিখি? বরং কেন লেখা বন্ধ করে দিই না?—সেটাও তো ভাবি| আমি লিখলে বিশ্বসাহিত্যের বা বাংলা সাহিত্যের কী এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হবে? ফরাসি দেশে লোকে যেমন মনে করে, লেখা নিয়ে মরিয়া হওয়ার কিছু নেই| মানে, বিখ্যাত হতে হবে, বা দুনিয়া-জাতি-দেশ বা দশজনকে উদ্ধার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি| আমি না-লিখলে ফরাসি সাহিত্যের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না, লিখলেও তেমন কোনো উন্নতি হবে না| আমার লেখা যদি ভালো হয়, তাহলে তা নিজ গুণে জায়গা করে নেবে, নইলে নিজ দোষে মুছে যাবে|—এমনটাই মনে হয়েছিল, প্রিয় কবি অরুণ মিত্রের একটি প্রবন্ধ পড়ে| তিনি ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য বিশেষজ্ঞ বলেই তাঁর নাম নিলাম|
স্লেটে লেখা নাম আমরা, মুছে যেতেই আসি—এমনটা বলতেন প্রিয় লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়| কালের ধুলায় তবু কত কিছু লিখে গেছেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে আপন মাহমুদ| পড়ে যাই ও উপভোগ করতে চাই শওকত আলী, সৈয়দ হক, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক বা কায়েস আহমেদের সব রকমের লেখা| আশ্চর্য হয়ে ভাবি আবুজাফর শামসুদ্দিন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম বা আবু রুশদ, শওকত ওসমান, রশীদ করীমদের সাধনা কোনোভাবেই বৃথা যেতে পারে না| কী বিপুল জীবনের ভেতর দিয়ে তারা গেছেন বা না-গেছেন—কেবল সেটাই মূল কথা নয়, তাঁদের পঠনপাঠন ও দায়বদ্ধতা ভালো বই ও ভালো লেখার প্রতি—এসব নিত্য অনুপ্রাণিত করে|
লেখার ক্ষেত্রে প্রায়ই এমন ঘটে যে, কেউ একজন অন্য কাউকে খারিজ করলেন তো আরেকজনের কাছে তিনি অনিবার্য হিসেবে দেখা দিলেন| এদেশে, সমকালের লেখকরা নিজেদের লেখা পড়লেও খুব একটা গণ্যতা-মান্যতা দেন না| অন্যকে বড় করলে নিজে ছোট হয়ে যাওয়ার কী ভয়ই না তাদের! বিদেশে বা বিভাষায় যদিও দেখি অ্যান্থনি পাওয়েল নিজের আগের পরের লেখকদের নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন, সেটা সালমান রুশদিও| রোবের্তো বোলানিয়ো তাঁর আগে পরের অনেকের সম্পর্র্কে যা যা মনে করেন, মুক্তভাবে ছোট ছোট গদ্যে লিখে গেছেন| তাঁর নিজের ছোট-বড় কত ধরনের উপন্যাস এবং ছোটগল্প আছে| লিখেছেন কবিতাও| কিন্তু ঔপন্যাসিক বোলানিয়োই সেগুলি ছাপিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন বিশ্বের পাঠকের কাছে, পরবর্তী বা উঠতি লেখকদের কাছে| সেদিক থেকে আমাদের দশা কোন জায়গায়? লেখা সম্পর্কে ভীতি বা সম্ভ্রম—কোনোটাই আমাদের শেষ অব্দি চালিত করে কি? ভীতি, কারণ নিজের লেখায় মুক্তভাবে প্রাণ উজাড় করে মনের সব কিছু বলার উপায় এখানে কতটা—তাতে আমাদের প্রত্যয় নেই| সম্ভ্রম, কেন না, লেখা বড়ই কঠিন চিজ| বাংলা ভাষার দুর্বলতা আমাদের বিদ্যাচর্চার ব্যর্থতায় চলমান রয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্য মোটেও দুর্বল কিছু নয়| বরং আমরা মধুসূদনের মতো কবি এবং বঙ্কিমের মতো গদ্যলেখক পেয়েছি| শ্রেষ্ঠ দুই দিয়েই আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শুরু| ভাবতে পারি না, এর শুরুটা চর্যাপদের মতো অসামান্য কীর্তি দিয়ে, বৈষ্ণব পদাবলির মতো ভাণ্ডার আমাদের আছে| মধ্যযুগের সাহিত্যে বৈচিত্র্য কম কিন্তু এর প্রতিটি কীর্তির ভাঁজে খাঁজে কত মূল্যবান মণিরত্ন আছে—বলে শেষ করা যাবে না| আধুনিক সাহিত্যে বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীর কীর্তিগুলির পথ ধরেই যে-কোনো তরুণ লেখক, বিশেষ করে যিনি বাংলায় লিখতে চান, তারা তৈরি হতে পারেন| শরৎচন্দ্রের কাছে ভাষার স্রোত ও গল্পবলার কায়দা এবং পরের তিন বাড়ুজ্জের কাছে দেখা-অনুভব-লেখাকে ‘বাস্তবতায়’ ফলানোর কায়দাটা বেশ শেখা যেতে পারে|
এসব ভাবতে ভাবতেও যে লোকে লেখে কি না?—কীভাবে বলি? আমি কেন লিখি?—এর হয়ত একটাও সত্যিকারের কারণ তুলে ধরতে পারব না| আবার পরে পরেই হয়ত হাজারটা কারণ দাঁড় করানো যেতে পারে| সবচেয়ে বড় কথা, লেখার জন্য সারাক্ষণ হাত নিশপিশ করতে থাকে| হাত চুলকায়| হাত শুলায়|—কথ্য বাংলায় এটা বলা যেতে পারে| নইলে, লেখা তো তারই কাজ—যার নতুন কিছু বলবার আছে|—এমনটাও কানে এসেছে কত| কী আছে আমার নতুন করে বলবার? হ্যাঁ, একটাই পথ আছে : কীভাবে নতুন করে বলা যায়? কীভাবে-টা এক দিকে গদ্যে, অন্য দিকে কাঠামোতে| মানে, স্টাইলটা তৈরি করা| কিন্তু স্টাইল কি তৈরি করা যায়? তৈরি করা যায়, ফ্যাশান| যেটা যখন চলে সেই ফ্যাশন : বাংলায় এখন জাদু ও ডার্কসাইকোলজির খুব চল হয়েছে দেখছি|

মিলান কুন্দেরা, গুন্টার গ্রাস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বা সালমান রুশদি বা হোসে সারামাগো বা জে. এম. কুয়েটজি—এঁদের লেখা থেকেও সবক নেওয়া যায়, কিন্তু লেখার কাজটা তো নিজের ওপরে বর্তায়| বাংলা ভাষায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের লেখকরা কমবেশি তলস্তয় কি ন্যূট হ্যামসুনদের পড়েছেন, বা তলস্তয় থেকে সল বেলো অব্দি| কিন্তু তাদের তুলনায় তেমন আধুনিক লেখাটা লিখতে পারলে কজন? গুন্টার গ্রাস পড়ে তো আর গুন্টার গ্রাস হওয়া যায় না| সেই আধুনিক ও বিনাশী দৃষ্টিভঙ্গিটা ভেতরে ‘ভেতর-থেকে’ থাকতে হয়| ফলে লেখাটা এই বঙ্গদেশে বসে, এই সময়ে, আমাদের মতো বাঙালি লেখক, যিনি বাংলা সাহিত্যের সিলসিলা অনুসরণ না করে, সবুজ শ্যামলিমা নদীমাঠপ্রান্তরের দেশে বসে, মরুভূমির পুণ্য নিয়ে আমরা যারা নিজেদের তৈরি করতে চাই, সেখানে লেখার গতি অগতির চেয়ে আর কোন দিকে যেতে পারে?
তবুও লিখি| কেন লিখি? নিজেকে জিজ্ঞাসা করে উত্তর পাওয়ার চেষ্টা যে হয়নি, তাও তো নয়| বহুবার চকিতে হানা দিয়ে যায় এই ছোট্ট কথাটা| কেন? কেন? কেন?—সেদিন একজন অনুজ লেখক, বিস্মিত হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনার কি এখনও লিখতে-পড়তে ভালো লাগে?! এই পোড়া দেশে, আর পড়েইবা কী করবেন? কেনই বা আর লিখবেন?
আমি উত্তর দিতে পারতাম, আরো পোড়ার জন্য| আরো দহনের জন্যই, আরো ব্যর্থ হওয়ার জন্যই লিখতে হবে| ব্যর্থতার চেয়ে খাঁটি মাল আর কিছু হতে পারে! সফলতা, বিশেষ করে অবিরাম অন্তহীন সফলতার চেয়ে ভেজাল জিনিস আর কিছু হতে পারে না| লেখা ব্যর্থতার এক ও অনবদ্য সুখ| এই সুখ এই নশ্বর জীবনে হেলায় হারাতে চাই না বলেই হয়ত লিখি|—এ কোনো নিজেকে বুঝ দেওয়া বা প্রবোধ দেওয়ার বিষয় নয়| কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কি যে, তিনি খুব সফল লেখক?
এখন অব্দি আশিটার মতো ছোটগল্প, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ছোটবড়োমাঝারি মিলিয়ে বোধ করি ডজনখানিক হবে| প্রবন্ধ-নিবন্ধ যে কত লিখেছি সেসবের কোনো ইয়ত্তা নেই| অনুবাদের সংখ্যাও কম হবে না| সব লেখা গোনায় ধরতে নেই| গুনতেও নেই| লেখা এক না-গুনে চলা পথ| কতটা পথ পেরোলাম?—সেই হিসাব নিতে মন মোর নহে রাজি| তারপরও যখন দেখি, বাংলাদেশের কোনো কোনো সংকলনে (কারণ অনেক জায়গায় আবার আছে বৈকি) বা বাংলা ছোটগল্প-উপন্যাসের আলোচনায়, আমার নামগন্ধ অব্দি নেই|—তখন মনেই হয়, এমন কিছু করিনি যে লোকে নাম নেবে, মনে রাখবে বা মনে করবে বা গণ্য করবে| ফলে নিজের দিকেই ফিরে আসি| নতুন করে নতুন ব্যর্থতার গর্ত খুঁড়তে শুরু করি|
কেন লিখে চলি? কারণ এছাড়া নিজেকে নিজে দেওয়ার মতো কোনো কাজ তো নেই| বিজ্ঞানী হলে কোনো গবেষণা করা যেত সেটি পর্দাথবিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানী যাই হতাম না কেন| সেটা হতো মানুষের জন্য করার মতো কাজ| কিন্তু লেখার নিজের জন্যই করার মতো একমাত্র কাজ| নিজের বেঁচে থাকাকে পরখ করা, নিজের ক্ষমতা ও অক্ষমতাকে যাচাই করার এই নিজের একান্ত কাজ—লেখা| যা কারো কাজে, এমনকি নিজের কাজেও লাগতে নাও পারে, তবু অবলীলায় করা যায়| কোনোমাত্র কোনো ক্ষতি হবে না, লাভ হোক বা না হোক|—এই গুণের কারণে লেখার কাজটা সবার চেয়ে আলাদা| এমন আলাদা কাজ করি, নিভৃতে-নির্জনে—তাতে কোনোমাত্র শ্লাঘা তৈরি হওয়ামাত্র নিজের কাছে লজ্জা লাগে| গ্লানিবোধ হয়| কারণ, লেখা মহৎ কোনো কাজ নয়, আবার হীন কোনো কাজও নয়| এটা স্রেফ কোনো ধারালো ছুরির ধার পরীক্ষার মতো| খুব সাবধানে, অযথা রক্তপাত হলেও তা মেনে নিতে হয়—এই রকমই লেখার বিষয়টা দেখা দেয়|
জীবন এক ক্ষুরধার পথ—সেই পথে আরো ক্ষুরধার পথ হলো নিজেকে যখন এই লেখার কাজে ঠেলে দিই|—কারো কারো এমনটাও বোধ হতে পারে| সবাই তো সব কিছু লিখবেন না, চাইলেও লিখতে পারবেন না| যেমন পড়ার বিষয়টা : দুনিয়ার হেন বিষয় নেই যে যা পড়তে ইচ্ছা করে না, আগ্রহ জাগে না| পড়ার সুযোগ আছে; কিন্তু দুনিয়ার সব কিছু নিয়ে তো আর যা-ই হোক লেখা হতে পারে না| যার ভাষায় দক্ষতা আছে, বিষয় অনুযায়ী ভাষা প্রয়োগের ক্ষমতা সামর্থ্য আছে, তিনি তো গণিত বা পদার্থবিদ্যাচর্চা নিয়েও দারুণ বই লিখতে পারেন|

লিখতে গেলেই মাঝে মাঝেই আরো একটা প্রশ্ন হানা দেয় : বাংলা ভাষার গদ্যটাইবা কতটা আয়ত্তে আনা গেল? পঞ্চাশদশকের লেখকদের মধ্যে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যখন তাদের প্রজন্মের মতি নন্দীই কেবল গদ্যটা সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন—এমন মন্তব্য করেন, সেটা খুঁজে ও বুঝে দেখতে গিয়ে এর সত্যতা টের পাই| যদিও মতি নন্দী বৃহৎ কিছু লেখেননি, মহৎ কিছু করতে চেষ্টা করেননি, কিন্তু তিনি যা দিয়ে গেছেন, কোনোমতেই তা ন্যূন নয়| বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাসের গদ্যে মানিকের পর, স্বচ্ছ তীক্ষ্ণ সুবিন্যস্ত গদ্যের কারবারি তিনি| এটুকু হওয়াও কম বড় বিষয় নয়| সেদিক থেকে বাংলা সৃজনশীল সাহিত্যের গদ্যে নিজের ভূমিকাকে কি আমরা যার যার মতো যাচাই করব না? আমি কী করেছি, পাঠকের হাতে ছেড়ে দেবো বটেই, কিন্তু নিজেও এর টিকি ধরে নেড়েচেড়ে দেখব না?
আমি আমার বহু প্রিয় লেখকের নানান লেখায় সাক্ষাৎকারে পড়েছি যে, তারা নিজেদের কোনো প্রকাশিত লেখা পড়ে দেখেন না| পড়ে তো দেখেনই না বরং বিলকুল ভুলে যান| আমি ঠিক এর উল্টা কাজ করি| নিজের কোনো লেখা প্রকাশিত হলে বারবার পড়ি ও চুল ছিঁড়ি; প্রথম পাঠে এমনই হয়| তারপর কেউ যখন, সামান্য প্রশংসা বা অতি প্রশংসা করেন, ফের পড়ে দেখি| এবং তখন আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে| ফলে, নতুন করে কেউ লেখা চাইলে, ফের লিখি| এবং লেখার সময়, একবারের জন্য মনে জাগে না, এই লেখা পড়ে চুল ছিঁড়তে হবে|
আরো একটা বিষয়, আমি খেয়াল করেছি : প্রায় কোনো বাঙালি লেখকই স্বীকার করতে চান না যে তাদের ওপর কারো তেমন প্রভাব আছে| কেউ কেউ প্রথম দিকে প্রভাব ছিল বলে মনে করলেও পরে সেটি কাটিয়ে উঠেছেন বলে মনে করেন| আমার ঠিক উল্টা মনে হয়| আদি মধ্যে অন্তে আমি হাজারো লেখক দিয়ে প্রভাবিত|
কোনো কোনো লেখক হয়ত জানেনও না, তিনি যে সিলসিলায় সার্থক, এটি জগতে কার হাতে শুরু হয়েছিল| কাফকার পূর্বসূরি হেনরিশ ফন ক্লাইস্ট (Heinrich von Kleist) লিখেছিলেন বলে ফ্রানৎস কাফকার জগতটা আমরা পেলাম | যদিও কাফকাকে মনে করা হয় তিনি দস্তয়েভস্কির সৃষ্টিজগতেরই উত্তরাধিকার, কাফকা নিজে বলতেন তিনি তলস্তয় থেকে জাত| আবার দেখা যায় শেক্সপিয়র ও ডিকেন্সও তাঁকে কীভাবে চালিত করেছেন|—ফলে এমন বিচিত্র দিকে প্রভাব থাকে| কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখক নিজেও সনাক্ত করতে পারেন না| অন্যরা কখনো ঠিক ধরতে ধরতেও ধরতে পারেন না|
আমার ওপর প্রভাব বলতে, আমি পাঠক হিসেবে ভালো যেকোনো লেখকের লেখাই পড়ি না কেন, পড়ি আর মুগ্ধ হই| মুগ্ধ পাঠক কি ভালো পাঠকের লক্ষণ? নিশ্চিত বলতে পারি না| ফলে পাঠক হিসেবে নিজেকে নিয়ে নিশ্চিত হতে পারি না, সেখানে লেখক হিসেবে নিজেকে নিয়ে কী করে নিশ্চিত হব? কেন লিখব, কী লিখব, কখন লিখব?—সব জানেন ও মানেন; সেমতো কাজে একচুল এদিক ওদিক হয় না—এমন কঠিন নিয়ন্ত্রণ বাঙালি লেখকদের মধ্যে কমই দেখা যায়|
লেখা তাই নিত্যই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলার নাম| ভুলত্রুটি কোনো কিছু এড়ানোর নেই| তবুও সব কিছু নিয়ে লিখে যাই| কেন লিখি? লেখার সময় কি অব্যবহিত পরেও বিন্দুমাত্র এ নিয়ে বিচলিত হই না| ছাপা হওয়ার পর, বিশেষ করে বই হওয়ার পর বিচিত্র আফসোস-অনুতাপে ভুগতে থাকি| নাহঃ! সামনে আর এমন ভুল করা যাবে না| ফলে আবার লিখতে এগিয়ে যাই| আবার ভুল করি| ফের অনুতাপ, এবং আবার প্রত্যয়| এবং আবারও…এই চক্রও মনে হয় চলতে থাকে| এজন্যও লেখাও থামানো যায় না| খুব ইচ্ছা করে গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস লিখতে, কিন্তু হয়েই ওঠে না| কারণ, সেখানে লেখা সাজানোর খেলাটা দারুণ উপভোগ্য হতে পারে| ইরোটিক উপন্যাস তো বাংলা ভাষায় লেখা এখন অব্দি সম্ভব হয়নি|—সেখানেও কাজ করতে ইচ্ছা হয়| মারিও ভার্গাস ইয়োসার মতো ‘সৎমায়ের মহিমাকীর্তন’-এর মতো লেখা বাংলায় ভাবা যায়? তবু নিজেকে প্রবোধ দিই যে, আমার মূল জায়গাটি হলো উপন্যাসের লেখার নতুন পরিসরে হানা দেওয়া| সেই উপন্যাস, যা সমস্ত রকমের বর্গ ছক তত্ত্বের ফাঁদ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারে| সেই লেখার জন্য বর্তমানের যাবতীয় লেখাজোখা চালিয়ে নিচ্ছি| এটাও ‘কেন লিখি’-র আরেকটি উত্তর|
অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, কী হবে লিখে? সারা জীবন লিখলে বা সবটুকু ঢেলে দিয়ে লিখলেও কি এই বাংলাদেশের বর্তমান কোনো লেখক হোমার-দান্তে-ভার্জিল-শেক্সপিয়র-গ্যোয়েটে-তলস্তয় তো দূরের কথা, রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ কি নজরুলের মতো নাম করতে পারবেন? কিন্তু বিখ্যাত হওয়ার জন্যই তো কেবল কেউ লেখেন না| জ্যাক লন্ডনের লেখা কতটা উদযাপন করি আমরা? যে জ্যাক লন্ডন তাঁর গল্পগুলির মতো ‘একটু আগুন জ্বালাতে’ চেয়েছিলেন? ফলে লেখাটা বর্তমানের কাজ| অতীতমুখীও নয়, ভবিষ্যতের কথা ভেবেও নয়| অতীতমুখী বলতে, এঁর মতো, তাঁর মতো নাম-খ্যাতি-পুরস্কার পাওয়া বা না-পাওয়ার বিবেচনায়ই কেবল লেখা নয়| অথবা তেমনও নয়, আমার এই লেখা টিকে থাকবে কি না হারিয়ে যাবে, বিস্মৃত হবে—সেসব ভাবার| লেখার কাজটা অন্তত করার সময় ‘এখানে এবং এখন’(হেয়ার অ্যান্ড নাও)-ও হতে পারে ‘কেন লিখি’-র আরেক সূত্র|

মাঝে মাঝে এও মনে হয়, বহু কিছুর জন্য লিখি| উল্টো দিকে এও মনে হয়, স্রেফ লেখার জন্য লিখি| ওই হাত চুলকায় বলে| একদিন জগতের সব লোক আমার লেখা পড়বে| লিখব আমি, পড়বে পৃথিবী (রুশদির ভাগ্যে যেমন ঘটেছে)—এমন গোপন আশাও কি হানা দিয়ে যায় না—কোনো কোনো লেখককে? মান্টো বা জালালউদ্দিন রুমি বা হাফিজ—কী কারণে লিখেছিলেন? শুধু পুরস্কার বা ইনাম পাওয়ার জন্য তো নয়| তাদের লেখা আজ সারাজগতের অনূদিত হয়ে পড়া হচ্ছে| তারা তো ইংরেজি ফ্রেঞ্চ লাতিন বা গ্রিক সংস্কৃত বা পালিতে লেখেননি| যার যার ভাষায় লিখেছেন| পাঠক পড়ছেন মালায়ালাম ভাষার অসামান্য লেখক ভৈকম মুহম্মদ বশিরকে! বানু মুশতাক বা গীতাঞ্জলি শ্রী—এঁরা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন| কিন্তু সারাজগতে কজন পাঠকের কাছেইবা আদৃত-সামদৃত হলো তাদের লেখা?—এর হিসাব করে তারা লেখাকে আরো গতিশীল করবেন না ছেড়ে দেবেন—সেটা কেউ তো ঠিক করতে দিতে পারেন না| ফলে লেখার কাজটা একদম নিজের ওপর বর্তায়| আমি লিখলে, আমার লেখা হবে; ছেড়ে দিলে, লেখাও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে—এটাই লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ হিসাব| কলমে তো শুধু জং ধরে না; কাগজই কেবল শূন্য থেকে যায় না; মগজেও শূন্যতা দেখা দিলে লেখায় বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে|
তাহলে কি লেখার জন্য পড়াটা জারি রাখা আবশ্যক? মনে যাতে জং যাতে না ধরে?—এরও তেমন কোনো উত্তর নেই| লেখার রহস্য এখানেই| এই রহস্যে হানা দেওয়ার জন্যও হয়ত লিখি| নাম খ্যাতি ও বিশ্ববিশ্রুত পুরস্কার কোনো কিছুই লেখার টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয় না| আবার ভালো লেখা ও লেখক খনিজ হয়ে গেলেও, ইতিহাসের ‘টন টন মাটির নিচে’ চাপা পড়ে গেলেও, একদিন না একদিন উত্তোলিত হন| এই কথা ভেবেও ভুলে যেতে হয়| কারণ লেখাটা ‘এখানে ও এখন’-এর ব্যাপার|—এটাই মাত্রারই কাজ| যদিও দায়বদ্ধতার কথা আছে বা সুদূরের বা আগামীর মানবজাতির কাজে দেবে; আজ নয়তো কাল—কাজগুলিই থেকে যাবে, মানুষের কাজে আসবে—এমন প্রেরণা থাকা তো মন্দ কিছু নয়| সেজন্য ম্যান অব ভ্যালুজ-ও হতে হয়|—কিন্তু লেখা তো কেবল ভালো মানুষ হওয়ার জন্য নয়, ভালো লেখাটাই লেখকের প্রধান কাজ |
লেখা নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরির নাম| মূল্যবোধ ভেঙে ফের নতুন মূল্যবোধ তৈরি, ফের ভেঙে দেওয়ার নাম| লেখার পথে নিজেকে অদম্য জারি রাখার যে লড়াই, তার আনন্দ আছে বলেই হয়ত লিখি| রাইটিং ইজ অ্যা ফাইটিং—এটা ইসমাইল রিড বলেছেন বলেই নয়, নিজের ভেতরেই বেজে ওঠে বার বার| এই ঘণ্টা বাজে বলেই লেখার নামের বন্দিশালা ভেঙে কেউ পালিয়ে যায় না|
লেখা নিজেকে বন্দি রেখে নিত্যই মুক্ত করার লীলা| ফলে লড়াই বলি কি লীলা বা খেলা| লেখা, লড়াই, লীলা ও খেলা—সব উজিয়ে গিয়েই কাগজে (বা ল্যাপটপ বা পিসির স্ক্রিনে) বা মগজে, খাতায় নয়তো মাথায়—অবিরাম লেখা হতে থাকে| এই বাঁধ তো কখন খুলতে হবে, আর কখন আটকে দিতে হবে|—এটা জানাতে পারলেও ‘কেন লিখি’-র আরেকটি উত্তর পাওয়া যেতে পারে|
তবে, কেন লিখি-র একটি কারণ আমি নিশ্চিতভাবে জানি, সেটা হলো : কথা রাখার জন্য লিখি| কেউ যদি লেখা চান, যদি তাঁকে লেখা দেবো বলে কথা দিই, তাহলে সেই লেখা না-লিখে পারি না| ফলে কথা রাখার জন্যই আসলে আমার লেখার কাজটা হয়| (এখন অব্দি এই ফরমায়েশেই চলছি| কবে বের হতে পারব জানি না|) কারণ, কথা দিয়ে কথা না-রাখাকে জগতের একমাত্র পাপ বলে মনে করি, যদি আদৌ পাপ বলে কোনো কিছু থেকে থাকে|
*হামীম কামরুল হক, কথাসাহিত্যিক
‘কেন লিখি’ প্রবাহের অন্যান্য গদ্য
- কেন লিখি? || হামীম কামরুল হক - April 17, 2026
- মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান - April 12, 2026
- শামীম কবীর : দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান || শাহ মাইদুল ইসলাম - April 12, 2026

COMMENTS