কবিতা-অন্ত এক সন্তের নাম কবি নূরুল হক। ষাটের দশকের নিভৃতচারী শক্তিমান এই কবি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব এক কাব্যরীতিরও প্রবর্তক, যে-কারণে তিনি প্রবীণ হয়েও ‘নতুন এক কবি’। তাঁর কবিতার সঙ্গে সাজুয্য খুঁজে পাওয়া যাবে এ সময়ের আমেরিকার উল্লেখযোগ্য কবি এ আর অ্যামন্সের। অ্যামন্সের একটি ছোট্ট কবিতা :
Now I’m
into things
So Small
When I
Say boo
I disappear
অলঙ্কারবিহীন হয়েও কবিতাটি চমৎকার। একটি মুহূর্তের বিশেষ অনুভূতির সহজ প্রকাশ কিন্তু তা স্বতঃস্ফ‚র্ত এবং ভেতর থেকে উৎসারিত। জাপানি হাইকুর মতো ছোট্ট অ্যামন্সের এই কবিতাটির পাশে উদাহরণ হিসেবে আনা যেতে পারে কবি নূরুল হকের ‘কে জানে’ কবিতাটি —
বসে ছিলাম পার্কে
রোদে ও ছায়ায়
কে বসেছিল কে জানে!
নূরুল হকের এই কবিতাটিতেও আমরা দেখি একটি মুহূর্তেরই অনুভ‚তির প্রকাশ। এভাবে কবিতায় তিনি সহজিয়া শব্দ ও বাক্যে নানা মুহূর্তকেই গেঁথে চলেছেন। দরাজ চরণেও তাই দেখি ফুটে উঠছে স্বদেশের বিপন্ন ছবি। যেমন,
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ
বুক ফুলিয়ে
পুড়তে পুড়তে
আজো নাকি
লকলকিয়ে বাঁচো,
জন্ম নিয়ে দেখতে এলাম
তুমি কেমন আছো?
[দেখতে এলাম / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ১৪]
নিখাদ এক দেশপ্রেমিকেরই অন্তর্গত প্রশ্ন।
তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘এ জীবন খসড়া জীবন’-এর প্রায় কবিতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে এ-ধরনের গভীর জীবনবোধের অকপট উচ্চারণ।
কবিতায় সহজ অলঙ্কারে নূরুল হক যে দার্শনিক প্রতিবিম্ব তৈরি করেন তা আমাদের চমৎকৃতই নয় শুধু, ভাবায়ও। যেমন :
সময় বিগলিত হয়ে
ঝরছে
নিঃসীম রৌদ্র থেকে
মলমূত্র মাঝে।
চিন্তাগুলো নির্জনবাতির মতো
নিঃসঙ্গ জ্বলছে।
অলিখিত।
[বস্তি / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৫১]
কিংবা
ধুলোতে উড়িয়ে দিই
পোকার বাসরঘর
উস্কে দিই ক’টি ঝরাপাতা
তা-ও যদি নিয়ে যায়
গরিবের চিঠি
যুগান্তরে।
[ধুলোর ডাকঘর / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৫৩]
কিংবা
এখনো চেনা হয়নি কিছুই।
বুকের রক্ত ঢেলে হয়ত
চিনে নেব সব।
টুকরো কিছু সময়ের ভেতর
আমাদের আত্মা বাসা বেঁধেছিল
পথিমধ্যে,
পাখিরা যেমন বাসা বেঁধে থাকে
গাছগাছালির ডালে, ছায়ায়।
তেমনি।
এর বেশি হয়ত আমি কিছুই বলতে পারব না।
হায়,
একজীবনের একটি বাক্য হলো এই পৃথিবী।
[একটি বাক্য / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৩৯]
উদ্ধৃত কবিতা তিনটির মধ্যে কবি নূরুল হক আমাদের যে বাস্তবতার কথা বলতে চান তা ‘নির্জনবাতি’, ‘নিঃসঙ্গ জ্বলছে’, ‘ঝরাপাতা’, ‘গরিবের চিঠি’, ‘টুকরো সময়’, ‘আত্মা বাসা’, ‘পথিমধ্যে’ … ইত্যাকার শব্দ ও অনুপ্রাসের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই কবিতাগুলোর অন্তর্গত ছবি এবং টের পাই এর অনুরণন। তা যেমন নির্জলা অনুভবের অকুণ্ঠ প্রকাশ তেমনি সংবেদী ও সংশ্লেষীও।
এ-ধরনের কবিতাকে স্পেনিশ কবি হিমেনেথ বলেছেন ‘নগ্ন কবিতা’। তাঁর মতে, ‘নগ্ন কবিতা’ হচ্ছে সেই কবিতা যার অলঙ্কার থাকবে না, থাকবে শুধু দিব্য উচ্চারণ। নূরুল হকের কবিতার মধ্যেও আমরা শুনতে পাই সেই দিব্য উচ্চারণ। জীবনানন্দের কবিতায় যখন প্রতিষ্ঠিত সত্য ‘চিত্রকল্পই কবিতা’। উপমা, রূপক ও প্রতীকের হাত ধরেই কবিতা। এর বাইরে কবিতার অস্তিত্ব চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু অ্যামন্স ও হিমেনেথরা বলছেন অন্য কথা। তাদের যুক্তি হচ্ছে অলঙ্কার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে বটে আবার প্রকৃত সৌন্দর্যকে আড়ালও করে। অর্থাৎ কেবল চিত্রকল্প, রূপক ও উপমার মধ্যে নয়, কবিতার প্রাণভোমরার বাস বোধের গভীরে। সেজন্য সহজ প্রকাশের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে প্রাণময় কবিতা, পাওয়া যেতে পারে জীবনের অমোঘ এক বার্তা।
তখন আমেরিকার অ্যামন্স, নূরুল হক ও ভারতের কবি সংযম পালের চিন্তার আকাশ এসে মিলে যায় একই আকাশে।
তাই কবি সংযম পাল যখন কবিতায় বলেন —
মরে যাওয়ার আগে
একটা ভাষা তৈরি করে নিতে হবে, যাতে
মরে যাওয়ার পরেও
তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি।
তখন তার পাশাপাশি নির্দ্বিধায় দাঁড় করাতে পারি কবি নূরুল হকের এই কবিতাটি :
মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই
কারণ
জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে
তাতেই তো বসবাস করি
তাই
মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই
যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি
কিন্তু
মৃত্যু হলে
পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কি না
তা জানব কী করে?
এই যা সমস্যা।
[সমস্যা / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৯]
দুটি কবিতার মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে কবির জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকার প্রত্যয়। যদিও দু-জনের প্রকাশ এক রকম নয়।
আমেরিকান কবি এ.আর. অ্যামন্সের সঙ্গেও নূরুল হকের কবিতার মিলটা আকৃতি ও প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অ্যামন্স শিল্পকে মনে করেন একটা যাতনাবৃক্ষের ফল। এই ফল আস্তে আস্তে বড় হয় অনিঃশেষিত জীবনের বাগানে। নূরুল হকের কবিতার মধ্যে সরাসরি কষ্টপ্রকাশ ততটা তীব্র নয়। তিনি বরং কবিতার সঙ্গে তথা শিল্পের মধ্যে লুকোচুরিটা দেখতে পান। তাই জীবনের অন্ধকার পাহারা দেয়াটা তার জন্য বিব্রতকরই।
কেমনে পাহারা দিই এই অন্ধকার
যেদিকে নিশ্চিন্ত থাকি
সেই দিক থেকে ঢুকে পড়ে অগোচরে
তড়িঘড়ি করে
ফুল ছুঁড়ে দিয়ে নৈঃশব্দ্য দোলাতে থাকে
ফুলগুলি যেন দরোজা
হৃদয়ের কাছে।
খুলে যায় আপনাআপনি
আড়ালে আবডালে।
[আড়ালে আবডালে / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৬১]
নূরুল হকের অধিকাংশ কবিতা তাই অ্যামন্সের কবিতার মতো ক্ষুদ্র হলেও তাতে ভাবের উচ্ছ্বাস নেই। বরং বাশোর হাইকুর মতো ছোট কিন্তু ভাবসংযমী ও অর্থবহ। তিনি প্রকৃত অর্থে একজন জীবনবাদী। তাঁর ভিতরে একজন ছোটখাটো রবীন্দ্রনাথেরই বসবাস। যদিও তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিমুহূর্তের চিত্র। সমকালীন জাতীয় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কলমে এতটাই জীবন্ত যে, মনে হবে তিনিই প্রতিনিধিত্ব করছেন নতুন প্রজন্মের। তাঁর কবিতার মধ্যে সেই তারুণ্যও দীপ্ত ও জ¦লজ্বলে। তবে তিনি তারুণ্যেই শুধু উজ্জীবিত নন, বার্ধ্যকেও বিচলিত। ফলে কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে বেলাশেষের সেই অসহায়ত্বের আকুতিও। যেমন :
বেলা শেষে
চারদিকে জলীয় মুহূর্ত সব
সর্বক্ষণ
টলমল করে।
[কে যেন সরিয়ে নিচ্ছে সব / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৭৭]
কিংবা
সীমাহীনতায়?
কোথায় আমার শুরু?
কোথায়ই বা সীমান্ত-বাঁধুনি?
কিভাবে তা মাপজোখ করি,
… …
যদি জানতাম আমি
সেই সীমারেখা
যদি জানতাম।
[যাত্রার প্রাক্কালে / এ জীবন খসড়া জীবন; পৃ. ৭৯]
কিংবা
বসে আছি
শুকনো ধুলোর মতো,
উড়ে যেতে হবে কোনোদিকে।
আকাশের ঝুলানো আঁধারে
জীবনের শত মিথ্যা
মিটমিট করে,
দূরের তারার মতো।
সমুদ্রের মতিগতি দেখে
বোঝ নাকি
কার ঘণ্টা বাজে এইখানে?
[এ মুহূর্তে / মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা; পৃ. ৯৫]
প্যাট্রিক কারনাফ বলেছেন, জীবনে অভিজ্ঞতার প্রাচূর্য বেড়ে গেলেই তার প্রকাশ হয় সহজ ও সরল। কবি নূরুল হকের বেলায় তাঁর এই উক্তি যেন শতভাগ সত্য। আসলে নূরুল হকের কবিতা তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতারই সরল প্রকাশ, তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতারই ফুটনোট তাঁর কবিতা।
নূ রু ল হ ক মূল্যাঙ্কন সংখ্যার অপরাপর রচনারাশি
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS