কবি ও কালপুরুষের আশ্রমে || চরু হক

কবি ও কালপুরুষের আশ্রমে || চরু হক

নূরুল হক ষাটের দশকের বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম কবি, এক লাবণ্য-উজ্জ্বল নাম। মানুষের ঘাম ও রক্তরেখায়, কুড়ি ও পাতায় বিপুল বিস্ময় আর আতুর মর্মবেদনায় অঙ্কিত এক নাম, যা জ্যোৎস্নালোকের মতো ভেসে আসে আর অপার্থিব আলো জ্বালিয়ে দেয় অন্তরের গহীনতম কন্দরে। ১৯৪৪ সালের ২৫ নভেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা জেলার নদী, হাওড় আর আবিস্তীর্ণ সবুজ নীলিমা অধ্যুষিত বালালী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ভাটি এলাকার ছোট্ট একটি গ্রাম। বছরের অনেকটা সময়ই থাকে ঐন্দ্রজালিক নীল জলরাশিতে আকীর্ণ। আষাঢ় মাসের ভাসা পানির দেশ। ছোট ছোট ঘর, ছায়া দেয়া বৃক্ষরাজি যেন মায়ের মমতার মতোই চারদিক থেকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। মানুষগুলো বড় সরল। আহারের যোগান নেই কিন্তু কণ্ঠে গান। এ-রকম একটি গ্রামে জন্মলাভ করেন এবং প্রকৃতির পৌরহিত্যে বেড়ে ওঠেন কবি নূরুল হক। একেবারে প্রকৃতিমাতার কোলে, রোদ আলো মায়া আর রূপ রস গন্ধের এক অভাবিত সুষমায় জারিত হয়ে এ-বিশ্বচরাচরে তিনি ফেলেন তার প্রথম পদক্ষেপ —

নিজের ভেতর নেমে মাটি খুঁড়লে
স্তরের পর স্তর দেখা যায়।
স্তরের ভেতর গর্ত
গর্ত থেকে জল উঠে আসে
আমি আশ্চর্য হয়ে তাকাই
সে-জল আমার গ্রামের।

এভাবেই যাত্রা হলো শুরু। এক বিপুল বিস্তৃত প্রকৃতির মধ্যে জন্মলাভ করে ও এর সমৃদ্ধ নির্যাস আস্বাদন করে কবি নূরুল হক ক্রমশ হয়ে ওঠেন প্রকৃতির একনিষ্ঠ পাঠক এবং এ মহাবিশ্ব হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রথম এবং প্রধানতম শিক্ষক। অতঃপর অনুরাগী শিক্ষার্থীর মতো তিনি জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে পাঠ করে যেতে থাকেন প্রকৃতির মায়াবী অন্তর্লোক —

গাছগাছালি দেখলেই আমি
কেমন
বিমূঢ় হয়ে যাই,
কারণ এগুলোই আমার স্মৃতিকথা, রাতের চাঁদ।
ফুলের ভাঁজের কাছে এলে
আমি
আজও আটকা পড়ে যাই
কারণ ওই ভাঁজই আমার মায়ের কোল
ছেঁড়া কাঁথা।
[রোদে দোলায়মান পঙক্তিমালা]

গাছগাছালি আর রাতের চাঁদ কেমন যেন পথ আটকে দেয় কবির, অবলীলায়। আর ফুলের ভাঁজ, যেন তার দুঃখিনী মায়ের কোল।

নূরুল হক ষাটের দশকের কবি হলেও মূলত আশির দশকে এসে তাঁর লেখালেখির কিয়দংশ পাঠককুলের সামনে এসে পড়ে তাঁর বিপুল রত্মরাশির সম্ভার নিয়ে। ‘পাদটীকা’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন,

জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য,
যা দেখে মানুষ
বাড়ি ফেরার কথা
ভুলে যায়।

জীবন যেন এক স্বপ্নমাত্র এবং তার স্বপদ্রষ্টা কবি নিজে। কবি ডুব দেন নিজের ভেতরে এবং এক নিমগ্ন নীরবতায় দরদি কণ্ঠে পঙক্তির পর পঙক্তি সাজিয়ে একের পর এক লিখে যেতে থাকেন স্মৃতি আর স্বপ্ন থেকে কুড়িয়ে আনা গহন অনুভূতির কথা, লিখে যেতে থাকেন জীবনের কথা, তার আশ্চর্য সৌন্দর্যের পরিপত্র, পরতে পরতে ছড়িয়ে দিয়ে মিহি আর মায়াবী শব্দের পেলবতা।

কবি নূরুল হক ছিলেন পেশায় একজন শিক্ষক। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে প্রথম স্থান লাভ করে কৃতিত্বের সাথে স্মাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এবং প্রিয় শিক্ষক জ্ঞানতাপস যতীন সরকারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বেছে নেন শিক্ষকতাকে। অতঃপর দীর্ঘ সময় দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে পাঠদান করে, অসংখ্য  শিক্ষানুরাগী ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সাহিত্য ও জীবনরস আস্বাদনের পিপাসার সলতেটাকে উসকে দিয়ে ২০০৪ সালে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা থেকে অবসর তিনি নিয়েছেন বটে, কিন্তু জীবনের প্রকৃত অর্থ উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা থেকে বিচ্যুত হননি এককণাও। প্রকৃতি প্রতিনিয়ত বাঙ্ময়। পাতার মর্মরধ্বনিতে অজস্র কথামালা রচিত হতে থাকে, প্রজাপতির পাখনায় রোদ এসে কথা বলে, আদিবাসী বৃদ্ধা যখন টংঘরে বসে তার কাঁপা কাঁপা হাতে চা খায় তখন তার চোখের পাশে, মুখে অগুনতি বলিরেখা কথা বলে, স্মৃতিতে মোড়া গ্রাম, গ্রামের মানুষ, পানায় ঢাকা পুকুরে টুপ টুপ বৃষ্টির ফোঁটা আর কদমের পাতা খসে পড়ার শব্দ, হাওড় জনপদ আর দেশমার্তৃকা — সবই তো কেমন সবাক আর হৃৎপিণ্ডময়। আর তাই জীবনের রহস্যকোরক উন্মোচিত করার যে ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষাকে অতি শৈশবে কবি করে নিয়েছিলেন আপন কণ্ঠহার, সেই হার তাঁর সমগ্র জীবনেও আর খোলেননি কোনোদিন। কুসুমে কুসুমে শোভিত হয়ে নূরুল হকের যাত্রা হয়ে ওঠে কেবল জগৎকে পাঠ করার, জগতের সুধাধারাকে নিঙড়ে নিঙড়ে পান করার। আর তাই পড়ে-থাকা একটি ডালও অনুভূতিশীল কবিহৃদয়ে হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত সৈনিক —

যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত সৈনিকের মতো
পড়ে আছে
একটি ডাল।
উবুড় হয়ে
মনে হচ্ছে ফুসফুস এখনো নড়ছে।
[একটি ডাল]

কিংবা ‘দুঃখ’ কবিতায় —

দুঃখ
মানুষের ঘরে
শুয়ে থাকে বিছানায়
সন্তানের মতো।
[দুঃখ]

এক গভীর সংবেদনশীল মন নিয়ে কবি নূরুল হক প্রতি মুহূর্তে নিজেকে একাত্ম করতে থাকেন, জগতের এক অমর প্রবাহের সাথে, যেখানে সামান্য কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে এ-মহাবিশ্ব নক্ষত্রমণ্ডলী অদৃশ্য এক নিবিড় সূত্রে গ্রথিত। সেখানে কেউ কারো থেকে ভিন্ন নয়। সকলে একসূত্রে গাঁথা। তাই সহজেই ‘ধ্যান’ কবিতায় কবিহৃদয় হয়ে ওঠে এ-বিশ্বের সমস্ত সত্তার নির্ভরতার পরম আশ্রয় —

তোমার জীবনই যেন একটি ধ্যান,
পদ্মাসনে স্থাপিত এক নিঝুম ভঙ্গি।
দুরান্তের কোনো ঝরাপাতা
একাকী জেগে আছো
নির্জনে
কোন্ অচেনা খেলায়,
যেন ছায়া দিয়ে
ভরা বাতাস দিয়ে
আলোয় প্রকাশ করতে চাচ্ছে
আগাম কোনো বীজকে,
যাতে হৃদয় তোমার
ক্রমে হয়ে ওঠে
প্রাণীজগতের
জিরোবার,
জিরোবার
একটুখানি ঠাঁই।

আবার ‘আমার সংসারের হালচাল’ কবিতায় যখন কবির মেহমান হয়ে আসে দুটি পাখি এবং একটি পিঁপড়ে তখন আমরা মোটেও ভড়কে যাই না। অবাক হই না যখন গভীর দরদ নিয়ে, মরমি কণ্ঠে একটি পথহারা কাকের দিকে তাকিয়ে কবি উচ্চারণ করেন,

এসেছো আমার কাছে, কাক,
খাবারের খোঁজে,
বন থেকে বনে বনে
ওড়াওড়ি করে
ক্লান্ত হয়ে,
এইখানে এসে
ডাকছো অধীর হয়ে,
জানালার শিকে,
জানি তো তোমার কেউ নেই।
[‘জানি তো তোমার কেউ নেই’ / মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা]

সাহিত্য হলো জীবনের প্রতিচ্ছবি, শিল্পের এক অনন্য মাধ্যম আর কবিতা হলো তার নির্যাস। সামান্য একটু ঘুরিয়ে বলা যায় কবিতা হলো আত্মার নির্যাস। দুঃখের অতল জলে ভিজিয়ে যে অলঙ্কার তৈরি করা হয়, তা-ই তো কবিতা। সেই অলঙ্কার নীলকণ্ঠের মতো কণ্ঠে ধারণ করেন যিনি তিনিই যোগ্য, কাব্যের বরপুত্র উপাধি ধারণের। আর সেই অলঙ্কার থেকে যে অমরলোকের দ্যুতি নির্গত হয় তার মধ্যে ঝিলমিল করতে থাকে ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’। তাই কবির চোখ এড়ায় না কিছুতেই ‘সত্য, সুন্দর আর সরল জীবনের আকিকা’, চুর চুর হয়ে ভেঙে-পড়া কিংবা ছোট্ট পাখির নীলিমার পারাপারে ডানা মেলে দেয়া —

কে যাচ্ছে উড়ে
এক টুকরো মিষ্টি ভাষা
ঠোঁটে নিয়ে?
নীলিমার গভীরতা মেপে?
যেতে যেতে ওপরে তাকায়,
আরো কত স্বর্গবাণী
ধরতে চায় নিথর নিঃশ্বাসে।
এত যে মিষ্টান্নভর্তি এ নীলিমা
কে জানত আগে?
শান্তি, শান্তি
ওম শান্তি।
[শান্তি শান্তি ওম]

মগ্নচৈতন্যের কবি নূরুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ প্রকাশিত হয় ‘নিরন্তর’ প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালের অমর একুশে বইমেলায়। এর আগে কবিতা ও প্রবন্ধ উত্তরআকাশ, সন্ধানী, নিরন্তর, খেয়া  ও আরো নানা সাহিত্য সাময়িকীতে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হতে থাকলেও গ্রন্থাকারে এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশনা। তখন কবির বয়স তেষট্টি বছর। নম্র লাজুক স্বভাবের এই মানুষটি ছিলেন আত্মপ্রচারে নিতান্তই কুণ্ঠিত। তা সত্ত্বেও গ্রন্থটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে একটা ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। নির্জন এই কাব্যসাধকের ভাণ্ডার এতটাই হীরকদ্যুতিতে পূর্ণ যে তা পাঠককুলের চোখ এড়িয়ে যাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে । কেননা এই কবির সৃজনসম্ভার উদ্ভাসিত আপন অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধিতে; কতগুলো ভারী ভারী শব্দের কারসাজি আর চকমকানিতে নয়। তাই প্রয়াত কবি ও সাংবাদিক শান্তিময় বিশ্বাস গ্রন্থটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “আমি গীতাঞ্জলি পাঠ করে যে-আনন্দ পেয়েছিলাম, নূরুল হকের কবিতা পড়েও সে-আনন্দ পেয়েছি”। অবশ্য সাহিত্যের জগতে প্রকৃত অর্থে একজনের সাথে অন্যজনের কোনো তুলনা হয় না। প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কবি নূরুল হককে নিয়ে যা উচ্চারণ করেছিলেন, তার কিছু অংশ তুলে ধরছি —

“নূরুল হকের কবিতার সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয় এবং স্বীকার করছি, অজানা ও নতুন কবির সঙ্গে পরিচয়ের আগ্রহ তেমন একটা করি না আজকাল। কবিতা যে মনোযোগ দাবী করে, সেই মনোযোগের স্রোতে পড়েছে ভাটির টান। নূরুল হক ও তাঁর কাব্য ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ আমার সেই অভ্যাসের বন্ধ দরজায় আঘাত করেছে। আমি দেখছি, কবি হিসাবে তিনি আমার কাছে এতদিন অপরিচিত হলেও তিনি নতুন নন, বয়সের হিসাবে ও কবিতাচর্চার হিসাবে। একটা মহলে তিনি আগে থেকেই পরিচিত ও সমাদৃত, সেটাও জানার সুযোগ করে দিল তাঁর এই কাব্য। প্রথম পাঠে এই কবিতাগুলো আমাকে বারবার ফিরে পড়ার লোভ দেখিয়েছে।” আরো লিখেছেন, “এই কবির আলোচনায় উদ্ধৃতির লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন। প্রায় প্রতিটি কবিতার তন্বীদেহে এত লাবণ্য বাঁধা আছে, কথার অতীত এত অকথিত ভাবনা আছে, শব্দের স্পষ্টতার সঙ্গে এত রহস্য জড়িয়ে আছে, যে-আমি এই কবিতার পাঠক, কতটা বুঝলাম আর কতটা বুঝলাম না, সে-হিসেব মুলতবী রাখতে বাধ্য হই, ওই লাবণ্যের দিকে চোখ ফেরাই।” (৯ এপ্রিল ২০০৭,  জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ কাব্যগ্রন্থের পাঠ-উৎসবে মূল আলোচকের ভাষণের অংশবিশেষ)

এরই স্বীকৃতি মেলে যখন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক আলো-জ্বলা শিক্ষক অধ্যাপক যতীন সরকার তাঁরই প্রিয় ছাত্রের খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরষ্কার (বাংলা ১৪১৯) প্রাপ্তিতে আবেগবিহ্বল হয়ে উচ্চারণ করেন, “আমি যখন মাষ্টার হয়ে গেলাম তখন নূরুল হক আমার ছাত্র ছিল। কিন্তু আমি কখনো তাকে ছাত্র হিসাবে দেখি নাই। আমি দেখতাম এমন একজন মানুষ আমার সামনে আছে তার সঙ্গে কথা বলছি, আমার চেয়ে জ্ঞানী একজন মানুষের সঙ্গে আমি কথা বলছি।” এবং “সর্বত্র জয়মিচ্ছেৎ পুত্রাৎ শিষ্যাৎ পরাজয়েৎ।” এই সংস্কৃত বাক্যের অনুসরণ করে তিনি বলতে থাকেন “আমি আজ বিজয়ী। আমার শিষ্যের হাতে আমি পরাজিত। এর চেয়ে বড় আর কিছু নাই।” মূলত এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এই মহান জ্ঞানসাধকের অবর্ণনীয় ঔদার্য আর স্বীয় ছাত্রের প্রতি অন্ধ ভালোবাসার নিদর্শন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথম কাব্য প্রকাশিত হবার পর স্বল্পবিরতিতে বের হতে থাকে একের পর এক কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। ২০১০-এ বিভাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’। ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে নান্দনিক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা’। নূরুল হক কেবল একজন কবিই নন, তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও। ১৯৭১ সালে একটি বামপন্থী গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অনন্য অবদান রাখেন তিনি। এই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিরই খানিকটা ঝলক পাঠক দেখতে পাবেন এই কাব্যগ্রন্থটিতে। বিশেষত এই কাব্যগ্রন্থের মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প, এই মৃত্যু  ইত্যাদি কবিতাগুলো তাঁর সৃষ্টির জ্বলন্ত স্বাক্ষর হয়ে আছে। ‘খেয়া’ প্রকাশনী থেকে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয় ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’ এবং ‘এ জীবন খসড়া জীবন’। ২০১৬ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হলো কবি শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাব্য নিয়ে আলোচনাগ্রন্থ ‘শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়, কবিতার দিকে একজন।’ প্রকাশক ‘বেহুলা বাংলা’ প্রকাশনী। সর্বশেষ ২০২০ সালে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলো কবি নূরুল হকের ‘কবিতাসমগ্র’ তাঁর কবিতার স্বর্ণপাত্র নিয়ে।

সুকোমল এক মিস্টিক সুর ছড়িয়ে দিয়ে কবি নূরুল হক তাঁর কবিতার পঙক্তিগুলো গেঁথে যান একের পর এক। একেকটা কবিতা যেন একেকটা শান্তির ধ্যান। কিন্তু তাই বলে পারিপার্শ্বিক বাস্তব জগতকে অস্বীকার করেননি কবি। যাপিত জীবনের আঘাত, অর্জন ও প্রজ্ঞানগুলো ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি কবিতার শোণিতধারায় প্রতিনিয়ত, শিরায় শিরায়। উঠে এসেছে জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সময়ের মর্মস্পর্শী দাবি ও আর্তি। উঠে এসেছে একটা করুণ জনপদের গভীরে লুকিয়ে থাকা হাহাকার। আর তাই কবিহৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হতে থাকে যখন সময় ও রাজনীতির তপ্ত অগ্নিশিখা পুড়ে ফেলে খুকুমণিদের স্বপ্নাতুর চোখ, কেড়ে নেয় কিশোরের কব্জি অথবা বাস হেলপারকে পাঠিয়ে দেয় ভস্মীভূত অনন্ত ঘুমে। একজন সংবেদনশীল কবিহৃদয় কি এতকিছু সইতে পারে? তাই ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’ কাব্যগ্রন্থে তাঁকে ঢেকে ফেলতে হয় চোখ, “কালো কালো মেঘের পালক দিয়ে।” জীবনের এই সংলগ্নতাই, বিশ্বলোককে ধারণ করাই তাই কবিতার চরণে চরণে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং কবি তাঁর বেদনার্ত হৃদয় মেলে ধরেন আমাদের সামনে তাঁর ‘ছায়াপাথর’ কবিতায় —

দেশটা এখন আমার কাছে ভীষণ ভারী লাগে।

এর জলধারা ভারী, গাছগাছালি ভারী
পালতোলা নৌকো ভারী, ঘরদরজাও ভারী
আর ভারী পাহাড়ের বুক।
আমি এ ভার বইতে পারি না।

যদি মাঠের দিকে যাও, দেখবে নীলছায়া ভারী।

পায়ের দাগ ভারী, দাঁড়-বাওয়া ভারী
চাষিমজুর ভারী, মাটি-ভঙ্গি ভারী
আর ভারী সমুদ্রের তল।
আমি এ ভার সইতে পারি না।

যদি ঘরের মধ্যে থাকো, তবে বউ-শিশু ভারী।

স্বপ্ন-বোঝা ভারী, হারিয়ে-আসা ভারী
সুখ-দুঃখ ভারী, জীবন-মৃত্যু ভারী
আর ভারী মা-জননীর নাম।
আমি এ ভার টানতে পারি না।

আবার মিস্টিক সুরটি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে যখন কবি অনুচ্চ সুরে উচ্চারণ করে যেতে থাকেন হৃৎকলবের পঙক্তিগুলি। দু-একটি উদাহরণ :

১.
বাদল দিনের ভার
কে সইতে পারে?
কে সইতে পারে এই
মাথা-নিচু-করে-থাকা বস্তুগুলি
দিগন্তের ঝোলানো আলনায়?
আমি বুঝতে পারি না
কে তুমি একজন
বৎসর বৎসর ধরে অগম্য সময়ের
সুদূর ওপার থেকে কাঁদো?
কাঁদো অরণ্যের ডাল ধরে ধরে?
[মেঘ]

২.
জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে
যে বস্তু ডুবে যায়
সে কি আমি?
[আমি]

৩.
শিউলিথোকার গন্ধের ভেতরস্থানে
যেতে চেয়ে আমি
একদিন পথ হারিয়েছিলাম
নিজের মধ্যে।
[একদিন]

৪.
মরুভূমিতে
একফোঁটা বৃষ্টির মতন
এই কবিতা,
আমার জীবন
ঝিলিমিলি বাতাসের মালা।
[বাতাসের মালা]

৫.
একদিন এই নিশি-আঁকা পৃথিবীতে
চাঁদ উঠবে,
তাই গলাজলে
দাঁড়িয়ে রয়েছি আজীবন।
[গলাজলে]

কবি নূরুল হকের মতে কবিতা হলো সমস্ত মানুষের সত্তার পরিচয়। কবিতা হলো মহাজগতের মাতৃভাষা। ফলে মহাজগৎ থেকে সৃষ্ট সকল অণুপরমাণু বস্তুকণাতেই কবিতা থাকে। এ সেই মাতৃভাষা, যে ভাষায় আমরা নিরন্তর আন্দোলিত হতে পারি, মহাজগতকে পাঠ করতে পারি হৃৎচক্ষু উন্মীলিত করে। আর তাই কবিতাই জগতের মূল সৌন্দর্য, আনন্দের অন্য নাম। এ সেই আনন্দ ও বেদনার মিলন স্রোতোধারা, যা থেকে ব্রহ্মাণ্ড প্রতিবিম্বিত হয় তার অরূপ রূপের শতদল মেলে।

কবি শঙ্খ ঘোষ বলেন, “লিখতে হবে নিঃশব্দে কবিতা, এবং নিঃশব্দ কবিতা। শব্দই জানে কেমন করে সে নিঃশব্দ পায়, ঐশ সূত্র না ছিঁড়েও। তার জন্য বিষম ঝাঁপ দেবার দরকার আছে দুঃসহ আড়ালে থেকে। দুঃসহ, কেননা অন্তরাল সহ্য করাই মানুষের পক্ষে সবার চেয়ে কঠিন। কবিকে তো আজ সবটাই খেয়ে ফেলেছে মানুষ, তাই মানুষের এই শেষ দায়টা মেনে নিয়েও ঘুরছে সে, অন্তরাল ভেঙে দিয়ে এক শরীর দাঁড়াতে চাইছে অন্য শরীরের সামীপ্যে। তা যদি না হয় তাহলেই সহ্য যায় পেরিয়ে — কিন্তু তবু সেই দুঃসহ আড়ালে বসে সে তৈরি রাখবে একটা দৈনন্দিনের মুখোশ; তাকে কেউ চিনবে না, আঙুল তুলে বলবে না ‘এ লোকটা কবি’, আর তার ভিতর থেকে গোপনে জন্ম নেবে নিঃশব্দ কবিতা”। কবি নূরুল হকের কবিতাও যখন কেউ পাঠ করতে শুরু করেন,তখন এই ‘নিঃশব্দে কবিতা’ এবং ‘নিঃশব্দ কবিতা’-র জয়যাত্রাটি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা, যেখানে জাগেন একা’, সেইখানটিকে একেবারে ডাকাতের মতো, নিজের মুখোমুখি একলা দাঁড়িয়ে যান প্রকৃত কবি।

প্রসঙ্গত এসে যায়, কবির কাছে কাব্যদেবী কী যাঞ্ছা করেন? একলব্য তার অঙ্গুলি কর্তন করে গুরুকে দক্ষিণা দিয়েছিলেন। তাই কাব্যদেবীকে আপন মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দক্ষিণা কিছু দিতে হবে বৈকি! দেবীর কাছে সমর্পণ করতে হবে তাঁর আপন জীবন, সম্পূর্ণরূপে এবং কোনোপ্রকার খাদ না মিশিয়ে। কবিতা, একমাত্র কবিতাই হয়ে উঠতে হবে একজন কবির আরাধ্য। এ প্রসঙ্গে কবি নূরুল হকের ভাবনা অত্যন্ত ঋজু ও সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমি তো মনে করি, কবিতা লেখা কোন খেলা নয়, নয় কোন পরীক্ষানিরীক্ষাও। বিনোদন তো নয়ই। কবিতা হলো জীবন। জীবন নিয়ে তো আর মস্করা করা চলে না। চলে না কোন হেলাফেলাও। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ তাঁর এক শিষ্যকে বলেছিলেন, যখন বাদ্যযন্ত্রটা হাতে ধরবে, লাঠিয়ালের লাঠির মতো ধরবে না, অন্ধের যষ্ঠির মতো ধরবে। কবিতা লেখার বেলায়ও এ-কথাই প্রযোজ্য। অথচ আমরা তো এখন কবিতায় লাঠিয়ালের লাঠি খেলা দেখাতে পছন্দ করি। খেলা শেষে লাঠি ফেলে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাই, কিন্তু অন্ধের মতো লাঠির সঙ্গে খোদ জীবনকে জড়িয়ে রাখি না।” আর আপন কণ্ঠনিঃসৃত এ বোধকে কবি লালন করেছেন তাঁর যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, রক্তধারায়।

আর তাই কবি নূরুল হক একজন বিশ্বসভার কবি। কাব্যের নির্জন সন্ন্যাসে ডুবে থাকা বাংলা কবিতার ষাটের দশকের সবচেয়ে গহিন ও নির্জন এক কাব্যসাধুর নাম। ঋষির মতো নির্মল হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকুন কবি। তাঁর সুঘ্রাণে ভরা কবিতার ফুলে, শ্রাবণের বৃষ্টিঘন বরইপাতার  ছায়ায়। পিপাসু পাঠকহৃদয়ে অমর হয়ে থাক এই রূপতপস্বীর নন্দনঋদ্ধ হীরন্ময় পঙক্তিমালা।


চরু হক। কবি ও গদ্যশিল্পী। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক


নূ রু ল  হ ক  মূল্যাঙ্কন সংখ্যার অপরাপর রচনারাশি

COMMENTS

error: