পাপড়ি রহমানের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘ঊষর দিন ধূসর রাত’ (২০২৫) সমসাময়িক নাগরিক জীবনের এমন এক প্রতীকী আখ্যান, যেখানে নারীর মাতৃত্ব, শরীর, পরিবেশ, এবং সর্বোপরি প্রকৃতি ও নারীর একান্ত সংযোগের প্রসঙ্গগুলো খুব গভীরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসটি কেবল এক বা একাধিক নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বিবরণ নয়, বরং লেখক এই উপন্যাসে এক জীবনবিরোধী নগরবাস্তবতার নৈতিক ধূলিচিত্র নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসটি পরিবেশবাদী নারীবাদ (Ecofeminism) ও যত্ন নৈতিকতা (Care Ethics)-এর আলোকে পাঠ করলে এতে বেশ ক’টি রূপক, প্রতীক, দৃশ্যকল্প একটি সুশৃঙ্খল প্র্যাক্সিস (তত্ত্ব ও প্রয়োগের সচেতন সংযোগ) আকারে ধরা পড়ে।
পরিবেশবাদী নারীবাদ (Ecofeminism) মূলত এমন এক সমালোচনামূলক তাত্ত্বিক অবস্থান, যা নারী নিপীড়ন ও প্রকৃতি শোষণের মধ্যে গভীর কাঠামোগত সম্পর্ক অন্বেষণ করে। এই ধারার প্রাথমিক পরিভাষা নির্মাণ করেন ফরাশি নারীবাদী লেখক ফ্রাসোয়াজ দো বোন (১৯২০-২০০৫) এবং পরবর্তী কালে বন্দনা শিভা (১৯৫২~) ও মারিয়া মিজ (১৯৩১- ২০২৩)। তারা মোটাদাগে পিতৃতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী উন্নয়ন-ব্যবস্থাকে ‘জীবন-বিরোধী’ অর্থনীতিরূপে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে, আধুনিক শিল্পসভ্যতা প্রকৃতি ও নারীর সৃষ্টিশীল ক্ষমতাকে একইসঙ্গে পণ্যায়িত ও নিয়ন্ত্রিত করে, ফলে জীবনচক্রের সহজাত পুনরুৎপাদনশীল ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে কেয়ার এথিক্স (Care Ethics) যার বিকাশে ক্যারল গিলিগান (১৯৩৬~) ও নেল নডিংজ (১৯২৯-২০২২) যত্ন-নৈতিকতাকে বিমূর্ত নিয়মের বদলে সম্পর্ক, পারস্পরিকতা ও যত্নের চর্চার ভেতর দেখতে শেখায়। এই ধারায় নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু হলো “ধারণ করা”, “শোনা” এবং “প্রতিক্রিয়া দেওয়া”, অর্থাৎ এক সম্পর্কনির্ভর অস্তিত্ববোধ। সমসাময়িক নগর-সভ্যতায় যখন বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায়, তখন এক ধরনের “কেয়ার ক্রাইসিস” তৈরি হয় এবং যত্নের সামাজিক ও নৈতিক অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে পাপড়ি রহমানের ‘ঊষর দিন ধূসর রাত’ উপন্যাসের প্রতীকসমূহ পাঠ করলে এই উপন্যাসটি কেবল ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের আখ্যান থাকে না, বরং একটি খণ্ডিত নগর-ইকোলজির জীবনচক্র ও যত্ন-নৈতিকতার সংকটে পরিণত হয়।
নারী এবং প্রকৃতিকে লেখক যে একসূত্রে গাঁথেন সেটা তিনি উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়েই স্পষ্ট করেন। উপন্যাসের প্রধান নারীচরিত্র শেফালী বারান্দা থেকে বহু কষ্টে উঁকিঝুঁকি দিয়ে ও অনেকখানি আকাশ দেখতে না-পাওয়ায় তার মনোবেদনা প্রথমেই জানান দেয় প্রকৃতি তার জন্য শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয় বরং বেঁচে থাকার চালিকাশক্তি।
“দুই হাতের দশ আঙুল দিয়ে গ্রিলের উপরের অংশ আঁকড়ে ধরে। বানরের মতো ঝুলতে ঝুলতে মুখটা উঁচু করে তাকায় বাইরে—একটা বিলম্বী নাকি কামরাঙার পত্রশাখা কিংবা ঘনছায়া শেফালির দৃষ্টি থেকে সমস্তই আড়াল করে রেখেছে। সহসা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে সে—এই সুদীর্ঘ নগরবাস তাকে যত না বিরক্ত করেছে আজ এই মুহূর্তে আসমানের কোনাকানচিও দেখতে না পেরে ততোধিক বিরক্ত হয়ে ওঠে শেফালি। … বিলম্বী নাকি কামরাঙা কিংবা বাড়িওয়ালা নাকি ভাড়াটিয়া—আপাতত চুলায় যাক। এখন যে করেই হোক আকাশের দশা শেফালিকে একবার দেখতেই হবে।” (পৃ. ১২)
শেফালির প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের যেই আকুলতা তাতে লেখক নিঃসন্দেহে বলতে চাইছেন নারী, সর্বোপরি মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। জল না-পেলে গাছ যেমন বাঁচে না যত্ন না-পেলে মানুষও বেড়ে ওঠে না। “উবু হয়ে টবের সারিতে তাকাতেই দেখে ফ্যাকাসে শাদা হয়ে আছে মাটি। গর্ভবতী নারীর উদরের মতো সরু সরু রেখায় মাটি ফেটে চৌচির। পর্যাপ্ত জল না পেলে এসব দাগ নিশ্চিহ্ন হবার নয়।” (পৃ. ১৪)। উপন্যাসের শুরুতেই আমরা পরিবেশবাদী নারীবাদ এবং যত্ন-নৈতিকতার আন্তঃ সংযোগ দেখতে পাই।

উপন্যাসের সূচনায় আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোটিফ হলো সাকুলেন্টের অঙ্কুরোদ্গম।
“হাতে মাটির ছোট্ট একটা পাত্র—কালো মাটির অন্ধকার ভেদ করে কিছু একটি দেখার চেষ্টা করছে শেফালি। কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারছে না—সত্যি নতুন কোনো জীবন প্রস্ফুটিত হলো কি না? … শাদা শাদা সরু সুতা মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠছে। কাঁকর-বালি আর কালো মাটির ওপর আলগোছে মাথা উঁচিয়ে দেখছে এই পৃথিবীর আলো-হাওয়া! সাকুলেন্ট! … ছোট্ট মাটির পাত্রটি পরিপূর্ণ করে দিয়ে সাকুলেন্টের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। ভীত সন্ত্রস্ত নজরে নতুন শিশুরা তাকিয়ে দেখছে এই পৃথিবী বাসোপযোগী কি না।” (পৃ. ১৫)।
সুতরাং মানুষ এবং প্রকৃতির এই সংযোগকে লেখক শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে, সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছেন এই উপন্যাসে। মরুভূমির উদ্ভিদ হিসেবে সাকুলেন্ট শুষ্কতার মধ্যেও জীবন সংরক্ষণ করে—বাহ্যিক কঠোরতার ভেতরে আর্দ্রতা ধরে রাখে। খুব অল্প যত্নেই বেঁচে বর্তে থাকে। ভারতীয় পরিবেশবাদী চিন্তাবিদ বন্দনা শিভা যে লাইফ-অ্যাফার্মিং নীতির কথা বলেন সাকুলেন্ট যেন তারই ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। তবে উপন্যাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, এই সম্ভাবনা পূর্ণরূপে বিকশিত হয় না, বরং নগরবাস্তবতা বারবার সেই ইকোসিস্টেমকে বিনষ্ট করে। এতটুকু সামান্য যত্নও কোনো সম্পর্ক কিংবা সমাজ নারীকে দেয় না যেখানে সে মহীরূহ না হোক, সাকুলেনট হয়ে টিকে থাকতে পারে।
“নাওয়া খাওয়ার তেমন একটা তাগিদ নেই, সামান্য জল দিলেই এরা টিকে থাকতে পারে। অচ্ছুত করে রাখলেও এরা মরে যায় না, তীব্র প্রাণাবেগে বেঁচে থাকতে চায়— … একদা শেফালির বেঁচে থাকাও কি ছিল না ওই সদ্য-অঙ্কুরিত সাকুলেন্টের মতোই? সামান্য পরিচর্যা, অল্প খাদ্য, কিছু বস্ত্র আর স্বল্প মনোযোগ। শুধুমাত্র একটা জিনিস অঢেল ছিল—অযাচিত অপমান।” (পৃ. ১৬)। এ যেন বাংলাদেশের প্রতিটি সাধারণ নারীরই আত্মকথন।
এই উপন্যাসে ঢাকা শহরের অতি পরিচিত অবিরাম শব্দ ও যানজট অবধারিতভাবেই জায়গা করে নিয়েছে যদিও লেখক এগুলোকে কেবল পটভূমি হিসেবেই বর্ণনা করেননি বরং তা হয়ে উঠেছে এক নৈতিক বধিরতার রূপক। লেখক শহরের শব্দকে কুড়া পাখির কর্কশ ডাকের সঙ্গে তুলনা করেছেন, প্রকৃতির সুর এখানে সংগীত নয়, বরং বিকৃত অনুরণন।
“বহুদূর থেকে কোন শব্দ ভেসে এসে ঘুমের ভেতর ঢুকে পড়েছে। এপাশ ওপাশ করে মুমু তাড়াতে চেয়েছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ, কিন্তু পেরে ওঠে নাই। মাথার নিচ থেকে শিমুল তুলার বালিশটা টেনে এনে কানের উপর চেপে ধরেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নাই। উপায়ান্তরহীন ওই শব্দকে সঙ্গী করেই শুয়ে থাকতে হচ্ছে—চিৎপাত পড়ে থাকা আরশোলার মতো।” (পৃ. ২৪)।
যত্ন-নৈতিকতার দৃষ্টিতে নৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে মনোযোগ, শ্রবণ ও পারস্পরিক সাড়া-প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু যখন পরিবেশই শব্দে পরিপূর্ণ, তখন ‘শোনা’ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই শ্রবণহীনতা মাতৃত্ব ও মানবিকতার সংকটকে ত্বরান্বিত করে। মুমু ও সজল যথেষ্ট ঘনিষ্ট হবার পরও কেউ কারো অন্তর্গত আর্তনাদ শুনতে পায় না। উপরন্তু প্রায় সব ক’টি চরিত্রও একরকম প্রশ্ন তোলে তারা কি প্রকৃতই তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়? তাহলে সজল কেন প্রতারিত করে মুমুকে কিংবা কেন আত্মহত্যা করতে হয় সন্তান সহ পারুলকে? কেনই বা এক ছাদের তলায় বাস করে শেফালি আর তুহিন, মাহিন যোজন যোজন দূর? এই দূষিত নগরসভ্যতায় সমগ্র জীবনাচরণ যেন এক বন্ধ্যা সময়ের কোলাহল।
পাখিরা কি গান গায়? সেকথা তারাই জানে।
যেমন তুমিই জানো, এই তুমি সেই তুমি কি না।
যেমন পৃথিবী জানে, সে-ই একমাত্র ভূমিহীনা।
এখনো সন্ধ্যাটি নামে বন্ধ্যা নারীদের প্রার্থনায়,
পাপে পূর্ণ দুটি মন যখন কিছুটা পুণ্য চায়!
ভেবে ভেবে ভালো লাগে, ঘোচে বেঁচে থাকার আতঙ্ক।
তুমি যে পথেই চলে যাও— শূন্যফল সরলাঙ্ক।
(পৃ. ২৮)
একইভাবে প্রকৃতির ভাষাও উপেক্ষা করে নাগরিক ঊনমানুষ। এই উপন্যাস যেন বারবার সেই কথাই বলে : প্রকৃতি ভালো না-থাকলে ভালো থাকে না নারী, মানবিক সম্পর্কের বুনন, সর্বোপরি সামগ্রিক ইকোসিস্টেম! “মাটি কাঁদে—কিন্তু মানুষ সে-কান্না শুনতে পায় না । শুনতে পায় না, দেখতেও পায় না। দেহের উপর এরকম পাথর চেপে থাকলে না কেঁদে উপায় কি?” (পৃ. ৮৩)।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য রূপক হলো গোলাপী রঙের বাড়ি। গোলাপী রং যা সমাজ বেঁধে দিয়েছে নারীর জন্য! নারী তো প্রকৃতির মতোই বহু রঙে বর্ণিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু নারী নয় নারীর একান্ত আশ্রয় ঘরকেও বিনির্মাণ করতে চায় একটি মাত্র রঙে, ভীষণ উৎকট সেই উজ্জ্বল একমুখী রঙের বহুমুখী প্রলেপ, যেই রঙের পরতে পরতে মিশে থাকে যন্ত্রণা, নানামুখী পারিবারিক সহিংসতা। পারুল শেষপর্যন্ত তার ফুলের মতো কোমল শিশুসন্তান সহ আত্মহত্যা করে, সবচেয়ে নিরাপদ গৃহ আশ্রয়ের বদলে পরিণত হয় মৃত্যু-পরিসরে। একইভাবে মালিহা বেগম ও বকুল মা-মেয়ে হয়েও সম্পর্কের টানাপোড়েনে হারিয়ে ফেলে নিজেদের, খুঁজে পায় না তাদের নিজস্ব ঠিকানা।
“মালিহা খাতুনের নিজস্ব বনভূমিটি আদতে কোথায়? কোন পথ ধরে হেঁটে এসে আম্মা হারিয়ে ফেলেছে ফিরে যাওয়ার পথটি?” (পৃ. ৭০)। কিংবা “কি হইব বইলতইল গিয়া? কার কাছে যাইমু?” ঢাকায় চলে আসার পর বকুলেরও এমনটি মনে হয়েছে, “কি হইব কাউন্দিয়া গিয়া? কার কাছে যাইমু?” (পৃ. ৭১)।
একইভাবে বাথরুমে আয়না ভাঙার দৃশ্য, মাতৃত্ব-পরবর্তী শরীরের প্রতি ঘৃণা ও সামাজিক সৌন্দর্য-মানদণ্ডের বিচারে নারীরা নিজেরা নিজেদের বিক্ষত করার ভয়ঙ্কর মনোজাগতিক গঠনে আটকে পড়ে। উপনিবেশবাদের মতো শুধু সমাজই নারীকে নিপীড়ন করে না, সমাজের নানামুখী নিয়ম/প্রথা আত্মস্থ করে নারী নিজেই নিজেকে ধ্বংস করার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আয়না, বরফ, সম্পর্ক—সবকিছুই বারবার ভেঙে যায়। বিশেষ করে স্ফটিক-স্বচ্ছ বরফের কিউব রঙিন মোজাইক মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার পুনরাবৃত্ত দৃশ্যটি নিষ্পাপ স্বচ্ছতার খণ্ডিত হওয়ার রূপক। বরফ কখনো গলে প্রবাহে রূপ নেয় না, অর্থাৎ জীবনচক্র শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাবনা ভেঙে যায়। মুমুর ভ্রুণহত্যাও সেই একসুতোয় গাঁথা।
“কাচের জারের ভিতর স্প্রাউট দেখতে দেখতে বিষন্ন হয়ে উঠেছিল মুমু। … ইচ্ছে করলে মুমু এখন এদের মাটিতে বুনে দিয়ে শস্যে পরিণত করতে পারে। … একেবারে অচেনা মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে নিজের তলপেটে হাত রাখে সে। আহ! উষ্ণ রক্তস্রোত অথচ অন্ধকারে পরিপূর্ণ এই গর্ভ। এখন এখানে অঙ্কুরিত হয়ে আছে মনুষ্যজীবন! … সেই মেলে দেয়া জীবন মুমুকে উপড়ে ফেলতে হবে। উপড়ে ফেলা ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা নাই।” (পৃ. ১১৭)।
কিংবা সন্তান জন্মদানের পর নারী কি পায় পরিপূর্ণ যত্ন কিংবা বিশ্রাম? বরং নিজের ঘাম-রক্ত-মাংস সব নিংড়ে দিয়ে আগলাতে চায় সন্তানকে।

“ফুল ফুটে ঝরে যাওয়ার পর বেশিরভাগ বৃক্ষই কি শূন্য হয়ে যায় না? নারী নামক সুদৃশ্য বৃক্ষটি আরো নাজুক। গর্ভধারণ করার পর সে তো শূন্যই হয়। শূন্য হতে হতে মাটি হয়। … গর্ভধারণে ভয়াবহ ধস নামে নারীর দেহে। সন্তান জন্মদানের পর ঝুরঝুরে হয়ে ওঠে সমস্ত শরীর।” (পৃ. ৯৭)। যত্নহীন ক্লিষ্ট নারী প্রকৃতির পুনুরুৎপাদন বাধাগ্রস্থ করে এবং ইকোসিস্টেমের জন্য অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে।
সবুজের উপস্থিতি উপন্যাসে ঘন, কিন্তু লেখক সতর্ক করেন, সবুজ অতিরিক্ত গাঢ় হলে কালো হয়ে যায়। উর্বরতা ও অন্ধকারের এই ঘনিষ্ঠতা ভারসাম্যহীন বিকাশের ইঙ্গিত দেয়। কামরাঙা, বিলম্বি, নিমলেবুর তিক্ত স্বাদ প্রকৃতির উপস্থিতি সত্ত্বেও জীবনের অম্ল অভিজ্ঞতাকেই সামনে আনে। এসব যেন সে-কথাই বলতে চায় প্রকৃতি অনুপস্থিত নয়, বরং বিকৃত ভারসাম্যে বিদ্যমান। বকুলের বয়ানে মালিহা বেগমের জীবনালেখ্য যেন সেই ধারণাই আরো স্পষ্ট করে। “ওই একটা বাড়ির তিনখানা ঘর, একটা চাতাল, স্বামী আর সন্তান—এসব নিয়ে জীবনকে আমচুর বানিয়ে ফেলল। যার ভিতর তাজা ফলের সৌন্দর্য-সুঘ্রাণ কিছুই অবশিষ্ট নাই। যেটুকু আছে, সবটুকুই অম্ল স্বাদে পরিপূর্ণ! রসকষহীন শুকনো আমের কালো-কুচকুচে বিদঘুটে চেহারা আর অম্ল স্বাদের জীবন আম্মা মালিহা খাতুনের।” (পৃ. ৭২)।
মাটির তৈজসপত্র বনাম প্লাস্টিক ও সিলিকন, এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রূপক। মাটির বাসন ভঙ্গুর, কিন্তু ভেঙে গেলে মাটিতেই ফিরে যায়। বিপরীতে প্লাস্টিক ও সিলিকন ইকোসিস্টেম বহির্ভূত, অমর কিন্তু সম্পর্কহীন। সিলিকন ডিল্ডোর উপস্থিতি এবং তা কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলার দৃশ্য বাজার-নির্ভর অন্তরঙ্গতার প্রত্যাখ্যান হিসেবে লেখক দেখাতে চেয়েছেন। এর মাধ্যমে নারী স্বাধীনতার একটি পণ্যায়িত সংস্করণ উপস্থাপিত হলেও, তা টেকসই সম্পর্ক-নৈতিকতার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। লেখক ঠিক নারীর স্বাধীনতার কিংবা নারীবাদের বিকল্পকে নির্দেশ করেননি বরং পুঁজিবাদী সভ্যতার দ্রুত প্রতিস্থাপন-সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন।
উপন্যাসের আশ্চর্য রূপকটি হলো মাটির টেপা পুতুল—যার পা নেই, হাত নেই, কেবল শরীরের ভারে দাঁড়িয়ে থাকে, এই প্রতীক উপন্যাসের দেহ-রাজনীতিকে চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করে। এটি জৈব সত্তা হলেও গতিশীল নয়, মাটির পুতুলের উপস্থিতি থাকলেও ক্ষমতা নেই। মাতৃত্ব, স্ত্রীত্ব এখানে শরীরী, কিন্তু কার্যকর নয়। যত্ন-নৈতিকতার ভাষায় যত্নচর্চার জন্য পারস্পরিকতা ও গতিশীলতা প্রয়োজন, অঙ্গহীন পুতুল সেই সম্ভাবনার ঘাটতিকে দৃশ্যমান করে।
“নরম এঁটেল মাটি দিয়ে বানানো পুতলা—ডানার ধার ঘেঁষে দুইটা হাত নির্মমভাবে কেটে নেয়া হয়েছে। … কেটে নেয়া হাতদুটি কখনো তিরের ফলার মতো সরু হয়েই থেমে গিয়েছে। ফুরিয়ে যাওয়া হাত নিয়ে হাজার বার ইচ্ছে হলেও কোনো কিছুকেই আর স্পর্শ করা যায় না। … দিব্যি দাঁড়িয়ে থাকা পুতুল, কিন্তু যার কোনো ভাষা নাই। আর দেহের নিম্নাংশ থেকে দুইটা পা-ই নাই। পা-হীন পুতলা দেহের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৌখিন কুমোর কাঠি দিয়ে সরু সরু দাগ এঁকে দিয়েছে—যাতে শাড়ি পরার কায়দাটা অনুমান করা যায়। … গজমতিহারের নিকটেই পীনোন্নত বক্ষ। … কতযুগ ধরে টেপা পুতুলের মতো অনড় দাঁড়িয়ে রয়েছে শেফালি?” (পৃ. ৯৫-৯৬)। মৃত শিল্প আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অস্তিত্ব; কিন্তু আমাদের হাজার বছরের শিল্প নারীকে ঠিক কি চোখে দেখে, মাটির টেপা পুতুল তার এক ছোট্ট অথচ আশ্চর্য রূপক! এখন ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় আমি নিজে মাটির টেপা পুতুল বানিয়ে রোদে শুকিয়ে কত খেলেছি আমার মেয়েবেলায়। কখনো নিজেকে প্রশ্ন করিনি আমি আসলে কার তৈরি করা নিয়মে খেলছি!

সমগ্র উপন্যাসে সর্বোপরি একটি ভঙ্গুরতার মোটিফ কাজ করে, বরফ ভাঙে, আয়না ভাঙে, সম্পর্ক ভাঙে, এমনকি সবুজও কালো রং ধারণ করে কিন্তু পুনর্গঠন ঘটে না। এই খণ্ডিত নগর-ইকোলজিতে জীবনচক্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। বন্দনা শিভা যে ‘ডেথ ইকোনমি’-র কথা বলেন, তা এই উপন্যাসে পরিপূর্ণভাবে উঠে এসেছে, যেখানে উৎপাদন আছে কিন্তু পুনর্জন্ম নেই—উপন্যাসের নাগরিক পরিসর তারই এক নান্দনিক প্রতিরূপ।
ব্যক্তিগতভাবে উপন্যাসের শিশু ও ভ্রূণ হত্যার চিত্রায়ন অস্বস্তিকর। তবু বিশ্লেষণধর্মী পাঠে দেখা যায়, এই অন্ধকার নির্মাণ একটি সতর্কবার্তা—যত্নহীন, সম্পর্কহীন, ভারসাম্যহীন সমাজে মাতৃত্বও জীবন-সংরক্ষণমূলক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। সাকুলেন্টের ক্ষুদ্র অঙ্কুরোদ্গম সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ: শুষ্কতার মধ্যেও জীবন সম্ভাবনাময়, কিন্তু তা টিকে থাকতে হলে পরিবেশগত ও নৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠন অপরিহার্য।
এই উপন্যাস আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে—প্রকৃতি, শরীর ও সম্পর্ক যদি খণ্ডিত হয়, তবে মানবিক ভবিষ্যৎ কোন ভিত্তিতে দাঁড়াবে? আধুনিক পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক নগরসভ্যতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? নগর নিসন্দেহে গ্রামীণ সভ্যতার পরিবর্তন ঘটায় কিন্তু গ্রামীণ সবকিছুই কি পশ্চাৎপদ? ঊষর দিন ও ধূসর রাতের এই নগরে উত্তর স্পষ্ট নয়, কিন্তু সংকেত স্পষ্ট—জীবনচক্র পুনরুদ্ধার না হলে ভাঙনই একমাত্র পরিণতি।
“রুক্ষ্ম-শুষ্ক চটকদার এক নগর । দিবারাত্র খুঁজেও এইখানে প্রাণের উত্তাপ পাওয়া বড় কঠিন। দ্রুতগামী অশ্বের মতো দৌড়ে চলেছে রাজধানী ঢাকা। দৌড়ে চলেছে ঢাকা শহরের তাবৎ মানুষ। প্রায় সকলেই দৌড়াচ্ছে চটকের পেছনে। যান্ত্রিক হতে হতে থেতলে ফেলছে নিজেদের হৃৎপিণ্ড।” (পৃ. ৮২)।
অভিবাদন পাপড়ি রহমান, আরেকটি সুন্দর সৃষ্টি উপহার দেবার জন্য!
ঊষর দিন ধূসর রাত ।। লেখক : পাপড়ি রহমান ।। প্রকাশকাল : ২০২৫ ।। প্রকাশক : বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ঢাকা ।। পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৩২
উম্মে কুলসুম। গবেষক ও শিক্ষক। দুই যুগেরও বেশি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের বিশ্ববিদ্যায়তনিক শিক্ষক হিসেবে কাজ করে আসছেন ঢাকা ও টরন্টোতে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে ল্যাঙ্গুয়েজ ও লিটেরেসি এডুকেশনে পিএইচডি-গবেষক হিসাবে কাজ করছেন। সংযোগ : ummeratna500@gmail.com
গানপারে এই লেখকের অন্যান্য রচনা
গানপারে পাপড়ি রহমান
- ঊষর নগর, পরিচর্যাহীন মাতৃত্ব ও জীবনচক্রের সংকট : পাপড়ি রহমানের উপন্যাস : পরিবেশবাদী নারীবাদী পাঠ || উম্মে কুলসুম - April 19, 2026
- কেন লিখি? || হামীম কামরুল হক - April 17, 2026
- মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান - April 12, 2026

COMMENTS