জলসা, ব্যান্ডসংগীত ও অনুষঙ্গ স্মরণ

জলসা, ব্যান্ডসংগীত ও অনুষঙ্গ স্মরণ

শেয়ার করুন:

রচনাটার প্রসঙ্গ ব্যান্ডসংগীত। কোথাকার? অদ্বিতীয়, বাংলাদেশের। দুনিয়ার অন্যত্র অন্য অনেক প্রকার সংগীত হয়, ব্যান্ডসংগীত হয় বাংলাদেশে শুধু। রক নয় পপ নয় ক্ল্যাসিক্যাল কলোনিয়্যাল নয়। ব্যান্ডসংগীত। পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশের এক অরিজিন্যাল জিনিশ। প্রসঙ্গতই স্মৃতিচারণঢঙে এসে যায় সেকালের টেলিভিশনের একটা আলেখ্য। ও, অনুষঙ্গ। সংক্ষেপে এই নিবন্ধ হয়ে-ওঠার ইতিহাসটি প্রিফেইসে একবার না বলে গেলে একে ভুঁইফোঁড় মনে হতে পারে। ফেইসবুকে সে-সময় যে-কোনো বিষয় নিয়া পাব্লিকলি আলাপ করত লোকে। লেখাপত্রের লিঙ্কশেয়ারিং একটা পোস্টের তলায় ফেইসবুকের কমেন্ট সেকশনে এই নিবন্ধের প্যারাগ্র্যাফগুলি লিখিত। দুইজনের মধ্যকার, রাহাত শাহরিয়ার ও আমার, আলাপে এই নিবন্ধ। অব্যবহিত পরে সেই পারস্পরিক কথাবার্তাগুলি কপি নিয়ে গুছিয়ে একটা নোট সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা হয়েছিল ‘কনভার্সেশন ১৯, উইথ রাহাত শাহরিয়ার তানিম’ হেডলাইনের আন্ডারে। এই সিরিজে এমন অনেক কনভার্সেশন আছে, ফেইসবুকমেমোরি ফিরায়া আনে মাঝেমাঝে। সে যা হোক। দুইজনের কথাবার্তা। ‘ব্যান্ডসাংগীতিক হাওয়ায় শ্বাসবাহী দিনগুলো’ পড়ে ক্যানাডাবাসী রাহাত শাহরিয়ার, যার ওয়ানলাইনার পরিচয় কথোপকথাধর্মী নিবন্ধের প্রিফেইসে দেয়া আছে, সূত্রপাত করেন আলাপের। কথায় কথায়, কমেন্টে এবং রিপ্লাইয়ে, বাকি কথাগুলো জন্মায়। আর, উল্লেখ্য, ‘ব্যান্ডসাংগীতিক হাওয়ায় শ্বাসবাহী দিনগুলো’ রচনাটা লাল জীপের ডায়েরী সাইটে একবার এবং গানপার সাইটে আরেকবার ছাপা হয় যথাক্রমে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে। এইবার বাকি কথাগুলো পড়তে সুবিধা হবে।
জাহেদ আহমদ ০৫ এপ্রিল ২০২৬

 


অত্র উপস্থাপিত কথোপকথা রাহাত শাহরিয়ার তানিম ফ্যাসিলিটেইট করেছিলেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। এর একটা কন্টেক্সটও অবশ্য ছিল যত অনুল্লেখ্যই হোক। ব্যান্ডগানপ্রাসঙ্গিক একটা আর্টিক্যলসূত্রে এই আলাপের সংঘটনা। আলাপ থেকে একটা লাভ হয়েছে এ-ই যে, মেমোরি রিকালেক্ট করার আদলে ব্যান্ডসংগীত নিয়া খানিক ব্রেইনস্টর্ম করে নেয়া গিয়েছে। সেই আর্টিক্যলটার সোর্সলিঙ্ক গুঁজে রাখা আছে এখানে এই নোটে; এবং অব্যবহিত পরে একটু পরিচয়টা সারি ফ্যাসিলিটেইটরের। রাহাত শাহরিয়ার তানিম একজন হার্ডকোর গানখোর, বাংলা-ইংরেজি দ্বিপদের গানেরই তিনি নিয়মিত শ্রোতাসমুজদার, ম্যুভিখোরও বটে। এর বাইরে তার খাদ্যাভ্যাস-পানীয়গ্রহণাভ্যাস সম্পর্কে এখানে তথ্য ছড়ানো অপ্রাসঙ্গিক হবে বিবেচনায় খামোশ রহা গেল। ভদ্রলোকের চেহারাচিত্র অনিন্দ্য, অমিতাভতনয় অভিষেকপ্রতিম, লম্বায় একইঞ্চি-কম ছয়ফিট, ডেন্টাল ও মেন্টাল স্ট্যাটাস ভালো। সদালাপী। বিদ্বান। বুদ্ধিদীপ্ত। উইটি। প্রিভিয়াস কলিগ। দৃশ্যত দেশপ্রেমে একটু কমজোরি, বিদেশবাসী, দি কল্যাণরাষ্ট্র ক্যানাডায় নিবাস। মিডিয়ায়, তথা ফেসবুকে, ডিসেন্ট প্রেজেন্স রয়েছে তার। সবিবেক, সযুক্তি, সস্মৃতি। বিচিত্র ব্যাপারাদি নিয়া বাংলায় নিজের স্টাইলে লেখেন। লিখনভঙ্গি উপভোগ্য। কমেন্ট/রিমার্ক ইত্যাদি ইংরিজিতেই করে থাকেন, বাংলায় ক্বচিৎ-কদাচিৎ, ভাষাপ্রাযুক্তিক সুবিধাদির অপ্রতুলতা হতে পারে এর একটা কারণ। তো, রাহাত শাহরিয়ার তানিমের ইংরেজিলিখিত কমেন্টের রিপ্লাই দিতে যেয়েই নিবন্ধ হলো।

Covering A to Z with ‘Tafseer’…This is so live and vibrant. Feels like yesterday’s. Don’t know if you remember a BTV program, named ‘Zalsa’. The program featured more traditional singers like Late Nilofar Yasmin, singing band songs and band singers performing non-band(?) songs. Partho Borua sang Sachin’s Dakatia Bashi; just a reminder. And please note, Partho was may be a bit touched. His later songs were more melodious instead of pop/rock music. Besides, Maqsud focused on folk. Not a question whether this influence is good or bad. Just, to me, we need more of such programs, where there would be platform of confluence among different generations. This will enrich our Bangla music for sure.

খুবই সিগ্নিফিক্যান্ট ইম্প্যাক্ট রয়েছে এই ‘জলসা’ প্রোগ্র্যামটার ব্যান্ডসংগীত ভার্সাস অপসংস্কৃতি বিষয়ক ভুয়া ডিবেইট নিরসনে। এইটা যদ্দুর মনে পড়ে নাইন্টিসিক্সের ঘটনা। (আসলে, চেক করে দেখেছি পরে, নাইন্টিসিক্স নয়, নাইন্টিফোর, নাইন্টিননাইন্টিফোর।) আজকের ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট ও হবু মেয়র আনিসুল হক অনুষ্ঠানটা সঞ্চালন করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে একপ্রকার রিসিপ্রোক্যাল এক্সচেইঞ্জ হয়েছিল মেইনস্ট্রিমড পপুলার মিউজিক-আর্টিস্ট/মিউজিশিয়্যানদের সঙ্গে ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানদের। এবং প্রথমবারের ন্যায় কিছু জিনিশ ক্লিয়ার হয়েছিল আমাদের কাছে। যেমন এখানে, এই টিভিশোয়, ব্যান্ডআর্টিস্টরা কথিত মূলধারা গানবাজনা ভালোই উৎরেছিলেন করতে যেয়ে, অন্যদিকে মেইনস্ট্রিম শিল্পীরা ব্যান্ডগান পার্ফোর্ম করতে যেয়ে খেয়েছিলেন ধরা।

আমরা তাদের মুখে, মেইনস্ট্রিম আর্টিস্টদের মুখে, এই কথাটা হামেশা শুনতাম যে ব্যান্ডগান গাইতে গেলে আদৌ কোনো গলা-সাধা বা শিক্ষাদীক্ষার দরকার পড়ে না। কার্যত দেখা গেল উল্টোটাই জিতে গেছে! ব্যান্ডগুলোর মধ্যে রেনেসাঁ, মাইলস, সোলস, ফিডব্যাক ছিল উল্লেখযোগ্য। মুরুব্বিদের মধ্যে খান আতাউর রহমান, মুস্তফা মনোয়ার প্রমুখ ছিলেন। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও ছিলেন মনে হয়। শিল্পীদের মধ্যে নীলুফার ইয়াসমিন, সুবীর নন্দী, সাদিয়া আফরিন মল্লিক, শাকিলা জাফর প্রমুখ ছিলেন।

সুবীর নন্দী ফিডব্যাকের/মাকসুদের গীতিকবিতা-২ তথা ‘ধন্যবাদ হে ভালোবাসা’ গাইতে যেয়ে নাকানিচুবানি সিচ্যুয়েশন হয়েছিল। নীলুফার ইয়াসমিন মোটামুটি ভালো গেয়েছিলেন রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়’ গানটা। খারাপ না-গাইলেও খুব ভালো গাইতে পারেন নাই সাদিয়া আফরিন মল্লিক মাইলসের ‘প্রথম প্রেমের মতো / প্রথম কবিতা এসে বলে / হাত ধরে নিয়ে চলো / অনেক দূরের দেশে’।

ও আচ্ছা, কলিম শরাফী ছিলেন, খুব সুন্দর গেয়েছিলেন রেনেসাঁর ‘আজ যে-শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে / আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’ গানটা। সবাই মিলে বেশ গেয়েছিলেন সোলসের ‘আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায়’। অন দি আদার সাইড, ফিডব্যাক  ফকিরি গানের জোয়ারি দিয়ে গেয়েছিল দুর্ধর্ষ ‘জনমদুঃখী কপালপোড়া গুরু আমি একজনা’ গানটা। মাকসুদ ও ফিডব্যাক  যখন জলসার মাঝখানে গোলমাদুর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গাইতে শুরু করে, ক্যামেরা টিল্ট করে তখন বারবার সমবেত উপস্থিত সুধীবৃন্দ মূলধারামহারথীদের মুখের এক্সপ্রেশন ফোকাস করছিল। মহারথীদের অবয়ব ঠিকরে বেরোচ্ছিল বিস্ময়বিমুগ্ধতা, অ্যামেইজিং সাইন। গানটা খালি দাঁত-কিড়িমিড়ি নাকমুখ চেপে সুভদ্র দণ্ডায়মান ধর্মকৃত্যপালনের জিনিশ নয়, গানটা আস্ত শরীরেরও, গোটা অস্তিত্বেরও ব্যাপার বটে গাওয়াটা—এই সহুজে সত্যটার স্বীকৃতি সেদিন অন্তত আমি দেখতে পেয়েছিলাম মূলধারাবাদীদের ক্যামেরাভাসিত মুখে-চোখে ফেইশিয়্যাল এক্সপ্রেশনে।

এছাড়া দারুণ ইন্টারেকশন হয়েছিল সেদিন পুরানায় এবং নতুনে, সেকেলে-একেলে-চিরকেলে মিলেমিশে। এবং, ইন অ্যাডিশন, এই প্রোগ্র্যামের এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও অনুরূপ টেমপ্লেইটে নেক্সট কোনো প্রোগ্র্যাম আর হয়নি। যেমন অলক্ষে একসময় কন্সার্ট আয়োজনও স্তিমিত হয়ে আসে মুক্তমঞ্চে, খোলা হাওয়ায় নির্ভয়া আকাশের তলায়। এইসবই কালচার অফ ডমিন্যান্স কন্সপিরেসির বাইরে রেখে দেখা আমার-আপনার দ্বারা আদৌ সম্ভব নয় মনে হয়। এই ‘জলসা’ অনুষ্ঠানের আগে-পরে সংঘটিত নানান ঘটনাবলির নোশন ধরে ধরে দেখে গেলে এই জিনিশটা ক্লিয়ার বোঝা যাবে। এখন পর্যন্ত যারা এশিয়াটিক-বিটপি ইত্যাদি শুদ্ধসংস্কৃতির নাট্যজাগতিক লোকলস্কর, তারাই স্পন্সর-প্রোমো-প্যাট্রন প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করেন, করে আসছেন সিন্স পোস্ট-ইন্ডিপেন্ডেন্স। ফ্রেশ ব্লাড যেটুকু সংবাহিত হয়েছে সংস্কৃতিতৎপরতার শরীরে, সেটুকু সবটা না-হলেও মোটা দাগের অংশটা তো ওই ইউটোপিয়টিক শুদ্ধতানুসারীদের কোম্প্যানির নিগড়ে বাঁধা, সাবোর্ডিনেইট, অধীনস্ত অংশ কোনো-না-কোনোভাবে।

অ্যানিওয়ে। একটা কথা সকলেই কনক্লুড করেছিলেন জলসাপ্রান্তে যেয়ে যে ব্যান্ড/রক হুদা চিল্লাচিল্লির ব্যাপার নয়, এর জন্যও দরকার বিশেষ স্কুলিঙের ভিতর দিয়া যাওয়া, এরও রয়েছে পৃথক ঘরানা ও তৈয়ার-হয়ে-ওঠার সোহবতপ্রক্রিয়া যা আয়াসসাধ্য; লক্ষণীয়, কত-কত বছর লেগে গেল তাদের এটুকু বুঝে উঠতে! কাজেই, বিটিভিতে প্রচারিত আনিসুল হকের ওয়ান্স-ইন-অ্যা-লাইফটাইম ‘জলসা’ অনুষ্ঠানটা বিশেষভাবেই উল্লেখের দাবিদার এইসব আলাপে। ব্যান্ডম্যুভ ব্যাপারটাকে একটা ব্রেকথ্রু দিয়েছিল এই প্রোগ্র্যাম, অনস্বীকার্য।

তো, সুযোগ খুঁজি সবসময় এইসব কথাবার্তা বলার; কিন্তু, কে আর সুযোগ দেয় বাতিলমাল আমরারে, হায়! আপনে একটু সুযোগ দিলেন বলেই, মহাত্মন, ইন শর্ট বলিলাম এই আন্ডারলায়িং হিস্টোরি অফ আওয়ার মেমোরি ওভারল্যুকড অ্যান্ড ইগ্নোর্ড বাই দি কালচারাল শেরিফস!

Those of sheriffs, as you said, are now more interested in arranging expensive evening programs of international actors, musicians etc. Brings more money u know. They don’t give a damn to the fact that what an amazing and rich history our band music has. Thus, band concerts are now subject to university programs. Nonetheless, music tastes and choices of different generations may change. But appeal of a good songs can’t be dominated. I heard teens in North America still humming with Stone’s beast of burden or with Stairway to heaven. And those old guys are still performing in concerts and making money. Hope one day, Bangla band industry would be back in form. They will come out and again dominate the music, other than restricting themselves within FM radio and few of our nostalgic minds.

এই শেরিফদের দৌরাত্ম্য ও দাপট বর্তমানে কেমন, এদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতা ইত্যাদি, এইসব নিয়াও অনুসন্ধান করা আগ্রহজাগানিয়া কাজ হতে পারে। একযুগ আগের একটা সিনারিয়ো পাই মাকসুদের লেখাতেই। কিয়দংশ উদ্ধার করি : “সংগীতের প্রথম শত্রু নাটকআন্দোলনের ছত্রছায়ায় বসবাসরত কিছু সাংস্কৃতিক কারবারি।…সেই-যে বিজ্ঞাপনের সম্রাটরা যারা মিডিয়ার সব স্তরে বিজ্ঞাপনসংস্থা, বহুজাতিক স্বার্থ, ক্যাবল টিভি, পত্রিকা-ম্যাগাজিন, সব জায়গা অবৈধভাবে বৈধ করতে নির্লজ্জ আস্ফালনে লিপ্ত। তাই বিগত দশ বছরে বিজ্ঞাপনসংস্থার সঙ্গে জড়িত এ-ধরনের হাতে-গোনা ১০/২০ জন সাংস্কৃতিক কারবারি বাংলাদেশ নামের দেশটিতে নিজেদের রাজতন্ত্র চালাচ্ছে। ২৮ বছরের ইতিহাসে তাদের সন্তানরাও সেই সিংহাসন দখল করে ফেলেছে। বাইরের কারোরই তাদের সেই সুবিকশিত মহলে ঢোকা নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে এই যোগ্যতা ১২ কোটি মানুষের ভেতরে হাতে-গোনা কিছু কারবারি ও তাদের ছেলেমেয়েদের ছাড়া যেন কারোই নেই। তারা নাট্য-আন্দোলন  করছেন ও টেলিভিশন দখল করে রেখেছেন, প্রচারমাধ্যমগুলো দখল করে রেখেছেন।”…এইটা আজ থেকে পাক্কা পনেরো বছর আগেকার পরিস্থিতি-প্রতিবেদন। মাকসুদ তখন কলাম লিখতেন একটা সাপ্তাহিকে, ‘এই নিষিদ্ধ সময়ে’ ছিল সেই কলামের শিরোনাম, উদ্ধৃতাংশ গৃহীত হয়েছে চলতিপত্র  ৩ মে ১৯৯৯ / ২০ বৈশাখ ১৪০৬ বর্ষ ৩ সংখ্যা ২০ থেকে। অ্যানিওয়ে। শেরিফদের মুখচ্ছবি আমাদের চেনা। আজও প্রতিদিন তারা গোলাপ ও রুমাল উপহার পান। মিডিয়ার গুডমর্নিং আর গুডইভনিং শোগুলোতে পালাক্রমে খোমা দেখান আমাদেরে আর উন্নত বহির্বিশ্বের বনেদি বাংলা গান শোনানোর জন্য শয়নে-স্বপনে কারিক্রম পরিচালন করেন। মন্ত্রীমিনিস্টার হয়েও তারা মমতা কুলকার্নিপৃষ্ঠপোষণা আর বিজ্ঞাপনবাণিজ্য পরিহার করেন না। আমরা তাদের নিকট অতএব বাছুরসমেত কৃতজ্ঞতাবদ্ধ।

তো, ঘটনাবহুল সেই নব্বইয়ের দশকটা সবদিক থেকেই ফিরে দেখতে হবে। হ্যাঁ, সেইটাই। স্মৃতি দিয়াই মিনারটা বানাতে হবে, যেহেতু ব্যান্ডসংগীতের দামাল দিনরাত্রির স্ট্রাগলটা আমাদের স্মৃতিতেই বিরাজিছে। কেউ তো অন্য কোনোভাবে সেই সময়টা দলিলায়িত করে রাখে নাই। হিস্ট্রিটা টাটকা পাওয়া যাবে এক সরাসরি ব্যান্ডগানে; দুই, কেউ যদি রীতিমতো হোমওয়ার্ক সেরে পরে আমাদের ব্যান্ডপুরোধাদের মুখ থেকে সেই সময়টা বার করে আনতে পারে। এক নাম্বারের সমস্যাটা হলো, অস্বীকার করলে অসত্য হবে যে আমাদের ব্যান্ডগানের লিরিক্স ওইভাবে স্ট্রেন্থ রাখে না যাতে টেক্সট থেকে চটজলদি সময়টা বার করা যায়; কিন্তু কেউ যদি সেই সময়টার সঙ্গে চেনাজানাসূত্রে গানগুলো নাড়াচাড়া করে, পাবে; যত অপটু অসতর্কভাবেই হোক, সময়টা ছাপানো-লুকানো তো থাকে না কোথাও।

অবশ্য ব্যান্ডগানের মূল ফিচার বা প্রস্পেক্টটা আদৌ লিরিক্সে নয়, অন্যত্র; প্রসঙ্গটা আলাদা কোনো পরিসরে নেড়েচেড়ে দেখব আমরা, যার যার জায়গা থেকে সেই সময়টার স্ট্রেন্থ-উইক্নেস-অপর্চুনিটি-থ্রেটগুলি রিভিজিট করা দরকার সমগ্রত বাংলা গানের স্বার্থে। এইটাও সংক্ষেপে স্বীকার্য যে, ব্যান্ডগানে স্ট্রং লিরিক্সও নগণ্য নয়। এইসবও যথাসময়ে যথাস্থানে কেউ মহাকাব্যিক দ্যোতনায় উঠায়া আনবে আমাদের সামনে, আমি ও আমরা এটুকু দেখে মরতে চাই। একটা এতবড় সাংস্কৃতিক-সাংগীতিক তৎপরতার কালপর্ব আমরা আমাদের চোখের সামনে হাপিশ করে দিলাম চুপটি তাকায়ে তাকায়ে! একদম হজম করে নিলাম মুক্তিযুদ্ধোত্তর নিজেদের প্রাণস্ফূর্ত বীণাবাকবিভূতির স্বর্ণশস্যপর্বটা! যা-হোক, করতালি তো কত-না হাতেই বেজেছে, সেইসব হিসাবনিকাশও নথিবদ্ধ করে রাখাটা আবশ্যক ভবিষ্যতে ট্রেন ডিরেইল্ড যাতে না-হয় সেজন্যে।

অ্যানিওয়ে। সেকন্ড থিং যেইটা হচ্ছে যে, ব্যান্ড-পায়োনিয়্যরদের ইন্টার্ভিয়্যু করে কথা আদায় করে নেয়ার সিলসিলা আমাদের তো নাই একেবারেই। আমরা মিউজিশিয়্যানদেরেও মনে করি শোবিজ-পার্ফোর্মার, শোভিনিস্ট, মনে করি তাদের ইন্টেলেকচুয়াল হাইট কবি-নিবন্ধকারদের মতো অত উঁচু ও চলিষ্ণু না। মাইন্ডসেটটা আমাদের, দুই তরফেই, এ-রকম গড়ে উঠেছে। ফলে মিউজিশিয়্যানদের মুখোমুখি হতে দেখি নিউজপেপারকর্মচারীদের, তারা সাড়ম্বর ফোটোশ্যুট সেরে মিনি-ইন্টার্ভিয়্যু নিতে যায়, যেয়ে জিগায় তিনি কি খান, কয়টায় ঘুমান আর অবসরে কোন চুলায় বেড়াতে যান অথবা বড়জোর আপকামিং অ্যালবামে কোনো ‘চমক’ থাকছে কি না ইত্যাদি। কাজেই এই জায়গা থেকে, এই মাইন্ডসেট থেকে, প্রথমত সাক্ষাৎকারপরিগ্রাহক বেরোতে পারবেন বলে ভরসা সহসা কম; দ্বিতীয়ত পরিগ্রাহক কায়ক্লেশে বেরিয়ে এলেও ওই পুরোধাব্যক্তি—যাকে ইন্টার্ভিয়্যু করা হচ্ছে—তিনি মাইন্ডসেট থেকে বেরোবেন কি না বলা মুশকিল। পলিটিক্স বুঝেশুনে পলিটিক্সটা কাউন্টার করেছেন, সোশিয়োকালচারাল ডিনামিক্সটার সঙ্গে যুঝেছেন, এমন জনের সংখ্যাও ব্যান্ডমিউজিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট/প্র্যাক্টিশনারদের মধ্যে বেশি-একটা নাই।

কিন্তু কোনোভাবেই মিউজিকে কারো কন্ট্রিবিউশন খাটো করা হচ্ছে না আজকের প্রেক্ষিতে এসব কথাবার্তা বলার মধ্য দিয়ে। অ্যানিওয়ে অ্যাগেইন। এইসমস্ত সংকট তো রয়েছেই। কিংবা আরেকটা ব্যাপার এ-ও যে, ব্যান্ডমিউজিকের সঙ্গে আমাদের গালগল্পকবিতাকেন্দ্রী শিল্পসাহিত্যের বাকিসব কম্পোনেন্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে কেন যেন। ফলে একটা আস্থাহীন/অনাস্থাভিত্তিক অপরিচয়ের সম্পর্ক সচল আগাগোড়া। এই অপরিচয় কাটায়া ওঠা বাংলাদেশের অধুনা সাহিত্য ও সংগীত উভয় তরফেরই প্রাথমিক ও একইসঙ্গে প্রধান কাজ বললেও মনে হয় বেশিকিছু বলা হবে না।

আরেকটা রাস্তায় এক্সপ্লোর করা যাবে এসব কার্যক্ষেত্রে নেমে। সেইটা হলো, তখনকার কাগুজে মিডিয়া কাভারেজগুলো থেকে ইনফো নিয়ে ইনসাইটস্ নিষ্কাশনের চেষ্টা। যত হেলাফেলা আর মামুলি নিউজকাভারেজই হোক, সেসব থেকে অনুসিদ্ধান্তসোপান তৈয়ার করে এগোনো সম্ভব। পাশাপাশি ওই-সময়কার আর্বেইন ফোকের ভেতরে, মব কালচারে, পাব্লিক পরিসরগুলোতে, যেসব চিহ্ন গোচরে আসবে সেগুলো থেকে ব্যান্ডমিউজিকের অভিঘাত বের করে আনা। আদানপ্রদান হয়েছে যেই-যেইখানে, কিংবা আদানপ্রদান আদৌ হয়েছে কি না, এই জায়গাগুলো খুঁজে দেখতে হবে। ইভেন ওইসময় এফডিসিসেন্ট্রিক ম্যুভি প্রোডাকশনগুলোতে ব্যান্ড ঢুকতে শুরু করেছিল মহাসমারোহে, প্লেব্যাক এমনকি মিউজিক ডিরেকশনেও দেখা যাবে একটা-সময়ে এসে ব্যান্ডসিঙ্গারদের, ব্যাপারটা উপেক্ষণীয় নয় কিন্তু! সবকিছু মিলিয়ে, এত উন্মথিত সংগীতোল্লাসের পরেও, ঠিক কোন পয়েন্টে এসে এর ডিপার্চার ঘটছে, ব্যাপারটা ঠাহর করে উঠতে পারলে একটা কাজের কাজ হবে।

এখন, প্রশ্ন হলো, এইসব ইনভেস্টিগেইট করা আদৌ দরকারি কি না বা কেন দরকার। প্রথমত কলকাতাগানেই তো বদন গদগদ আমাদিগের। দুনিয়ায় ইন্ডিয়াগান তব্ তক্ টপ রহেগা, বুলন্দ দরোয়াজা লাভ করেগা আমাদের কাছে, যব্ তক্ কুল্লে-একটা বাংলাদেশি সিউডোকালচারকর্মী জিন্দা থাকবে। বিলকুল সাচ হ্যায় ইয়ে বাত। কলকাতাগানের কদর করব আমরা, বাংলাদেশের গান আমি কিঞ্চিন্মাত্রও অনুমোদন করতে পারি না মর্মে সগর্ব মূর্খামি প্রকাশিব আমরাই। বিন্দাস! কিংবা কী দরকার, আমার প্রাণরসগোল্লা যদি নেক্সটডোর নেইব্যর জোগায়ে দেয় তো আম্মার সাতনরি শিকের দিকে কোন বোকাহাঁদা তাকায়? কলকাতাগানের তারিফ আমরা আদাজল খেয়ে বাল্যকালে ঢের করেছি, বৃদ্ধকালেও করব জরুর, নিশ্চয় তাতে সমস্যাও নাই। কিন্তু ওদিকে বেলা তো ভাটি নিয়া নেয়, দ্যাখো, ওহে ভাইট্যাল গাঙের মাঝি! নিজেদের তারিফের জায়গাগুলোও তো অবিলম্বে সিজিলমিসিল করে নেয়া চাই।

শিরদাঁড়াহারা আকাম্মা ভোম্বল ভোদাইয়ের মতো কদরদারি আর তারিফি অ্যাপ্রিসিয়েইশন অনেক তো হলো। শুধুই খারিজি অ্যাপ্রিসিয়েইশন হয় যদি তো বুঝতে হবে মিঠা ফালুদায় কেউ গোহাড্ডি দিয়াছে ঢুকায়ে। একইভাবে কেবল তারিফি ডিস্কাশন মানেও তথৈবচ। স্বভূমিতেই রয়েছে যার যার নিঃশ্বাসোপযোগী অরণ্য, বনস্পতি ও ভেষজ; এভরি জেনারেশন গেটস দি লিট্রেচার ইট ডিজার্ভস, এভরি জেনারেশন গেটস দি আর্ট ইট ডিজার্ভস, এভরি জেনারেশন গেটস দি লিট্রেচার ইট ডিজার্ভস;—সেইটা যার যার নিজের সময়েই, নিজেকেই নিজের জেনারেশনের লিট্রেচার-আর্ট-মিউজ খুঁজে নিতে হয়। ইত্যাকার প্রতীতি মিথ্যে না-হলে যে-কাণ্ড আমরা আজও করে চলেছি, এ থেকে বেরোনো দরকার।

জাহেদ আহমদ রচনাকাল ১৪ মার্চ ২০১৫


আনিসুল হক পরিকল্পিত ও উপস্থাপিত জলসা
ব্যান্ডসাংগীতিক হাওয়ায় শ্বাসবাহী দিনগুলো

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you