লেটার ফ্রম চিফ সিয়াটল

লেটার ফ্রম চিফ সিয়াটল

১৮৫২ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তদানীন্তন আমেরিকা ভূখণ্ডে দখলদারিসূত্রে-থিতু নবাগত জনসমষ্টির স্থান সংকুলানের জন্য রেড-ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে জমি কিনতে চেয়ে চিঠি দেন। প্রত্যুত্তরে গোত্রপতি সিয়াটল — চিফ সিয়াটল নামেই যিনি পৃথিবীবিখ্যাত — পুরোপলিও নৈতিক নিয়মের শেষ প্রবক্তা ছিলেন চিফ সিয়াটল — চমৎকার একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিটি নিজেরই গরজে, একান্তই নিজের ভেঙে-পড়ার মুহূর্তে যেন এ থেকে প্রেরণা ও শক্তি নিতে পারি আমি, একটি একযুগ-পুরনো বোর্ডবাঁধাই দিনপঞ্জিকার গহ্বর থেকে এখানে এই নিবন্ধে গেঁথে রাখছি।

বলা বাহুল্য, বহুকাল আগের একটা সময়ে এই নিবন্ধকারের কিছু বাতিক ছিল যা আজ নেই আর। তার মধ্যে একটি ছিল বই পড়ার — বাতিক — আরেকটি ছিল চারপাশের সমস্তকিছু খাতায় লিখে ফেলার, খুব বিদ্বান হওয়ার শখ ছিল তখন, বোধহয়, একটা সময়ে অনেকেরই যা থাকে। একটা সময়ে এইসব বাতিক স্বাভাবিকভাবেই ইরেজ হয়ে যায়, ইরেজ হয়ে গিয়েছে লাইফ থেকে আমারও। ততদিনে অবশ্য অনেক অনেক মাইল খাতা পারায়ে এসেছি, সেসব খাতায় এটা-ওটা আগড়মবাগড়ম বহুকিছুর পাশাপাশি কিছু পঠিত-বই-থেকে-টুকে-রাখা তথ্যানু-উদ্ধৃতি প্রভৃতি ছিল। রয়েছে এখনো, ক্রমশ হলুদ ও কীটের আহার হবার পথে, কোনোকিছুই নয় চিরস্থায়ী। কিন্তু মনে হলো, খাতা থেকে এই পাতায় — এই নিবন্ধে — এনে রাখি, মহাশয় মার্ক জুকার্বার্গ প্রোভাইডেড সুবিধা এস্তেমাল করি। নিজের জন্যই, নিজের পড়ার জন্য, চিঠিটি প্রিজার্ভ করছি এই আর্কাইভে।

চিফ সিয়াটলের পরিচয় এবং স্বগোত্রের পক্ষে তার অবদান ইত্যাদি খানিকটা জানা যায়, কিংবা আমি জেনেছি, দুটো বই থেকে। এক নম্বর বইটি মিথের শক্তি  এবং দুই নম্বর আমাকে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে। দুটোরই ভালো বঙ্গানুবাদ রয়েছে, এবং তা বাজারেও সুলভ। প্রথমোক্ত বই থেকেই চিঠিটি নিয়েছিলাম টুকে, বহু বহু বছর আগে, এটি কবচের মতো রক্ষা করে চলেছি আমি বহু বহু ধূসর বছর ধরে। সে-যাকগে, বলা যাক দ্য পাওয়ার অফ মিথ  সম্পর্কে অল্প কথার গল্প। দুনিয়াখ্যাত মিথতাত্ত্বিক ও যুক্তরাষ্ট্রে-জন্মানো সত্যিকারের ভিনস্রোতের ভাবুক জোসেফ ক্যাম্পবেল। মিথের শক্তি  তাঁর বই। কিংবা বই নয়, সামথিং এল্স, মনে হয়েছে আমার। খুব কম বই পড়েই এমন অনুভূতি হয় একটা মানুষের একজীবনে। আমার ক্ষেত্রে এমন তিনটে বইয়ের মধ্যে মিথের শক্তি  একটি। স্বীকার করেছি এই কথাটা আমি অন্যত্রও, বন্ধুবান্ধবদের গুলতানিতে এটি এবং অত্র অনুক্ত অন্য দুটো বই নিয়ে বলতে যেয়ে আমি আবেগে আরক্ত হয়ে যাই দীর্ঘদিন ধরেই, বন্ধুরা তা জানেন।

বইটি, মিথের শক্তি, মূলত কথোপকথনভিত্তিক। জোসেফ ক্যাম্পবেলের সঙ্গে বিল ময়ার্স কথাবার্তা বলেছেন, সেই কথাবার্তার নির্যাস নিয়ে (বা, বিস্তারেই) নির্মিত গ্রন্থ মিথের শক্তি, যেখানে লিপিবদ্ধ রয়েছে আপন কওমের প্রতি তীব্র কমিটমেন্ট ও মমতাবাধিত সম্পর্কসুতোর আখর-ধরে-রাখা সেই চিঠি। চিফ সিয়াটলের চিঠি। পড়তে পড়তে আমাদেরও বুক ব্যথা করে ওঠে এক অজানা মমতায়, এত অসহায় লাগে এর সামনে নিজেকে, এত নাজুক হয়ে আসে শক্তপোক্ত গতিমত্ত মোদের গরব গলাবাদ্য মোদের যত বড়াই। কিংবা আমাদের চোখ ভিজে ওঠে, বহুদিন বাদে আমাদের রুখাশুখা পৃথিবী যেন সজল ও আর্দ্র-শ্যামলিম হয়ে ওঠে। যেন অতিনন্দনের ভারে ন্যুব্জ ন্যাক্কারজনক নর্তনকুর্দনের দুনিয়াদারির তাবৎ অপরাধপঙ্কিলতা লহমায় ভুলিয়া যাওয়া যায়। কিংবা প্রণোদনা জাগে ফের দায়বোধে প্রাণিত হবার। পুরনো দিনের মানুষের মতো মায়ামমতায় জগৎ বুঝি মুহূর্তে থেমে যেতে চায়। এমনই সেই চিঠির ইন্দ্রশব্দাবলি, ইন্দ্রজালি, কিংবা শব্দ আর কথার অধিক কিছু যেনবা। চিঠিটি পাওয়া যাবে প্রোক্ত গ্রন্থের সাম্প্রতিক সংস্করণের ৬৮ থেকে ৭০ পৃষ্ঠা জুড়ে। এই রিসেন্টলি রিলিজড এডিশন আমি কিনেছিলাম এক বিদায়োদ্যত সহকর্মীকে গ্যুডউইশ প্রেজেন্ট দিতে যেয়ে, তাও তো সেই কবে, ২০০৭ সালে! এত দ্রুত সময় উড়ে যায়! সেই গ্রন্থে ধৃত চিঠিটির পুরো অংশটুকু এইখানে রেখে দিই টুকে :

ওয়াশিংটন থেকে প্রেসিডেন্ট সাহেব জানিয়েছেন যে তিনি আমাদের জমিজিরাত কিনতে চান। কিন্তু আকাশ কি কেনাবেচা করা যায়? যায় জমি কেনাবেচা করা? আমাদের কাছে এই ধারণা খুব অদ্ভূত মনে হচ্ছে। বাতাসের সজীবতা, জলের স্বচ্ছতা তো আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাহলে? কি করে কিনবেন তাদের?

এই ধরিত্রীর প্রতিটি ধূলিকণা আমার লোকেদের কাছে পবিত্র; প্রতিটি পাইনপাতার কাঁটা, প্রতিটি বালুবেলা, ঘনান্ধকার অরণ্যের প্রতিটি শিশিরকণা, প্রতিটি মাঠ, প্রতিটি গুঞ্জরিত পতঙ্গ — আমার লোকেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এরা সবাই খুব পবিত্র।

গাছ রস টেনে নেয় গোপন পথে আমরা তা জানি, যেমন জানি রক্ত আমাদের ধমনী বেয়ে চলে। আমরা এই ভূলোকের অংশ, যেমন এই ভূলোক আমাদের অংশ। সুরভিত ফুলেরা আমাদের বোন। ভালুক, হরিণ, রাজকীয় ঈগল — এরা সবাই আমাদের ভাই। পাহাড়ের চূড়া, সবুজ প্রান্তরের রস, ঘোড়ার শরীরের ওম, আর মানুষ, সবাই আমরা একই পরিবারের সদস্য।

ঝর্ণায় নদীতে স্ফটিক-স্বচ্ছ যে জল গড়িয়ে যায় সে তো নেহায়েৎ জল নয়, আমাদের প্রপিতাদের শরীরের স্বেদ, রক্ত। আমরা যদি আপনাকে জমি বিক্রি করি তো অবশ্যই স্মরণ রাখবেন জমিটা পবিত্র। ঝিলের স্বচ্ছ জলে অলৌকিক ছায়া পড়ে। তার প্রতিটিতে আমার লোকেদের স্মৃতি আর ঘটনা বিম্বিত হয়। বনের মর্মরধ্বনিতে আমি আমার পিতামহের ডাক শুনতে পাই।

নদীরা আমাদের ভাই। তাদের জলে আমাদের তৃষ্ণা মেটে। ওরা আমাদের নৌকা বয়ে নেয়, আমাদের সন্তানদের মুখের গ্রাস যোগায়। অতএব আপনি অবশ্যই নদীকে সেইরকম দয়াদাক্ষিণ্য করবেন যেমনটি করবেন আপনার ভাইকে।

আমরা যদি জমি বিক্রি করি তো মনে রাখবেন যে সেই জমির ওপর প্রবাহিত বাতাস আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। হাওয়া তার উদ্যমের অংশ দান করে তার সমস্ত পোষ্যকে। হাওয়া যেমন প্রথম ফুৎকারে আমাদের প্রপিতামহের ফুসফুসে দিয়েছে দম, তেমনি গ্রহণ করেছে তার অন্তিম শ্বাসবায়ুও। আমাদের শিশুদের বাতাস দেয় জীবনের উদ্যম। অতএব আপনাকে জমি বিক্রি করলে অবশ্যই সেই জমি বিশেষ যত্ন করে রাখবেন যেন সেখানে লোকে মাঠের ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়ার লোভে সমবেত হয়।

আমাদের সন্ততিদের আমরা যা শিখিয়েছি আপনারাও কি আপনাদের ছেলেপুলেদের তা-ই শেখাবেন? আমরা শিখিয়েছি যে ধরণী আমাদের মা। এই ধরণীর কিছু হলে এর সন্তানদের সবারই তা হবে।

আমরা এটুকু জানি : মাটি মানুষের নয়, বরং মানুষই মাটির। রক্ত যেমন আমাদের একসূত্রে বেঁধেছে, তেমনি সমস্ত জিনিশও পরস্পরে বাঁধা। জীবনের জাল মানুষ বয়ন করেনি। সে তো এই জালেরই একটি সূতো। এই জালের ক্ষতি করা মানে নিজেরই ক্ষতি করা।

আপনাদের ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়। গরু-মোষ সব জবাই করলে কী হবে অবস্থাটা? বুনো ঘোড়া পোষ মানিয়ে চালাবেন? অরণ্যের গোপন অঞ্চলগুলি যখন মানুষের ঘামের গন্ধে উঠবে ভরে, এবং উঁচু পাহাড়ের চূড়া আলাপী তারের আড়ালে পড়বে ঢাকা, তখন কী হবে? ঝোপঝাড়, বনবাদাড় যাবে কোথায়? সব উধাও। ঈগলপাখি যাবে কোথায়? উধাও, উধাও। আর ক্ষিপ্রগতি টাট্টুঘোড়া আর শিকারকে অকালে বিদায় জানাতে হলে কেমন হয় ব্যাপারটা? তখন ফুটে উঠবে জীবনের অন্তিম দশা এবং শুরু হবে ধুঁকে ধুঁকে জীবনের পথে চলা।

যখন একেবারে শেষ লাল মানুষটিও তার নিধুয়া দিগন্তপাড়ে হাওয়া হয়ে গেছে, এবং তার স্মৃতি কেবল ভাসমান মেঘের মতো প্রেইরির পাথারে থেকে থেকে ছায়াসম্পাত করে বেড়াচ্ছে, তখনও কি এই সমুদ্রতট, এই অরণ্যরাজি থাকবে যেমন আজো আছে? তখনো কি আমার লোকেদের আত্মা মিশে থাকবে এদের আনাচেকানাচে?

নবজাতক যেমন তার মায়ের হৃদস্পন্দন ভালোবাসে, তেমনি আমরা ভালোবাসি এই পৃথিবীকে। অতএব আমরা জমি বিক্রি করলে আপনিও একে আমাদের মতোই ভালোবাসবেন। আমরা এর যেমন যত্ন নিয়েছি, আপনাকেও সে-রকম যত্ন নিতে বলি। ভূমি সম্প্রদানের অবিকল স্মৃতি মনে ধরে রাখুন। সমস্ত সন্তানের জন্য জমি রক্ষা করুন, জমিকে ভালোবাসুন যেমন ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন।

আমরা যেহেতু সবাই এই ভূমির অংশ, তেমনি আপনিও এর অংশ। জমি আমাদের কাছে যেমন মূল্যবান, তেমনি আপনার কাছেও। একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিত : ঈশ্বর এক। মানুষ সে লালই হোক আর শাদাই হোক, কখনো একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। হাজার হলেও আমরা তো পরস্পর ভাই।

আজকের আমেরিকার জন্মেতিহাস যারা জানেন, তারা এই চিঠির মর্মবেদনাদায়ক পটভূমিটি সম্যক বুঝবেন। না জানলেও, না বুঝলেও, ক্ষতি নেই।

সভ্যতার শৈশব থেকে ধর্ম ও পুরাণের রূপক-প্রতীকের আড়ালে গেঁথে-থাকা যেসব সত্য মানুষকে জীবনযাপনে সাহায্য করেছে, তার কল্পনা ও মন ও মনন ও সৃজনকে সমৃদ্ধ ও প্রসারিত করেছে, তাকে জীবনের নানা রহস্য উদ্ঘাটনে এবং সেইসব রহস্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, সেইসব সত্য উন্মোচন-বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় পুনরোদ্বোধন এবং বর্তমান জীবনযাত্রায় তাদের অন্তর্লীন ধারাবাহিকতা প্রদর্শনই ক্যাম্পবেলের সারাজীবনের মিথচর্চার উদ্দেশ্য। গ্রন্থানুবাদে একটি যথেষ্ট-বিস্তারিত ভূমিকায় এর অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস জোসেফ ক্যাম্পবেলের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে বলেছেনও যথেষ্টই বিশদে। এখন, আজকাল, গ্যুগল সার্চ দিলে এঁর — ক্যাম্পবেলের — বইপত্র মুফতেই পেয়ে যাওয়া যায়।

ক্যাম্পবেলের কয়েকটি বইয়ের নাম আমি, তিতপুরানাকালের ১২/১৩ বছর পূর্বে সেই দিনলিপিপৃষ্ঠায়, লিখে রেখেছিলাম দেখতে পাচ্ছি : The Hero with a Thousand Faces, The Mythic Image, The Masks of God, The Myths to Live By ইত্যাদি। আরেকটি বইয়ের কথা টুকে রাখি : A Key to Finnegans Wake, জেমস জয়েসের সেই জটিল উপন্যাসটির সম্ভাব্য পাঠোদ্ঘাটনে একটা চাবিবই। মিথের শক্তিতেও জয়েস ও ‘ফিনেগান্স ওয়েইক’ নিয়ে ইন্ট্রেস্টিং কথাবার্তা আছে, এমন কথা আমি ঠিক আগে কোথাও শুনি নাই উপন্যাসটি সম্পর্কে। বেশ লেগেছিল তখন।


মিথের শক্তি ।। জোসেফ ক্যাম্পবেল : বিল ময়ার্সের সঙ্গে কথোপকথন ।। অনুবাদ ও ভূমিকা : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ।। প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ।। দ্বিতীয় প্রকাশ ২০০৭, ঐতিহ্য, ঢাকা


ভাষ্য ও গ্রন্থনা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: